ঢাকার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জানায়, পাখি সংরক্ষণে গণসচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছরের মতো এবারও শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০ বার্ষিক পাখি মেলা অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজকেরা একে ২০তম 'পাখি মেলা-২০২০' বলে উল্লেখ করেন, আর এবারের স্লোগান ছিল 'পাখ-পাখালি দেশের রত্ন, আসুন করি সবাই যত্ন'। দিনব্যাপী এই মেলা হওয়ার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনের সামনে।
মেলার আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান বুধবার, ২২ জানুয়ারি ২০২০ জাগো নিউজকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ২০০১ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে পাখি মেলার আয়োজন করে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, আর এবারও পাখি সংরক্ষণে সবাইকে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণও ২২ জানুয়ারি একই পরিকল্পনার খবর দেয়। পত্রিকাটি মেলাকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করে এবং বিভাগের সহযোগীদের মধ্যে ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টার, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, আইইউসিএন ও বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির নাম উল্লেখ করে।
মেলার দিনের আয়োজন
আহ্বায়কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় জহির রায়হান মিলনায়তনের সামনে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের মেলার উদ্বোধন করার কথা ছিল। দিনের বাকি সময়ের জন্য ঘোষিত কর্মসূচি ছিল এরকম:
- আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় পাখি দেখা প্রতিযোগিতা;
- পাখিবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী;
- শিশু-কিশোরদের পাখির ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা;
- টেলিস্কোপ ও বাইনোকুলার দিয়ে শিশু-কিশোরদের পাখি পর্যবেক্ষণ;
- স্টল সাজানো প্রতিযোগিতা, যেখানে পাখির আলোকচিত্র এবং পত্র-পত্রিকা প্রদর্শিত হবে;
- অডিও-ভিজুয়ালের মাধ্যমে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় পাখি চেনা প্রতিযোগিতা;
- উপস্থিত সবার অংশগ্রহণে পাখিবিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা;
- সবশেষে পুরস্কার বিতরণী ও সমাপনী অনুষ্ঠান।
ঘোষণায় সহ-আয়োজক হিসেবে নাম ছিল ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টার, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, আরণ্যক ফাউন্ডেশন, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতি, প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন, টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল টুয়েন্টিফোর এবং বাংলাদেশ বন বিভাগের। প্রথম আলোর বিবরণেও একই কর্মসূচির কথা আছে: উদ্বোধনী পর্ব, পাখি চেনা প্রতিযোগিতা, টেলিস্কোপে পাখি দেখা, স্টল সাজানো, শিশুদের ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা এবং পুরস্কার বিতরণী।
মেলার তারিখ পড়েছে ক্যাম্পাসের শীতের পাখিদের মৌসুমে। আগের প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী এই পাখিরা নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আসে এবং এপ্রিল পর্যন্ত থাকে, তাই পাখি দেখা ও পাখি চেনার প্রতিযোগিতা হয় অতিথিরা যখন লেকে থাকে তখনই।
