টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে ২০২৬ সালের ৭ জুলাই, মঙ্গলবার, তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে সেদিন সন্ধ্যা ৬টায় পানি বিপৎসীমার মাত্র ১২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) আশঙ্কা করছিল, পানি যেকোনো সময় বিপৎসীমা অতিক্রম করে নদীতীরের নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। জাগো নিউজের লালমনিরহাট প্রতিনিধির খবর অনুযায়ী, দুই মাসের ব্যবধানে তৃতীয়বারের মতো বন্যার আতঙ্কে দিন কাটছিল তিস্তাপাড়ের মানুষের।
১২ ঘণ্টায় বিপৎসীমার আরও কাছে
ডালিয়া পয়েন্টের তথ্যানুযায়ী, ৭ জুলাই সকাল ৬টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। মাত্র ১২ ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৬টায় তা বেড়ে বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার নিচে অবস্থান করে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জাগো নিউজকে জানান, পরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, কোথাও নদীভাঙন দেখা দিলে তা রোধে লালমনিরহাট পাউবো প্রস্তুত রয়েছে, আর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বালির বস্তা ও জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিস্তা ব্যারাজ লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা ও নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় অবস্থিত। এটি তিস্তা সেচ প্রকল্পের প্রধান স্থাপনা, যা দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প হিসেবে পরিচিত এবং ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ নামেও ডাকা হয়। ব্যারাজের নির্মাণকাজ ১৯৭৯ সালে শুরু হয়ে ১৯৯০ সালে শেষ হয়; এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে পাউবো।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের সতর্কবার্তা
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সেদিন এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি কমলেও পরের তিন দিন তা দ্রুত বাড়তে পারে। কেন্দ্রটি ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রমের প্রবল আশঙ্কার কথা জানায়, যাতে নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। পরের ৭২ ঘণ্টায় ধরলা ও দুধকুমারের পানি লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে সতর্কসীমায় পৌঁছে ওইসব এলাকার নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত করতে পারে বলেও জানানো হয়।
ডেইলি অবজারভারের ৭ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রটির হিসাবে সেদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত দেশের কোনো পর্যবেক্ষণ স্টেশনে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গের সংলগ্ন এলাকায় পরের চার দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়। পত্রিকাটি জানায়, এতে অন্তত ১২টি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। একই পূর্বাভাসে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি পরের তিন দিন কমতে পারে এবং পদ্মার পানি পাঁচ দিন কমতে পারে বলে জানানো হয়।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এই কেন্দ্র দেশের নদ-নদীর পানি পর্যবেক্ষণ করে বন্যার পূর্বাভাস দেয়।

তিস্তা, ধরলা ও নদীপাড়ের জেলা
তিস্তা পূর্ব হিমালয়ে উৎপন্ন হয়ে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে রংপুর বিভাগ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪১৪ কিলোমিটার, যার ১০৯ কিলোমিটার বাংলাদেশে। দেশে এটি লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে ফুলছড়ি উপজেলায় যমুনায় মিশেছে।
ধরলা ব্রহ্মপুত্রের একটি উপনদী। ভারতে জলঢাকা নামে পরিচিত নদীটি লালমনিরহাট জেলা দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে ধরলা নামে প্রবাহিত হয় এবং কুড়িগ্রামের কাছে যমুনায় পড়ে।

ছবি: Shafiul Islam Shaikot / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি অবজারভার, উইকিপিডিয়া (তিস্তা নদী, তিস্তা সেচ প্রকল্প, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র, ধরলা নদী)





মন্তব্য
(০)