সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

গরমের দিনের জন্য আলু দিয়ে শিং মাছের ঝোলের রেসিপি

জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ১০ জুন গরমের দিনের জন্য কম মসলায় আলু দিয়ে শিং মাছের ঝোলের রেসিপি প্রকাশ করে। সঙ্গে শিং মাছের পরিচিতি, খাদ্য উপাদান সারণির পুষ্টিমান ও গরমে খাবার নিরাপদ রাখার নিয়ম।

গরমের দিনের জন্য আলু দিয়ে শিং মাছের ঝোলের রেসিপি
রান্নাবান্না

২০২৬ সালের ১০ জুন অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪ তাদের লাইফস্টাইল বিভাগে গরমের দিনের জন্য আলু দিয়ে শিং মাছের ঝোলের একটি রেসিপি প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তীব্র গরমে শরীর সুস্থ ও সতেজ রাখতে হালকা ও পুষ্টিকর খাবার দরকার, আর কম মসলায় রাঁধা শিং মাছের ঝোল সে সময়ের খাবারের তালিকায় একটি ভালো পছন্দ হতে পারে। রেসিপিতে মাছ ও আলু আলাদা করে হালকা ভেজে নিয়ে পাঁচফোড়নের ফোড়ন, জিরা, আদা বাটা, হলুদ ও মরিচ দিয়ে ঝোল রাঁধার নিয়ম দেওয়া হয়।

রেসিপিটি এসেছিল এক গরম মাসের শুরুতে। ঢাকা টাইমস ২০২৬ সালের ২ জুন জানায়, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে জুন মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি এবং দুই থেকে তিনটি বিচ্ছিন্ন মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহের আভাস দেওয়া হয়েছিল। একই পূর্বাভাসে বলা হয়, জুনের প্রথমার্ধে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু দেশের ওপর বিস্তার লাভ করতে পারে, মাসে পাঁচ থেকে সাত দিন হালকা থেকে মাঝারি বজ্রঝড় হতে পারে এবং বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে।

রেসিপির উপকরণ


জাগো নিউজের রেসিপিতে উপকরণের আলাদা তালিকা বা মাপ দেওয়া হয়নি। রান্নার ধাপগুলোতে যেসব উপকরণের নাম আছে, সেগুলো হলো:

  • শিং মাছ, পরিষ্কার করে ধুয়ে পানি ঝরানো
  • আলু, টুকরো করে কাটা
  • রান্নার তেল, মাছ ও আলু ভাজা এবং ফোড়নের জন্য
  • লবণ, মাছ ও আলু মাখানোর জন্য
  • হলুদ গুঁড়া, মাছ ও আলু মাখানো এবং ঝোলের মসলার জন্য
  • পাঁচফোড়ন, ফোড়নের জন্য
  • জিরা
  • আদা বাটা
  • মরিচ
  • পানি, মসলা কষানো ও ঝোলের জন্য

মূল প্রতিবেদনের ভূমিকায় টাটকা সবজি দিয়ে রান্নার কথাও বলা হয়েছে, তবে রেসিপির ধাপে সবজি হিসেবে কেবল আলুর নাম আছে। মাপ না থাকায় রাঁধুনিকে মাছের পরিমাণ অনুযায়ী লবণ, মসলা ও পানি ঠিক করে নিতে হবে।

রান্নার ধাপ


জাগো নিউজের দেওয়া পদ্ধতি অনুযায়ী রান্নাটি ছয়টি ধাপে করা যায়:

  • শিং মাছ পরিষ্কার করে ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন।
  • মাছে অল্প লবণ ও হলুদ মাখিয়ে গরম তেলে হালকা করে ভেজে আলাদা করে রাখুন।
  • একই তেলে আলুর টুকরোয় সামান্য লবণ ও হলুদ মিশিয়ে হালকা বাদামি রং হওয়া পর্যন্ত ভেজে তুলে নিন।
  • কড়াইয়ে দরকার হলে আরও একটু তেল দিয়ে পাঁচফোড়নের ফোড়ন দিন। সুবাস বের হলে জিরা, আদা বাটা, হলুদ গুঁড়া ও মরিচ সামান্য পানিতে মিশিয়ে দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিন।
  • মসলা থেকে তেল আলাদা হয়ে এলে ভাজা আলু ও পরিমাণমতো পানি দিন। ঝোল ফুটে আলু নরম হয়ে এলে ভেজে রাখা মাছ দিন।
  • মাঝারি আঁচে আরও চার থেকে পাঁচ মিনিট রান্না করুন। ঝোল পছন্দমতো ঘন হলে চুলা থেকে নামিয়ে পরিবেশন করুন।

