২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা জয়পুরহাটের মাঠে মাঠে চলছিল আলু তোলার ধুম, কিন্তু ফসল ঘরে তুলতে থাকা কৃষকদের মুখে হাসি ছিল না। জাগো নিউজ ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জেলা থেকে খবর দেয়, ফলন ভালো হলেও স্থানীয় বাজারে আলুর দাম দিন দিন কমছিল। চাষিরা বলছিলেন, সে সময়ের বাজারদরে লাভ তো দূরের কথা, প্রতি বিঘায় যে টাকা খরচ হয়েছে তা-ও উঠছে না। দামের এই অস্থিতিশীলতা নিয়ে জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও (ডিএই) চিন্তিত ছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
জয়পুরহাটে ডিএইর উপপরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলায় ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়। এ জেলার শীতের মাঠে আলুর প্রাধান্য অনেক দিনের: ২০২৩-২৪ মৌসুমে ডিএই জয়পুরহাটে ৩৮ হাজার ৮১৫ হেক্টরে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল, আর ২০১৯-২০ মৌসুমে জেলায় আলু চাষ হয়েছিল ৩৮ হাজার ৩২৫ হেক্টরে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চাষিরা কত দাম পাচ্ছিলেন
জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলা কৃষকদের হিসাবে, চলতি মৌসুমে সার, বীজ ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অথচ ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝির বাজারদরে এক বিঘার আলু বিক্রি হচ্ছিল মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায়। তাঁদের হিসাবে এতে বিঘাপ্রতি লোকসান দাঁড়াচ্ছিল ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
স্থানীয় বাজারে খোঁজ নিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, তখন সাদা আলু এবং স্থানীয়ভাবে 'সৃটিক' নামে বিক্রি হওয়া জাতের প্রতি মণ আলু মাত্র ২২০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, আর গ্র্যানোলা জাতের আলু বিক্রি হচ্ছিল মণপ্রতি ২০০ থেকে ২১০ টাকায়। মণ হলো ওজনের প্রচলিত একক, জেলার বাজারে আলু এই এককেই কেনাবেচা হয়।
হঠাৎ এই দরপতনের পেছনে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট, নাকি চাহিদার অভাব, তা কৃষকেরা বুঝতে পারছিলেন না, আর এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। সিন্ডিকেটের সন্দেহটি কৃষকদের নিজেদের; প্রতিবেদনে কোনো ব্যবসায়ীর নাম বা কোনো ব্যবসায়ীর বক্তব্য ছিল না। চাষিরা বলছিলেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় আলু রপ্তানি করা গেলে তাঁদের এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো না।
মাঠেই আলু বিক্রি করতে আসা কৃষক জয়নাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'কয়েকদিন আগেও এক মণ আলু ৫৫০ টাকায় বেচেছি। এখন সেই আলু ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় নামছে। বাজারে প্রতিদিন মণে ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে দাম কমছে। আমরা কৃষক এখন যাবো কোথায়?'
কৃষক সাইফুল ইসলামসহ অন্যরা জাগো নিউজকে বলেন, 'বর্তমান সরকারকে প্রান্তিক চাষিদের কথা চিন্তা করে আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।'
ঋণ, রপ্তানি ও আলুভিত্তিক শিল্পের দাবি
জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি শামস মতিন জাগো নিউজকে বলেন, সহজ ঋণ পেলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে: 'সরকার যদি ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে দেয়, তবে এখানে অনেক উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে। এতে আলু বিদেশে রপ্তানি করা সহজ হবে এবং কৃষকরাও লোকসানের হাত থেকে বাঁচবেন।'
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, 'এবার জেলায় ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। জেলায় আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা যায়। তাহলে যেমন কর্মসংস্থান হবে, তেমনই চাষিরা আলুর ন্যায্যমূল্য পাবেন। এতে সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব পাবে।'