২০০১ সাল থেকে প্রতি শীতে পাখি মেলা
আগের সংবাদপত্রের প্রতিবেদন দেখায়, মেলাটি কীভাবে ক্যাম্পাসের বার্ষিক দিনপঞ্জির নির্দিষ্ট আয়োজনে পরিণত হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০১০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার 'প্রতি বছরের মতো' আয়োজিত দিনব্যাপী পাখি মেলায় সারা দেশ থেকে শত শত পাখিপ্রেমী আসেন। প্রাণিবিদ্যা বিভাগ তার ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের সঙ্গে মিলে মেলাটি পরিচালনা করে, আর তৎকালীন উপাচার্য সকাল ৮টায় উদ্বোধন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। ক্যাম্পাসের কয়েকটি জায়গায় টেলিস্কোপ ও বাইনোকুলার বসানো হয়, আর কর্মসূচিতে ছিল পাখিবিষয়ক বিতর্ক ও কুইজ, শিশুদের ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা এবং সাময়িকী, জার্নাল, ডাকটিকিট ও আলোকচিত্রের প্রদর্শনী। একই মেলার আগাম খবরে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস আরও জানায় পাখির ডাক নকল করার প্রতিযোগিতা, পাখি নিয়ে বক্তৃতা এবং ক্যাম্পাসের কয়েকটি স্থান থেকে টেলিস্কোপে অতিথি পাখি দেখার কথা।
২০১৩ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার দ্বাদশ বার্ষিক মেলার বিবরণ দেয়, সেটিও শুক্রবার প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ও তার ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টার আয়োজন করে। শিশুসহ পরিবার, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং পেশাজীবীরা অংশ নেন। পাখি চেনা প্রতিযোগিতায় দলগুলো ক্যাম্পাস ঘুরে চোখে দেখে বা ডাক শুনে পাখি শনাক্ত করে, বিচারক ছিলেন বিভাগের শিক্ষকেরা। এ ছাড়া ছিল শিশুদের ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা, পাখি নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২টি লেক ঘুরে দেখা। প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন ১৮৯ প্রজাতির অতিথি পাখি উপস্থিত ছিল। সেই মেলার উদ্বোধক তথ্যমন্ত্রী বলেন, স্কুল-কলেজগুলোর উচিত পাখি নিয়ে শিক্ষাসফরে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে আনা।
২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারির মেলা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার ২০১৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জানায়, জহির রায়হান মিলনায়তন প্রাঙ্গণে ক্যাম্পাসে ১৬তম বারের মতো এই মেলা হচ্ছে। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তৎকালীন সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসান নতুন কলাভবনের শিক্ষক লাউঞ্জে সংবাদ সম্মেলনে তা ঘোষণা করেন। সে বছরের সহ-আয়োজক ছিল ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টার, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, আরণ্যক ফাউন্ডেশন, চ্যানেল টুয়েন্টিফোর, আইইউসিএন ও বাংলাদেশ বন বিভাগ, যা ২০২০ সালের দলের প্রায় একই রকম। প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর পাশাপাশি ২০১৭ সালের কর্মসূচিতে জাবিতে দেখা পাখি নিয়ে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপনও ছিল। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে একই পত্রিকা জানায়, বিভাগ ২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি নিয়মিত মেলার পরিকল্পনা করেছে।
