গোলাপের জাতের নাম, ফোটার সময় ও চাষ পদ্ধতি
বর্তমানে বাংলাদেশে ফুল ও সুদৃশ্য গাছ বাণিজ্যিক উৎপাদন বিশেষ ভাবে গোলাপ চোখে পড়ছে। এছাড়াও বিভিন্ন সুগন্ধি প্রস্তুতি ফুলের নির্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ফুল ও সুদৃশ্য গাছ বাণিজ্যিক উৎপাদন বিশেষ ভাবে গোলাপ চোখে পড়ছে। এছাড়াও বিভিন্ন সুগন্ধি প্রস্তুতি ফুলের নির্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
গোলাপ ফুলকে ফুলের রাণী বলা হয়ে থাকে। এর কোমলতা, বর্ণ, সুগন্ধ এমন কেউ নেই যাকে আকৃষ্ট করে না। সাজ সজ্জায় কাটা ফুল হিসেবে কদর রয়েছে। এছাড়া সুগন্ধি প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়।
যতদূর জানা যায় ভারতীয় উপমহাদেশে সুন্দর গোলাপ এসেছে প্রায় পাঁচশ বছর আগে বসরা থেকে। মোগল সম্রাট বাবর প্রথম ‘বসরা’ নামের এক গোলাপ নিয়ে এসেছিলেন। সুগন্ধি গোলাপি রঙের এ গোলাপ এখনও বাংলাদেশে ‘বসরা’ নামে পরিচিত। কোনো কোনো পুরানো বাগানে এখনও এটির চাষ হয়। দুর্বল প্রকৃতির লম্বাটে গাছগুলিতে ডালের মাথায় থোকায় থোকায় ফুল ফোটে।
পৃথিবী জুড়ে গোলাপের অসংখ্য জাত রয়েছে। জাতগুলোর কোনোটির গাছ বড়, কোনোটি ঝোপালো, কোনোটি লতানো। জাত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী গোলাপ সাদা, লাল, হলুদ, কমলা, গোলাপী বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে।
গোলাপের কয়েকটি জাতের নাম হলোঃ
বাংলাদেশে চাষ হয় এমন কতকগুলো গোলাপ ফুলের জাত হলো- মিরান্ডা, পাপা মেলান্ড, ডাবল ডিলাইট, তাজমহল, প্যারাডাইস, ব্লু-মুন, মন্টেজুমা, টাটা সেন্টার, সিটি অব বেলফাষ্ট ইত্যাদি।
যাহোক গোলাপ ফুলকে অনেক শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। তবে উল্লেখযোগ্য শ্রেণিগুলো হলো-
১। হাইব্রিড (Hybrideas): ফুলগুলো বেশ বড়, সুগঠিত ও অনেক পাপড়ি বিশিষ্ট। কাটা ফুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন: ক্রিমশন গোরি, পাপা মিল্যান্ড, টিপটিপ ইত্যাদি এ শ্রেণির জাত।
২। পলিয়েন্থা (Polyanha): ফুলগুলো আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট এবং বড় বড় থোকায় ধরে। যেমন: জর্জ এলগার, ক্যামিও, আইডিয়াল ইত্যাদি।
৩। ফ্লোরিবান্দা (Floribunda): ফুলগুলো আকারে ছোট এবং থোকায় ধরে। কাটা ফুলের জন্য চাষ করা হয়। যেমন: হানিমুন, সানসিল্ক ইত্যাদি।
৪। মিনিয়েচার (Miniaure): গাছ ছোট, পাতা ছোট এবং ফুল ছোট হয়। যেমন: রাজিনা, গোল্ডেন, ইয়ালো ডল ইত্যাদি।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশে যে সব জাতের গোলাপ উদ্ভব হয়েছে তার মধ্যে ‘ফাতেমা ছাত্তার’, ‘শিবলী’, ‘রাহেলা হামিদ’, ‘পিয়ারী’, ‘ভাসানী’, ‘শের-এ-বাংলা’, ‘১৯৫২’, ‘জয়ন্তি’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তবে উপযুক্ত বাগান এবং উদ্যোগের অভাবে এগুলি কতদিন টিকে থাকবে তা বলা যায় না।
গোলাপ ফুল কখন ফোটে: গোলাপ সার বছরই ফোটে। গোলাপ মূলত শীতকালীন ফুল। তবে বর্তমানে এর চাহিদা ও সৌন্দর্য্যের কারণে সারা বছরই গোলাপ চাষ করা হচ্ছে। পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি সারাবছর গোলাপের চাষ হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জেলাতে গোলাপের চাষ করা হচ্ছে। গোলাপের চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় গোলাপ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
সিজনে গোলাপ ফুলের সাইজ বড় হয়। অফ সিজনে গোলাপ ফুলের সাইজটা ছোট হয়। বর্ষাকালে শেষে গোলাপ ফুলের মাটি চেঞ্জ করতে হয়।
বীজ, শাখা কলম, দাবা কলম এবং চোখ কলম এর মাধ্যমে গোলাপের বংশ বিস্তার করা হয়। তবে সংকর জাত উদ্ভাবনের জন্য বীজ মাধ্যমে বেছে নেয়া হয়।