এর কোনো প্রস্তাবই নতুন ছিল না। রেকর্ড ফলনের পর ২০২৫ সালজুড়ে দাম পড়তে থাকায় জাতীয় পর্যায়ে রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কথা উঠেছিল, আর ২০২৫ সালের আগস্টে সরকার একবার বাজারে হস্তক্ষেপও করেছিল। নিচের অংশগুলোতে সে বিবরণ রয়েছে।
জয়পুরহাট: প্রাচীন বরেন্দ্রের আলুর জেলা
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জয়পুরহাট জেলার আয়তন ১০১২.৪১ বর্গকিলোমিটার। জেলায় পাঁচটি উপজেলা: আক্কেলপুর, কালাই, ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি। প্রধান নদী ছোট যমুনা, তুলসিগঙ্গা ও হরবতী। ১৯৭১ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত জয়পুরহাট ছিল বগুড়া জেলার একটি মহকুমা; ১৯৮৪ সালে মহকুমাটিকে জেলায় উন্নীত করা হয়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, ৬৯.৫১ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে; শিল্পের ক্ষেত্রে এই হার ১.১৮ শতাংশ।
দৈনিক ইত্তেফাক ২০২০ সালের এপ্রিলে জয়পুরহাটকে প্রাচীন বরেন্দ্র অঞ্চলের একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে বর্ণনা করে। পত্রিকাটি জানায়, ২০১৯-২০ মৌসুমে জেলায় ৩৭ হাজার ৯১৭ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৩৮ হাজার ৩২৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪০৮ হেক্টর বেশি, আর উৎপাদন হয় ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। তার আগের মৌসুমে ৪২ হাজার ৫৩০ হেক্টরে আবাদ করে উৎপাদন হয়েছিল ৮ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন। জেলায় তখন ১৬টি হিমাগার ছিল, যেগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন, আর জেলার আলু ৯টি দেশে রপ্তানি হতো। সেখানে চাষ হওয়া জাতের মধ্যে ছিল গ্র্যানোলা, মিউজিকা, ডায়মন্ড, এস্টেরিক্স, কার্ডিনাল ও রোজেটা।
প্রথম আলো ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে জানায়, ২০২৩-২৪ মৌসুমে ডিএই জয়পুরহাটে ৩৮ হাজার ৮১৫ হেক্টর জমিতে আলু রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল, আর জেলার কালাই, ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুর উপজেলায় আলু সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয়। কৃষি বিভাগের হিসাবে তখন বিঘাপ্রতি আলু চাষের খরচ আগের বছরের ২৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪১ হাজার টাকা হয়েছিল, আর কৃষকেরা নিজেদের খরচ বলছিলেন ৪২ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এস্টেরিক্স ও ডায়মন্ড জাতের বীজের দাম কেজিপ্রতি ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮ টাকা হয়েছিল, আর বেসরকারি এসিআই ও ব্র্যাকের বীজ ৫৮-৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৮-৭০ টাকা। বিঘাপ্রতি রোপণের মজুরি ২ হাজার ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে ৩ হাজার টাকা হয়েছিল, আর ডিজেলের দাম বাড়ায় চাষের খরচ ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার টাকা। পত্রিকাটির তথ্যমতে, জানুয়ারির শেষ দিকে আলু তোলা শুরুর কথা ছিল।

বাংলাদেশে আলু ফসল
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী আলুর (Solanum tuberosum) গোত্র সোলানেসি, আর ফসলটি সম্ভবত আমেরিকার স্থানীয়। ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা পেরু থেকে আলু স্পেনে নিয়ে যান, সেখান থেকে তা ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশে আলু কবে এসেছে তা নিশ্চিত নয়; ধারণা করা হয়, সপ্তদশ শতকের শুরুতে পর্তুগিজ নাবিকেরা এটি নিয়ে আসেন। প্রথমে কলকাতার আশপাশে, পরে চেরাপুঞ্জিতে আলুর চাষ ছড়ায়, আর ওয়ারেন হেস্টিংসের শাসনামলে (১৭৭২-১৭৮৫) তা বোম্বে ও অন্যান্য প্রদেশে বিস্তৃত হয়।
বাংলাদেশে আলু প্রধানত শীতের ফসল। বাংলাপিডিয়া বলছে, সাধারণত নভেম্বরের প্রথমার্ধে আলু রোপণ করা হয়, যদিও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু কৃষক অক্টোবরে রোপণ করেন, আর ফসলের বেশির ভাগ তোলা হয় ফেব্রুয়ারি ও মার্চে। রোদযুক্ত, উর্বর ও পর্যাপ্ত আর্দ্রতার জমিতে আলু সবচেয়ে ভালো হয়। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি জয়পুরহাটে আলু তোলা পুরোদমে চলছিল।
