২০২৬ সালের জুনে নওগাঁর নাক ফজলি আম কিনে অপরিপক্ব ফল পাওয়ার অভিযোগ তোলেন ক্রেতারা। নাবি মৌসুমের এই আম এক বছর আগে, ২০২৫ সালে, দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছিল। জাগো নিউজ ২৪ ওই বছরের ২৪ জুন এক প্রতিবেদনে জানায়, জিআই স্বীকৃতির পর আমটি নিয়ে দেশজুড়ে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও চাষির বিরুদ্ধে সময়ের আগেই আম পেড়ে বাজারজাত করার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো আমের ভেতরে সেদ্ধভাব, টক স্বাদ ও দুর্গন্ধ পাওয়া গেছে, আবার কোনো আম একেবারেই পাকেনি, শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞরা বলেন, অধিক মুনাফার আশায় অপরিপক্ব আম সংগ্রহ ও রাসায়নিক প্রয়োগের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে জিআই স্বীকৃত নাক ফজলির সুনাম ও বাজার দুটিই ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে তাঁরা সতর্ক করেন।
ক্রেতারা যা বলেছেন
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আরিফ রায়হান জাগো নিউজকে জানান, ২০২৬ সালের ১৩ জুন তিনি নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকায় ৪৫ কেজি নাক ফজলি আম কেনেন। দ্রুত আম হাতে পেয়ে তিনি খুশিই ছিলেন, কিন্তু দুদিন পর খেতে গিয়ে হতাশ হন।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সামান্য পাকার পর নিয়ম মেনেই আম কাটলাম। কিন্তু ভেতরে সেদ্ধভাব, টক স্বাদ আর হালকা দুর্গন্ধ ছিল। দেখে মনে হয়েছে, পরিপক্ব হওয়ার আগেই কোনো রাসায়নিক প্রয়োগ করে পাকানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সব আমই ফেলে দিতে হয়েছে।’
এমন অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর একার নয়। নওগাঁয় কর্মরত এক কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে পত্রিকাটিকে বলেন, জেলায় কর্মরত থাকায় তিনি স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী এই আম একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও আমগুলো পাকেনি, বরং শুকিয়ে চ্যাপ্টা হয়ে যায়। উপহার পাওয়া ব্যক্তি নষ্ট আমের ছবি পাঠালে তিনি বিব্রত ও লজ্জিত হন বলে জানান।
স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জাগো নিউজ জানায়, জিআই স্বীকৃতির পর আমটির চাহিদা ও দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছু চাষি বেশি লাভের আশায় অপরিপক্ব অবস্থাতেই আম সংগ্রহ করেছেন এবং পরে রাসায়নিক প্রয়োগ করে দ্রুত পাকিয়ে বাজারে বিক্রি করেছেন। এতে ক্রেতারা প্রত্যাশিত স্বাদ ও গুণগত মান থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীরা যা বলেছেন
প্রতিবেদনে নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা মনজুর রহমান প্রথমে গাছের বয়সের দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বদলগাছী এলাকার অনেক নাক ফজলি গাছের বয়স বেশি। বয়সজনিত কারণেও কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে আম গবেষণা কেন্দ্রের সহযোগিতা নেওয়া হবে। তারা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন ব্যাখ্যা করেন, পাকানোর রাসায়নিক কীভাবে কাজ করে। তিনি বলেন, ‘বাজারে ইথিলিনভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের রাইপেন পাওয়া যায়। এসব রাসায়নিক প্রয়োগ করলে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আম খাওয়ার উপযোগী দেখায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আম তখনো পরিপক্ব হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে সময় নাক ফজলি পরিপক্ব হওয়ার কথা, তার আগেই বাগান থেকে বেশিরভাগ আম নামিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে ক্রেতারা আম খাওয়ার সময় বুঝতে পারছেন এটি