এ পদ্ধতিতে মাছ আগে ভেজে নেওয়া হয় এবং আলু সেদ্ধ হওয়ার পর ঝোলে দেওয়া হয়, ফলে মাছ শেষ ধাপে অল্প সময় ঝোলে থাকে। মাছ ও আলু মাখাতে হলুদ এবং ঝোলের মসলায় আবার হলুদ গুঁড়া ব্যবহারের কথা আছে; ফোড়নে পাঁচফোড়ন ছাড়া আলাদা পেঁয়াজ বা রসুনের উল্লেখ নেই।

শিং মাছ কোন মাছ


শিং মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Heteropneustes fossilis। বাংলাদেশের মিঠাপানির জীববৈচিত্র্য পোর্টাল অনুযায়ী এর ইংরেজি নাম স্টিংগিং ক্যাটফিশ বা ফসিল ক্যাটফিশ। জার্মান প্রকৃতিবিদ মার্কাস এলিয়েজার ব্লখ ১৭৯৪ সালে মাছটিকে Silurus fossilis নামে প্রথম বর্ণনা করেন। মাছটি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও ভুটানের স্থানীয় প্রজাতি; ইরানের টাইগ্রিস অববাহিকায় এটি বাইরে থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মিঠাপানির জীববৈচিত্র্য পোর্টালের বর্ণনায় শিংয়ের দেহ লম্বাটে ও দুই পাশে চাপা, মাথা চ্যাপ্টা এবং মুখের চারপাশে চার জোড়া শুঁড় থাকে; লেজের পাখনা গোলাকার। মাছের তথ্যভান্ডার ফিশবেস অনুযায়ী এর সর্বোচ্চ লিপিবদ্ধ দৈর্ঘ্য ৪১.২ সেন্টিমিটার এবং সর্বোচ্চ লিপিবদ্ধ ওজন ৪০০ গ্রাম, যদিও সাধারণভাবে এটি প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হয়। মাছটি মিঠাপানির, তবে সামান্য লোনা পানিও সইতে পারে; থাকে পানির তলার দিকে, এক মিটারের কম গভীরতায়।

বাংলাদেশে শিং প্রধানত পুকুর, ডোবা ও জলাভূমিতে পাওয়া যায়, কখনো কখনো ঘোলা পানির নদীতেও। এর বিশেষত্ব হলো বাতাস থেকে শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা: ফুলকার প্রকোষ্ঠ থেকে দেহের ভেতরে লম্বা বায়ুথলি চলে গেছে, যা ফুসফুসের মতো কাজ করে। ফিশবেস একে প্রয়োজনে বাতাসে শ্বাস নেওয়া মাছ হিসেবে বর্ণনা করে। মাছটি সর্বভুক এবং বর্ষায় আবদ্ধ জলাশয়ে ডিম ছাড়ে; বৃষ্টির পানি যথেষ্ট জমলে পুকুর ও ডোবাতেও প্রজনন করতে পারে।

একটি শিং মাছ (Heteropneustes fossilis); মুখের শুঁড় ও লম্বাটে দেহ দেখা যাচ্ছে। ছবি: দিব্য দত্ত / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
একটি শিং মাছ (Heteropneustes fossilis); মুখের শুঁড় ও লম্বাটে দেহ দেখা যাচ্ছে। ছবি: দিব্য দত্ত / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) বিশ্বপর্যায়ে শিংকে ‘ন্যূনতম উদ্বেগ’ শ্রেণিতে রেখেছে; ফিশবেস অনুযায়ী মূল্যায়নটি হয় ২০১৯ সালের ১১ আগস্ট। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে উল্লেখ আছে, আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের লাল তালিকাতেও মাছটি ‘ন্যূনতম উদ্বেগ’ শ্রেণিতে। ফিশবেস মাছটিকে বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণে ‘অত্যন্ত বাণিজ্যিক’ প্রজাতি বলে চিহ্নিত করেছে, যা চাষ ও অ্যাকুয়ারিয়াম ব্যবসায়ও ব্যবহৃত হয়। তথ্যভান্ডারটি আরও বলে, প্রচলিত ঔষধি গুণের ধারণার কারণে মাছটির চাহিদা বেশি; এ প্রতিবেদনের জন্য পড়া কোনো স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের উৎস নির্দিষ্ট কোনো ঔষধি গুণ নিশ্চিত করেনি।