সংবাদপত্রগুলো মেলার ক্রমিক সংখ্যা সব সময় একভাবে গোনেনি: ২০১৩ সালের মেলাকে দ্বাদশ, ২০১৭ সালেরটিকে ১৬তম বার বলা হয়, আর আয়োজকেরা ২০২০ সালের মেলাকে ২০তম বলে উল্লেখ করেন। তবে প্রতিবেদনগুলো একটি বিষয়ে একমত: এক দশকের বেশি সময় ধরে মেলার ধরন প্রায় একই রয়েছে। সকালে শুরু, টেলিস্কোপে পাখি দেখা, পাখি চেনা ও ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা, প্রদর্শনী এবং দিনের শেষে পুরস্কার বিতরণী।
ক্যাম্পাস ও তার লেক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট, জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭০-এর অধীনে, আর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩ দিয়ে এটি পুনর্গঠিত হয়। ক্যাম্পাসটি ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার পাথালিয়া ইউনিয়নে, রাজধানী থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে, আয়তন ৬৯৭.৫৬ একর। মেলার স্থান জহির রায়হান মিলনায়তন ক্যাম্পাসের টিএসসি কমপ্লেক্সে অবস্থিত। কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের নামে নামকরণ করা এই মিলনায়তনে আসন ১ হাজার ৫০০টি।
এখানে মেলা হওয়ার কারণ পাখি। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাম্পাসে ছোট-বড় ২২টি লেক আছে, জলাশয়গুলোতে লাল শাপলা ফোটে, আর ১৯৮৬ সাল থেকে সেখানে অতিথি পাখি আসছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শীতে বাংলাদেশে আসা পরিযায়ী পাখির প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ জাবির লেকগুলোতে নামে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেশির ভাগ লেককে পাখির নিরাপদ আবাস ঘোষণা করে এবং পাড় ধরে মানুষের অবাধ চলাচল সীমিত করতে বেড়া ও সীমানা দেয়।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দ্য ডেইলি স্টার চারটি লেকের নাম উল্লেখ করে, যেখানে পাখি সবচেয়ে বেশি জড়ো হয়: প্রশাসনিক ভবনের সামনের লেক, বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশের লেক, ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের পাশের লেক এবং জাহানারা ইমাম হলের লেক। তখন ক্যাম্পাসের প্রায় ২০টি জলাশয়ে শাপলা ফুটতে শুরু করেছিল। অধ্যাপক কামরুল হাসান পত্রিকাটিকে জানান, প্রতি মৌসুমে সাধারণত প্রায় ৬৯ প্রজাতির অতিথি পাখি ক্যাম্পাসে আসে, আর প্রায় ১২৬টি দেশি প্রজাতির পাখিও সেখানে দেখা যায়।

শীতের অতিথিরা
২০০৮ সালের বাসস প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাখিগুলো শীতের সঙ্গে আসে, সাধারণত নভেম্বরের শুরু থেকে ডিসেম্বরের শেষের মধ্যে, আর থাকে এপ্রিল পর্যন্ত। এরা আসে সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, চীনের শিনজিয়াং ও হিমালয় অঞ্চল থেকে। বেশির ভাগই হাঁস বা হাঁসজাতীয় পাখি; প্রতিবেদনে সরালি, ভুতিহাঁস (পোচার্ড), ফ্লাইক্যাচার, বক ও নাকটা হাঁসের (কম্ব ডাক) নাম আছে। লেকে এরা ছোট মাছ, পোকামাকড়, ছোট শামুক ও জলজ উদ্ভিদ খায়। ২০১৭ সালের ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনেও বলা হয়, কিছু পাখি আসে সাইবেরিয়া ও হিমালয়ের উপত্যকা থেকে এবং এপ্রিল পর্যন্ত থাকে।
এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পাতি সরালি বা ছোট সরালি (Dendrocygna javanica), ইংরেজিতে লেসার হুইসলিং ডাক। লম্বা গলার এই হাঁসের রং বাদামি-খয়েরি, ডানা চওড়া, আর স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। জোরালো, সাঁই সাঁই দুই সুরের শিসের মতো ডাক থেকেই এর নাম, উড়ার সময় ডানাতেও শিসের মতো শব্দ হয়। এরা জলজ উদ্ভিদে ভরা মিঠা পানির জলাভূমি, লেক ও ভেজা ধানখেতে থাকে; প্রধানত জলজ উদ্ভিদ ও ধানের দানা খায়, সঙ্গে ছোট মাছ, ব্যাঙ, শামুক-ঝিনুক ও কেঁচোজাতীয় প্রাণীও। পাখিটি মূলত নিশাচর, দিনের বেলা পানিতে বা পাড়ে বিশ্রাম নেয়। বর্ষায় প্রজনন করে, গাছের কোটরে, ডালের খাঁজে বা অন্য পাখির পুরোনো বাসায় ৭ থেকে ১২টি সাদা ডিম পাড়ে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এরা মূলত স্থায়ী বাসিন্দা, উত্তরের পাখিরা শীতে দক্ষিণে সরে আসে। আইইউসিএন একে ন্যূনতম উদ্বেগের (লিস্ট কনসার্ন) তালিকায় রেখেছে।
২০১৭ সালের প্রতিবেদনে যে 'বড় সরালি'র কথা আছে, সেটি হলো ফালভাস হুইসলিং ডাক (Dendrocygna bicolor)। এটি আকারে বড়, লম্বায় প্রায় ৪৫ থেকে ৫৩ সেন্টিমিটার; ঘাড়ের পেছন বরাবর কালচে দাগ আর উড়ার সময় কোমরের ওপর সাদা পট্টি দেখে একে ছোট সরালি থেকে আলাদা করা যায়। ভারতীয় উপমহাদেশ এশিয়ায় এই প্রজাতির প্রধান আবাস।

বাংলাদেশি প্রতিবেদকেরা জাবির হাঁসের মধ্যে যে গিরিয়া হাঁসের (গারগেনি, Spatula querquedula) নাম লেখেন, সেটি সত্যিকারের দূরপাল্লার পরিযায়ী। এরা ইউরোপ ও বিস্তৃত প্যালিআর্কটিক অঞ্চলে প্রজনন করে, আর শীতে পুরো সংখ্যাই দক্ষিণে চলে আসে, আফ্রিকা, ভারত, বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলেশিয়ায়; বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল এর শীতকালীন আবাসের একটি পরিচিত জায়গা। ছোট আকারের এই হাঁস লম্বায় প্রায় ৪১ সেন্টিমিটার, ওজন ৩০০ থেকে ৪৪০ গ্রাম। পুরুষ পাখির মাথা ও বুক বাদামি, চোখের ওপর চওড়া সাদা বাঁকা দাগ, আর উড়ার সময় ডানায় ফিকে নীল ছোপ দেখা যায়; স্ত্রী পাখি বাদামি, দেখতে পাতি তিলিহাঁসের মতো হলেও মুখের দাগ বেশি স্পষ্ট।

পাখির সংখ্যা কেন বেড়েছে-কমেছে
মেলা উৎসবের পাশাপাশি সব সময় একটি সতর্কবার্তাও বহন করেছে। ২০০৮ সালের বাসস প্রতিবেদনে প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক মোস্তফা ফিরোজ বলেন, প্রতি বছর সাধারণত প্রায় ১০ হাজার অতিথি পাখি জাবির লেকে নামে, তবে সংখ্যা কমছে। এর জন্য তিনি প্রতিকূল পরিবেশ, লেকের চারপাশে শব্দ ও হইচই এবং পাখির নিরাপত্তাহীনতাকে দায়ী করেন। পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখা এই পাখিদের ব্যাপারে সবাইকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
২০১২ সালের জুনে দ্য ডেইলি স্টার বড় ধরনের পতনের খবর দেয়। পরিবেশবিদ ও পাখি পর্যবেক্ষকদের বরাতে বলা হয়, সে বছর চারটি লেকে অতিথি পাখি নেমে এসেছিল মাত্র ২৫ থেকে ৩০টিতে, তা-ও দুই প্রজাতির; অথচ পাঁচ বছর আগে সেখানে ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির প্রায় ২ হাজার পাখি আসত। পর্যবেক্ষকেরা এর জন্য আগের তিন বছরে মাছ চাষে লেক ও ফসল চাষে আশপাশের জমি ইজারা দেওয়া, গাছ কাটা, পানির কাছে বেশি ভবন ও মানুষের চলাচল এবং পোনা ছাড়ার আগে পানিতে চুন দেওয়াকে দায়ী করেন; চুনে কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ মরে যায়, যেগুলোতে পাখিরা আড়াল নিত। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন সার, কীটনাশক ও চুন প্রয়োগকে পাখি কমার সঙ্গে যুক্ত করেন। তৎকালীন উপাচার্য জানান, লেক ও জমি যাতে আর ইজারা দেওয়া না হয় সে জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, এতে পাখির খাবার ও আবাস ফিরবে বলে তিনি আশা করেন।