লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি, বুধবার সকালে ভুট্টা ক্ষেত থেকে অসুস্থ অবস্থায় তিনটি হিমালয়ী গৃধিনী শকুন উদ্ধার করেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। উপজেলার জগতবের ও ব্যাংককান্দা এলাকা থেকে পাখিগুলো উদ্ধার করা হয়। পরদিন ১৫ জানুয়ারি জাগো নিউজ ২৪ খবরটি প্রকাশ করে।
ভুট্টা ক্ষেতে উড়তে না পারা তিন শকুন
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জাগো নিউজ জানায়, সেদিন সকালে ব্যাংককান্দা ও জগতবের এলাকার একটি ভুট্টা ক্ষেতে বিশাল আকারের তিনটি পাখিকে পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। পাখিগুলো উড়তে পারছিল না, মাটিতে ডানা ঝাপটাচ্ছিল। স্থানীয় বাসিন্দা আলাউদ্দিন প্রধান বাদশা একটি শকুন ধরে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান এবং বন বিভাগকে খবর দেন। খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে একে একে তিনটি শকুনই নিজেদের হেফাজতে নেন।
বন বিভাগ জানায়, উদ্ধার হওয়া প্রতিটি শকুনের ওজন আনুমানিক ৫ থেকে ৭ কেজি, ঠোঁট বেশ বড়। পাটগ্রাম উপজেলা বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এই প্রজাতির শকুন মূলত হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের পাখি। শীতকালীন পরিযায়নের সময় প্রচণ্ড ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে কিংবা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তিতে এরা অনেক সময় লোকালয়ে নেমে পড়ে। তিনি জানান, উদ্ধার করা শকুনগুলোকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য দিনাজপুরের শকুন পরিচর্যা কেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে; সুস্থ হলে সেগুলো আবার প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হবে।
পাটগ্রাম দেশের উত্তর সীমান্তের একটি উপজেলা, আয়তন ২৪৬.৮৫ বর্গকিলোমিটার। জগতবের এই উপজেলার আটটি ইউনিয়নের একটি। দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলও পাটগ্রামে, যা তিনবিঘা করিডোর দিয়ে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত।

হিমালয়ী গৃধিনী কোন পাখি
হিমালয়ী গৃধিনীর বৈজ্ঞানিক নাম Gyps himalayensis; ইংরেজিতে একে হিমালয়ান গ্রিফন বা হিমালয়ান ভালচার বলা হয়। এটি হিমালয় ও তিব্বত মালভূমির পাখি। কাজাখস্তান ও মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণে পাকিস্তান, ভারত, নেপাল ও ভুটান এবং পূর্বে পশ্চিম চীন ও মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত এর বিস্তার। মৌসুমভেদে অল্পবয়সী পাখিরা আরও দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ে।
এটি বড় আকারের শকুন। প্রজাতিটির ওজন সাধারণত ৬ থেকে ১২.৫ কেজি, ডানার বিস্তার ২.৫৬ থেকে ৩.১ মিটার। এরা কেবল মৃত প্রাণীর মাংস খায়, তাই প্রকৃতিতে মৃতদেহ সরিয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের লাল তালিকায় হিমালয়ী গৃধিনী 'প্রায়-সংকটাপন্ন' (নিয়ার থ্রেটেনড) প্রজাতি। গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ব্যথানাশক ডাইক্লোফেনাকের অবশিষ্টাংশ থাকা মৃতদেহ খেয়ে এরা বিষক্রিয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যদিও অন্য Gyps প্রজাতির শকুনের মতো এত ব্যাপক হারে এদের সংখ্যা কমেনি।

শীতে উত্তরাঞ্চলে নামা শকুনের পরিচর্যা
আইইউসিএন জানায়, প্রতিবছর পরিযায়নের মৌসুমে দুর্বল বা আহত হিমালয়ী গৃধিনী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে উদ্ধার হয়। ২০১৬ সালের নভেম্বরে বন বিভাগের সহায়তায় আইইউসিএন বাংলাদেশ দিনাজপুরের সিংড়া জাতীয় উদ্যানে দেশের প্রথম শকুন উদ্ধার কেন্দ্র চালু করে। সংস্থাটির ২০১৭ সালের মার্চের তথ্যে, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ৪০টি শকুন উদ্ধার হয়েছিল, আর ২০১৬-১৭ মৌসুমে উদ্ধার হয় ১৬টি।
প্রথম আলোর ২০২১ সালের নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবছর প্রায় ১০০টি হিমালয়ী গৃধিনী বাংলাদেশে আসে, আর এত দূর উড়ে আসা শকুনের প্রায় অর্ধেক ক্লান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়, উড়তে পারে না। মরা প্রাণী সহজে না পাওয়ায় এরা অনেক সময় দিনের পর দিন না খেয়ে থাকে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে বন বিভাগ ও আইইউসিএন এই শকুন নিয়ে কাজ করছে; ২০২০ সাল পর্যন্ত ১১৪টি শকুন উদ্ধার করা হয়েছিল। সিংড়ার কেন্দ্রে পাখিগুলো সাধারণত প্রায় তিন মাস থাকে এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে অবমুক্ত করা হয়।
সিংড়া জাতীয় উদ্যান দিনাজপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে একটি শালবন। বন বিভাগ ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর একে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে; জাতীয় উদ্যানের আয়তন ৩০৫.৬৯ হেক্টর।

ছবি: Ksuryawanshi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, আইইউসিএন, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)