কাঁটায় বিষ: মাছ কাটার সময় সাবধানতা


শিংয়ের ইংরেজি নামের ‘স্টিংগিং’ শব্দটি এসেছে এর বিষাক্ত কাঁটা থেকে। মাছটির বুকের দুই পাখনায় একটি করে শক্ত কাঁটা থাকে, আর সেই কাঁটার সঙ্গে থাকে একটি বিষগ্রন্থি। এই কাঁটা মানুষের গায়ে ফুটলে তা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হয়। ফিশবেস শিংকে বুকের কাঁটার কারণে বিষাক্ত মাছের তালিকায় রেখেছে এবং মানুষের জন্য আঘাতজনিত ঝুঁকির শ্রেণিতে চিহ্নিত করেছে।

তাই শিং মাছ কেনা, ধোয়া ও কাটার সময় বুকের পাখনার কাঁটা থেকে হাত সাবধানে রাখা দরকার। কাঁটা ফুটে গেলে এবং ব্যথা বা ফোলা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রথম আলোর ২০২১ সালের একটি রেসিপিতে মাছ কেটে ভালোভাবে ধুয়ে টুকরো করে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে; জাগো নিউজের রেসিপিতে মাছ পরিষ্কার করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নেওয়ার কথা আছে।

পুষ্টিমান: খাদ্য উপাদান সারণি কী বলে


জাগো নিউজের প্রতিবেদনে শিং মাছকে প্রোটিন, আয়রন ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ বলা হয়েছিল। দেশের খাবারের পুষ্টিমানের প্রামাণ্য উৎস ‘ফুড কম্পোজিশন টেবল ফর বাংলাদেশ’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (আইএনএফএস) ২০১৩ সালের জুনে সারণিটি প্রকাশ করে; জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তাদের খাদ্য উপাদান তথ্যভান্ডারে এটি রাখে। সারণির সব মান খাওয়ার উপযোগী অংশের প্রতি ১০০ গ্রামের হিসাবে দেওয়া।

সারণিটি তৈরি করেন নাজমা শাহীন, আবু তোরাব এম এ রহিমসহ আইএনএফএসের গবেষকেরা, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ফুড পলিসি ক্যাপাসিটি স্ট্রেংদেনিং প্রোগ্রাম (এনএফপিসিএসপি) ও এফএওর সহায়তায় এবং ইউএসএআইডি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায়। এতে ৩৮১টি খাবারের ৮৭টি উপাদানের মান আছে। দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি সংস্থার তথ্য সংকলনের পাশাপাশি ২০টি প্রধান খাবার গবেষণাগারে বিশ্লেষণ করা হয়; যেসব মান পাওয়া যায়নি, সেগুলো ভারত ও ভিয়েতনামের খাদ্য উপাদান সারণি, ইউএসডিএ ও বৈজ্ঞানিক সাময়িকী থেকে নেওয়া হয়। একই খাবারের বিভিন্ন উৎসের মানের গড় করে সারণির মান ঠিক করা হয়েছে; শিং মাছের মানের উৎসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের কয়েকটি স্নাতকোত্তর গবেষণাও আছে।

এর আগে দেশের খাবারের পুষ্টিমানের প্রথম প্রতিবেদন ‘নিউট্রিটিভ ভ্যালুজ অব সাম কমন ফুড স্টাফস’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে, তাতে ১০৮টি কাঁচা খাবারের তথ্য ছিল। আইএনএফএস ১৯৭৭ সালে সেটি সংশোধন করে ‘দেশীয় খাদ্যদ্রব্যের পুষ্টিমান’ নামে পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে। ১৯৮৮ সালে হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও আইএনএফএস মিলে প্রকাশ করে ‘টেবলস অব নিউট্রিয়েন্ট কম্পোজিশন অব বাংলাদেশি ফুডস’, যাতে ৩৩৮টি কাঁচা খাবারের মাত্র ১৩টি উপাদানের মান ছিল। পুরোনো ও অসম্পূর্ণ তথ্যের এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই ২০১৩ সালের নতুন সারণি তৈরি হয়।

সারণিতে কাঁচা, কাঁটা ছাড়া শিং মাছের প্রতি ১০০ গ্রামে যে মান দেওয়া আছে, তা হলো:

