খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বোয়ালখালী বাজারে বিক্রির জন্য আনা একটি মহাবিপন্ন পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপ উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। ২০২৬ সালের ৮ জুলাই, বুধবার বিকেলে বাজারের জাফর স্টোর এলাকা থেকে কচ্ছপটি উদ্ধার করা হয়। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের (ডব্লিউসিসিইউ) পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মাছের পরিত্যক্ত ড্রামে ছিল কচ্ছপটি
বন বিভাগ জানায়, স্থানীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী বাজারে কচ্ছপটি বিক্রির জন্য আনার বিষয়টি দেখতে পেয়ে বন বিভাগকে খবর দেন। খবর পেয়ে বন বিভাগের মেরুং রেঞ্জের কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাফর উল্লাহ ঘটনাস্থলে যান এবং মাছ বহনের একটি পরিত্যক্ত ড্রামের ভেতর থেকে কচ্ছপটি উদ্ধার করেন।
জাফর উল্লাহ বলেন, 'কচ্ছপটি মহাবিপন্ন প্রজাতির বিধায় বন বিভাগের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে উপযুক্ত প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হবে।' ডব্লিউসিসিইউ পরিচালকও জানান, কোয়ারান্টাইন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর কচ্ছপটি প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হবে।
বন বিভাগের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কচ্ছপটি বাজারে আনা ব্যক্তি দাবি করেন, প্রাণীটি যে মহাবিপন্ন প্রজাতির, সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি একটি নালার পাশ থেকে কচ্ছপটি ধরে না বুঝেই বিক্রির জন্য বাজারে এনেছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় বাজারে এখনো মহাবিপন্ন বন্যপ্রাণী বিক্রির জন্য আনার ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের অবৈধ বাণিজ্য ঠেকাতে তারা নজরদারি জোরদার, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।

পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপ কোন প্রাণী
পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপের ইংরেজি নাম এলংগেটেড টরটয়েজ, বৈজ্ঞানিক নাম Indotestudo elongata। এটি স্থলচর কচ্ছপ। এর খোলস ও বুকের অংশ সবুজাভ হলুদ, প্রতিটি খণ্ডে থাকে অনিয়মিত কালো দাগ। পূর্ণবয়স্ক কচ্ছপ সাধারণত প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা ও প্রায় সাড়ে ৩ কেজি ওজনের হয়।
প্রজাতিটি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, পশ্চিম মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ চীনে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এর আবাস পাহাড়ি বনাঞ্চলে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনেও প্রজাতিটির রেকর্ড রয়েছে।

কেন মহাবিপন্ন এই প্রজাতি
প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন ২০১৯ সালের মূল্যায়নে পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপকে লাল তালিকায় 'মহাবিপন্ন' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। পুরো বিচরণ এলাকাজুড়েই প্রজাতিটির সংখ্যা দ্রুত কমছে। বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার এবং খাদ্য ও পোষা প্রাণীর বাজারের জন্য পাচার এর প্রধান কারণ।
২০১৫ সালে 'কেলোনিয়ান কনজারভেশন অ্যান্ড বায়োলজি' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় শাহরিয়ার সিজার রহমান ও সহগবেষকেরা জানান, দেশের মোট আয়তনের ১০ শতাংশের বেশি জুড়ে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম ইন্দো-বার্মা জীববৈচিত্র্য হটস্পটের অংশ। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সাঙ্গু-মাতামুহুরী সংরক্ষিত বন ও আশপাশে জরিপ চালিয়ে তারা পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপসহ আট প্রজাতির কচ্ছপ ও কাছিমের নমুনাভিত্তিক রেকর্ড পান। গবেষকদের মতে, ওই অঞ্চলে কচ্ছপের জন্য সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক হুমকি জীবিকার জন্য শিকার; তা ঠেকাতে তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে আস্থাভিত্তিক সংরক্ষণের সুপারিশ করেন।
দেশের আইনেও বন্যপ্রাণী রক্ষার বিধান রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে উপদেষ্টা পরিষদ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুমোদন করে, যা ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইনের জায়গা নেয়। বন মন্ত্রণালয় তখন জানায়, অধ্যাদেশে বন্যপ্রাণী শিকার, পাচার, হত্যা ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় করা হয়েছে।

ছবি: Marek Ślusarczyk (Tupungato) / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন, আইইউসিএন লাল তালিকা, কেলোনিয়ান কনজারভেশন অ্যান্ড বায়োলজি, প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)