অপরিপক্ব। অনেক ক্ষেত্রে ভেতরে ও বাইরে পচন ধরছে, আবার স্বাদও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের দুই দশকে নাক ফজলি নিয়ে তেমন কোনো অভিযোগ ছিল না। শরফ উদ্দিনের মতে, এর কারণ তখন নির্ধারিত সময়েই আম সংগ্রহ করা হতো। তিনি বলেন, ‘জিআই স্বীকৃতির পর চাহিদা বেড়েছে। বেশি লাভের আশায় কিছু চাষি সঠিক সময়ের আগে আম সংগ্রহ করেছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব এখন বাজারে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে নাক ফজলি আমের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা কমে যাবে। একসময় বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে ঐতিহ্যবাহী এই আম।’
নাক ফজলি: বদলগাছীর নাবি জাতের আম
নাক ফজলি নাবি মৌসুমের আম। ২০২৫ সালের ৬ মে প্রথম আলো যখন এর জিআই স্বীকৃতির খবর প্রকাশ করে, তখন কৃষি কর্মকর্তারা জানান, জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে আমটি পাকে এবং আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এর সংগ্রহকাল। ২০২৬ সালের জুনে জাগো নিউজও একই সময়ের কথা লেখে: সাধারণত জুনের শেষ সপ্তাহে আমটি পরিপক্ব হয় এবং আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সংগ্রহ করা যায়, কিন্তু সেবার স্বাভাবিক সময়ের আগেই বিপুল পরিমাণ নাক ফজলি বাজারে চলে আসে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে কৃষি কর্মকর্তাদের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, ফলটি বেশ বড়, লম্বাটে ও চ্যাপ্টা আকারের। গড়ে এটি লম্বায় ১০ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার, পুরুত্বে ৪ দশমিক ৪ সেন্টিমিটার এবং গড় ওজন ৩০০ গ্রাম। পাকা ফলের ত্বকের রং প্রায় সবুজ থেকে হালকা হলুদাভ, শাঁসের রং হলুদ। আমটি খেতে সুস্বাদু ও মিষ্টি; খোসা পাতলা, আঁটি লম্বা, চ্যাপ্টা ও পাতলা। জাগো নিউজের প্রতিবেদনেও বলা হয়, বড় আকার, পাতলা খোসা, মিষ্টি স্বাদ ও বিশেষ গন্ধের জন্য জাতটি পরিচিত।
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় এই আমের প্রথম চাষ হয়, আর এখনো এই উপজেলাতেই নাক ফজলি সবচেয়ে বেশি চাষ হয়। বদলগাছী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবাব ফারহান ২০২৫ সালের মে মাসে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে নওগাঁর নাক ফজলি সারা দেশের সম্পদ হয়ে গেল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় ২০২৬ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) যে হিসাব দেয়, তাতে সে মৌসুমে নওগাঁয় ৯০০ হেক্টর জমিতে নাক ফজলির বাগান ছিল।
নাক ফজলি রাজশাহীর বহুল পরিচিত ফজলি থেকে আলাদা জাত; রাজশাহীর ফজলি পাকে আরও পরে। ২০২১ সালের অক্টোবরে ওই জাতের জিআই নোটিশ প্রকাশের সময় রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলীম উদ্দিন ইউএনবিকে বলেছিলেন, যা দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস প্রকাশ করে, রাজশাহীর ফজলি জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত পাকে, মুকুল আসা থেকে পরিপক্ব হতে প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস লাগে এবং পাড়ার পর পাকতে সাত থেকে আট দিন সময় নেয়।

জিআই স্বীকৃতি ও এর পেছনের আইন
