২০২৫ সালের জুনের মাঝামাঝি, গ্রীষ্মের ভরা মৌসুমে দেশের বাজার ভরে ছিল আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, তরমুজ ও বাঙ্গির মতো রসালো ফলে। জাগো নিউজ ২৪-এর ১৬ জুন ২০২৫ তারিখের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ফলের আসল উপকার মেলে তখনই, যখন সেগুলো সঠিক মৌসুমে, গাছে স্বাভাবিকভাবে পেকে বাজারে আসে। কৃত্রিমভাবে পাকানো বা সংরক্ষিত ফল অনেক সময় উপকারের বদলে ক্ষতি করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক তথ্যপত্রেও (২৯ এপ্রিল ২০২০) এই পরামর্শ আছে। সংস্থাটির মতে, দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম বা পাঁচ ভাগ ফল ও সবজি খেলে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমে এবং খাদ্যআঁশের চাহিদা মেটে। ফল ও সবজি বেশি খাওয়ার যে উপায়গুলো সংস্থাটি বলেছে, তার একটি হলো মৌসুমের তাজা ফল ও সবজি খাওয়া।
গ্রীষ্মের ফলে কী পুষ্টি থাকে
প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, গরমে ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও খনিজ লবণ বেরিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য-উপাদান তথ্যভান্ডার ফুডডেটা সেন্ট্রালের হিসাবে, ১০০ গ্রাম আমে ৮৩.৪৬ গ্রাম পানি, ৩৬.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি এবং ৫৪ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ থাকে। ১০০ গ্রাম লিচুতে ভিটামিন সি থাকে ৭১.৫ মিলিগ্রাম।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (এনআইএইচ) খাদ্য সম্পূরক দপ্তরের তথ্যে, ভিটামিন এ স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, প্রজনন এবং বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন সি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কোষকে সুরক্ষা দেয়, উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন শোষণ বাড়ায় এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ঠিকমতো কাজ করতে সাহায্য করে।
অন্য ফলগুলোর মধ্যে তরমুজের ৯১ শতাংশই পানি। কাঁঠালের শাঁসের ৭৪ শতাংশ পানি; ১০০ গ্রাম শাঁসে প্রায় ৯৫ কিলোক্যালরি শক্তি মেলে, সঙ্গে খাদ্যআঁশ, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি ও পটাশিয়াম। জামের ৮৩ শতাংশ পানি, এতে মাঝারি মাত্রায় ভিটামিন সি আছে।


কার্বাইডে পাকানো ফল কেন ঝুঁকিপূর্ণ
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, মৌসুমের আগেই বাজারে আসা অনেক ফল ক্যালসিয়াম কার্বাইডসহ নানা রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হয়। এই রাসায়নিকের ঝুঁকি নিয়ে ২০২৪ সালের ১৮ মে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান কর্তৃপক্ষ (এফএসএসএআই) ফল ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে। ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির বরাতে সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম অল ইন্ডিয়া রেডিও জানায়, আম পাকাতে বহুল ব্যবহৃত ক্যালসিয়াম কার্বাইড থেকে অ্যাসিটিলিন গ্যাস বের হয়, যাতে আর্সেনিক ও ফসফরাসের ক্ষতিকর অবশেষ থাকে। এতে মাথা ঘোরা, ঘন ঘন পিপাসা, জ্বালাপোড়া, দুর্বলতা, গিলতে কষ্ট, বমি ও ত্বকে ঘা হতে পারে।
কার্বাইড ফলের গায়ে অবশেষ রেখে যেতে পারে, আর যাঁরা এটি নাড়াচাড়া করেন তাঁদের জন্যও গ্যাসটি বিপজ্জনক। তাই ভারতে ২০১১ সালের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান (বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ) প্রবিধানে ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড নিষিদ্ধ, আর নিরাপদ বিকল্প হিসেবে ইথিলিন গ্যাসের অনুমতি আছে।
মৌসুম মেনে আম পাড়া
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিটি ফলের নিজস্ব ভরা মৌসুম আছে, আর মৌসুমের বাইরে খাওয়া ফল স্বাদে ভালো না-ও লাগতে পারে। আমের ক্ষেত্রে এই মৌসুম বেঁধে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, রাজশাহী জেলা প্রশাসন ২০২৫ সালের ৭ মে আম পাড়ার সময়সূচি ঘোষণা করে। সূচি অনুযায়ী গুটি আম ১৫ মে, গোপালভোগ ২০ মে, হিমসাগর ও খিরসাপাত ২৫ মে, ল্যাংড়া ৩০ মে, ফজলি ১০ জুন এবং গৌরমতি ১৫ জুলাই থেকে পাড়া যাবে। সূচি না মানলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সে বছর জেলায় ২ লাখ ৬০ হাজার ৬ টন আম উৎপাদনের আশা করে। প্রতিবেদনের আরেকটি যুক্তি, এসব ফল দেশের কৃষকেরাই ফলান এবং রাজশাহী, নওগাঁ ও দিনাজপুরের মতো জেলা থেকে আম ও লিচু সহজেই ঢাকায় পৌঁছায়। তাই দীর্ঘ পরিবহন ও সংরক্ষণের রাসায়নিকের দরকার কম পড়ে।
খাওয়ার সময় যে সতর্কতা দরকার
মৌসুমি ফলও খেতে হবে পরিমিত পরিমাণে, ভালোভাবে ধুয়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতিরিক্ত খাওয়া, না ধুয়ে খাওয়া বা পচা ফল খাওয়ায় বমি, পেটের সমস্যা বা জ্বর হতে পারে, আর শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা দরকার।
লিচু নিয়ে শিশুদের জন্য একটি বাড়তি সতর্কতা গবেষণায় এসেছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির গবেষকেরা ২০১৭ সালে দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ সাময়িকীতে জানান, ভারতের সবচেয়ে বড় লিচু উৎপাদন এলাকা বিহারের মুজাফফরপুরে ২০১৪ সালের মে থেকে জুলাইয়ে খিঁচুনি বা অচেতনতা নিয়ে ৩৯০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়, মারা যায় ১২২ জন। অসুস্থ হওয়ার আগের ২৪ ঘণ্টায় লিচু খাওয়া এবং রাতের খাবার না খাওয়ার সঙ্গে রোগের সম্পর্ক পাওয়া যায়। রোগটির সঙ্গে যুক্ত ছিল লিচুতে থাকা প্রাকৃতিক বিষ হাইপোগ্লাইসিন এ ও এমসিপিজি, যা রক্তে শর্করা কমিয়ে দেয়। গবেষকেরা ওই এলাকায় লিচু কম খাওয়া ও শিশুদের রাতের খাবার নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।

ছবি: Mahinur11 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (স্বাস্থ্যকর খাদ্য তথ্যপত্র, ২০২০), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, এনআইএইচ খাদ্য সম্পূরক দপ্তর, অল ইন্ডিয়া রেডিও (এফএসএসএআই, ১৮ মে ২০২৪), দ্য ডেইলি স্টার (৭ মে ২০২৫), দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ (শ্রীবাস্তব ও অন্যান্য, ২০১৭), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)