টানা চার দিনের বৃষ্টির পর ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার কিশোরগঞ্জে রোদের দেখা মেলে। সেদিন সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন হাওরে কৃষকেরা ধান কাটা ও মাড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রোদে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বছরের একমাত্র বোরো ফসল পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারবেন কি না, সেই শঙ্কা তখনো কাটেনি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জেলায় ৪ হাজার ৭৫৪ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে যায়।
রোদ উঠতেই হাওরে ধান কাটা ও শুকানোর ব্যস্ততা
জাগো নিউজের কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি সেদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নিকলী, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন হাওরে গিয়ে দেখেন, শ্রমিকেরা কেউ পানিতে নেমে, কেউ শুকনো জমিতে দাঁড়িয়ে পাকা ধান কাটছেন। কাটা ধান ট্রাকসহ ছোট-বড় যানবাহনে করে মাড়াইয়ের জন্য খলায় নেওয়া হচ্ছিল। খলায় স্তূপ করে রাখা ধান রোদে শুকাতে ব্যস্ত ছিলেন কৃষক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। অনেকে ভেজা খড় সড়ক ও খোলা মাঠে ছড়িয়ে শুকাচ্ছিলেন।
মিঠামইনের শান্তিপুর গ্রামের কৃষক রমিজ মিয়া জাগো নিউজকে জানান, তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে খলায় আনলেও বৃষ্টির কারণে তা শুকাতে পারছিলেন না। রোদ ওঠায় তিনি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন, সবাই তখন ধান শুকাতে ব্যস্ত। রোদ থাকলে জমির পানিও কমবে বলে তাঁর আশা, তবে সব ধান ঘরে তুলতে পারবেন কি না, সে শঙ্কা তাঁর যায়নি।

বৃষ্টি ও নদীর পানির হিসাব
নিকলী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র পর্যবেক্ষক আখতার ফারুক জানান, বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ৬১.১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেনের দেওয়া তথ্যে নদীর পানির চিত্র ছিল মিশ্র:
- করিমগঞ্জের চামড়াঘাট এলাকায় মগড়া নদীর পানি বুধবার ৬৩ সেন্টিমিটার বাড়ে, বৃহস্পতিবার কমে ২ সেন্টিমিটার।
- ইটনায় ধনু-বৌলাই নদীর পানি বুধবার ৪৯ সেন্টিমিটার বাড়ে, বৃহস্পতিবারও বাড়ে ১৪ সেন্টিমিটার।
- অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি বুধবার ৬৯ সেন্টিমিটার বাড়ে, বৃহস্পতিবার বাড়ে মাত্র ১ সেন্টিমিটার।
- ভৈরবে মেঘনা নদীর পানি কমতে শুরু করে।
তিনি জানান, কৃষকদের আগেই দ্রুত ধান কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

৪ হাজার ৭৫৪ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জে ৪ হাজার ৭৫৪ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, ক্ষতি সবচেয়ে বেশি ইটনা উপজেলায়। নতুন করে বৃষ্টি না হলে কৃষকেরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এর তিন দিন আগে, ২৭ এপ্রিল প্রথম আলো জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, সে বছর কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল, যার ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর হাওরাঞ্চলে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ধান, যা থেকে প্রায় ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ মেট্রিক টন চাল পাওয়ার কথা। উপপরিচালক তখন জানান, হাওরে ৪৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে; ধানগাছ ৫-৬ দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি বাড়বে, তাই ৮০ শতাংশ পাকা ধান কেটে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। অষ্টগ্রামে পলি জমে নদীর পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হাওর ও কিশোরগঞ্জ
হাওর বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গামলা বা পিরিচ আকৃতির অগভীর নিচু জলাভূমি। বর্ষায় নদী ও খাল থেকে আসা পানিতে এগুলো বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়। কিশোরগঞ্জ ঢাকা বিভাগের একটি জেলা, এর উপজেলা ১৩টি। বিস্তীর্ণ হাওরের কারণে ইটনা আয়তনে দেশের বড় উপজেলাগুলোর একটি।

ছবি: ZahidTushar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)