  • শক্তি: ১০১ কিলোক্যালরি
  • পানি: প্রায় ৭৬.৭ গ্রাম
  • প্রোটিন: প্রায় ১৭.২ গ্রাম
  • চর্বি: প্রায় ৩.৫ গ্রাম
  • শর্করা: ০ গ্রাম
  • ক্যালসিয়াম: প্রায় ৩১৯ মিলিগ্রাম
  • আয়রন: প্রায় ২.১ মিলিগ্রাম
  • ফসফরাস: প্রায় ৩০৪ মিলিগ্রাম
  • পটাশিয়াম: প্রায় ৪৩৪ মিলিগ্রাম
  • সোডিয়াম: প্রায় ৮৩ মিলিগ্রাম
  • জিংক: প্রায় ০.৫৫ মিলিগ্রাম
  • ভিটামিন এ: প্রায় ১৬ মাইক্রোগ্রাম (রেটিনল কার্যকারিতা সমতুল্য)

একই সারণিতে শিং মাছের খাওয়ার উপযোগী অংশের সহগ ০.৭৫ ধরা হয়েছে, অর্থাৎ বাজার থেকে কেনা মাছের বাকি অংশ মাথা, কাঁটা বা অন্য ফেলে দেওয়া অংশ। তুলনার জন্য সারণির অন্য কয়েকটি মাছের মান দেখা যায়। কাঁচা দেশি কই মাছের প্রতি ১০০ গ্রামে শক্তি ১৩০ কিলোক্যালরি, প্রোটিন প্রায় ১৭.৫ গ্রাম, চর্বি প্রায় ৬.৬ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৪১০ মিলিগ্রাম ও আয়রন প্রায় ১.২ মিলিগ্রাম। রুই, কাতলা ও মৃগেলের চামড়াসহ পিঠের অংশে শক্তি ১০৪ কিলোক্যালরি, প্রোটিন প্রায় ১৯.৭ গ্রাম, চর্বি প্রায় ২.৮ গ্রাম, ক্যালসিয়াম প্রায় ৩৮ মিলিগ্রাম ও আয়রন প্রায় ০.৯ মিলিগ্রাম। চোখসহ পুরো মলা মাছে ক্যালসিয়াম প্রায় ৭৬৭ মিলিগ্রাম ও আয়রন প্রায় ৩.৮ মিলিগ্রাম।

অর্থাৎ সারণির হিসাবে শিং মাছে প্রোটিন রুই-কাতলার কাছাকাছি, চর্বি কইয়ের চেয়ে কম, আর ক্যালসিয়াম ও আয়রন রুই-কাতলার পিঠের অংশের চেয়ে বেশি, যদিও মলার মতো পুরো খাওয়া ছোট মাছের চেয়ে কম। সৌদি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেসে ২০২১ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশি গবেষকদের একটি গবেষণাপত্রেও শিংকে প্রোটিন, আয়রন ও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস এবং কম চর্বি ও সহজে হজম হওয়া মাছ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

মূল প্রতিবেদনে শিং মাছ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় বলে যে দাবি ছিল, কোনো স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের উৎসে তা পাওয়া যায়নি বলে এ সংস্করণে রাখা হয়নি। রান্নার পর পুষ্টিমান কিছুটা বদলায়, আর তেলে ভাজলে চর্বির পরিমাণ বাড়ে। কারও বিশেষ খাদ্যাভ্যাস বা রোগের কারণে খাবার বাছাই করতে হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রজনন মৌসুম ও চাষ


বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গাজনার বিলে শিং মাছের প্রজনন নিয়ে মো. রবিউল হাসান, মো. ইয়ামিন হোসাইন, জান্নাতুল মাওয়া ও মোস্তফা এ. আর. হোসাইনের গবেষণাটি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেসে প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে নমুনা নিয়ে মোট ৪২৬টি স্ত্রী শিং মাছ পরীক্ষা করেন।

গবেষণায় দেখা যায়, এপ্রিল থেকে আগস্ট শিংয়ের প্রজনন মৌসুম এবং জুন মাসে ডিম ছাড়ার হার সর্বোচ্চ। প্রথম যৌন পরিপক্বতার সময় মাছের দৈর্ঘ্য বিভিন্ন পদ্ধতিতে ১৩ থেকে ১৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে পাওয়া যায়, আর একেকটি স্ত্রী মাছে ডিমের সংখ্যা ছিল ১,৭৩০ থেকে ২৩,৮৭০টি। গবেষকেরা সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুমের ভিত্তিতে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় ঠিক করার সুপারিশ করেন। তাঁরা আরও লেখেন, তাপমাত্রা বাড়া ও বৃষ্টি কমার কারণে প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ের অর্ধেকজুড়ে বেশির ভাগ বিল শুকিয়ে থাকে।

