চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশে কোবরার কামড়ে আহত স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন এক নারী। টেলিভিশনে দেখা একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে তিনি স্বামীর ক্ষতস্থান থেকে মুখ দিয়ে বিষ টেনে বের করার চেষ্টা করেন। পরে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। চীনের জিমু নিউজের বরাতে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট (এসসিএমপি) ২০২৬ সালের ৪ জুলাই ঘটনাটির খবর প্রকাশ করে; একই দিন জাগো নিউজ ২৪ এটি বাংলায় প্রকাশ করে।
মাঠে কাজের সময় কোবরার কামড়
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউনানের ইউয়ানইয়াং কাউন্টিতে এক বয়স্ক কৃষক নিজের জমিতে কাজ করার সময় একটি কোবরা তার আঙুলে কামড় দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্ষতস্থান ফুলে যায় এবং তিনি মাথা ঘোরা ও দুর্বলতা অনুভব করেন।
এ সময় আতঙ্কিত স্ত্রী টেলিভিশনে দেখা পদ্ধতি অনুসরণ করে কোনো সুরক্ষা ছাড়াই সরাসরি মুখ দিয়ে স্বামীর ক্ষত থেকে বিষ টেনে বের করার চেষ্টা করেন। আহত কৃষককে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা পর স্ত্রীর মুখ, জিহ্বা, মুখমণ্ডল ও হাত-পায়ে অবশ ভাব দেখা দেয়। পরদিন তিনি প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তাকেও হাসপাতালে নিয়ে যান।
হংহে প্রিফেকচারের থার্ড পিপলস হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, স্থানীয় একটি প্রজাতির কোবরার বিষে স্বামী-স্ত্রী দুজনই আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাদের অ্যান্টিভেনম সিরাম ইনজেকশনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থা স্থিতিশীল হলে কয়েক দিন পর দুজনকেই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ইউয়ানইয়াং কাউন্টি হংহে প্রিফেকচারের অংশ; পাহাড়ের গায়ে হানি জনগোষ্ঠীর ধাপে ধাপে তৈরি ধানক্ষেতের জন্য এলাকাটি পরিচিত।

মুখ দিয়ে বিষ টানা কেন বিপজ্জনক
ইউনানের ওই হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলেন, সাপে কাটলে মুখ দিয়ে বিষ টেনে বের করতে হবে, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। তাদের ব্যাখ্যা, মুখের ভেতরের ঝিল্লিতে প্রচুর সূক্ষ্ম রক্তনালি থাকে; বিষের সংস্পর্শে এলে তা দ্রুত উদ্ধারকারীর রক্তে ঢুকে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। তা ছাড়া সাপের কামড়ের ক্ষত সাধারণত সুচের ছিদ্রের মতো ছোট, আর বিষ দ্রুত চামড়ার নিচের টিস্যু বা রক্তে ছড়িয়ে পড়ে; তাই মুখ দিয়ে তা টেনে বের করা কার্যত অসম্ভব।
চিকিৎসকেরা আরও বলেন, ক্ষতস্থান কেটে রক্ত বের করাও আরেকটি বড় ভুল ধারণা; এতে আহত ব্যক্তির অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা সংক্রমণ হতে পারে। ক্ষতে আগুনের তাপ দেওয়া বা বরফ লাগানোও এড়িয়ে চলতে বলেন তারা। এর বদলে জরুরি চিকিৎসা সেবায় ফোন করা, যত কম সম্ভব নড়াচড়া করা এবং সাপের রং, দাগ ও মাথার আকৃতি মনে রাখা বা সম্ভব হলে ছবি তুলে রাখার পরামর্শ দেন, যাতে চিকিৎসকেরা সঠিক ওষুধ বেছে নিতে পারেন।

স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক চিকিৎসা নির্দেশনা
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্যতথ্য সেবা মেডলাইনপ্লাসও স্পষ্টভাবে বলে, মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করা যাবে না। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী সাপে কাটলে করণীয়:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখুন এবং দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন; উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করবেন না।
- নড়াচড়া সীমিত রাখুন; কোবরা কামড়ালে আক্রান্ত অঙ্গ হৃৎপিণ্ডের স্তরের নিচে রাখুন।
- আংটি বা আঁটসাঁট কিছু খুলে ফেলুন, কারণ জায়গাটি ফুলে যেতে পারে; অঙ্গটি ঢিলেঢালাভাবে স্প্লিন্ট বা স্লিংয়ে রাখুন।
- টর্নিকেট বা শক্ত বাঁধন দেবেন না, বরফ লাগাবেন না বা ক্ষত পানিতে ডোবাবেন না।
- ছুরি বা ব্লেড দিয়ে ক্ষত কাটবেন না এবং মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করবেন না।
- নিরাপদ হলে দূর থেকে সাপের ছবি তুলুন বা রং, আকার ও আকৃতি মনে রাখুন; সাপ ধরতে বা খুঁজতে সময় নষ্ট করবেন না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের তথ্যপত্র অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষকে সাপে কাটে, যার মধ্যে ১৮ লাখ থেকে ২৭ লাখ ক্ষেত্রে বিষক্রিয়া হয়। প্রতিবছর প্রায় ৮১ হাজার ৪১০ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ জন সাপের কামড়ে মারা যান। শুধু এশিয়াতেই বছরে ২০ লাখ পর্যন্ত মানুষ বিষক্রিয়ার শিকার হন, আর গ্রামের দরিদ্র কৃষকেরা এর বড় ভুক্তভোগী। ডব্লিউএইচওর মতে, মানসম্মত অ্যান্টিভেনমই সাপের বিষের বেশির ভাগ প্রভাব ঠেকানো বা সারিয়ে তোলার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। তাই সাপে কাটলে ঘরোয়া পদ্ধতিতে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি।

চীনে সাপের কামড়ের ঘটনা প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে। এসসিএমপি জানায়, ২০২৬ সালের মে মাসে দক্ষিণের গুয়াংডং প্রদেশে ১৪ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রকে স্কুল চত্বরের ঘাসে অজানা কিছু কামড় দেয়। ব্যথা না থাকায় সে শুরুতে গুরুত্ব দেয়নি; কয়েক ঘণ্টা পর হাত-পা অবশ ও দৃষ্টি ঝাপসা হলে শিক্ষককে জানায়। চিকিৎসকেরা বলেন, আর এক-দুই ঘণ্টা দেরি হলে তার শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারত।
ছবি: Thomas Brown / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট (দ্য স্টারে পুনঃপ্রকাশিত), মাদারশিপ, মেডলাইনপ্লাস (ইউএস ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা





মন্তব্য
(০)