২০২৬ সালের ৩০ জুন জাগো নিউজ ২৪-এর কৃষি ও প্রকৃতি বিভাগে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের কৃষি তিনটি পরস্পর জড়িত সংকটের মুখে: অসুস্থ মাটি, অতিমাত্রায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার এবং অযাচিত কীটনাশক প্রয়োগ। লেখকের যুক্তি ছিল, উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় অনেক সময় ভুলে যাওয়া হয় যে উৎপাদনের মূল ভিত্তি সুস্থ মাটি; মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হলে কৃষি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা সবই ঝুঁকিতে পড়ে।
মাটির জৈব পদার্থ ও অম্লতার চিত্র
নিবন্ধে বলা হয়, গত কয়েক দশকে খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্যের বড় অংশ এসেছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা ছাড়া দীর্ঘদিন একই পদ্ধতি চালিয়ে যাওয়ায় মাটির জৈব পদার্থ কমছে, উপকারী অণুজীব নষ্ট হচ্ছে, পিএইচের ভারসাম্য ভাঙছে এবং পুষ্টি উপাদানের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আগের ফলন পেতে কৃষককে আরও বেশি সার দিতে হচ্ছে, যাকে লেখক একটি দুষ্টচক্র বলেছেন।
সরকারি গবেষণার তথ্যও এই উদ্বেগের সঙ্গে মেলে। বণিক বার্তার ২৫ মে ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) তার আগের দিন ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে ৫০টি উপজেলার ২৮ হাজার ৯১২টি স্থানের মাটির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিজমিতে তীব্র অম্লতা পাওয়া যায়: ৬.৮৯ শতাংশ জমি 'খুব বেশি অম্লীয়' এবং ৩২.১১ শতাংশ 'বেশি অম্লীয়'। ১৫.৪০ শতাংশ মাটিতে জৈব পদার্থ ছিল 'খুব কম' এবং ৪২.৬৯ শতাংশে 'কম'। নাইট্রোজেন ৩৪.৮১ শতাংশ মাটিতে খুব কম এবং ৩৮.৮৩ শতাংশে কম পাওয়া যায়।
পরিবেশবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মোঙ্গাবে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এসআরডিআইয়ের মানদণ্ড উল্লেখ করে জানায়, ভালো মাটিতে অন্তত ২.৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা দরকার, অথচ দেশের বেশির ভাগ মাটিতে তা ১.৫ শতাংশের কম। জাগো নিউজের নিবন্ধে লেখক গোবর, কম্পোস্ট, সবুজ সার ও ফসলের অবশিষ্টাংশের ব্যবহার বাড়িয়ে এই ঘাটতি পূরণের কথা বলেন।
ইউরিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার ও পানিদূষণ
নিবন্ধ অনুযায়ী, অনেক কৃষক মনে করেন বেশি সার মানেই বেশি ফলন। অথচ ফসলের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার অর্থের অপচয় ঘটায়, মাটির রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে, অন্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি তৈরি করে এবং ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানি দূষিত করে। মোঙ্গাবের হিসাবে দেশে ইউরিয়ার ব্যবহার ১৯৮০-৮১ সালের ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৮৮১ টন থেকে ২০১৫-১৬ সালে ১১ লাখ ৮৩ হাজার ২৪ টনে পৌঁছায়।
বণিক বার্তাকে এসআরডিআইয়ের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আমির মুহাম্মদ জাহিদ বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টি মাটি থেকে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো ক্ষারীয় উপাদান ধুয়ে নেয়, আর ইউরিয়া ও সালফার সারের অতিরিক্ত ব্যবহারও অম্লতা বাড়ায়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আবেদীনের মতে, মাটির অম্লতা বাড়ার প্রধান কারণ ইউরিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার।
লেখক সতর্ক করেন, জলাশয়ে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাস ঢুকলে শৈবালের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে এবং মাছসহ জলজ প্রাণী হুমকিতে পড়ে। এই প্রক্রিয়ার নাম ইউট্রোফিকেশন: পানিতে পুষ্টি জমে জীবের বৃদ্ধি বেড়ে যায়, তাতে পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে, আর অক্সিজেন খুব কমে গেলে মাছ মারা যায়।

নির্বিচার কীটনাশক ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা
নিবন্ধে বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে রোগ বা পোকার উপস্থিতি নিশ্চিত না হয়েই আগাম কীটনাশক ছিটানো হয়। এতে উপকারী পোকা, মৌমাছি, মাকড়সা, পরাগায়নকারী পতঙ্গ ও মাটির অণুজীব মারা যায়, আর ক্ষতিকর পোকার প্রতিরোধক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় কৃষককে আরও শক্তিশালী ও দামি কীটনাশক কিনতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ে।
লেখকের সমাধান সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম)। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আইপিএমকে বর্ণনা করে সব ধরনের বালাই দমন কৌশল বিবেচনা করে এমন ব্যবস্থার সমন্বয় হিসেবে, যা পোকার সংখ্যা বাড়তে দেয় না। এতে জৈবিক, রাসায়নিক, যান্ত্রিক ও ফসলভিত্তিক পদ্ধতি মিলিয়ে কীটনাশকের ব্যবহার ও মানুষের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ঝুঁকি যতটা সম্ভব কমানো হয়।

মাটি রক্ষায় লেখকের প্রস্তাব
সংকট থেকে উত্তরণে নিবন্ধে কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়:
- মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রতিটি জমির জন্য নির্দিষ্ট মাত্রায় ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান দিয়ে সুষম সার ব্যবস্থাপনা।
- রাসায়নিকের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে জৈবিক, যান্ত্রিক ও আবাদভিত্তিক পদ্ধতির সমন্বয়ে আইপিএমের বিস্তার।
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, রিমোট সেন্সিং, ড্রোন ও বিগ ডেটা দিয়ে জমির পুষ্টি, রোগ-পোকা ও সারের চাহিদা নির্ধারণ।
- কৃষকের প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণ এবং ভেজাল সার ও কীটনাশকের ওপর কঠোর নজরদারি।
- গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে অঞ্চলভিত্তিক মাটির স্বাস্থ্য মানচিত্র ও জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি।

লেখকের সতর্কবার্তা ছিল, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, কৃষকের খরচ বাড়বে, আয় কমবে, দূষণ তীব্র হবে এবং নিরাপদ খাদ্যের সংকট গভীর হবে। তিনি 'মাটি বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করো' স্লোগানে জাতীয় অঙ্গীকারের আহ্বান জানান।
ছবি: SEJustice / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বণিক বার্তা, মোঙ্গাবে, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)