একই গবেষণাপত্রে বলা হয়, কার্যকর চাষপ্রযুক্তি এবং মানসম্মত পোনার অভাবে বাংলাদেশে শিং চাষ তখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। এককভাবে শিং চাষের জন্য গবেষকেরা হেক্টরপ্রতি ১ লাখ ২৫ হাজার পোনা মজুত, ৪০ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত খাবার এবং দিনে দুবার খাবার দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। চাষ শুরুর আগে চাষিদের উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া ভালো।

সরকারি মৎস্য পরিসংখ্যানে শিং মাছ কই ও মাগুরের সঙ্গে ‘লাইভ ফিশ’ বা জিওল মাছের দলে গোনা হয়। গাজাহ মাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য সাময়িকীতে ২০২৪ সালে প্রকাশিত মেহেদী হাসান মানিকের এক বিশ্লেষণে মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য ধরে প্রজাতিভিত্তিক এই শ্রেণিবিভাগ দেখানো হয়েছে। প্রথম আলো ২০২৪ সালের ১০ জুন জানায়, এফএওর ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৪’ প্রতিবেদনে ২০২২ সালের তথ্যে মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়, যার পরিমাণ ১৩ লাখ ২২ হাজার টন। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে সরকারি বার্তার বরাতে জানায়, এফএওর হিসাবে বদ্ধ জলাশয়ে চাষের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ পঞ্চম।

পাঁচফোড়ন ও বাংলা রান্নায় মাছের ঝোল


রেসিপির ফোড়নে যে পাঁচফোড়ন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, তা পাঁচটি গোটা মসলার মিশ্রণ: মেথি, জিরা, কালোজিরা, সরিষা ও মৌরি, সাধারণত সমান ভাগে। মেথির হালকা তেতো স্বাদের কারণে কেউ কেউ মেথি কম দেন, আবার কেউ সরিষার বদলে রাঁধুনি ব্যবহার করেন। অন্য অনেক মসলা মিশ্রণের মতো এটি গুঁড়া করা হয় না; গরম তেলে গোটা অবস্থায় ছেড়ে সুবাস বের করে তারপর অন্য উপকরণ দেওয়া হয়, যাকে ফোড়ন দেওয়া বলে। পাঁচফোড়নের উৎপত্তি বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতে; পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা, বিহারের ভোজপুরি অঞ্চল, আসাম ও নেপালের রান্নাতেও এর ব্যবহার আছে।

পাঁচফোড়ন: মেথি, জিরা, কালোজিরা, সরিষা ও মৌরির মিশ্রণ। ছবি: Wiki-uk / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
পাঁচফোড়ন: মেথি, জিরা, কালোজিরা, সরিষা ও মৌরির মিশ্রণ। ছবি: Wiki-uk / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় ২০২২ সালের ১২ এপ্রিল প্রকাশিত ‘ঝোল, ঘাটের থেকে ঘরের’ লেখায় শাহানা হুদা রঞ্জনা লেখেন, ‘ঝোল’ শব্দটি এসেছে ‘ঝোর’ থেকে, আর রামায়ণ, চৈতন্যচরিতামৃত ও ধর্মমঙ্গলে ঝোলের উল্লেখ আছে। তাঁর লেখায় বলা হয়, মাগুর, শিং ও শোল মাছের সঙ্গে আলু, বেগুন, কপি ও টমেটোর ঝোল হতে পারে। অঞ্চলভেদে ঝোলের ঘনত্বেও পার্থক্যের কথা তিনি লেখেন: চট্টগ্রামের মানুষ শুকনো ধরনের তরকারি পছন্দ করেন, ময়মনসিংহ ও হাওর অঞ্চলে ঘন ঝোলের চল, আর সুনামগঞ্জের পাতলা মাছের ঝোলের তিনি বিশেষ প্রশংসা করেন।

