ফসলের সার বলতে সাধারণত ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপির কথাই আগে মনে আসে। কিন্তু গাছের ঠিকমতো বেড়ে ওঠা, ফুল ও ফল ধরা এবং ভালো ফলনের জন্য আরও কিছু উপাদান দরকার হয়, যেগুলো লাগে খুব অল্প পরিমাণে। এদের বলা হয় অনুখাদ্য বা মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট। ২০২৫ সালের ৪ মার্চ জাগো নিউজে প্রকাশিত কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাসের লেখায় এই অনুখাদ্যের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং উদ্ভিদ পুষ্টিবিষয়ক তথ্যসূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি এখানে তুলে ধরা হলো।
গাছের ১৭টি অপরিহার্য উপাদান
গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বংশবিস্তারের জন্য মোট ১৭টি অপরিহার্য উপাদান দরকার। এর মধ্যে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গাছ পায় বাতাস ও পানি থেকে। নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, গন্ধক, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম বেশি পরিমাণে লাগে বলে এগুলো মুখ্য পুষ্টি উপাদান। বাকি ৮টি অনুখাদ্য: লোহা, বোরন, ক্লোরিন, ম্যাঙ্গানিজ, দস্তা, তামা, মলিবডেনাম ও নিকেল। পরিমাণে অল্প লাগলেও এর যেকোনো একটির ঘাটতি থাকলে অন্য সার পর্যাপ্ত দিলেও গাছ স্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে না।
এফএওর ২০০৬ সালের প্রকাশনা ‘প্ল্যান্ট নিউট্রিশন ফর ফুড সিকিউরিটি’ অনুযায়ী, কয়েক দশক আগে মাঝারি ফলনের যুগে বেশির ভাগ মাটি নিজেই প্রয়োজনীয় অনুখাদ্য জোগাতে পারত। নিবিড় চাষ ও উচ্চ ফলনের কারণে পরিস্থিতি বদলেছে; অনেক জায়গায় অনুখাদ্যই এখন ফলন সীমিত করার কারণ হয়ে উঠছে এবং নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম সারের কার্যকারিতা কমার পেছনেও আংশিকভাবে দায়ী। সংস্থাটির মতে, বিশ্বজুড়ে দস্তা ও বোরনের ঘাটতিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কোন অনুখাদ্য কী কাজ করে
- দস্তা: গাছের বহু এনজাইমের জন্য দরকার, ডিএনএ প্রতিলিপিতেও এর ভূমিকা আছে। অভাবে পাতা ছোট হয়ে যায়, পাতার শিরার মাঝের অংশ হলুদ হয় এবং গাছ খাটো থাকে।
- লোহা: সালোকসংশ্লেষণের জন্য দরকার এবং এনজাইমের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। অভাবে পাতার শিরার মাঝের অংশ হলুদ হয়ে যায়।
- বোরন: কোষপ্রাচীর মজবুত রাখে; ফুল ধরা ও টিকে থাকা, পরাগরেণুর অঙ্কুরোদ্গম এবং বীজ ও ফলের গঠনে কাজ করে। অভাবে গাছের ডগা মরে যায়, গাছ খাটো ও ঝোপালো হয় এবং বেশি ঘাটতিতে ফল ধরে না।
- ম্যাঙ্গানিজ: সালোকসংশ্লেষণ ও ক্লোরোপ্লাস্ট গঠনে দরকার। অভাবে পাতায় বিবর্ণ দাগ দেখা দিতে পারে।
- তামা: সালোকসংশ্লেষণে এবং কোষপ্রাচীরের লিগনিন তৈরিতে কাজ করে।
- মলিবডেনাম, ক্লোরিন ও নিকেল: মলিবডেনাম নাইট্রোজেন বিপাকে, ক্লোরিন অভিস্রবণ ও আয়নের ভারসাম্যে এবং নিকেল ইউরিয়েজ এনজাইম সক্রিয় করতে লাগে।

কোন মাটিতে ঘাটতি বেশি, ধানে কী করণীয়
এফএও জানায়, লোহা, ম্যাঙ্গানিজ ও দস্তার ঘাটতি বেশি দেখা যায় নিরপেক্ষ থেকে ক্ষারীয় মাটিতে; বোরন ও তামার ঘাটতির আশঙ্কা বেশি আর্দ্র জলবায়ুর অম্লীয় মাটিতে, যদিও পূর্ব ভারতের অনেক নিরপেক্ষ ও ক্ষারীয় মাটিতেও ব্যাপক বোরন ঘাটতি পাওয়া গেছে। ধানচাষ নিবিড় হওয়ায় ধানক্ষেতে অনুখাদ্যের ঘাটতি বাড়ছে; দস্তা ও লোহার ঘাটতি সেখানে বেশ সাধারণ।
ধানের বীজতলায় দস্তা না দেওয়া হলে রোপণের আগে জিংক সালফেটের মাধ্যমে হেক্টরপ্রতি ১০ থেকে ১২ কেজি দস্তা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে এফএও। লোহার ঘাটতিতে সাপ্তাহিক বিরতিতে ১ শতাংশ ফেরাস সালফেট দ্রবণ দুই থেকে তিনবার পাতায় স্প্রে করা যায়; সবুজ সারও লোহার ঘাটতি কমায়।

মাটি পরীক্ষা করে পরিমিত প্রয়োগ
অনুখাদ্য সব সারের বিকল্প নয়; এফএওর ভাষায়, প্রচলিত নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামভিত্তিক সারের সঙ্গে ঘাটতি থাকা অনুখাদ্যটি যোগ করতে হয়। বাজারে অনেক মিশ্র অনুখাদ্য সার পাওয়া যায়, কিন্তু সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এমন মিশ্রণে কিছু উপাদান কম আর কিছু বেশি পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রয়োজনের বেশি দিলে ক্ষতিও হতে পারে; যেমন মাটির পানিতে বোরনের মাত্রা প্রতি মিলিয়নে ১ ভাগের বেশি হলে তা বেশির ভাগ গাছের জন্য বিষাক্ত। তাই মাটির পুষ্টি পরীক্ষা ও স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনুখাদ্য প্রয়োগ করাই এফএওর পরামর্শ।
সুষম সারের ঘাটতি দক্ষিণ এশিয়ার একটি পরিচিত সমস্যা। ২০২১ সালে গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত আইএফপিআরআই ও সিমিটের গবেষকদের এক পর্যালোচনায় বলা হয়, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সার ভর্তুকি ব্যবস্থা ইউরিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অনুখাদ্য ও জৈব উপকরণের কম ব্যবহারে উৎসাহ দেয়, যা মাটির অবক্ষয় ও ভূগর্ভস্থ পানি দূষণে ভূমিকা রাখে।
ছবি: Alandmanson / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (প্ল্যান্ট নিউট্রিশন ফর ফুড সিকিউরিটি, ২০০৬), গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি (কিশোর ও অন্যান্য, ২০২১), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)