ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও ২০২৬ সালের জুনে বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ আসছিল খুবই কম। জাগো নিউজ ২৪ ১৭ জুন এই আকালের খবর দেয়। এর আগে ২ জুন মঙ্গলবার সকালে কেন্দ্রটি ঘুরে আরটিভি জানায়, সেদিন মোকামে প্রায় ৬০ মণ ইলিশ এসেছিল, অথচ এ সময়ে হাজার মণ ইলিশ পাওয়ার কথা। বাংলাদেশে এক মণ ৪০ কেজি। সরবরাহ কম থাকায় বাজারে ইলিশের দাম বেড়ে গিয়েছিল।
বরিশাল শহর কীর্তনখোলা নদীর তীরে; এটি বরিশাল জেলা ও বিভাগের সদর দপ্তর, আর বরিশাল নদীবন্দর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদীবন্দর। পোর্ট রোডের আড়তগুলো দক্ষিণাঞ্চলের ইলিশ কেনাবেচার বড় কেন্দ্র।
সরবরাহ কম, দাম আকাশছোঁয়া
আরটিভির ২ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রে এক কেজি আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছিল প্রতি কেজি আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায়। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রামের (এলসি) ইলিশ কেজি ২ হাজার ৫০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা, ৫০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ৪০০ গ্রামের ইলিশ কেজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। বিক্রেতারা বলেন, ভরা মৌসুমেও নদীতে ইলিশ না থাকায় সরবরাহ কম, তাই দাম বেশি।
মেসার্স দুলাল ফিশের ম্যানেজার মো. রবিন বলেন, ‘দুয়েক বছর আগেও ভরা মৌসুমে পোর্ট রোডের আড়তে দিনশেষে দুই হাজার মণ ইলিশ বেচাকেনা হতো। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য পুরোপুরি উল্টো।’ তাঁর কথায়, কয়েক দিন ধরে ৬০ মণের বেশি মাছ আসছিল না, ফলে চাহিদা থাকলেও দাম বাড়ছিল।
পোর্ট রোডে মাছ কিনতে আসা শাহিন আরটিভিকে বলেন, আগে যে ইলিশের কেজি ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা ছিল, তা তখন কিনতে হচ্ছিল ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়; তাঁর অভিযোগ, সরবরাহ কমের অজুহাতে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো হয়েছে। ক্রেতা সোহেল রানা বলেন, কম দামের আশায় পাইকারি বাজারে এসেও খুচরা বাজারের মতো দাম দিতে হয়েছে; ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের চারটি ইলিশ তিনি কিনেছেন ৩ হাজার টাকায়।

ধারদেনায় জেলেরা, অপেক্ষা বৃষ্টির
নদীতে ইলিশ ধরতে যাওয়া জেলে আসলাম বলেন, ‘ইলিশও নেই, জাটকাও নেই।’ তিনি জানান, আপাতত ধারদেনায় চলছেন, তবে বৃষ্টি হলে মাছ ধরা পড়বে বলে তাঁর আশা। কীর্তনখোলা নদীর জেলে সগির বলেন, নিষেধাজ্ঞা মেনেই নদীতে নেমেছেন, অথচ ইলিশের দেখা নেই; এমন চলতে থাকলে জাল বেচে দেনা শোধ করতে হবে।

মৌসুম, নিষেধাজ্ঞা ও জাটকার হিসাব
বরিশালের মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান আরটিভিকে বলেন, জুন থেকে ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও ভরা মৌসুম শুরু হয় জুলাইয়ে। বৃষ্টি হলেই সাগর থেকে নদীতে ইলিশ আসবে বলে তিনি আশা করেন, কারণ সে বছর মার্চ ও এপ্রিলে ষষ্ঠ অভয়াশ্রমে কড়া নজরদারিতে জাটকা নিধন কমেছিল। তাঁর কথায়, বড় ইলিশ ধরায় কোনো বাধা ছিল না।
ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন আরটিভিকে জানান, সে বছর এপ্রিলের শেষ নাগাদ চাপিলা আকারের জাটকার ঝাঁক সাগরে চলে গিয়েছিল, আগের বছর যা গিয়েছিল মে মাসের প্রথম সপ্তাহে। মৎস্য অধিদপ্তরের নজরদারিতে এবার জাটকা কম ধরা পড়ায় তাঁদের ধারণা, প্রায় ৯০ শতাংশ জাটকা সাগরে পৌঁছেছে।
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। এটি ডিম ছাড়তে সাগর থেকে নদীর উজানে আসে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সময়ে; ২০১৭ সালে ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। ইউএনবি ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল জানায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদের তথ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয় ৫ লাখ মেট্রিক টন, যা মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ইলিশ রক্ষায় দেশে ছয়টি অভয়াশ্রম রয়েছে, আর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা, পরিবহন ও বিক্রি নিষিদ্ধ।
বাসসের খবর অনুযায়ী, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও টেকসই মাছ উৎপাদনের জন্য বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরায় ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা ১৪ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ১১ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত চলে। অর্থাৎ আরটিভি যখন পোর্ট রোডের চিত্র তুলে ধরে, তখন সাগরে নিষেধাজ্ঞা চলছিল, আর জাগো নিউজের খবরের কয়েক দিন আগে তা শেষ হয়েছিল।

ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, আরটিভি, ইউএনবি, বাসস, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)