প্রথম আলোর ২০২৫ সালের মে মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে (ডিপিডিটি) নওগাঁর নাক ফজলি আমের জিআই নিবন্ধনের আবেদন করা হয়। নওগাঁ কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় বদলগাছী নাক ফজলি আম চাষি সমিতি নামের একটি সংগঠন এই আবেদন করে। বিধি অনুযায়ী দুই মাস অপেক্ষার পর কোনো পক্ষ থেকে বিরোধিতার নোটিশ না আসায় আমটির ভৌগোলিক নির্দেশক নাম দেওয়া হয় ‘নওগাঁর নাক ফজলি আম’ এবং সনদ দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের ১ মে বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় নাক ফজলি আমচাষি সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মোজাফ্ফর হোসেনের হাতে জিআই সনদ তুলে দেওয়া হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁর তৎকালীন উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন। পত্রিকাটি জানায়, এই স্বীকৃতির ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বদলগাছীর আমটির পরিচিতি ও চাহিদা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছিল।
বাংলাদেশে ভৌগোলিক নির্দেশক নিবন্ধিত হয় ‘ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী। এটি ২০১৩ সালের ৫৪ নম্বর আইন, রাষ্ট্রপতির সম্মতি পায় ২০১৩ সালের ১০ নভেম্বর। বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থার (ডব্লিউআইপিও) আইনি তথ্যভান্ডার ডব্লিউআইপিও লেক্সের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, এই আইনে ডিপিডিটির ভেতরে একটি ভৌগোলিক নির্দেশক ইউনিট গঠন করা হয়; উৎপাদকদের প্রতিনিধিত্বকারী সমিতি ও সরকারি সংস্থাকে আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়; প্রতিটি আবেদন প্রকাশ করে আপত্তির জন্য দুই মাস সময় রাখার বিধান করা হয়; ভিন্ন উৎসের মিথ্যা ইঙ্গিত দেয় এমন চিহ্নের বিরুদ্ধে নিবন্ধিত নাম সুরক্ষিত করা হয়; এবং দেওয়ানি প্রতিকারের পাশাপাশি সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২১ সালে বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থার সংজ্ঞা তুলে ধরে লেখে, জিআই এমন একটি চিহ্ন, যা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক উৎসের পণ্যে ব্যবহৃত হয় এবং যে পণ্যের গুণ বা খ্যাতি ওই উৎসের কারণেই। রাজশাহীর ফজলিও একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়: রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের আবেদনের ভিত্তিতে ডিপিডিটি ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর সাধারণ নোটিশ প্রকাশ করে, আর দুই মাসের মধ্যে কোনো আপত্তি না এলে জাতটি জিআই সনদ পাওয়ার কথা ছিল। ওই প্রতিবেদনে কেন্দ্রটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রায় ২০০ বছর আগেও ভারতের বাজারে এই আম ‘বাঘা ফজলি’ নামে পরিচিত ছিল।
আম পাড়ার সময়সূচি ও আগাম বাজারে আসা
অপরিপক্ব আম বাজারে আসা ঠেকাতে নওগাঁ জেলা প্রশাসন প্রতিবছর আম পাড়ার সময়সূচি ঘোষণা করে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ মে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে এক মতবিনিময় সভায় সে বছরের সময়সূচি জানানো হয়। এতে ২২ মে থেকে সব ধরনের গুটি জাতের আম, ৩০ মে থেকে গোপালভোগ, ২ জুন থেকে ক্ষীরসাপাত বা হিমসাগর, ৫ জুন থেকে নাক ফজলি, ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া ও হাঁড়িভাঙা, ১৫ জুন থেকে আম্রপালি, ২৫ জুন থেকে ফজলি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো এবং ৫ জুলাই থেকে আশ্বিনা, বারি আম-৪, গৌড়মতি ও কাটিমন আম সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়। আবহাওয়া, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতসহ বিশেষ কারণে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে আগে আম সংগ্রহ করা যাবে বলেও জানানো হয়।
সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, পরিপক্ব আম নামানোর জন্যই এই সময়সূচি; অধিক মুনাফার লোভে নির্ধারিত সময়ের আগে কোনোভাবেই অপরিপক্ব আম সংগ্রহ কিংবা বাজারে তোলা যাবে না, এবং সময়সূচি মানাতে জেলাজুড়ে প্রচারণা চালানো হবে। ৬ জুন তিনি বাসসকে বলেন, অপরিপক্ব আম যেন বাজারে না আসে, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, আর আমে রাসায়নিক দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাক ফজলির জন্য ৫ জুন তারিখটি নতুন ছিল না। দেশ রূপান্তর ২০২৪ সালের ৭ মে জানায়, সে বছরও জেলা প্রশাসন জাতটির জন্য একই দিন নির্ধারণ করেছিল। তখন আগাম আম পাড়ার নিয়মও বলে দেওয়া হয়: নির্ধারিত সময়ের আগে আম পেকে গেলে বাগান মালিককে আবেদন করতে হবে, এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনে অনুমতি দেবেন। অর্থাৎ সরকারি সময়সূচিতে নাক ফজলি পাড়া শুরুর দিন ছিল ৫ জুন, অথচ ২০২৫ সালে প্রথম আলোকে কৃষি কর্মকর্তারা এবং ২০২৬ সালে জাগো নিউজের প্রতিবেদন, দুটিতেই জাতটির স্বাভাবিক পাকার সময় বলা হয়েছে জুনের শেষ সপ্তাহ।
প্রথম আলো ২০২৬ সালের ৬ জুন জানায়, সময়সূচি অনুযায়ী আগের দিন, শুক্রবার ৫ জুন থেকে নওগাঁর সবচেয়ে বড় আমবাজার সাপাহারে নাক ফজলি উঠতে শুরু করে। পত্নীতলা উপজেলার দিবর গ্রামের চাষি সোহেল হোসেন দুটি ভ্যানে আট মণ নাক ফজলি এনেছিলেন; সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল মণপ্রতি এক হাজার ৬০০ টাকা, যেখানে আগের বছর একই সময়ে নাক ফজলি বিক্রি হয়েছিল মণপ্রতি এক হাজার ৯০০ টাকায়। চাষিদের অভিযোগ ছিল, দাম আগের বছরের চেয়ে কম, আর প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সমঝোতার ভিত্তিতে ৪৮ কেজিতে এক মণ ধরে আম বিক্রি করতে হচ্ছে। আড়তদার সমিতির সভাপতি কার্তিক সাহা জানান, বাজারে ২৩০টি আড়ত বসেছে এবং তখন প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ মণ আম উঠছিল। সাপাহারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা রিয়াজ বলেন, ৪০ কেজিতে মণ ধরে কৃষিপণ্য বেচাকেনার বিষয়ে সম্প্রতি পরিপত্র জারি হয়েছে, তবে অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার কোনো অভিযোগ তখনো পাওয়া যায়নি।

নওগাঁর আম অর্থনীতি
প্রথম আলো ২০২৫ সালের মে মাসে জানায়, দুই দশক ধরে নওগাঁয় আমবাগানের পরিসর বাড়ছিল এবং ২০২৪ সালে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদিত হয় এই জেলায়। ২০২৬ মৌসুমের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় বাসসকে জানায়, জেলায় ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির বাগানে আমের ফলন হয়েছে, আগের বছর যা ছিল ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর, আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় চার লাখ ২২ হাজার টন। ২০২৬ সালের ৬ জুন প্রথম আলো কৃষি বিভাগের বরাতে কিছুটা ভিন্ন হিসাব দেয়: ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ, হেক্টরপ্রতি গড়ে ১২ দশমিক ৭৮ টন ফলন ধরে মোট তিন লাখ ৮৭ হাজার ৩৬১ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা, পাশাপাশি ২০০ টন আম বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্য।
বাসসের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে জেলার বাগানের বড় অংশই ছিল আম্রপালির, ১৮ হাজার ৫২২ হেক্টর। এ ছাড়া বারি আম-৪ দুই হাজার ৪৭০ হেক্টরে, আশ্বিনা দুই হাজার ৩২৩ হেক্টরে, ল্যাংড়া এক হাজার ৫৬০ হেক্টরে, খিরসাপাত এক হাজার ৪৭৬ হেক্টরে এবং নাক ফজলি ৯০০ হেক্টরে ছিল; সঙ্গে কিছু বিদেশি জাতের বাগানও ছিল। জেলায় প্রায় ১৬ জাতের আম উৎপাদন হয়, আর সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও পত্নীতলা উপজেলার আংশিক এলাকায় জেলার ৭০ শতাংশের বেশি আমবাগান। জেলার বড় তিনটি আমের মোকাম সাপাহার, নোচনাহার ও মিনাবাজার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নওগাঁর উপপরিচালক হোমায়রা মণ্ডল বাসসকে জানান, জানুয়ারির শেষ দিক থেকে গাছে মুকুল আসতে শুরু করে, আর সে বছর জেলায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার আম বাণিজ্যের সম্ভাবনা ছিল।
