মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার নহাটা ইউনিয়নের পানিঘাটা ব্লকে ২০২৫-২৬ সালের রবি মৌসুমে ভিয়েতনামি সরিষা ও কিনোয়া চাষ করেছেন বেজড়া গ্রামের কৃষক মো. তামজিদ হোসেন। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ৭ মার্চ জানায়, উপজেলায় এই দুই ফসলের চাষ এবারই প্রথম, এবং খেতে ‘বাম্পার ফলন’ দেখে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কৃষি অফিস শুরু থেকে তাঁকে পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
অনলাইনে বীজ, ১৫ শতকে সরিষা
তামজিদ হোসেন জানান, আধুনিক কৃষির প্রতি আগ্রহ থেকে তিনি ইন্টারনেটে ভিয়েতনামি সরিষার কথা জানতে পারেন এবং অনলাইনেই বীজ সংগ্রহ করেন। কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে তিনি ১৫ শতক জমিতে এই সরিষা বোনেন। তাঁর ভাষায়, ‘ভিয়েতনামি সরিষার ফলন সাধারণ জাতের তুলনায় বেশ ভালো। মাত্র ১৫ শতক জমি থেকে আমি ৫ মণ সরিষা পাবো বলে আশা করছি।’ প্রতিবেদনে এই হিসাবটি কৃষকের প্রত্যাশা হিসেবে এসেছে; সাধারণ জাতের চেয়ে বেশি ফলন ও কম সময়ে পাকার দাবিও প্রতিবেদনে স্থানীয়দের বরাতে বলা হয়েছে, কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত জাত হিসেবে এর উল্লেখ নেই।
বাংলাদেশে সরিষা প্রধান তেলবীজ ফসল। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফরেন এগ্রিকালচারাল সার্ভিসের ২০২৫ সালের মার্চের তেলবীজ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের কৃষকেরা রাই ও সরিষা দুটোকেই ‘সরিষা’ বলে চেনেন, এবং বারি, বিনা ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ২০টির বেশি সরিষার জাত অবমুক্ত করেছে। ঠান্ডা আবহাওয়ার ফসল বলে সরিষা রবি মৌসুমে (নভেম্বর থেকে মার্চ) হয়; দেশে গড় ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ১.৩ টন। একই প্রতিবেদন বলছে, দেশে উৎপাদিত তেলবীজ ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ মেটায়, বাকিটা আমদানি করতে হয়। এ কারণে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সরিষার আবাদ বাড়াতে কাজ করছে।

প্রায় ১৩ শতকে কিনোয়া
সরিষার পাশাপাশি তামজিদ প্রায় ১৩ শতক জমিতে কিনোয়া চাষ করেছেন। প্রতিবেদনে কিনোয়াকে বিদেশি উচ্চমূল্যের ফসল বলা হয়েছে, যাকে বিশ্বজুড়ে ‘সুপার ফুড’ বলে প্রচার করা হয়। কম খরচ ও কম পরিশ্রমে গাছের ভালো বৃদ্ধি দেখে কৃষক সন্তুষ্ট বলে জানানো হয়েছে।
কিনোয়া দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ অঞ্চলের ফসল; হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের ‘দ্য নিউট্রিশন সোর্স’ জানায়, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, চিলি ও পেরুতে প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে এর চাষ হচ্ছে। এটি আসলে দানাশস্য নয়, পালং ও অ্যামারান্থের আত্মীয় একটি উদ্ভিদ, যার বীজ খাওয়া হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১৩ সালকে ‘আন্তর্জাতিক কিনোয়া বর্ষ’ ঘোষণা করেছিল। বাংলাদেশে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক পরিমল কান্তি বিশ্বাসের পাঁচ বছরের গবেষণার পর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে কৃষি মন্ত্রণালয় কিনোয়া চাষের অনুমোদন দেয় বলে দ্য ডেইলি স্টার ২০২১ সালে জানিয়েছিল। তখন লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও পটুয়াখালীর মাঠে পরীক্ষামূলক চাষ হয়; নভেম্বরের মাঝামাঝি বুনে মার্চের প্রথম থেকে মাঝামাঝি সময়ে কাটা হয়, আর খরা ও লবণাক্ত মাটিতেও এর চাষ সম্ভব বলে জানানো হয়।

পুষ্টিগুণ ও কৃষি বিভাগের মত
প্রতিবেদনে বলা হয়, কিনোয়ায় প্রোটিন, আঁশ ও অ্যামাইনো অ্যাসিড বেশি থাকায় এর বাজারমূল্যও বেশি। হার্ভার্ডের নিউট্রিশন সোর্স অনুযায়ী, কিনোয়া একটি সম্পূর্ণ প্রোটিন, অর্থাৎ শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না এমন নয়টি অত্যাবশ্যক অ্যামাইনো অ্যাসিডের সবই এতে আছে; এক কাপ রান্না করা কিনোয়ায় প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন ও ৫ গ্রাম আঁশ থাকে। বীজের গায়ে স্যাপোনিন নামে তেতো একটি আবরণ থাকে, যা ফসল তোলার পর প্রক্রিয়াজাত করে সরানো হয়।

পানিঘাটা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. এমলাচুর জামান তামজিদ হোসেনকে উদ্যমী কৃষক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘তামজিদ হোসেনকে আমরা নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে আসছি। রবি মৌসুমের ফসলগুলো চাষ করে তিনি লাভবান।’ তাঁর সাফল্য দেখে এলাকার অন্য কৃষকেরাও এসব ফসল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। নতুন ফসল চাষের আগে বীজ ও চাষপদ্ধতি নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
ছবি: Belayet2014 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, মার্কিন কৃষি বিভাগের ফরেন এগ্রিকালচারাল সার্ভিস (তেলবীজ বার্ষিক প্রতিবেদন, মার্চ ২০২৫), দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ (দ্য নিউট্রিশন সোর্স), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)