স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজ দেওয়া হবে, আর বার্ষিক পরীক্ষার রিপোর্ট কার্ডে এ কাজের জন্য নম্বর থাকবে। ২০২৬ সালের মার্চে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত করা ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় এমন উদ্যোগের কথা বলা হয়। জাগো নিউজ ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ পরিকল্পনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শিক্ষার্থীরা সরকারের দেওয়া গাছের চারা লাগাবে এবং পরিচর্যা করবে; প্রতিটি গাছ কীভাবে বাড়ছে এবং কতটা যত্ন পাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করবেন শিক্ষকরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্ষিক পরীক্ষার পর যে নম্বরপত্র (রিপোর্ট কার্ড) দেওয়া হবে, তাতে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার ওপরও নম্বর থাকবে। যার গাছ সঠিক পরিচর্যায় ভালোভাবে বেড়ে উঠবে, সে বেশি নম্বর পাবে। সরকার গঠনকারী দল বিএনপির প্রতিশ্রুত 'ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি' কর্মসূচি বাস্তবায়নে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টির বিস্তারিত যে কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে, তা ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় চূড়ান্ত করা হয়।
কর্মপরিকল্পনায় যা বলা হয়েছিল
কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়, 'ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি' কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করতে প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হবে। প্রতিটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা নিজ বাড়ি, স্কুলের মাঠ, খেলার জায়গা এবং আশপাশের খালি জমিতে গাছ লাগাবে।
শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা আগে গাছের পরিচর্যা শিখবে। এরপর প্রতিটি শিশুকে তার নিজের গাছের পরিচর্যার দায়িত্ব দেওয়া হবে। গাছের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করবেন শিক্ষকরা, আর বার্ষিক পরীক্ষার রিপোর্ট কার্ডের পরিবেশবিষয়ক মূল্যায়ন অংশে গাছ লাগানো ও পরিচর্যার নম্বর দেওয়া হবে।
পরিকল্পনায় বলা হয়, স্থানীয় বন বিভাগ ও কৃষি অফিস থেকে গাছের চারা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। গাছ লাগানোর জায়গা ঠিক করা হবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনকে সম্পৃক্ত করে; এ তিনটি হলো গ্রাম, শহর ও বড় নগরের নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে শিগগির 'একটি শিশু, একটি গাছ' বিষয়ক নির্দেশনা জারি করার কথা ছিল। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর কথাও বলা হয়।
উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিকল্পনায় বলা হয়, শিক্ষার্থীরা বছরে অন্তত ১ কোটি গাছ লাগাবে ও পরিচর্যা করবে। এতে পরিবেশের উন্নতি হবে এবং দেশের জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা বাড়বে; একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরি হবে। আরও উৎসাহ দিতে গণমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এই সাফল্য প্রচারের ব্যবস্থা রাখার কথাও পরিকল্পনায় ছিল।
মাউশির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বি এম আব্দুল হান্নান জাগো নিউজকে বলেন, '১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় বিষয়টিকে অগ্রাধিকার-ভিত্তিতে রাখা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় শিগগির প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হবে। একটি শিশু, একটি গাছ কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাউশি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা দেওয়া হবে।'
ঈদের পর ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মসূচি