বাংলাদেশে আলু মূলত সবজি হিসেবে খাওয়া হয়, প্রায়ই মাছ, মাংস বা ডিমের সঙ্গে রান্না করে; সেদ্ধ আলু, আলুভাজা, চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও শিঙাড়াতেও এর ব্যবহার আছে। অন্য দেশে, বিশেষ করে ইউরোপে, আলু থেকে শ্বেতসার, অ্যালকোহল, আটা ও পশুখাদ্যও তৈরি হয়। আলুর কন্দ শ্বেতসারে সমৃদ্ধ এবং আমিষ, ভিটামিন সি ও বি, পটাশিয়াম, ফসফরাস ও লোহার উৎস; আমিষ ও খনিজের বড় অংশ থাকে খোসার ঠিক নিচে, আর খোসা খাদ্য-আঁশেরও উৎস।
বাংলাপিডিয়ায় প্রায় ২৭টি দেশি জাতের কথা আছে, যেমন শিলবিলাতি, লাল শীল, লাল পাকড়ি ও দোহাজারি, আর অবমুক্ত উচ্চফলনশীল জাত প্রায় ৩৬টি, যার মধ্যে কার্ডিনাল, ডায়মন্ট ও কুফরি সিন্দুরি উল্লেখযোগ্য। আলুর গবেষণায় নেতৃত্ব দেয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র, যা ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত। কেন্দ্রটি পেরুর আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্রসহ বিভিন্ন উৎস থেকে জাত সংগ্রহ করে দেশের মাঠে পরীক্ষা করেছে, কয়েকটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে ভূমিকা রেখেছে এবং পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে একটি প্রজনন বীজ খামার পরিচালনা করে। অনেক ক্ষুদ্র কৃষক এখনো প্রচলিত পদ্ধতিতে ঘরে আলু সংরক্ষণ করেন, ফলে আর্দ্রতা, পোকামাকড় ও রোগে প্রায়ই ক্ষতি হয়।

২০২৫ সালের উদ্বৃত্ত আলু ও সরকারের পদক্ষেপ
জয়পুরহাটের কৃষকেরা যে বাজারে আলু বেচছিলেন, তার ওপর আগের মৌসুমের ছায়া তখনো ছিল। দৈনিক ইত্তেফাক ২০২৫ সালের মার্চে জানায়, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৯৮ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন, আর জমিতে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকায়। পত্রিকাটির তথ্যমতে উত্তরাঞ্চলের ২২১টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টন, যা মোট আলুর প্রায় ২৩ ভাগ। অনেক সাধারণ কৃষক অভিযোগ করেন, ব্যবসায়ীরা আগেভাগে বুকিং নিয়ে রাখায় তাঁরা হিমাগারে জায়গা পাননি; রাজশাহী হিমাগার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আবাদ শুরুর অনেক আগেই বুকিং হয়ে যায়। ডিএইর রাজশাহী বিভাগের একজন অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু এত আলু সংরক্ষণের সুবিধা না থাকায় দাম কমেছে।
জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৪-২৫ মৌসুমে রেকর্ড ১ কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়; অথচ দেশে চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। পত্রিকাটির তথ্যমতে প্রায় ১০ লাখ টন আলু বীজ হিসেবে রাখা হয়, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৬২ হাজার টন। প্রথম আলো ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জানায়, ওই মৌসুমে ডিএইর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন, আর ৪ লাখ ৯৪ হাজার হেক্টর জমি থেকে প্রকৃত উৎপাদন হয় ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন। বাংলাদেশ হিমাগার সমিতি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে উৎপাদন আরও বেশি, প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন বলে উল্লেখ করে, যা তাদের হিসাবে চাহিদার চেয়ে প্রায় ৪০ লাখ টন বেশি।
২০২৫ সালজুড়ে দাম কমতে থাকে। জুলাইয়ে হিমাগার সমিতি জানায়, হিমাগারের গেটে কেজিপ্রতি আলু বিক্রি হচ্ছে ১৩ থেকে ১৫ টাকায়, অথচ সে বছর কৃষকের গড় উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৭ টাকা; ২০২৪ সালের বেশির ভাগ সময়ে আলুর কেজি ছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা। সমিতি হিমাগার গেটে কেজিপ্রতি ন্যূনতম দাম ২৫ টাকা নির্ধারণ, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে নিম্ন আয়ের পরিবারকে চালের সঙ্গে ১০ কেজি করে আলু দেওয়া এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকসেলে আলু বিক্রির প্রস্তাব দেয়। দাম না বাড়লে হিমাগারের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ আলু, অর্থাৎ প্রায় ৭ থেকে ১০ লাখ টন, খালাস না হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানায় সমিতি।
