পুকুরে চাষ করা মাছের একটি পরিচিত সমস্যা মাছের উকুন রোগ, যার কারণ আরগুলাস (Argulus) নামের একটি বহিঃপরজীবী। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মৎস্য বিভাগের তথ্যে এ রোগের লক্ষণ, প্রতিরোধ ও প্রতিকার নিয়ে এই প্রতিবেদন ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার মৎস্য সম্প্রসারণ বিভাগ এবং বাংলাদেশে করা গবেষণার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে এখানে তা হালনাগাদ করা হলো।
আরগুলাস কী এবং কীভাবে ক্ষতি করে
আরগুলাস একধরনের ক্রাস্টেশিয়ান বা কবচী প্রাণী, কাঁকড়া ও চিংড়ির আত্মীয়। উইকিপিডিয়ার তথ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই গণের ১৩৮টি প্রজাতি স্বীকৃত। ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার তথ্যপত্র অনুযায়ী, এর দেহ চ্যাপ্টা ও ডিম্বাকার, ওপরে চওড়া খোলস এবং দুটি যৌগিক চোখ থাকে। মুখনলের সামনে সুচের মতো একটি শুঁড় (স্টাইলেট) দিয়ে এটি মাছের চামড়া ফুটো করে দেহরস গ্রহণ করে, আর মুখের দুই পাশের দুটি বড় চোষক দিয়ে মাছের গায়ে আটকে থাকে। পূর্ণবয়স্ক Argulus foliaceus লম্বায় প্রায় ৩ থেকে ৭ মিলিমিটার, তাই এদের খালি চোখেই দেখা যায়।
আরগুলাসের জীবনচক্র সম্পূর্ণ হতে প্রজাতি ও পানির তাপমাত্রাভেদে ৩০ থেকে ৬০ দিন লাগে। স্ত্রী উকুন মাছের গা ছেড়ে পুকুরের শক্ত কোনো তল বা জলজ উদ্ভিদে ডিম পাড়ে, তারপর আবার মাছে ফিরে আসে। Argulus japonicus-এর ডিম ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ১০ দিনে ফোটে, কিন্তু ১৫ ডিগ্রিতে লাগে ৬১ দিন। অনেক প্রজাতির সদ্য ফোটা বাচ্চাকে ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে আশ্রয়দাতা মাছ খুঁজে নিতে হয়, নইলে মারা যায়। পূর্ণবয়স্ক উকুন মাছ ছাড়াও কয়েক দিন বেঁচে থাকতে পারে।

রোগের লক্ষণ
উকুন মাছের চামড়া, পাখনা, ফুলকার প্রকোষ্ঠ ও মুখে লেগে থাকে। আটকে থাকার জায়গায় প্রদাহ হয়। আক্রান্ত মাছে সাধারণত যেসব লক্ষণ দেখা যায়:
- দেহে বা পাখনায় খালি চোখে দেখা যায় এমন গোলাকার, চ্যাপ্টা উকুন
- চামড়ায় বিন্দু বিন্দু রক্তক্ষরণ এবং আক্রান্ত স্থানের চারপাশ লালচে হওয়া
- আঁশ ও পাখনা ক্ষয়, দেহে অতিরিক্ত পিচ্ছিল শ্লেষ্মা
- পুকুরের তলা বা শক্ত কিছুতে গা ঘষা, অস্থির বা এলোমেলো সাঁতার
- খাবার কম খাওয়া, নিস্তেজ হয়ে পানির ওপরের দিকে ভেসে থাকা, রক্তশূন্যতা ও স্বাস্থ্য খারাপ হওয়া
ক্ষতস্থানে পরে অ্যারোমোনাস ব্যাকটেরিয়া ও স্যাপ্রোলেগনিয়া নামের জলজ ছত্রাকসদৃশ জীবের সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। আরগুলাস কার্পজাতীয় মাছের স্প্রিং ভিরেমিয়া নামের ভাইরাস রোগও বহন করতে পারে।

বাংলাদেশের রুই ও টাকি মাছে আরগুলাস
এফএওর রুই মাছ চাষবিষয়ক তথ্যপত্র অনুযায়ী, বেশি ঘনত্বে মাছ ছাড়া পুকুরে আরগুলাস রুইয়ের জন্য অন্য কার্পের চেয়ে বড় সমস্যা; এতে মাছের বৃদ্ধি কমে, কখনো মাছ মারাও যায়। মিশ্রচাষে কাতলা ও মৃগেলের চেয়ে রুই এ পরজীবীতে বেশি আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে রুই মাছে আরগুলাস পাওয়ার কথা ২০০২ সালের এক গবেষণায় নথিভুক্ত হয়েছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভেটেরিনারি মেডিসিন অ্যান্ড সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় খুলনার চারটি মাছবাজার থেকে ২০২৩ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগ্রহ করা ১৪০টি টাকি মাছের ৮৫টিতে Argulus japonicus পাওয়া যায়, অর্থাৎ ৬০.৭ শতাংশ। আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি ছিল ডিসেম্বরে, ৭৫ শতাংশ। উকুন বেশি ছিল ফুলকা, চোখের চারপাশ ও দেহের বাইরের অংশে।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার
উকুন একবার ছড়িয়ে পড়লে দূর করা কঠিন, তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা ও এফএওর পরামর্শ অনুযায়ী:
- নতুন মাছ, বিশেষ করে প্রাকৃতিক উৎস বা অন্য পুকুর থেকে আনা মাছ, কিছুদিন আলাদা রেখে পর্যবেক্ষণ করে তারপর পুকুরে ছাড়ুন
- পুকুরে যে পানি ঢোকানো হয় তা দিয়ে যেন উকুনের ডিম না আসে, সম্ভব হলে পানি ছেঁকে নিন
- নিয়মিত জাল টেনে মাছের গা ও পাখনা পরীক্ষা করুন এবং উকুন দেখা দিলে দেরি না করে ব্যবস্থা নিন
- আক্রান্ত মাছ সরিয়ে আলাদা করুন; শুধু মাছের গা থেকে উকুন তুলে ফেললে হয় না, কারণ ডিম ও বাচ্চা পুকুরেই থেকে যায়
- মারাত্মকভাবে আক্রান্ত পুকুরের পানি সরিয়ে পুকুর শুকিয়ে ফেলুন (এফএও)
- এফএওর তথ্যপত্রে আক্রান্ত মাছকে স্বল্প সময়ের জন্য ৫ পিপিএম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণে ডুবিয়ে নেওয়ার কথা আছে
ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার তথ্যপত্র জানায়, ট্রাইক্লোরফন (বাণিজ্যিক নাম ডাইলকস) নামের অর্গানোফসফেট কীটনাশক একসময় কার্যকর ছিল, তবে যুক্তরাষ্ট্রে ওই পণ্য আর তৈরি হয় না, আর সেখানে খাওয়ার মাছে তালিকাভুক্ত ওষুধগুলোর মধ্যে বৈধভাবে ব্যবহারযোগ্য কেবল পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট। ওষুধ বা কীটনাশক বাছাই ও মাত্রা ঠিক করার আগে মৎস্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ছবি: Donald Hobern / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস (মৎস্য বিভাগ), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও, রুই মাছ চাষের তথ্যপত্র), ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা আইএফএএস এক্সটেনশন (FA184), ভেটেরিনারি মেডিসিন অ্যান্ড সায়েন্স (জাহান ও অন্যান্য, ২০২৫; আহাম্মদ ও অন্যান্য, ২০২৪), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)