২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে টানা ভারী বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের হাওরে পাকা বোরো ধান তলিয়ে যায়। ধান কাটার মৌসুমের মাঝপথে এই দুর্যোগে জেলার হাজারো কৃষক তাঁদের বছরের একমাত্র ফসল হারানোর মুখে পড়েন। ৫ মে জাগো নিউজে প্রকাশিত এক লেখায় ইডেন মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বৈশাখী এই ক্ষতিকে শুধু কৃষকের নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও সতর্কসংকেত বলে উল্লেখ করেন।
কত জমি, কত ধান
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সে বছর সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। ২৭ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে ২৮ এপ্রিল সকাল ৯টা পর্যন্ত জেলায় ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা ছিল ওই মৌসুমের সর্বোচ্চ। একই ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি বাড়ে ৩৫ সেন্টিমিটার। তখন পর্যন্ত জেলার ৪৪ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছিল।
৩০ এপ্রিল প্রথম আলোর প্রতিবেদনে কৃষি বিভাগের হিসাবে বলা হয়, বিভিন্ন হাওরে ৯ হাজার ৫৭ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৭ হেক্টর; এর আগে জলাবদ্ধতায় ৩ হাজার ২০০ হেক্টরের ক্ষতির কথা জানানো হয়েছিল। ৪ মে প্রকাশিত হিসাবে সুনামগঞ্জের কৃষি বিভাগ জানায়, বৃষ্টিতে ১৮ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর আগে ক্ষতি হয়েছিল ২ হাজার হেক্টরের ফসল; সেই অনুযায়ী ক্ষতি অন্তত ৫০০ কোটি টাকা। হাওর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ও কৃষকেরা দাবি করেন, প্রকৃত ক্ষতি সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

বাঁধ ভাঙন, উপচে পড়া পানি ও জলাবদ্ধতা
২৮ এপ্রিল সকালে মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের চান্দালীপাড়া গ্রামে ইকরাছই হাওরের একটি বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়। পানির তোড়ে সদর উপজেলার দেখার হাওরের গুজাউনি বাঁধও ভেঙে যায়। এই দুটি বাঁধ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাভুক্ত ছিল না, স্থানীয় লোকজন সংস্কার করেছিলেন। একই দিন বিশ্বম্ভরপুরের করচার হাওরের হরিমনের বাঁধ উপচে হাওরে পানি ঢোকে। জামালগঞ্জের হালির, দিরাইয়ের পাগনার, শাল্লার ছায়ার, শান্তিগঞ্জের খাই ও পাখিমারা হাওরেও বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে ফসলের ক্ষতি হয়। ১ মে ভোরে মধ্যনগরের কাইল্যানীতে বাঁধ উপচে শালদিঘা হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করে।
পাউবো জানায়, ঢলের পানি মূলত এসেছে ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরামের বৃষ্টি থেকে; সুরমা ছাড়াও কুশিয়ারা, জাদুকাটা, বৌলাইসহ জেলার প্রায় সব নদীর পানি বাড়ছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টি হয়, যা ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, হাওরের তলদেশ ও নদী-নালা পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং এসবের ওপর স্থাপনা ওঠায় পানি সহজে নামতে পারেনি।

এক ফসলের ওপর নির্ভর হাওরের জীবন
হাওর হলো দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গামলা আকৃতির নিচু জলাভূমি। বর্ষায় নদী ও খালের পানিতে এটি বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়, আর শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠা জমিতে বোরো ধান চাষ হয়। তাই হাওরের বড় অংশের কৃষক বছরে এই একটি ফসলের ওপরই নির্ভর করেন। হাওরের সাত জেলা সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দেশের বোরো চালের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হাওরের আবাদি জমির ৬৩ শতাংশের ধান কাটা হয়েছিল; সুনামগঞ্জে তখনো ৩৮ শতাংশ ধান মাঠে ছিল। ধান কাটায় কৃষকেরা হারভেস্টরের ওপর বেশি নির্ভর করেন, কিন্তু পানি ও কাদার কারণে অনেক জায়গায় যন্ত্র চালানো যায়নি। দ্বিগুণ মজুরিতেও শ্রমিক মেলেনি, অনেকে কোমর বা বুকসমান পানিতে নেমে নিজেরাই ধান কেটেছেন। রোদ না থাকায় কেটে আনা ধানও খলায় পচতে থাকে, কোথাও ধানে চারা গজিয়ে যায়। অনেক কৃষক ধারদেনা করে আবাদ করেছিলেন।

টেকসই বাঁধ ও সহায়তার দাবি
জাগো নিউজের লেখায় নুসরাত জাহান বৈশাখী প্রশ্ন তোলেন, প্রতিবছর এমন দুর্যোগে কৃষকেরা কেন এত অসহায় হয়ে পড়েন। তাঁর মতে, বাঁধ ভাঙা, পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব বারবার একই চিত্র তৈরি করে। তিনি হাওরের ক্ষণস্থায়ী বাঁধের বদলে বৈজ্ঞানিক ও টেকসই বাঁধ, জরুরি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, ক্ষতিপূরণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি জানান।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুস সাত্তার মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, হাওরের ভূপ্রকৃতি অনেকটাই মানুষের তৈরি সড়ক ও স্থাপনার কারণে বদলে গেছে, তাই হাওরের প্রচলিত কৃষি ও ফসল নির্বাচনে পরিবর্তন আনতে হবে এবং অকৃষি খাতের ওপরও জোর দিতে হবে।

ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, সমকাল, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)