প্রতিবেদন প্রকাশের তিন দিন আগে মন্ত্রী বৃহত্তর কর্মসূচিটি ঘোষণা করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস সেদিনই জানায়, ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ, মঙ্গলবার, পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর প্রথম কর্মদিবসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ঈদ-পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময় সভায় তিনি শিক্ষা খাতের জন্য ১৮০ দিনের বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচি তুলে ধরেন। সভায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাসসের খবর অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে মন্ত্রী এই ১৮০ দিনের কর্মসূচি, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের পরিকল্পনা এবং আগামী পাঁচ বছরের শিক্ষা খাতের উন্নয়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে আধুনিকায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে 'ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব', মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা এবং 'ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি' কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও জুতা দেওয়া, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থী ঋণ এবং হাফেজে কুরআনদের সম্মান ও স্বীকৃতির বিষয়েও তিনি জোর দেন।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় মোট দুই লাখের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও কেডস বিতরণ করা হবে, আর এক বছরের মধ্যে প্রাথমিক, কারিগরি, মাদ্রাসা এবং স্কুল-কলেজের সব শিক্ষকের হাতে ট্যাব দেওয়া হবে। উপজেলা পর্যায়ে গণিত অলিম্পিয়াড চালু এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও বিতর্ক ক্লাব গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জট কাটাতে প্রয়োজনে একাধিক শিফটে প্রশিক্ষণ চালানোর নির্দেশ দেন মন্ত্রী। অর্থাৎ গাছ লাগানো ছিল একই ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে থাকা কয়েকটি প্রতিশ্রুতির একটি।

প্রাথমিকের পরিকল্পনা: পাঁচ বছরে ৫ কোটি গাছ
মাধ্যমিক স্তরের এই পরিকল্পনার আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য আলাদা একটি পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল। ২০২৬ সালের ৮ মার্চ চট্টগ্রাম প্রতিদিন পত্রিকা জানায়, 'ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি' কর্মসূচির আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ডিপিই সূত্রের ভাষ্য, দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর সরকারি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ কর্মসূচি নেওয়া হয়। প্রতিবেদনটি সেদিন সন্ধ্যায় শিক্ষকদের সরকারি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম শিক্ষক বাতায়নেও পুনঃপ্রকাশিত হয়।
ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে প্রতিবছর একটি করে গাছের চারা দেওয়া হবে, আর গাছ লাগানোর পর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার জন্য প্রতি গাছের বিপরীতে শিক্ষার্থী বছরে ৫০০ টাকা পাবে। বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যাকে একাডেমিক পাঠক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা হবে এবং বছর শেষে মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানো হবে। সে সময় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছিল; তাদের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮০ লাখ এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আরও প্রায় ২০ লাখ গাছ লাগানো হবে। এভাবে প্রতিবছর ১ কোটি করে পাঁচ বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানোর হিসাব করা হয়।
প্রতিবেদনে প্রতিটি গাছের ৫০০ টাকার বাজেট এভাবে ভাগ করে দেখানো হয়:
- গর্ত তৈরি, মাটি প্রস্তুত ও চারা রোপণে ৫০ টাকা;
- সার ও পরিচর্যার জন্য ১৫০ টাকা;
- গাছের নিরাপত্তায় বেড়া দেওয়ার জন্য ১৫০ টাকা;
