নামে মাছির মতো শোনালেও জোনাকি আসলে গুবরে পোকা বা বিটল, ল্যামপাইরিডি (Lampyridae) পরিবারের সদস্য। ইংরেজিতে এদের ফায়ারফ্লাই বা লাইটনিং বাগ বলা হয়। গরম ও বর্ষার রাতে পুকুর, খাল ও বিলের ধারে ঘাস আর ঝোপঝাড়ে এদের আলো একবার জ্বলে, একবার নেভে। জাগো নিউজ ২৪-এর এক প্রতিবেদনে এই আলোর রহস্য তুলে ধরা হয়েছিল। বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় এই আলো একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল, আর জোনাকির কাছে এটি যোগাযোগের মাধ্যম।
উইকিপিডিয়ার তথ্যে এই পরিবারে ২,৪০০-র বেশি বর্ণিত প্রজাতি আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার এক গবেষণা প্রতিবেদনে সেখানকার গবেষক ব্র্যানহামের ধারণা, আরও প্রায় ৩,০০০ প্রজাতি এখনো আবিষ্কার বা নামকরণের বাকি। পূর্ণবয়স্ক জোনাকি সর্বোচ্চ প্রায় ২৫ মিলিমিটার, অর্থাৎ এক ইঞ্চির মতো লম্বা হয়। প্রজাতিভেদে আলোর রং হলুদ, সবুজ বা হালকা লাল।
লুসিফেরিন আর লুসিফেরেজের ঠান্ডা আলো
জোনাকির পেটের শেষ ভাগে থাকে আলো তৈরির অঙ্গ। সেখানে লুসিফেরেজ নামের একটি এনজাইম লুসিফেরিন নামের যৌগের ওপর কাজ করে। এই বিক্রিয়ায় লাগে অক্সিজেন, কোষের শক্তির অণু এটিপি (অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট) এবং ম্যাগনেসিয়াম আয়ন। এতে যে আলো তৈরি হয় তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৫১০ থেকে ৬৭০ ন্যানোমিটার। এতে অবলোহিত বা অতিবেগুনি রশ্মি থাকে না, তাই একে ঠান্ডা আলো বলা হয়।
ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জোনাকি তার শক্তির প্রায় শতভাগ এই ঠান্ডা আলো তৈরিতে কাজে লাগায়, যেখানে সাধারণ ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের শক্তির ৯০ শতাংশ তাপ হয়ে নষ্ট হয়। আলোর অঙ্গের পেছনে গাড়ির হেডলাইটের প্রতিফলকের মতো একটি স্তর এই দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে।

প্রজাতিভেদে আলাদা প্রেমের সংকেত
জোনাকি সারাক্ষণ আলো জ্বালিয়ে রাখে না; জ্বালানো আর নেভানোর ছন্দই এদের সংকেত। প্রতিটি প্রজাতির ঝলকের ধরন আলাদা। সঙ্গী খুঁজতে পুরুষ জোনাকি উড়ে উড়ে নিজের প্রজাতির ছন্দে আলো জ্বালায়, আর স্ত্রী জোনাকি ঘাস বা ঝোপে বসে আলো জ্বেলে সাড়া দেয়। ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার গবেষণায় দেখা গেছে, স্ত্রী জোনাকি দ্রুত ঝলক বেশি পছন্দ করে; কৃত্রিমভাবে তৈরি এমন দ্রুত ঝলকেও তারা সাড়া দিয়েছে, যা প্রকৃতিতে দেখা যায় না।
এই সংকেত নকলও হয়। উইকিপিডিয়ার তথ্যে, ফটুরিস (Photuris) গণের স্ত্রী জোনাকি ছোট আকারের ফটিনাস (Photinus) পুরুষদের আলোর ছন্দ নকল করে তাদের কাছে ডেকে আনে এবং খেয়ে ফেলে; শিকারের শরীরের বিষাক্ত প্রতিরক্ষা-যৌগ পেতেই এমন করে। এদের তাই বলা হয় 'ফেম ফাটাল' জোনাকি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে আবার বড় দলে জোনাকি একসঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্বলে-নেভে; ফিলিপাইনের দনসল ও যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির এলকমন্ট এমন দৃশ্যের জন্য পরিচিত।

লার্ভা থেকে পূর্ণবয়স্ক জোনাকি
ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার তথ্যে, সব জোনাকিই লার্ভা অবস্থায় আলো দেয়; পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় যোগাযোগের জন্য আলো ব্যবহার করে কেবল বিবর্তনের দিক থেকে সবচেয়ে অগ্রসর প্রজাতিগুলো। ডিম পাড়ার তিন থেকে চার সপ্তাহ পর লার্ভা বের হয়। লার্ভা দক্ষ শিকারি, অন্য পোকার লার্ভা, শামুক ও স্লাগ খায়। কিছু প্রজাতির লার্ভার খাঁজকাটা চোয়াল দিয়ে শিকারের শরীরে সরাসরি পাচক রস ঢোকে। প্রজাতিভেদে লার্ভা দশা কয়েক সপ্তাহ থেকে দুই বছর বা তারও বেশি সময় চলে, তারপর এক থেকে আড়াই সপ্তাহের পিউপা দশা। পূর্ণবয়স্ক বেশির ভাগ জোনাকি গ্রীষ্মে মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাঁচে।
শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে জোনাকির শরীরে থাকে লুসিবুফাজিন নামের স্টেরয়েড যৌগ, যা বিষাক্ত কুনোব্যাঙের হৃদ্যন্ত্র-উদ্দীপক যৌগের মতো। এর কারণে শিকারির কাছে জোনাকি বিস্বাদ লাগে।

আবাস হারানো ও আলো দূষণে বিপন্ন জোনাকি
২০২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বায়োসায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী সারা লুইসের নেতৃত্বে গবেষকেরা বিশ্বজুড়ে জোনাকি বিশেষজ্ঞদের মতামত নেন। তাঁদের বিচারে বেশির ভাগ অঞ্চলে জোনাকির টিকে থাকার পথে সবচেয়ে বড় হুমকি আবাসস্থল হারানো, এরপর আলো দূষণ ও কীটনাশক। গত এক শতাব্দীতে কৃত্রিম আলো বিপুল হারে বেড়েছে। গবেষণার সহলেখক অ্যাভালন ওয়েন্সের ভাষায়, আলো দূষণ জোনাকির মিলনের আচার একেবারে এলোমেলো করে দেয়।
মালয়েশিয়ার Pteroptyx tener প্রজাতির জোনাকি, যারা দলবেঁধে তাল মিলিয়ে জ্বলার জন্য বিখ্যাত, কেবল ম্যানগ্রোভ বনে থাকে। সেই বন পাম তেলের বাগান ও জলজ চাষের খামারে বদলে যাওয়ায় এদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমেছে। লার্ভা দুই বছর পর্যন্ত মাটির নিচে বা পানিতে কাটায় বলে কীটনাশকের সংস্পর্শও বেশি পায়। ইংল্যান্ডের গ্লো-ওয়ার্ম (Lampyris noctiluca) হাতে গোনা সেই প্রজাতিগুলোর একটি, যাদের সংখ্যা কমার হিসাব নথিভুক্ত হয়েছে।

ছবি: art farmer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, উইকিপিডিয়া, ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা, টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়, সায়েন্সডেইলি





মন্তব্য
(০)