২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট সরকার হিমাগার গেটে কেজিপ্রতি আলুর ন্যূনতম দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করে এবং সরকারি উদ্যোগে ৫০ হাজার মেট্রিক টন আলু কিনে হিমাগারে সংরক্ষণ করে অক্টোবর-নভেম্বরে বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আগামী মৌসুমে আলুচাষিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার কথাও জানানো হয়। দৈনিক ইত্তেফাকের তথ্যমতে, প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় কৃষিসচিবের নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের একটি কমিটি এসব সুপারিশ করে, যার সদস্য ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের সচিবেরা।
দ্য ডেইলি স্টার বাংলাে উদ্ধৃত ব্যবসায়ীদের ভাষ্যে, ২০২৫ সালের অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত এসব পদক্ষেপে দাম বাড়েনি: খুচরা বাজারে আলুর কেজি ২০ টাকার নিচে নেমেছিল, পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছিল ১১ থেকে ১২ টাকায়, আর হিমাগার সমিতির সভাপতি জানান, হিমাগারে প্রতি কেজির দর ১০ থেকে ১১ টাকা এবং তখনো প্রায় ১২ লাখ টন আলু মজুত। পত্রিকাটি জানায়, দেশে গড় উৎপাদন খরচ ছিল কেজিপ্রতি ১৪ টাকা, উত্তরাঞ্চলে প্রায় ২০ টাকা। টিসিবির চেয়ারম্যান তখন বলেন, সে মাসের শেষ দিক থেকে আলু কেনা শুরু হবে।
২০২৫-২৬ মৌসুমে আবাদ কমলেও দাম কম
২০২৫ সালের লোকসানের প্রভাব পড়ে সেই মৌসুমে, যার আলু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জয়পুরহাটের কৃষকেরা তুলছিলেন। প্রথম আলো ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জানায়, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সারা দেশে ৪ লাখ ৬৭ হাজার হেক্টর জমিতে আলু রোপণ হয়েছে, যা আগের মৌসুমের ৪ লাখ ৯৪ হাজার হেক্টরের চেয়ে প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর কম, আর ডিএই ২০২৫-২৬ মৌসুমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ১ কোটি ১৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন করেছে। ডিএইর একজন উপপরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকেরা দ্রুত ও বেশি লাভের সবজির দিকে ঝুঁকছেন। রংপুরের তারাগঞ্জে কিছু কৃষক নিশ্চিত বাজারের কারণে তামাক চাষে যাচ্ছিলেন, আর কুমিল্লার বুড়িচংয়ে এক বছরে আলুর আবাদ ৭৫১ হেক্টর কমে যায়, কৃষকেরা সেখানে মিষ্টিকুমড়া ও অন্যান্য সবজি চাষ করছিলেন।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষকের উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা, তার ওপর হিমাগার ভাড়া কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা; অথচ জানুয়ারির শুরুতে হিমাগারে পাইকারি দাম ছিল কেজিপ্রতি মাত্র ৫ থেকে ৮ টাকা, আর ভোক্তারা কিনছিলেন প্রায় ৩০ টাকায়। আগের মৌসুমে ৩৮৪টি হিমাগার ও ৫৩৯টি 'মডেল ঘরে' ৩১ লাখ ৬১ হাজার টন আলু রাখা হয়েছিল; জানুয়ারির শুরুতেও প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার টন অবিক্রীত ছিল, আর বিক্রি করে ভাড়া না ওঠায় অনেক কৃষক আলু হিমাগারেই ফেলে রেখেছিলেন। পত্রিকাটির তথ্যমতে দেশে বছরে আলুর চাহিদা প্রায় ১ কোটি টন, আর যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে উৎপাদনের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নষ্ট হয়।