- পানি সরবরাহ ও পরবর্তী পরিচর্যার জন্য ১৫০ টাকা।
সারাদেশের প্রায় ৬৫ হাজার বিদ্যালয়ের মাঠ ও আঙিনায় এবং শিক্ষার্থীদের বসতবাড়ির আশপাশে গাছ লাগানোর পরিকল্পনা ছিল। চারা বিনামূল্যে সরবরাহ করবে বন বিভাগ, আর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে লাগানো ২০ লাখ গাছের পরিচর্যা হবে অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায়। যেসব বিদ্যালয় সফলভাবে গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজ করবে, সেগুলোর মধ্য থেকে শ্রেষ্ঠ 'সবুজ বিদ্যালয়' বেছে পুরস্কার দেওয়া হবে। গাছের বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ বিষয়ে আলোচনা সভা, প্রদর্শনী ও নানা শিক্ষামূলক কার্যক্রমও আয়োজনের কথা ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর দেশের আটটি বিভাগীয় শিক্ষা অফিসে চিঠি দিয়ে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কত গাছ লাগানো সম্ভব, তার তালিকা চায়। ২ মার্চ অধিদপ্তর বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সময়সূচি অনুযায়ী প্রথমে সচেতনতা কার্যক্রম ও প্রস্তুতিমূলক সভা হবে; এরপর মার্চ ও এপ্রিলে স্থানীয় প্রশাসন এবং কৃষি ও বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে গাছের ধরন বাছাই, চারা সংগ্রহ ও রোপণের জায়গা ঠিক করা হবে। মে মাসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রস্তুতি শেষে জুনে বৃক্ষরোপণ শুরু হতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ মার্চ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৃক্ষরোপণ-সংক্রান্ত সেলের পর্যালোচনার পর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে সারাদেশে ৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে এবং মে মাস থেকে কাজ শুরু হতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রতিবেদনে বলেন, প্রথম বছরে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে ১ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে; এটি শুধু বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়, বরং শিশুদের জন্য পরিবেশ সচেতনতার প্রাথমিক পাঠ।
চারা আসবে কোথা থেকে
কর্মপরিকল্পনা নির্ভর করছে সরকারের বিদ্যমান দুটি ব্যবস্থার ওপর: বন বিভাগের নার্সারি ও কৃষি অফিস। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বন অধিদপ্তরের সম্প্রসারণ কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৬২-৬৩ সালে। তখন চারা উৎপাদন ও বিতরণের জন্য রাজশাহী ও ঢাকায় দুটি বন সম্প্রসারণ বিভাগ গঠন করা হয় এবং ১ জুন বৃক্ষরোপণ দিবস চালু হয়। প্রথমে এক দিনের এই অভিযান পরে এক সপ্তাহ, তারপর এক মাস এবং পরে তিন মাসে বিস্তৃত হয়।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পগুলো এই ব্যবস্থা আরও বড় করে। বাংলাপিডিয়া জানায়, সুন্দরবন ও বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া সারাদেশে বাস্তবায়িত 'উপজেলা বনায়ন ও নার্সারি উন্নয়ন' প্রকল্পের লক্ষ্যের মধ্যে ছিল কমিউনিটি বনায়ন কেন্দ্রগুলোকে বন সম্প্রসারণ নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, উন্নত করা ও রক্ষণাবেক্ষণ; উপজেলা কমপ্লেক্সে আরও ৩৪৫টি নার্সারি স্থাপন; নতুন উপজেলা নার্সারি থেকে ১ কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার চারা উৎপাদন ও বিতরণ; এবং উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে ১০০টি বেসরকারি নার্সারি গড়ে তুলতে সাহায্য করা।
২০২৪ সালের জুনে তৎকালীন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে জানান, ২০০৯-১০ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার ৪০২ হেক্টর ব্লক বাগান ও ৩০ হাজার ২৫২ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান করা হয়েছে, আর ১১ কোটি ২০ লাখের বেশি চারা বিতরণ ও রোপণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের বর্ষায় সারাদেশে ৮ কোটি ৩৩ লাখ চারা রোপণের পরিকল্পনার কথাও তিনি বলেন।