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পাখিরা ফিরছিল, তবে উদ্বেগ থেকে যায়। অধ্যাপক কামরুল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, পরিবেশের অবনতি, মাছ চাষে লেক ইজারা দেওয়া এবং শীতের অতিথিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে না পারা অতিথি পাখি কমে যাওয়ার কয়েকটি কারণ। তিনি ভিড়, যানবাহন, হর্ন ও লেকের পাড়ে পিকনিককেও সংখ্যা কমার সঙ্গে যুক্ত করেন এবং বলেন, অনেক পাখি জাহানারা ইমাম হলের লেক ছেড়ে অন্য লেকে চলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার জানান, লেকের চারপাশে বেড়া ও সীমানা দেওয়া হয়েছে এবং এস্টেট অফিস দর্শনার্থীদের তদারকি করবে। পাখি দেখতে আসা শিক্ষার্থী, পরিবার ও দর্শনার্থীদের মধ্যে যে সচেতনতা তৈরি করতে চায় পাখি মেলা, আয়োজকদের দিক থেকে সেটিই এই সমস্যার উত্তরের একটি অংশ।
সংখ্যায় বাংলাদেশের পাখি
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দেশে পাখির প্রজাতি ৬২৮টি, এর মধ্যে ৩৮৮টি স্থায়ী এবং ২৪০টি পরিযায়ী। পরিযায়ীদের বেশির ভাগ আসে হিমালয় ও তার ওপারের অঞ্চল থেকে, কিছু আসে ইউরোপ ও সাইবেরিয়ার মতো দূর থেকে, ইউরেশিয়া থেকে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার দিকে পাখিদের দক্ষিণমুখী যাত্রার অংশ হিসেবে। বাংলাপিডিয়া বলছে, ইউরেশিয়ায় প্রজনন করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা আফ্রিকায় যায় এমন ৬০০টির বেশি প্রজাতির এক-তৃতীয়াংশের বেশি বাংলাদেশে আসে। পরিযায়ী সৈকত পাখিরা উপকূল, মোহনা, চর, বিল, বাঁওড়, হাওর, পুকুর ও লেক ব্যবহার করে, বড় জলাশয়ে বড় ঝাঁক দেখা যায়।
২০২০ সালের মেলার আগে সর্বশেষ জাতীয় মূল্যায়ন ছিল 'রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ ২০১৫', যা বাংলাদেশ বন বিভাগ ও আইইউসিএন ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে তৈরি করে এবং ২০১৬ সালের জুনে প্রকাশ করে। এর পাখি খণ্ডটি ৬৭৬ পৃষ্ঠার। প্রকাশের খবরে প্রথম আলো দেশে পাখির প্রজাতির সংখ্যা ৫৬৬ উল্লেখ করে। মূল্যায়নে দেখা যায়, সমীক্ষার আওতায় থাকা সাতটি প্রাণিগোষ্ঠীর ৩৯০টি প্রজাতি হুমকির মুখে, আর বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত ৩১টি প্রজাতি, যার ১৯টি পাখি। হারিয়ে যাওয়া পাখির মধ্যে আছে গোলাপি-মাথা হাঁস, বাদিহাঁস (হোয়াইট-উইংড ডাক), সারস, বড় মদনটাক, বাংলা ডাহর ও চিতি-ঠোঁট গগনবেড়। পাখি মূল্যায়ন দলের প্রধান ইনাম আল হক ব্যাখ্যা করেন, ৫০ বছর ধরে বনে দেখা না গেলে একটি প্রজাতিকে বিলুপ্ত ধরা হয়।
জলচর পাখির শুমারি থেকে বোঝা যায় এখনো কত পাখি আসে। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ২০১৫ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি বন বিভাগ, চ্যানেল আই ও বেসরকারি সংস্থা নেকমের সঙ্গে ভোলার আশপাশে নিঝুম দ্বীপ, ডমার চর, চর কুকরি মুকরি, চর শাহজালালসহ বিভিন্ন চরে উপকূলীয় শুমারি চালায়। তাতে ৭৬ প্রজাতির ৫৭ হাজার ২৫টি পাখি গোনা হয়, যার ৫২টি প্রজাতি পরিযায়ী; আগের বছর একই পথে গোনা হয়েছিল ৬৬ প্রজাতির ৫০ হাজার ৮০টি পাখি। শুমারি দল দেখতে পায় দেশি গাঙচষা, চর শাহজালালে প্রায় ৫ হাজার পালাসি গাঙচিলের ঝাঁক এবং মহাবিপন্ন চামচঠুঁটো বাটান।
পাখি নিয়ে আইন কী বলে