সাধারণতঃ উন্নত জাতের গোলাপ এর নতুন গাছ উৎপন্নের প্রধান পদ্ধতি মাধ্যম হিসেবে বাডিং বা চোখ কলম বংশ বিস্তার করানো হয়। বাংলাদেশে নভেম্বর থেকে জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি সময় এ চোখ কলম করা হয়।
যে জাতটির বংশবৃদ্ধি করা হয় তার চোখ অপর একটি সুবিধামত আদিজোড় বা (rootstock) এর উপর স্থাপন করা হয়। আদিজোড় গাছের সজীবতা, উৎপাদনশীলতা, ফুলের গুনাবলী, ঝোপের স্থায়ীত্ব, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মাটি ও আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
আদিজোড়ের কাটিং সমূহ (পেন্সিল আকৃতি) গ্রীষ্মের শেষে তৈরী করা হয়ে থাকে এবং নার্সারীতে সারি করে ২৫ -৩০ সেঃ মিঃ দুরত্বে রোপন করা হয়। প্রায় ৬ মাস পর এইসব কাটিংসমূহ বাডিং এর জন্য উপযুক্ত আকৃতির কান্ড তৈরী করে থাকে। গোলাপে প্রধানতঃ T-কাডিং করা হয়।
জংলি গোলাপের কান্ডে বিভিন্ন উচ্চতায় ‘চোখ কলম’ জুড়ে দিয়ে সুন্দর সুন্দর গোলাপের ঝাড় বানানো যায় যেগুলিকে ‘স্ট্যান্ডার্ড রোজ’ বলে। বাগান সাজাতে পিছনে উঁচু, তারপর ক্রমান্বয়ে নিচু মাপের গাছ লাগালে দেখতে মানানসই হয়।
অনুকূল পরিবেশে পিঁপড়া, প্রজাপতি, মৌমাছি ইত্যাদির সাহায্যে পরাগায়িত হলে পরিণতিতে গোলাপ গাছে ফল ও বীজ উৎপন্ন হয়। এসব বীজ থেকে উৎপন্ন চারাগুলিতে প্রকারভেদ দেখা দেয়। এভাবেই গোলাপের নতুন জাত সৃষ্টি হয়। কখনও কখনও এক রঙের গোলাপ ফুলের গাছে হঠাৎ মিউটেশনের ফলে অন্য একটি ডালে ভিন্ন প্রকার ফুল ফোটে। আবার মিউটেশনের ফলে ঝাড় গোলাপের গাছ থেকে লতা গোলাপের গাছও জন্মায়। কোনোও কোনোও গোলাপ গাছের একটু পরিণত বয়সের ডালের কিছুটা অংশ কেটে মাটিতে লাগিয়ে দিলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শিকড় গজিয়ে নতুন পাতা ছাড়ে। এ পদ্ধতিতে চারা তৈরী করাকে কাটিং বা কলম বলে।
বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গোলাপের চারা উৎপাদনের জন্য জংলি বা বুনো গোলাপের গাছে ‘চোখ কলম’ বসিয়ে বহু চারা বানানো যায়। এক্ষেত্রে গাছের নিচের অংশে থাকে বুনো গোলাপ, উপরের অংশটি নির্বাচিত গাছের ‘চোখ’ থেকে উৎপন্ন মূল গোলাপ। এভাবে বাংলাদেশেও এখন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের নামিদামি গোলাপ পাওয়া যায়। যেমন- Papa Meilland, Double Delight, Dutch Gold, Queen Elizabeth, Monte Zuma ইত্যাদি। ইদানিং টিস্যু-কালচার বা মাইক্রোপ্রোপাগেশন পদ্ধতিতেও গোলাপের চারা উৎপাদনের চেষ্টা চলছে, তবে তা এখনও ততটা প্রসার লাভ করে নি।
বিদেশি গোলাপের মধ্যে তাজমহল (Tajmahal), পাপা মিলল্যান্ড (Papa Meilland) প্রভৃতি গোলাপের ডাল থেকে কাটিং করা যায়, তবে ডালের নিচে কাটা মাথায় উপযুক্ত হরমোন দিলে শিকড় গজাবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
সব সময় গোলাপ এর বেড আগাছা মুক্ত রাখা হবে। উত্তম ফুল পাওয়ার জন্য সেপ্টেম্বর এর মাঝামাঝি থেকে অক্টোবর মাস এর মধ্যে প্রুনিং করতে হবে। শুকনো বা রোগাক্রান্ত ডালপালা কেটে দেয়া হয়। নতুন শাখা বের হলে ফুল ফোটা শুরু হয়।
প্রুনিং এর পর গাছের গোড়ার চারদিক হতে ২০ সে.মি. মাটি সরিয়ে এক পার্শ্বে রেখে দিয়ে রৌদ্র ও বাতাসে উম্মুক্ত রাখতে হবে। এর ৮-১০ দিন পরে গাছ প্রতি ৫ কেজি গোবর সার, ১০০ গ্রাম হাড়ের গুড়া, ৫০ গ্রাম টিএসপি এবং ২৫ গ্রাম এমপি সার মিশিয়ে দিয়ে গাছের গোড়ায় ভালোভাবে সেচ দিতে হবে।
বাজারের চাহিদার উপর ফুলের প্যাকেজিং নির্ভরশীল। অনেক উৎপাদনকারী নিকটস্থ স্থানীয় বাজারের জন্য প্যাকেজিং ছাড়াই ফুলের আঁটি বা গোছা বাজারে সরবরাহ করে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আঁটিসমূহ খবরের কাগজ দ্বারা আবৃত থাকে।



