বাংলাদেশে শাকসবজি ও ফলের চাষ চলে সারা বছর, তবে কোন মাসে কোন কাজ করলে ভালো ফলন মেলে, তা নির্ভর করে ঋতু ও কৃষি মৌসুমের ওপর। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এই মাসভিত্তিক পঞ্জিকায় বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত বারো মাসের সবজিখেত ও ফলবাগানের কাজ তুলে ধরা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) মাসিক পত্রিকা ‘কৃষিকথা’র নিয়মিত বিভাগ ‘মাসের কৃষি’র পরামর্শের সঙ্গে মিলিয়ে তথ্যগুলো যাচাই করা হয়েছে।
তিন কৃষি মৌসুম, বারো মাসের কাজ
ছয় ঋতুর দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে কৃষির মৌসুম তিনটি: খরিফ-১, খরিফ-২ ও রবি। রবি হলো শীতের ফসলের মৌসুম; বর্ষা শেষে বীজ বোনা হয়, ফসল ঘরে ওঠে বসন্তে। খরিফ বর্ষাকালের ফসল, যার জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টি দরকার। মৌসুম তিনটি হলেও আবহাওয়া ও প্রয়োজনের কারণে প্রতি মাসেই খেতে ও বাগানে কিছু না কিছু কাজ থাকে। নিচে প্রতিটি বাংলা মাসের পাশে খ্রিস্টীয় মাসের আনুমানিক সময় দেওয়া হলো; বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ পালিত হয় ১৪ এপ্রিল।
গ্রীষ্ম ও বর্ষা: বৈশাখ থেকে শ্রাবণ
- বৈশাখ (মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য মে): লালশাক, গিমাকলমি, ডাঁটা, পাতাপেঁয়াজ, পাটশাক, বেগুন, মরিচ, আদা, হলুদ ও ঢেঁড়সের বীজ বোনার ভালো সময়। মিষ্টিকুমড়া, করলা, ধুন্দুল, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, চালকুমড়া ও শসার মাদা ও মাচা তৈরি করে বীজ বা চারা লাগাতে হয়। গ্রীষ্মকালীন টমেটোর জন্য এআইএস বারি টমেটো ৪, ৫, ৬, ১০ ও ১১, বারি হাইব্রিড টমেটো ৪ ও ৫ এবং বিনা টমেটো ১ ও ২ জাতের কথা বলে, সঙ্গে পলিথিনের ছাউনি দিতে হয়। ডাঁটা, পুঁইশাক, লালশাক, বরবটি, কচি সজনে, তরমুজ ও বাঙ্গি তোলার সময়ও এটি।
- জ্যৈষ্ঠ (মধ্য মে থেকে মধ্য জুন): বীজতলায় তৈরি খরিফ-২ সবজির চারা মূল জমিতে রোপণ, সেচ ও পরিচর্যা; গ্রীষ্মকালীন টমেটোর যত্ন; ঝিঙা, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, পটোল ও কাঁকরোল তোলা এবং নাবি কুমড়াজাতীয় ফসলের মাচা তৈরি।
- আষাঢ় (মধ্য জুন থেকে মধ্য জুলাই): গ্রীষ্মকালীন বেগুন, টমেটো ও কাঁচা মরিচের যত্ন; শিমের বীজ বোনা; আগে লাগানো বেগুন, টমেটো ও ঢেঁড়স তোলা; খরিফ-২ সবজির চারা রোপণ।
- শ্রাবণ (মধ্য জুলাই থেকে মধ্য আগস্ট): আগাম রবি সবজি বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাউ, টমেটো ও বেগুনের বীজতলা তৈরি ও বীজ বোনা শুরু করা যায়। বর্ষায় শুকনো জায়গা না পেলে টব, মাটির চাড়ি, কাঠের বাক্স বা পলিথিন ব্যাগে চারা তোলার পরামর্শ দেয় এআইএস। মাদায় মাটি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার ও গাছের গোড়ায় পানি জমতে না দেওয়া এ মাসের মূল কাজ; আষাঢ়ে শিম ও লাউয়ের চারা লাগানো না হলে দ্রুত লাগাতে হয়।
এআইএসের পরামর্শে, কুমড়াজাতীয় সবজিতে মাছি পোকা বড় ক্ষতি করে; খেতে খুঁটির মাথায় বিষটোপ ফাঁদ বা সেক্স ফেরোমন ফাঁদ দিয়ে এর আক্রমণ ঠেকানো যায়। ফুল আসা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরে হাতে পরাগায়ন করলে ফলন অনেক বাড়ে। লতানো গাছের বাড়বাড়ন্ত বেশি হলে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পাতা ও লতা ছেঁটে দিলে তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল আসে।

