২০২৬ সালের ১৭ জুলাই জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক লেখায় লেখক অভিলাষ মাহমুদ বলেন, বর্ষা ও শরতে দেশের নানা প্রান্তে সাপ দেখার খবর বাড়ে, আর তার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ায় গুজব ও আতঙ্ক। তাঁর মতে, ভয় আর ভুল ধারণায় নিরীহ সাপকেও দেখামাত্র মারা হয়, অথচ সাপ লাজুক প্রাণী, সাপে কাটলে যেতে হবে হাসপাতালে, আর সাপ মারা দণ্ডনীয়।
দেশের অধিকাংশ সাপ বিষধর নয়
বন্যপ্রাণী ও সাপ বিশেষজ্ঞ মো. আবু সাঈদ ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২০ প্রজাতির সাপের তালিকা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬ প্রজাতির সামুদ্রিক সাপসহ বিষধর প্রজাতি ৩৫টি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এনসিডিসির ২০২১ থেকে ২০২২ সালের জাতীয় জরিপ, যা ২০২৩ সালের জুনে প্রকাশিত হয়, জানায় দেশে বছরে প্রায় চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং মারা যান ৭ হাজার ৫১১ জন। জরিপ অনুযায়ী এসব কামড়ের এক-চতুর্থাংশ বিষধর সাপের।
বড় সাপ মানেই বিষধর, এই ধারণাও ভুল বলে লেখক মনে করিয়ে দেন। বড় আকারের দাঁড়াশ (ওরিয়েন্টাল র্যাট স্নেক) নির্বিষ, অজগরও বিষহীন; অথচ মাঝারি আকারের কালাচ (কমন ক্রেইট) অত্যন্ত বিষধর এবং ভারতীয় উপমহাদেশে চিকিৎসার দিক থেকে গুরুতর সাপের কামড়ের বড় অংশের জন্য দায়ী।


সাপ কেন কামড়ায়
লেখকের মতে, সাপ মানুষকে তাড়া করে না; আটকা পড়লে, ভয় পেলে বা গায়ে পা পড়লে আত্মরক্ষায় কামড়ায়। ২০২৪ সালের জুনে রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাও তা-ই বলে: সাপটি ঝোপঝাড়, ঘাসবন ও কৃষিজমিতে থাকে, বসতি এড়িয়ে চলে এবং মাটির রঙে মিশে থাকায় অজান্তে কেউ কাছে গেলে ভয় পেয়ে আক্রমণ করে। দক্ষ সাঁতারু বলে এটি নদীর স্রোত ও বন্যার পানিতে নানা এলাকায় ছড়িয়েছে।
সে সময় বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেছিলেন, মানুষ যেকোনো সাপ দেখলেই রাসেলস ভাইপার ভেবে মেরে ফেলছে।

সাপে কাটলে ওঝা নয়, হাসপাতাল
লেখকের পর্যবেক্ষণ, নির্বিষ সাপের কামড়ের পর ওঝার ঝাড়ফুঁকে রোগী সেরে উঠলে মানুষ ওঝাকে কৃতিত্ব দেয়, ফলে বিষধর সাপ কামড়ালেও ওঝার কাছে সময় নষ্ট হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের সাপে কাটার চিকিৎসা নির্দেশিকা (২০১৬) বলছে, ক্ষত কাটা, বিষ চুষে বের করা, শক্ত বাঁধন বা ভেষজ লাগানোর মতো প্রচলিত বেশির ভাগ প্রাথমিক চিকিৎসা অকার্যকর, এমনকি বিপজ্জনক। নির্দেশিকা ও মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে আশ্বস্ত ও শান্ত রাখুন।
- কামড়ের জায়গা ও আক্রান্ত অঙ্গ নড়াচড়া করাবেন না, স্থির রাখুন।
- ক্ষত কাটবেন না, সুই ফোটাবেন না, কিছু লাগাবেন না; শক্ত করে বাঁধবেন না।
- ওঝা বা কবিরাজের কাছে না গিয়ে দেরি না করে রোগীকে হাসপাতালে নিন।
মন্ত্রণালয় জানায়, রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিভেনম নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে পাওয়া যায়; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে অ্যান্টিভেনমই একমাত্র কার্যকর প্রতিষেধক, যা দেন চিকিৎসক। সাপ দেখলে ধরা বা মারার চেষ্টা না করে সরে যেতে এবং জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩ বা নিকটস্থ বন বিভাগের অফিসে জানাতে বলেছে মন্ত্রণালয়।
ফসলের বন্ধু, আইনের সুরক্ষা
লেখকের মতে, মাঠের ইঁদুর খেয়ে সাপ কৃষকের উপকার করে; বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদও বলেন, সাপ ক্ষতিকর পোকামাকড় ও ইঁদুর খেয়ে ফসলের উৎপাদন বাড়ায়। বন উজাড়, নদী ভরাট, অতিরিক্ত কীটনাশক ও আবাসস্থল ধ্বংসে সাপ লোকালয়ে চলে আসছে বলেও লেখকের মত।
লেখার শিরোনামে সাপ হত্যায় ৭ বছরের জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছিল। লেখাটি প্রকাশের সময় কার্যকর ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬; ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিলের এই আইন ৭ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর বলে গণ্য এবং এটি ২০১২ সালের আইন রহিত করেছে। আইনে শিকার বলতে বন্যপ্রাণী হত্যা করা, ধরা, বিষ প্রয়োগ, আহত করা এবং সরীসৃপের বাসা বা ডিম সংগ্রহ বা ধ্বংস করাকে বোঝায়। সর্বনিম্ন ২ ও সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ ও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান আইনে রাখা হয়েছে তফসিল ১(ক)-এর বাঘ বা হাতি শিকারের জন্য। অন্য তফসিলভুক্ত বন্যপ্রাণী শিকারে দণ্ড তফসিল অনুযায়ী আলাদা:
- তফসিল ১(খ): সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।
- তফসিল ১(গ): সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।
- লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া তফসিল ২-এর প্রাণী: সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।
- একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে প্রতিটি ক্ষেত্রে দণ্ড বাড়ে।
লেখকের আহ্বান: সাপ দেখলে নিরাপদ দূরত্বে থাকুন এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী বা বন বিভাগের সাহায্য নিন।
ছবি: Abhinav Chawla (AChawla) / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ (লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, আইন মন্ত্রণালয়), পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও প্রথম আলো (২২ জুন ২০২৪), প্রথম আলো (৮ নভেম্বর ২০২৫), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (১৮ জুন ২০২৩), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয় (২০১৬), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)