পোরশা উপজেলার সরাইগাছী গ্রামের আমচাষি কামাল উদ্দিন মিয়া বাসসকে বলেন, ১২ বছরের জন্য এক বিঘা জমি লিজ নিতে জমির মালিককে বিঘাপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়, এক বিঘায় আম চাষের খরচ প্রায় ৪০ হাজার টাকা, আর খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়।
জাতীয় পর্যায়ে, জাগো নিউজ ২০২৬ সালের ৪ জুন কৃষি অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, ২০২৫ সালে দেশে দুই লাখ সাত হাজার হেক্টর জমিতে ২৬ লাখ ৬২ হাজার টন আম উৎপাদন হয়েছিল এবং দেশি আমের বাজার আনুমানিক ১৩ হাজার কোটি টাকার। তুলনায় রপ্তানি সামান্য: ২০২৫ সালে দুই হাজার ১৯৪ টন। দেশের ১৪টি জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আমের চাষ হচ্ছিল, আর প্রধান জাতগুলো ৫ মে থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ধাপে ধাপে বাজারে আসছিল।
পরিপক্ব আম চেনার উপায়
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আমের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাদের সংকলনে লিখেছে, মুকুল আসার চার থেকে পাঁচ মাস পর সাধারণত আম পরিপক্ব হয়, এবং সবচেয়ে ভালো মানের জন্য সাধারণত শারীরবৃত্তীয়ভাবে পরিপক্ব অবস্থায় আম পেড়ে পরে পাকানো হয়।
সংকলনটিতে মাঠে পরিপক্বতা বোঝার একটি সহজ লক্ষণ দেওয়া আছে: আম পুরোপুরি বেড়ে উঠে পাড়ার উপযোগী হলে হালকা টানেই বোঁটা সহজে ছিঁড়ে আসে; জোরে টানতে হলে বুঝতে হবে ফলটি এখনো কিছুটা অপরিপক্ব, তখন পাড়া উচিত নয়। লালচে জাতের আমে ফলের গোড়ায় বেগুনি লালচে আভা আসাও পরিপক্বতার আরেকটি লক্ষণ। সংকলনে সকালে আম পাড়া, পাড়া আম ছায়ায় রাখা, আম মাটিতে পড়তে না দেওয়া এবং ফলের সঙ্গে খানিকটা বোঁটা রেখে দেওয়ার পরামর্শ রয়েছে, যাতে কষের দাগ ও বোঁটার দিকের পচন কম হয়। এফএওর হিসাবে, সংগ্রহ থেকে খাওয়া পর্যন্ত আমের ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়।
নওগাঁর অভিযোগের কেন্দ্রে যে চর্চা, এফএওর একই লেখায় তারও উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, আগাম বাজার ধরতে মৌসুমের শুরুতে অপরিপক্ব অবস্থায় আম পাড়া একটি প্রচলিত চর্চা, আর এমন আম পাকানোর সহায়ক ছাড়া সমানভাবে পাকে না। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ইথিলিন গ্যাস দিয়ে পাকানোর বিষয়ে সংকলনটি বলছে, সঠিক পর্যায়ে পাড়া আমের জন্য সাধারণত ২৪ ঘণ্টা ইথিলিনের সংস্পর্শই যথেষ্ট; যে আমে ৪৮ ঘণ্টার বেশি ইথিলিন প্রয়োগ লাগে, সেগুলো অপরিপক্ব অবস্থায় পাড়া হয়েছে এবং বাজারজাত করার উপযোগী নয়।
ইথিলিন, ইথোফন ও কার্বাইড: নিয়ম ও গবেষণা যা বলে
ইথিলিন একটি প্রাকৃতিক হরমোন, যা আমসহ বিভিন্ন ফল পাকার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। মাইশা মমতাজ, সানিয়া ইয়াসমিন বুবলি ও মোহিদুস সামাদ খানের লেখা খাদ্যে ভেজাল বিষয়ক একটি পর্যালোচনা ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পিয়ার-রিভিউড সাময়িকী ‘ফুডস’-এ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, সংগ্রহ ও পরিবহনের সময় পচে যাওয়ার ক্ষতি এড়াতে বিক্রেতারা অনেক সময় যথাযথ পরিপক্বতার অনেক আগেই ফল পাড়েন এবং খুচরা বিক্রির ঠিক আগে কৃত্রিমভাবে পাকান; আবার বাড়তি লাভের জন্য মৌসুমের আগেই ফল বিক্রি করতে চাইলেও কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়। পর্যালোচনায় ব্যবহৃত উপাদানের মধ্যে ইথিলিন, ইথানল, মিথানল, প্রোপিলিন, মিথাইল জেসমোনেট, ইথিলিন গ্লাইকল, ইথোফন ও ক্যালসিয়াম কার্বাইডের নাম রয়েছে।