শরৎ ও হেমন্ত: ভাদ্র থেকে অগ্রহায়ণ
- ভাদ্র (মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর): আগাম রবি সবজি বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, টমেটো, বেগুন, কুমড়া ও লাউয়ের জমি তৈরি ও চারা রোপণ; মধ্যম ও নাবি রবি সবজির বীজতলা তৈরি; নাবি খরিফ-২ সবজি তোলা ও বীজ রাখা।
- আশ্বিন (মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য অক্টোবর): আগাম রবি সবজির চারা রোপণ, সেচ ও আগাছা দমন; নাবি রবি সবজির বীজতলা তৈরি; শিম, লাউ ও বরবটির মাচা তৈরি ও পরিচর্যা।
- কার্তিক (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর): এআইএসের পরামর্শ, যত দ্রুত সম্ভব ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, বাটিশাক, টমেটো ও বেগুনের বীজতলায় বীজ বোনা এবং আগের মাসে তোলা চারা মূল জমিতে লাগানো। লালশাক, মুলাশাক, গাজর ও মটরশুঁটির বীজ বোনা এবং পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ও ধনিয়ার চাষ এ সময়। হালকা বেলে-দোআঁশ মাটিতে আলু লাগানো হয়; নদীর ধারের পলিমাটিতে মিষ্টিআলু ভালো হয়। হঠাৎ বৃষ্টিতে চারা নষ্ট হতে পারে বলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হয়।
- অগ্রহায়ণ (মধ্য নভেম্বর থেকে মধ্য ডিসেম্বর): মিষ্টিআলুর লতা রোপণ; পেঁয়াজ, রসুন ও মরিচের চারা রোপণ; আলুখেতে সেচ; ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, ওলকপি ও শালগমের যত্ন, আগাছা পরিষ্কার ও সবজি তোলা।

শীত ও বসন্ত: পৌষ থেকে চৈত্র
- পৌষ (মধ্য ডিসেম্বর থেকে মধ্য জানুয়ারি): আগাম ও মধ্যম রবি সবজি তোলা এবং পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন; নাবি রবি সবজির পরিচর্যা। বাণিজ্যিকভাবে মৌসুমি ফুল চাষ করলে এ সময় গাছের বাড়তি যত্ন নিতে হয়।
- মাঘ (মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি): আলু, পেঁয়াজ ও রসুনের গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়া; শীতে মাটির রস কমে যায় বলে সবজিখেতে চাহিদামতো সেচ। এআইএসের মতে, টমেটোর ফলছিদ্রকারী পোকা সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় (আইপিএম) দমন করতে হয়, আর আলুতে নাবি ধসা রোগ দেখা দিলে আক্রান্ত জমিতে সেচ বন্ধ রাখতে হয়। আগাম খরিফ-১ সবজির বীজতলা ও মাদা তৈরির সময়ও এটি; সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত চারাই ভালো ফলনের ভিত্তি।
- ফাল্গুন (মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ): বসতবাড়ির বাগানে ডাঁটা, কলমিশাক, পুঁইশাক, করলা, ঢেঁড়স, বেগুন ও পটোল চাষ এবং মাদায় চিচিঙ্গা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টিকুমড়া ও চালকুমড়ার বীজ বোনা। আলু ও মিষ্টিআলু তোলা এবং রবি সবজির বীজ সংগ্রহ। এআইএসের পরামর্শ, আলুগাছের বয়স ৯০ দিন হলে মাটির সমান করে গাছ কেটে দিয়ে ১০ দিন পর আলু তুলতে হয়, তারপর ভালো করে শুকিয়ে বাছাই করে সংরক্ষণ করতে হয়।
- চৈত্র (মধ্য মার্চ থেকে মধ্য এপ্রিল): গ্রীষ্মকালীন সবজির বীজ বোনা বা চারা রোপণ শুরু করার মাস; এআইএসের তালিকায় আছে টমেটো, ঢেঁড়স, বেগুন, করলা, ঝিঙা, ধুন্দুল, চিচিঙ্গা, শসা, ওলকচু, পটোল, কাঁকরোল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, লালশাক ও পুঁইশাক। নাবি রবি সবজি তোলা এবং বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ।

ফলবাগানের সারা বছরের কাজ
বৈশাখে ফলবাগানের জায়গা বাছাই এবং ভালো জাতের চারা ও কলম সংগ্রহের সময়; এআইএসের মতে নারিকেলের চারা এ সময় লাগানো যায়, গ্রামের রাস্তার পাশে লাগানো যায় খেজুর ও তালের চারা। আষাঢ়-শ্রাবণে সারা দেশে গাছ লাগানোর মৌসুম চলে; ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা লাগিয়ে গোড়ায় মাটি তুলে খুঁটির সঙ্গে সোজা করে বেঁধে দিতে হয় এবং গরু-ছাগল থেকে বাঁচাতে চারপাশে বেড়া দিতে হয়। ভাদ্রে ফল তোলার পর ডালপালা ছাঁটাই, কার্তিক-অগ্রহায়ণে মালচিং করে মাটির রস ধরে রাখা এবং পৌষ থেকে ফাল্গুনে পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন করতে হয়। চৈত্রে বৃষ্টির অভাবে মাটির রস কমে যায়; তখন গাছের গোড়ায় নিয়মিত সেচ দিতে হয়, নইলে ফলের গুটি ঝরে পড়ে।
জমির অবস্থাভেদে সারের পরিমাণ কমবেশি হয়, আর বালাইনাশক ভুল মাত্রায় দিলে ক্ষতি হয়। তাই সার ও বালাইনাশকের মাত্রা জানতে উপজেলা কৃষি অফিস বা কৃষি কল সেন্টারের (১৬১২৩) পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) ‘কৃষিকথা’, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)