বসতবাড়ির আঙিনায় ফল ও সবজি চাষ জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতেও কাজে লাগতে পারে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বিবিসির এক প্রতিবেদনে এমন অভিজ্ঞতা উঠে আসে। সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার গ্রামে নারীদের নিয়ে কাজ করা জার্মান গবেষক অধ্যাপক সাবিনে গাব্রিশ বার্লিনে নোবেল ফাউন্ডেশন আয়োজিত স্বাস্থ্য ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের এক সম্মেলনে বিবিসিকে এ অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি বার্লিনের শারিটে বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল এবং পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চে জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য বিষয়ের অধ্যাপক।
আগাম ঢলে নষ্ট হয় বোরো ধান
বিবিসি জানায়, ২০১৭ সালের এপ্রিলে সিলেট বিভাগের উত্তর-পূর্বের প্লাবনভূমিতে বৃষ্টি নামে, অথচ তা আসার কথা ছিল আরও দুই মাস পরে। এতে মাঠের ধান নষ্ট হয়ে যায়। অধিকাংশ কৃষক ফসলের বেশির ভাগ বা পুরোটাই হারান। এর অর্থ ছিল পরিবারগুলোর আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ঘরে যথেষ্ট খাবার না থাকা।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের ২০১৭ সালের বার্ষিক বন্যা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের মেঘালয় ও বরাক অববাহিকায় ভারী বৃষ্টিতে এপ্রিলের শুরুতেই উত্তর-পূর্বের হাওর অঞ্চল প্লাবিত হয়। সেবার এপ্রিলে মেঘনা অববাহিকায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৯০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়, যার বেশির ভাগ ঝরে ১ থেকে ৫ এপ্রিল এবং ১৯ থেকে ২২ এপ্রিলের মধ্যে। এই আগাম আকস্মিক বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০১৭ সালের মে মাসে জানায়, দেশের মোট ধানের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে সেচনির্ভর বোরো মৌসুম থেকে, আর প্লাবন হয় ঠিক ধান কাটার আগে, বিশেষ করে সিলেট, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে।

আগে থেকেই অপুষ্টিতে ভুগছিল পরিবারগুলো
অধ্যাপক গাব্রিশ বিবিসিকে বলেন, ‘এটা খুবই অন্যায্য, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনে এই মানুষদের কোনো ভূমিকাই নেই।’ তাঁর ভাষায়, ‘তারা সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত পাচ্ছে, কারণ তারা জীবিকা হারাচ্ছে, পুষ্টির উৎসও হারাচ্ছে। আর সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে তাদের শিশুরা, কারণ তারা দ্রুত বড় হচ্ছে এবং তাদের অনেক পুষ্টি দরকার।’
তিনি জানান, আগাম বৃষ্টির আগেও ওই এলাকায় প্রতি তিনজন নারীর একজনের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম ছিল এবং ৪০ শতাংশ শিশু দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টিতে ভুগছিল। ‘মানুষ এমনিতেই টিকে থাকার শেষ সীমায়, নানা রোগে ভুগছে, বিপদ সামলানোর মতো সঞ্চয় তাদের তেমন নেই,’ বলেন তিনি। ‘তাদের কোনো বীমাও নেই।’ গবেষকদের প্রকাশিত প্রটোকল অনুযায়ী, জাতীয় জরিপে ২০১৪ সালে সিলেট বিভাগে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪৪ শতাংশ শিশু খর্বকায় ছিল এবং ৪০ শতাংশ গর্ভবতী নারী অপুষ্টির শিকার ছিলেন।
বন্যার প্রভাব নিয়ে অধ্যাপক গাব্রিশের নেতৃত্বে একটি গবেষণা চলছিল, যাতে এলাকার বিভিন্ন গ্রামের দুই হাজারের বেশি নারী যুক্ত ছিলেন। তাঁদের অর্ধেক জানান, বন্যায় তাঁদের পরিবার উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামলাতে বেশির ভাগ পরিবার ধার করে, মূলত চড়া সুদের মহাজনদের কাছ থেকে, ফলে তারা ঋণে জড়িয়ে পড়ে।

উঁচু ভিটায় সবজি বাগান ও মুরগি পালন
বন্যার আগেই গবেষক দলটি গ্রামবাসীকে বাড়ির উঁচু জমিতে বাগান করে নানা পুষ্টিকর ফল ও সবজি ফলাতে এবং মুরগি পালন করতে শেখাতে শুরু করেছিল। অধ্যাপক গাব্রিশ বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমার মনে হয় না এটি ধানের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে, কারণ ধানই তাদের জীবিকা। তবে অন্তত কিছুটা হলেও তাদের সাহায্য করতে পারে।’
কাজটি হচ্ছিল ‘ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যাপ্রোচেস টু রিডিউসিং ম্যালনিউট্রিশন’ (ফার্ম) নামের একটি গবেষণা প্রকল্পে। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে বিএমজে ওপেন সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রকল্পের প্রটোকল অনুযায়ী, ২০১৫ সালে হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও নবীগঞ্জ উপজেলার ৯৬টি গ্রামীণ বসতির বিবাহিত তরুণী নারী ও তাঁদের শিশুদের এতে যুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪৮টি বসতিতে হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল তিন বছরের বসতবাড়িতে খাদ্য উৎপাদন কর্মসূচি চালায়, বাকি ৪৮টি তুলনার জন্য রাখা হয়; লক্ষ্য ছিল ২ হাজার ৭০০-র বেশি নারী। এতে সারা বছর সবজি চাষ, ফলের গাছ, মুরগি পালন এবং পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বর্ষায় বাগান ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় বস্তায় সবজি চাষও শেখানো হয়।
ধানের পুষ্টিও কমাচ্ছে বাড়তি কার্বন ডাই-অক্সাইড
বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ফসল ও খাবারের পুষ্টি দুটিকেই প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস্টি এবি বিবিসিকে জানান, তাঁর দলের গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত ধানে স্বাভাবিকের তুলনায় গড়ে ৩০ শতাংশ বি ভিটামিন কম ছিল, এর মধ্যে গর্ভবতী নারীর জন্য জরুরি ফলিক অ্যাসিডও আছে। তিনি বলেন, ‘দেশ ধনী হলেও আজও বাংলাদেশে চারটি ক্যালরির তিনটিই আসে ভাত থেকে। তাই খাবারে অণুপুষ্টি কমে যাওয়ার পরিণতি খুবই গুরুতর হতে পারে।’
২০১৮ সালের মে মাসে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গবেষণায়, যার লেখকদের একজন অধ্যাপক এবি, এশিয়ায় চাষ হওয়া ১৮টি ধানের জাত খোলা মাঠে বাড়তি কার্বন ডাই-অক্সাইডের মধ্যে কয়েক বছর ধরে কয়েকটি স্থানে পরীক্ষা করা হয়। এতে প্রোটিন, আয়রন ও জিংকের পাশাপাশি ভিটামিন বি১, বি২, বি৫ ও বি৯ ধারাবাহিকভাবে কমতে দেখা যায়, তবে ভিটামিন ই বাড়ে।
ছবি: Md Majirul Tanber Jake / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, বিবিসি নিউজ, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও জিআইইডব্লিউএস), বিএমজে ওপেন, সায়েন্স অ্যাডভান্সেস





মন্তব্য
(০)