শিংয়ের ঝোল আলু ছাড়া অন্য উপকরণেও রাঁধা হয়। প্রথম আলোর ২০২১ সালের ১৫ মার্চ প্রকাশিত দেশি মাছের রেসিপির আয়োজনে কল্পনা রহমানের ‘শিমের বিচিতে শিং মাছের ঝোল’-এর উপকরণ ছিল শিং মাছ ৩ থেকে ৪টি, শিমের বিচি ১ কাপ, পাকা টমেটো ২টি, কাঁচা মরিচ ৫ থেকে ৬টি, ধনেপাতা ১ মুঠো ও হলুদ গুঁড়া ১ চা-চামচ। সেই পদ্ধতিতে টমেটো গরম পানিতে এক মিনিট সেদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে টুকরো করা হয়, তেলে বাটা ও গুঁড়া মসলা, এক কাপ পানি ও টমেটো দিয়ে কষানো হয়, টমেটো গলে গেলে মাছ কষিয়ে তুলে রাখা হয়, তারপর শিমের বিচি কষিয়ে ঝোল দেওয়া হয় এবং বিচি মোটামুটি সেদ্ধ হলে মাছ, কাঁচা মরিচ ও ধনেপাতা দিয়ে ঝোল থাকতে থাকতে নামানো হয়।

আলু দিয়ে রাঁধা কই মাছের ঝোল, শিংয়ের ঝোলের মতো বাংলা রান্নার একটি পরিচিত পদ। ছবি: Sirsendu.mohanta / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
আলু দিয়ে রাঁধা কই মাছের ঝোল, শিংয়ের ঝোলের মতো বাংলা রান্নার একটি পরিচিত পদ। ছবি: Sirsendu.mohanta / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

গরমে রান্না করা খাবার নিরাপদ রাখা


গরমের দিনে রান্না করা খাবার দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিরাপদ খাবারের জন্য পাঁচটি মূল নিয়ম দিয়েছে: পরিষ্কার রাখা; কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা; ভালোভাবে রান্না করা; খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখা; এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করা।

সংস্থাটির নির্দেশনা অনুযায়ী মাংস, পোলট্রি, ডিম ও সামুদ্রিক খাবার বিশেষভাবে ভালো করে রান্না করতে হবে; গবেষণায় দেখা গেছে, খাবার ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পর্যন্ত রান্না করলে তা খাওয়ার জন্য নিরাপদ হতে সাহায্য করে। রান্না করা খাবার আবার গরম করলে তা পুরোপুরি গরম করতে হবে। কাঁচা মাছ-মাংস কাটার ছুরি ও কাটার বোর্ড আলাদা রাখার পরামর্শও এই নিয়মে আছে।

ডব্লিউএইচওর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রান্না করা খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি রেখে দেওয়া যাবে না। রান্না করা ও পচনশীল খাবার দ্রুত ফ্রিজে রাখতে হবে, সম্ভব হলে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে; পরিবেশনের আগ পর্যন্ত গরম খাবার ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় রাখতে হবে; ফ্রিজেও খাবার বেশি দিন রাখা যাবে না; আর হিমায়িত খাবার ঘরের তাপমাত্রায় রেখে গলানো যাবে না। সংস্থাটির ব্যাখ্যা, ঘরের তাপমাত্রায় জীবাণু খুব দ্রুত বাড়ে, আর ৫ ডিগ্রির নিচে বা ৬০ ডিগ্রির ওপরে রাখলে তাদের বৃদ্ধি ধীর হয় বা থেমে যায়। কাঁচামাল কেনার ক্ষেত্রেও টাটকা ও ভালো মানের খাবার বেছে নিতে বলা হয়েছে।

খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্ব বোঝাতে ডব্লিউএইচও ২০২৬ সালের ৪ জুন হালনাগাদ করা তথ্যপত্রে জানায়, ২০২১ সালের হিসাবে বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় প্রতি ৯ জনে ১ জন, দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হন এবং ১৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যান। অনিরাপদ খাবারজনিত স্বাস্থ্য-বোঝার ২৯ শতাংশ বহন করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা।

ছবি: AravindManoj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১০ জুন ২০২৬), ঢাকা টাইমস (২ জুন ২০২৬), ফুড কম্পোজিশন টেবল ফর বাংলাদেশ (আইএনএফএস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৩; এফএও), ফিশবেস, বাংলাদেশের মিঠাপানির জীববৈচিত্র্য পোর্টাল, সৌদি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস (হাসান ও অন্যান্য, ২০২১), জার্নাল পেরিকানান ইউনিভার্সিটাস গাজাহ মাদা (মানিক, ২০২৪), প্রথম আলো (১৫ মার্চ ২০২১ ও ১০ জুন ২০২৪), ঢাকা ট্রিবিউন (৩০ জুলাই ২০২৪), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (১২ এপ্রিল ২০২২), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)