উত্তরের আরেক আলুর জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের চিত্র দেখায়, এই পরিস্থিতি কতবার ফিরে এসেছে। প্রথম আলো একই দিনে জানায়, গত ১৫ বছরের ৯ বছরই সেখানকার কৃষকেরা আলুতে লোকসান দিয়েছেন, আর ২০১১, ২০১৩, ২০১৭ ও ২০২৫ সালে কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার সবাই বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ঠাকুরগাঁওয়ে ৩৪ হাজার ৭২৫ হেক্টরে আলু চাষ করে উৎপাদন হয় ৮ লাখ ৬৮ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন; জেলার ১৭টি হিমাগারে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৩২ মেট্রিক টন আলু রাখা যায়। ২০২৫-২৬ মৌসুমে সেখানে ২৮ হাজার হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয় ২৮ হাজার ২৮৫ হেক্টরে। পত্রিকাটি জানায়, সেখানে আগাম আলু বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১২ টাকায়, আর হিমাগারগুলো সাধারণত ১৫ নভেম্বর কুলিং মেশিন বন্ধ করলেও এবার আরও প্রায় এক মাস চালু রাখে; তখনো সেখানে পুরোনো আলু অবিক্রীত পড়ে ছিল।

হিমাগার ভাড়া ও তখনকার নিয়ম
ভালো দামের আশায় যে কৃষকেরা ফসলের একটি অংশ ধরে রাখেন, তাঁদের খরচের বড় অংশ হিমাগার ভাড়া। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানায়, বাংলাদেশ হিমাগার সমিতি ২০২৪ সালের নভেম্বরের এক সভায় ২০২৫ মৌসুমের জন্য সর্বোচ্চ ভাড়া আগের বছরের কেজিপ্রতি ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা করার সিদ্ধান্ত নেয়। বস্তা সর্বোচ্চ ৫০ কেজিতে সীমিত করে কেজি হিসাবে ভাড়া ধরায়, ৭০ কেজি পর্যন্ত বস্তায় যে পরিমাণ আলু রাখতে আগে একদরে ৩৫০ টাকা লাগত, তাতে লাগবে ৪০০ টাকা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, এর প্রতিবাদে রাজশাহীর কৃষকেরা ২০২৫ সালের ২ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি সড়কে আলু ফেলে বিক্ষোভ করেন, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও বগুড়াতেও একই ধরনের প্রতিবাদ হয়। ২০২৫ সালের ২ মার্চ একই সংবাদমাধ্যম জানায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক তথ্য বিবরণী অনুযায়ী কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কৃষি বিপণন আইনের ক্ষমতাবলে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের সর্বোচ্চ ভাড়া কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করেছে। সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু দাবি করেন, ১০ হাজার টনের একটি হিমাগারে কেবল ব্যাংকঋণের সুদ বাবদই কেজিপ্রতি খরচ ৫ টাকা ৮৬ পয়সা, বিদ্যুৎ খরচ যোগ করলে ৬ টাকা ৯৬ পয়সা, যা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি; এর যৌক্তিকতা যাচাইয়ে তিনি বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় এবং ট্যারিফ কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলো ২০২৫-২৬ মৌসুমের প্রসঙ্গে এই ৬ টাকা ৭৫ পয়সা ভাড়ার কথাই উল্লেখ করে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের হিসাবে দেশের হিমাগারগুলোর ধারণক্ষমতা মোটামুটি ৩০ লাখ টন, যা মোট উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ; সমিতির সদস্য হিমাগার ৪০৫টি, তবে চালু রয়েছে প্রায় ৩৫০টি।
রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ: আলোচিত সমাধান
জয়পুরহাটে যে দুটি সমাধানের কথা ওঠে, রপ্তানি ও আলুভিত্তিক শিল্প, সেগুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছিল আলু তোলার আগে থেকেই। কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলোকে বলেন, অন্য দেশগুলো উৎপাদিত আলুর ১০ শতাংশ পর্যন্ত রপ্তানি করে, অথচ বাংলাদেশ ১ শতাংশের অর্ধেকও রপ্তানি করতে পারছে না। তিনি সরকারকে উৎপাদনের ১০ শতাংশ সরাসরি কিনে সংরক্ষণ, হিমাগার ভাড়ার অর্ধেক ভর্তুকি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন।
ছবি: কুউ পুলক / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬), প্রথম আলো (১৬ ডিসেম্বর ২০২৩; ২৩ জুলাই ২০২৫; ১৯ জানুয়ারি ২০২৬), দৈনিক ইত্তেফাক (১৮ এপ্রিল ২০২০; ১৮ মার্চ ২০২৫; ২৭ আগস্ট ২০২৫), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (৩ অক্টোবর ২০২৫), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (২ মার্চ ২০২৫), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫), বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ: জয়পুরহাট জেলা; আলু)





মন্তব্য
(০)