দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান ২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর জানান, বজ্রপাতের প্রভাব কমাতে সরকার দেশজুড়ে তালগাছের চারা রোপণের কর্মসূচি নিয়েছে এবং সে সময় পর্যন্ত প্রায় ৩৮ লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে। ওই দিন রাজধানীর স্পেকট্রা কনভেনশন সেন্টারে ব্র্যাক আয়োজিত ‘বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ তথ্য দেন। সংবাদ সংস্থা ইউএনবির বরাতে খবরটি প্রকাশ করে ঢাকা ট্রিবিউন; একই দিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডও ৩৮ লাখ তালগাছ রোপণের তথ্য জানায়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “এ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। দুর্যোগ-বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলিতেও (এসওডি) বজ্রপাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”
প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া মৃত্যুর হিসাব
প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে দেশে কমপক্ষে ১ হাজার ৭৬০ জন মানুষ নিহত হন। ২০১৬ সালে মাত্র চার দিনে বজ্রপাতে ৮১ জনের প্রাণহানি ঘটে, আর ২০১৮ সালে নিহত হন ৩৫৯ জন।
বজ্রপাতকে সরকার দেশের দুর্যোগের তালিকায় যুক্ত করেছে। প্রতিমন্ত্রী এর সাল হিসেবে ২০১৫ উল্লেখ করেন; তবে ভয়েস অব আমেরিকা ২০১৬ সালের জুনে এই অন্তর্ভুক্তির খবর দেয়। সংস্থাটির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, খরা ও নদীভাঙনের মতো সরকারি দুর্যোগের তালিকায় বজ্রপাত যোগ হওয়ায় নিহতদের পরিবার সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পায়।

মাঠের কৃষক কেন বেশি ঝুঁকিতে
বৈঠকের এক সপ্তাহ আগে, ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর, বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সাইডেভ ডটনেট ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশনে প্রকাশিত একটি গবেষণার কথা জানায়, যার লেখক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এম রফিউদ্দিন। গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালে দেশে বজ্রপাতে নথিভুক্ত ১ হাজার ৪৩৪ জনের মৃত্যুর অর্ধেকই কৃষি খাতের মানুষ। বজ্রপাত সবচেয়ে বেশি হয় মার্চ থেকে জুনের প্রাক্-বর্ষা মৌসুমে, যখন মাঠে কৃষিকাজও চলে সবচেয়ে বেশি; এ সময় গড়ে দিনে ১.৭৩ জনের মৃত্যু হয়। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুনের শুরু পর্যন্ত বজ্রপাত সবচেয়ে ঘন ঘন ঘটে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী মুরাদ আহমেদ ফারুখ সাইডেভকে বলেন, বঙ্গোপসাগরের আর্দ্র গরম বাতাস হিমালয়ের দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে মিশে বজ্রঝড় তৈরি করে। কৃষকদের সুরক্ষায় তিনি উঁচু গাছ লাগানো এবং বজ্রপাতকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে উঁচু খুঁটি বসানোর পরামর্শ দেন।

তালগাছ কেন বেছে নেওয়া হলো
ভয়েস অব আমেরিকার ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে দেশি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়, বন উজাড়ে যেসব উঁচু গাছ আগে বজ্রপাত নিজের দিকে টেনে নিত, সেগুলো হারিয়ে যাওয়াও মৃত্যু বাড়ার একটি কারণ হতে পারে। তালগাছ (Borassus flabellifer) দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি পাখার মতো পাতাওয়ালা পাম, যা ২০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, কিছুটা খরা সহ্য করতে পারে এবং শত বছরের বেশি ফল দিতে পারে। এর ফল, রস, পাতা ও কাণ্ড সবই কাজে লাগে।

সরকারের সামনের অগ্রাধিকার
প্রতিমন্ত্রী জানান, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা ব্যবস্থাপনায় দেশে পরীক্ষিত মডেল থাকলেও বজ্রপাত ব্যবস্থাপনায় তখনো তা ছিল না। এ সীমাবদ্ধতা কাটাতে সরকার অবকাঠামোগত ও অ-অবকাঠামোগত দুই ধরনের সমাধানই চায়, আর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছিল গবেষণায়, কারণ বজ্রপাত নিয়ে সব স্তরে অনেক ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। তাঁর বর্ণনায় সরকারের অগ্রাধিকারগুলো ছিল:
- বজ্রপাতের ঝুঁকি ও প্রাণহানি বাড়ার কারণ নির্ণয় করে তা কমানোর উপায় নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা
- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাঠ্যবইয়ে বজ্রপাত বিষয়ে প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা
- আগাম বার্তা দিতে গবেষণা এবং আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া ও জনগণকে জানানোর ব্যবস্থা
- সচেতনতার জন্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও গান তৈরি
- বিল্ডিং কোডে বজ্রপাত বিষয়ে নির্দেশনা বাস্তবায়ন
- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় সচেতনতা কার্যক্রমে উৎসাহিত করা
ছবি: Reaid Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন (ইউএনবি), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, সাইডেভ ডটনেট, ভয়েস অব আমেরিকা, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)