ভরা মৌসুমেও সাগরে আশানুরূপ ইলিশ না পেয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার অনেক জেলে পেশা বদলাচ্ছেন। ২০২৫ সালের ২ আগস্ট জাগো নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উপজেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এখানে ইলিশ আহরণ প্রতি বছর কমেছে। স্থানীয় জেলে ও সংশ্লিষ্টদের অভিমত, সাহেরখালী উপকূল ঘিরে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠায় মাছের বিচরণক্ষেত্র বদলে গেছে; বিশেষজ্ঞরা এর সঙ্গে উজানের মিঠাপানির প্রবাহের পরিবর্তন, দূষণ ও জলবায়ুর প্রভাবের কথাও বলেছেন।
পাঁচ বছরে আহরণের চিত্র
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরসরাইয়ে ২০২০ সালে ইলিশ আহরণ হয় ৩২৭.৪ মেট্রিক টন। ২০২১ সালে তা নেমে আসে ২৫২.৩ মেট্রিক টনে, ২০২২ সালে ১৪৭.৪ মেট্রিক টনে এবং ২০২৩ সালে ১১৬ মেট্রিক টনে। ২০২৪ সালে আহরণ হয় মাত্র ৩৬.৪৯ টন।
উপজেলা মৎস্য দপ্তরের হিসাবে মিরসরাইয়ের ২৯টি জেলেপাড়ায় নিবন্ধিত জেলে দুই হাজার ৫৫৭ জন, তাঁদের পরিবার প্রায় ৫ হাজার। জেলেরা জানান, ইলিশ বাড়াতে সরকার বছরে একাধিকবার সাগর ও নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখলেও কেন আহরণ বাড়ছে না, তা তাঁদের বোধগম্য নয়। ২০২৫ সালে বঙ্গোপসাগরে ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল; এ বছর প্রথমবার এই সময়সূচি ভারতের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মিলিয়ে নির্ধারণ করা হয়। মা ইলিশ রক্ষায় প্রতি বছর অক্টোবরের প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন ইলিশ ধরাও বন্ধ থাকে।

দাদন, ঋণ আর পেশা বদল
ডোমখালী জলদাশপাড়ার জেলে রতন জলদাশ জাগো নিউজকে জানান, তাঁর ছয় সদস্যের সংসার। প্রতি মৌসুমে দাদনে (অগ্রিম ঋণে) জাল কিনে ইলিশ বিক্রির টাকায় তা শোধ করেন। কয়েক বছর ধরে আহরণ কমে যাওয়ায় দাদন শোধ করতে তাঁকে স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে; বছরে দুবার মাছ ধরা বন্ধ থাকায় পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে।
সাহেরখালী ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকার জেলে জদু জলদাশ বলেন, 'ইলিশ এখন সোনার হরিণ। সাগর ও নদীদূষণ বেড়ে গেছে। তাই ইলিশ মাছ দিনদিন কমে যাচ্ছে।' তাঁর দাবি, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি ভরাটের কাজে বড় বড় ড্রেজার ব্যবহারের কারণেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। একই এলাকার অজয় জলদাশ জানান, সাগরে আগের মতো মাছ না পাওয়ায় তিনি এখন আর মাছ ধরতে যান না, কৃষিকাজ করছেন; অনেকটা বাধ্য হয়েই বাপ-দাদার পেশা ছেড়েছেন।

কারণ নিয়ে গবেষক ও মৎস্য কর্মকর্তারা যা বলেছেন
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) নদীকেন্দ্র চাঁদপুরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. হারুনর রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, ইলিশ কমার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত হয়েছে। 'নদীতে মাত্রাতিরিক্ত দূষণ ইলিশের প্রজনন ও আবাসস্থলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ডুবোচর তৈরি হওয়া ও নদীর তীরে শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার কারণে মাছের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।' তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সাগর থেকে বালু তোলার ড্রেজিংও ইলিশের বিচরণক্ষেত্র ও আবাসস্থলের ক্ষতি করছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞরা সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি, আগের বছরগুলোর অতিরিক্ত আহরণ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলের বর্জ্যকেও সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, এ বছর জেলেদের জালে আশানুরূপ ইলিশ ধরা পড়েনি এবং আহরণ কমে যাওয়ায় মৎস্য বিভাগ চিন্তিত। 'আগে যেভাবে উপকূলে ইলিশ পাওয়া যেত এখন সেভাবে পাওয়া যায় না। এটার প্রধান কারণ হচ্ছে ইলিশ উৎপাদন ও প্রজনন ক্ষেত্রগুলো বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে ঘাটগুলো বদলে ফেলায় ইলিশ আহরণ কমেছে।'
ইলিশের প্রজননক্ষেত্র ও দেশের উৎপাদন
সরকার আগেই প্রায় ৭ হাজার বর্গকিলোমিটারের একটি ইলিশ প্রজননক্ষেত্র ঘোষণা করে, যার একটি সীমানাবিন্দু চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মায়ানী পয়েন্ট; বাকিগুলো ভোলা, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর কলাপাড়ায়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বলেশ্বর নদীর প্রায় ৩৪২.৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে দ্বিতীয় প্রজননক্ষেত্র ঘোষণা করা হয়। ২০২৩ সালে নিউ এজের এক প্রতিবেদনে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য উদ্ধৃত করে মায়ানী-মিরসরাই মোহনাকে ইলিশের পাঁচটি প্রধান প্রজনন এলাকার একটি বলা হয়, এবং মিরসরাই থেকে ভোলার লালমোহন পর্যন্ত এলাকাকে সবচেয়ে বড় প্রজনন এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
দেশজুড়েও ইলিশের উৎপাদন তখন কমছিল। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের এপ্রিলে জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয় ৫ দশমিক ২৯ লাখ টন, যা আগের বছর ছিল ৫ দশমিক ৭১ লাখ টন এবং যা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিএফআরআইয়ের বিজ্ঞানী মোহাম্মদ আবু কাওসার দিদার তখন বলেন, অনেক রুটে নদীর গভীরতা কমে যাওয়া এবং টেকসই সীমার বেশি আহরণ এর অন্যতম কারণ।

ছবি: বিশ্বরূপ গাঙ্গুলী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, দ্য ডেইলি স্টার, নিউ এজ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড





মন্তব্য
(০)