ক্যালসিয়াম কার্বাইড আর্দ্রতার সংস্পর্শে এসে অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করে, যা আমে পাকার প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, শিল্প কাজে ব্যবহৃত ক্যালসিয়াম কার্বাইডে কখনো কখনো ক্যালসিয়াম ফসফাইড, আর্সেনিক সালফাইড ও ফসফিনের মতো অপদ্রব্য থাকে। এতে আরও বলা হয়েছে, ইথিলিন নিঃসরণকারী যৌগ ইথোফন দিয়ে পাকানো ফল ক্যালসিয়াম কার্বাইডে পাকানো ফলের চেয়ে বেশি দিন ভালো থাকে।
বাংলাদেশে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ২০১৮ সালের ২৩ মে ঢাকায় এক কর্মশালায় তাদের অবস্থান তুলে ধরে, দ্য ডেইলি স্টার পরদিন এ খবর দেয়। ইথোফন ও কার্বাইডের উপস্থিতি পাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আম নষ্ট করার সমালোচনা করে বিএফএসএ বলে, সীমিত মাত্রায় ব্যবহার করলে এগুলো ক্ষতিকর নয়। বক্তারা বলেন, অনেক দেশে ফল পাকাতে ইথোফন ব্যবহৃত হয় এবং সেখানে এটি নিষিদ্ধ নয়; সঠিক সময়ের আগে ইথোফন দিয়ে পাকানো ফলে পুষ্টিমান কিছুটা কম হতে পারে, তবে তা খাওয়ার উপযোগী ও ক্ষতিহীন। আর কার্বাইডে পাকানো আম সরাসরি মানুষের ক্ষতি করতে পারে, এ কারণে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী তা নিষিদ্ধ।
একই কর্মশালায় বিএফএসএর সদস্য অধ্যাপক ইকবাল রউফ মামুন বলেন, অন্যান্য দেশে বদ্ধ প্রকোষ্ঠে ইথিলিন গ্যাস দিয়ে ফল পাকানো হয়, কিন্তু বাংলাদেশে গ্যাস আকারে এর ব্যবহার নেই; অনেক অংশগ্রহণকারী নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে ইথিলিন গ্যাস ব্যবহারের ওপর জোর দেন। বিএফএসএর তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন, অভিযানে সময়ের আগে পাকানো ফল পাওয়া গেলে বিক্রেতাদের শাস্তি হওয়া উচিত, তবে ক্ষতিকর নয় এমন ফল নষ্ট করা দুর্ভাগ্যজনক। এফএওর সংকলনেও উল্লেখ আছে, ইসরায়েলে স্থানীয় বাজারের জন্য ফল পাকাতে ইথিলিন প্রয়োগ একটি প্রচলিত চর্চা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কিছু চাষি এর ওপর নির্ভর করেন; সেখানে ফলের চারপাশের বাতাসে গ্যাস দেওয়া হয় এবং তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
বদলগাছী ও নওগাঁ
নাক ফজলির আদি এলাকা বদলগাছী রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার একটি উপজেলা, আয়তন ২১৩ দশমিক ৯৭ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এখানে ৫৯ হাজার ৩৫৮টি খানা এবং দুই লাখ ছয় হাজার ৫৫৭ জন মানুষ। ১৮০৭ সালে থানা হিসেবে গঠিত বদলগাছী ১৯৮৩ সালে উপজেলায় উন্নীত হয়। উপজেলায় আটটি ইউনিয়ন: আধাইপুর, বদলগাছী, বালুভরা, বিলাশবাড়ী, কোলা, মথুরাপুর, মিঠাপুর ও পাহাড়পুর।
পাহাড়পুর ইউনিয়নেই উপজেলার সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন সোমপুর মহাবিহার, যা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নামেও পরিচিত। এটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলগুলোর একটি, ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
নওগাঁ জেলা দেশের উত্তর-পশ্চিমের ঐতিহাসিক বরেন্দ্র অঞ্চলে অবস্থিত; আয়তন প্রায় তিন হাজার ৪৩৫ দশমিক ৬৭ বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় ৮০ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ হয়। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৭ লাখ ৮৪ হাজার ৫৯৯। ধান উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় এই জেলায় আম, পাট, গম, ভুট্টা, আখ, আলু, ডাল ও তেলবীজও চাষ হয়; আর প্রথম আলোর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দশক ধরে এখানে আমবাগানের পরিসর ক্রমাগত বাড়ছিল।

ছবি: Fozli.com / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বাংলাদেশ প্রতিদিন, দেশ রূপান্তর, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য ডেইলি স্টার, ডব্লিউআইপিও লেক্স, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ফুডস (এমডিপিআই), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)