সংখ্যায় দেশের বৃক্ষাচ্ছাদন
সরকারের বৃক্ষরোপণ অভিযানের সাফল্য মাপা হয় দেশের কত ভাগ জমি গাছে ঢাকা, তা দিয়ে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২১ সালের ১২ মার্চ জানায়, ঢাকার আগারগাঁওয়ে বন অধিদপ্তরের এক আলোচনা সভায় তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী বলেন, দেশের মোট ভূমির ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ গাছে আচ্ছাদিত এবং ২০২৫ সালের মধ্যে তা ২৪ শতাংশের বেশিতে নিতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিন বছর পর মন্ত্রণালয় ইউএনবিকে দুটি হিসাব পাশাপাশি দেয়: বনাচ্ছাদন ১৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং বৃক্ষাচ্ছাদন ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে এগুলো যথাক্রমে ১৬ শতাংশ ও ২৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়। দুটি হিসাব আলাদা জিনিস মাপে: প্রথমটি বনভূমির আয়তন, দ্বিতীয়টি গাছে ঢাকা জমির বৃহত্তর আয়তন।
মন্ত্রণালয় এই লক্ষ্যগুলোকে যুক্ত করে মরুকরণ, ভূমি অবক্ষয় ও খরা মোকাবিলায় ২০১৫-২০২৪ সালের জাতীয় কর্মসূচি, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ১৫ ও জাতিসংঘের মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশনের ত্রয়োদশ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে 'ভূমি অবক্ষয় নিরপেক্ষতা' অর্জনের লক্ষ্য এবং ২০২১ থেকে ২০৪১ সালের জাতীয় ভূমি অবক্ষয় রোডম্যাপের সঙ্গে। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সামাজিক বনায়নে যুক্ত ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৯৯ জন উপকারভোগী মোট ৩ হাজার ২৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা লভ্যাংশ পেয়েছেন, আর ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বেদখল হওয়া প্রায় ৩০ হাজার একর বনভূমি উদ্ধার হয়েছে।
এক দিনের বৃক্ষরোপণ থেকে জাতীয় কর্মসূচি
গাছ লাগানোয় জনগণকে যুক্ত করার ইতিহাস বাংলাদেশে দীর্ঘ। বাংলাপিডিয়া জানায়, স্বাধীনতার পর নতুন বননীতি গ্রহণ করা হয় এবং ১৯৭২ সালে 'সবার জন্য বনায়ন' আহ্বানে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা শুরু হয়। এতে সংরক্ষিত বনের বাইরে পতিত ও প্রান্তিক জমিতে এবং গ্রামের বাগানে গাছ লাগিয়ে বৃক্ষসম্পদ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। ১৯৮০ সালের পর সামাজিক বনায়ন বেশি গুরুত্ব পায়; বন নেই বা খুব কম এমন জেলা রংপুর, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরে নতুন বন বিভাগ গঠন করা হয়।
বাংলাপিডিয়ার ভাষ্যে, প্রকৃত অর্থে সামাজিক বনায়ন শুরু হয় এডিবির অর্থায়নে কমিউনিটি বনায়ন প্রকল্প দিয়ে, যা ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, কুষ্টিয়া ও যশোর এই সাত জেলায় বাস্তবায়িত হয়। এডিবি ১ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ দেয়, আর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মাধ্যমে কারিগরি সহায়তা হিসেবে ২০ লাখ ডলার দেয়। প্রকল্পে সড়ক, রেলপথ ও খালের বাঁধ বরাবর প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগানের পরিকল্পনা ছিল, এবং এর মাধ্যমেই প্রথমবার নারীরা কমিউনিটি বনায়নে অংশগ্রহণকারী হিসেবে যুক্ত হন। পরে ১৯৯৪-৯৫ সালে উপকূলের ১০টি জেলায় শুরু হয় উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্প, যার লক্ষ্য ছিল গাছপালা বাড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি কমানো।
বিদ্যালয়গুলো অনেক দিন ধরেই দেশের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচির অংশ। ইউএনবি জানায়, ২০২৪ সালের জুনে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সারাদেশের বিদ্যালয়ে চিত্রাঙ্কন ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করতে প্রথমবারের মতো 'ওয়াইল্ডলাইফ অলিম্পিয়াড' চালুর ঘোষণা দেয় পরিবেশ মন্ত্রণালয়। ২০২৬ সালের পরিকল্পনায় নতুন যা যোগ হয়, তা হলো প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিজের একটি গাছ, যার সারা বছরের পরিচর্যার নম্বর উঠবে রিপোর্ট কার্ডে।