২০২০ সালের মেলার সময় বাংলাদেশে পাখি সুরক্ষিত ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ দিয়ে (২০১২ সনের ৩০ নং আইন, ১০ জুলাই ২০১২)। আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী এই আইনের অধীন লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারবেন না, আর সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে নির্দিষ্ট বা সব বন্যপ্রাণী কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বা সারা দেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিকার নিষিদ্ধ করতে পারে।
পাখির বিষয়টি এসেছে ৩৮ ধারায়। আইনের তফসিল ১ ও ২-এ উল্লিখিত কোনো পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা অপরাধ, এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড; একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। এমন পাখির ট্রফি, মাংস বা দেহের অংশ সংগ্রহ, দখলে রাখা, কেনা, বেচা বা পরিবহনের শাস্তি সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড, পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ১ বছর বা ৫০ হাজার টাকা।
মেলার পেছনের প্রতিষ্ঠানগুলো
ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অংশ; ২০১০ ও ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে একে মেলা পরিচালনায় বিভাগের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আর পাখি জড়ো হওয়া চারটি প্রধান লেকের একটি এর পাশেই। পাখিবিদ ইনাম আল হকের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব দেশের জলাভূমি ও উপকূলে বার্ষিক জলচর পাখি শুমারির আয়োজন করে; ২০১৫ সালে এর সভাপতি ছিলেন ড. নিয়াজ আবদুর রহমান।
আরণ্যক ফাউন্ডেশন, যার আরেক নাম বাংলাদেশ ট্রপিক্যাল ফরেস্ট কনজারভেশন ফাউন্ডেশন, গড়ে ওঠে ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মধ্যে সই হওয়া একটি চুক্তি থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৯৮ সালের ট্রপিক্যাল ফরেস্ট কনজারভেশন অ্যাক্টের অধীন বন সংরক্ষণের বিনিময়ে ঋণ মওকুফ পাওয়া প্রথম দেশ বাংলাদেশ: চুক্তিতে দেশের ডলার ঋণের কিস্তি ১ কোটি ডলারের বেশি কমে এবং বন তহবিল গঠনের জন্য ৮৫ লাখ ডলারের সমপরিমাণ স্থানীয় মুদ্রার অর্থ তৈরি হয়। প্রাকৃতিক বনের ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে সহায়তার লক্ষ্যে ফাউন্ডেশনটি ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ৫ অক্টোবর ফ্রান্সের ফঁতেনব্লোতে, সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের গ্লঁ শহরে। রাষ্ট্র, সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠন এর সদস্য, আর এর সবচেয়ে পরিচিত কাজ বিপন্ন প্রজাতির আইইউসিএন লাল তালিকা; ২০১৫ সালের জাতীয় লাল তালিকা প্রকাশ করে ঢাকার আইইউসিএন বাংলাদেশ। ২০১৭ ও ২০২০ দুই মেলারই সহযোগী বাংলাদেশ বন বিভাগ সেই লাল তালিকা মূল্যায়নেও আইইউসিএনের অংশীদার ছিল। বাকি সহযোগী প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতি ও চ্যানেল টুয়েন্টিফোর মেলার বার্তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হয়।
ছবি: Syed Sajidul Islam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (বাসস), বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ আইন (আইন মন্ত্রণালয়: বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২), আইইউসিএন, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ, হোয়াইট হাউস (২০০০ সালের আর্কাইভ), উইকিপিডিয়া (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, পাতি সরালি, ফালভাস হুইসলিং ডাক, গিরিয়া হাঁস, আইইউসিএন)





মন্তব্য
(০)