২০২৬ সালের ২৬ জুলাই, ২৮ জুলাইয়ের বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসের দুই দিন আগে, জাগো নিউজ ২৪-এর কৃষি ও প্রকৃতি বিভাগে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লেখক যুক্তি দেন যে প্রকৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব কেবল সরকার বা কোনো সংস্থার নয়, প্রতিটি নাগরিকের। তাঁর মতে আলো, পানি, বাতাস, গাছপালা, পাহাড় ও ফসলের মাঠ সবই সৃষ্টিকর্তার দান, আর এসবের পরিমিত ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। লেখক মনে করিয়ে দেন, অবারিত ফসলের মাঠ, বৈচিত্র্যময় বন আর সবুজে ভরা বাংলাদেশে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় বন্ধনেই মানুষের জীবন গড়ে উঠেছে।
নগরায়ন, দূষণ ও হারিয়ে যাওয়া বন
প্রবন্ধে বলা হয়, জীবনযাত্রার মান বদলের সঙ্গে চাহিদা বাড়ছে; শিল্পকারখানা, রাস্তাঘাট, উঁচু ভবন ও দ্রুত নগরায়ন সবুজ প্রকৃতিকে সংকুচিত করছে। আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক মনে হলেও এতে বনাঞ্চল কমছে, পরিবেশ ভারসাম্য হারাচ্ছে এবং বহু প্রজাতির পাখি ও প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে। লেখক মনে করিয়ে দেন, ঝড় ও বন্যার মতো দুর্যোগ থেকে বন মানুষকে কিছুটা রক্ষা করে, অথচ সেই বনই নির্বিচারে উজাড় হচ্ছে। প্রবন্ধ লেখার সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বন্যাকবলিত ছিল, যাকে তিনি প্রকৃতির প্রতি অবিচার ও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবের ফল বলে উল্লেখ করেন।
লেখকের মতে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ ও লাগামহীন দূষণে বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাস বাড়ছে, পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে এবং আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে। দূষণে পানিতে অক্সিজেন কমে জলজ প্রাণী কষ্ট পায়, বন উজাড় হওয়ায় বন্যপ্রাণী আবাস হারায়, আর এসব পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মানুষেরই।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় একটি দেশের মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি প্রয়োজন, কিন্তু বাংলাদেশে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বন অধিদপ্তরের হিসাবে দেশের বনভূমি মোট আয়তনের ১২.১ শতাংশ, আর কেবল স্থলভাগ ধরলে ১৩.৩ শতাংশ। বন অধিদপ্তর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং সিলভাকার্বনের কারিগরি সহায়তায় ও ইউএসএআইডির অর্থায়নে বাংলাদেশ ফরেস্ট ইনভেন্টরি পরিচালনা করে; ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মাঠ জরিপে ১ হাজার ৮৫৭টি নমুনা প্লটের মধ্যে ১ হাজার ৭৮১টি জরিপ করা হয় এবং ৬ হাজার ৪০০ খানার আর্থসামাজিক জরিপ হয়।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, বন্যা ও লবণাক্ততা
লেখক সতর্ক করেন, বিশ্বজুড়ে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, দাবানল ও খরার মতো দুর্যোগ বাড়ছে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এই আশঙ্কা আন্তর্জাতিক পরিসরেও উঠে এসেছে: ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে তৎকালীন জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যেতে পারে এবং ২ কোটি মানুষ গৃহহীন হতে পারে।

প্রবন্ধে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলের মাটিতে লবণাক্ততা ও বন্যা বাড়ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার ২০১৯ সালে জানায়, ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ৩৫ বছরে দেশে লবণাক্ততায় আক্রান্ত জমি প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে।

লেখকের প্রস্তাব: দূষণ কমানো ও সামাজিক আন্দোলন
পরিবেশের এই বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্রবন্ধে কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়:
- প্রচলিত জ্বালানির বদলে বায়ু, সৌর ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো
- শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন করে নির্দিষ্ট স্থানে রাখা
- কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানো
- পরিবেশ দূষণ রোধের কাজকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া
লেখক সবাইকে নিজে সচেতন হতে, অন্যকে সচেতন করতে এবং সময় থাকতেই প্রকৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, 'প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করুন'। তিনি মনে করিয়ে দেন, মানুষ নিজেও প্রকৃতির অংশ এবং প্রকৃতির মাঝেই তার বসবাস, তাই বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসে প্রকৃতি রক্ষার প্রত্যয়ই হোক সবার।

ছবি: Abu Sayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বন অধিদপ্তর, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), দ্য ডেইলি স্টার





মন্তব্য
(০)