বসতবাড়ির গাছ: কোথায় কী জন্মায়
পরিকল্পনা অনুযায়ী গাছ লাগানোর বড় অংশই হওয়ার কথা শিক্ষার্থীদের বাড়িতে। বাংলাপিডিয়া বলছে, জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় দেশের বসতবাড়িগুলো সাধারণত খণ্ডিত, আর একটি বাড়ির জমি হতে পারে মাত্র প্রায় ০.১৬ হেক্টর। এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০ প্রজাতির গাছ, ৫৫ প্রজাতির গুল্ম এবং ১০০ প্রজাতির লতা ও বিরুৎকে দেশের বসতবাড়ির উদ্ভিদ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। প্রায় সব ফল, জ্বালানি কাঠ, কাঠ, পশুখাদ্য ও গৃহস্থালির উপকরণ আসে এসব গাছ থেকে, আর সব ধরনের কাঠের প্রায় ৭০ শতাংশ জোগায় বসতবাড়ির গাছ।
জমিভেদে মানুষ ভিন্ন গাছ লাগায়। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলে নারকেল, সুপারি, রেইনট্রি, জিলাপি গাছ (ম্যানিলা তেঁতুল), আম, জাম, মান্দার, দেবদারু, কুল, হিজল, কয়েক প্রজাতির বাঁশ ও ডুমুর; মধ্যাঞ্চলে নারকেল, আম, কাঁঠাল, জাম, রেইনট্রি, খেজুর, তাল, সুপারি, পেয়ারা ও বাঁশ; আর বন্যাসীমার ওপরে থাকা বসতবাড়িতে আম, কাঁঠাল, কড়ই, লিচু, বেল, তেঁতুল, কামরাঙা, জলপাই, লেবু, কলা, পেয়ারা, পেঁপে ও বাঁশ বেশি দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি প্রজাতির মেহগনি, শিশু, আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাসও ব্যাপকভাবে বেছে নেওয়া হচ্ছে।
একই জ্ঞানকোষ সতর্ক করেছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে বসতবাড়ির প্রায় ১০ শতাংশ গাছ প্রতিবছর কেটে ফেলা হচ্ছে, কিন্তু তার জায়গায় নতুন গাছ লাগানো হচ্ছে না। বাংলাপিডিয়ায় উদ্ধৃত গবেষণা অনুযায়ী গাঙ্গেয় প্লাবনভূমির ফসলি জমির পাশে প্রধান গাছ হিসেবে বাবলা, খয়ের, খেজুর, কাঁঠাল, তাল ও আম, আর তিস্তা প্লাবনভূমির উঁচু জমিতে নিম, আম, খয়ের, শিশু, কাঁঠাল ও কয়েক প্রজাতির বাঁশ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে ২৭ মার্চের প্রতিবেদনে কর্মপরিকল্পনায় শিক্ষার্থীরা কোন প্রজাতির গাছ লাগাবে, তা উল্লেখ ছিল না।

পরিকল্পনায় নাম আসা প্রতিষ্ঠানগুলো
নির্দেশনা জারির দায়িত্ব পাওয়া মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান; মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের দেখভাল করে এটি। বাংলাপিডিয়া জানায়, স্যার চার্লস উডের ১৮৫৪ সালের শিক্ষা প্রস্তাব (উডস ডেসপ্যাচ) অনুযায়ী ব্রিটিশ ভারতের প্রতিটি প্রদেশে জনশিক্ষা পরিচালকের (ডিপিআই) পদ সৃষ্টি হয়; এই দপ্তরই অধিদপ্তরটির শিকড়। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সরকার জনশিক্ষা পরিদপ্তরকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে রূপান্তর করে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা তৈরি করা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন। ২০২৬ সালের মার্চে দুটি মন্ত্রণালয়েরই দায়িত্বে ছিলেন একই মন্ত্রী, যিনি ২৪ মার্চের সভায় সভাপতিত্ব করেন।
চারা সরবরাহের দায়িত্ব পাওয়া বন অধিদপ্তর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬৪ সালের ১ নভেম্বর প্রথম বন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়, আর ১৯৮০ সালের পর বনহীন বা স্বল্প বনের জেলাগুলোকে সামাজিক বনায়নের আওতায় আনতে নতুন বন সার্কেল ও বিভাগ গঠন করা হয়।
গাছ লাগানোর জায়গা খুঁজতে যাদের সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে, সেই ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন হলো যথাক্রমে গ্রামীণ ইউনিয়ন, শহর ও বড় নগরের নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান।
ছবি: Nazmulhuqrussell / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), চট্টগ্রাম প্রতিদিন (শিক্ষক বাতায়নের মাধ্যমে), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)