২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর জাগো নিউজের কৃষি ও প্রকৃতি বিভাগে কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাসের একটি লেখা প্রকাশিত হয়। তাতে তিনি যুক্তি দেন, জলবায়ু পরিবর্তনে ফসল যখন ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন শস্য বিমা বা ক্রপ ইন্স্যুরেন্স কৃষকের পাশে দাঁড়াতে পারে। উষ্ণ হয়ে ওঠা জলবায়ু কীভাবে ফসলের ক্ষতি করে, সেই ক্ষতি কেন কৃষক পরিবারের জন্য আর্থিক ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায় এবং আবহাওয়া কেন্দ্র, স্যাটেলাইট ও তথ্য মডেলনির্ভর সূচকভিত্তিক বিমা কীভাবে দ্রুত কৃষকের হাতে টাকা পৌঁছে দিতে পারে, লেখায় তিনি তা তুলে ধরেন। এই প্রতিবেদনে তাঁর যুক্তির পাশাপাশি সেই তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশে শস্য বিমা নিয়ে সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও আগের সংবাদ প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছিল, তা-ও তুলে ধরা হলো।
সমীরণ বিশ্বাস লেখেন, জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের ধরন, আর্দ্রতা, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং খরার সময়কাল দ্রুত বদলে দিচ্ছে। বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার উল্লেখ করে তিনি বলেন, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের ঘনত্ব বৃদ্ধি বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। তাঁর ভাষায়, তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা, অসময়ে বৃষ্টি, দীর্ঘ খরা, আকস্মিক বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কীটপতঙ্গের জীবনচক্রের পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের ফসল উৎপাদনকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে দেশের কৃষি
সমীরণ বিশ্বাসের হিসাবে, বাংলাদেশের কৃষিখাতের প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষক জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করেন। ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি থেকে শুরু করে ফল চাষ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে বলে তিনি লেখেন। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) প্রতিবেদনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি অঞ্চলগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে বাংলাদেশ, যেখানে কৃষি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী গত কয়েক দশকে গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে চরম আবহাওয়ার ঘটনা: অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, লবণাক্ততার বিস্তার এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঘনত্ব ও তীব্রতা। জলবায়ু পরিবর্তন যে হারে বিশ্বের কৃষি উৎপাদনকে প্রভাবিত করছে, তা কৃষিবিজ্ঞানীদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আইপিসিসির দ্বিতীয় কার্যকরী দলের (ওয়ার্কিং গ্রুপ টু) প্রভাব, অভিযোজন ও ঝুঁকিবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২০২২ সালে। এর নীতিনির্ধারকদের জন্য সারসংক্ষেপে জলবায়ুজনিত বিপদের মুখে মানুষের উচ্চ ঝুঁকির বৈশ্বিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার নাম রয়েছে। সারসংক্ষেপে বলা হয়, যেখানে জীবিকা জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ঝুঁকি বেশি; এর উদাহরণ হিসেবে ক্ষুদ্র কৃষক, পশুপালক ও মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে। একই সারসংক্ষেপে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যপ্রাপ্তির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করবে, আর খরা, বন্যা ও তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন, তীব্র ও গুরুতর হওয়ায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়বে। মধ্যমেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে এই ঝুঁকি আরও গুরুতর হবে এবং অপুষ্টি ও অণুপুষ্টির ঘাটতি দেখা দেবে, যা কেন্দ্রীভূত হবে সাব-সাহারান আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে। প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়, উষ্ণায়ন ধীরে ধীরে মাটির স্বাস্থ্য ও পরাগায়নের মতো বাস্তুতন্ত্রের সেবা দুর্বল করবে এবং রোগবালাই ও কীটপতঙ্গের চাপ বাড়াবে।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জন্য তৈরি কান্ট্রি ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্টে এই ঝুঁকির একটি হিসাব দেয়; প্রতিবেদনের মূল তথ্যগুলো ব্যাংকটি প্রকাশ করে ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর। সেখানে বলা হয়, জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা ও চরম আবহাওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে কৃষি জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক একে বিপর্যয়কর বলে উল্লেখ করে, কারণ দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় অর্ধেকই কৃষিখাতে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গড়পড়তা ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয় এবং বড় বন্যায় জিডিপি ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। কৃষিতে জলবায়ুর প্রভাব, পানির সংকট ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আগামী ৩০ বছরে ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ দেশের ভেতরে অভিবাসী হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়। একই সঙ্গে ১৯৭০ সালের পর ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যু ১০০ গুণ কমিয়ে আনার কৃতিত্ব বাংলাদেশকে দেওয়া হয় এবং ফসল বহুমুখীকরণ ও জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিকে কৃষির উৎপাদনশীলতা, জলবায়ু সহনশীলতা ও গ্রামীণ আয় বাড়ানোর চাবিকাঠি বলা হয়।
তাপ, খরা ও বন্যা যেভাবে ফসলের ক্ষতি করে
সমীরণ বিশ্বাস ব্যাখ্যা করেন, জলবায়ু পরিবর্তন ফসলের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাপমাত্রা বাড়লে উদ্ভিদের স্টোমাটাল কন্ডাকট্যান্স, অর্থাৎ পাতার সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে গ্যাস চলাচলের মাত্রা কমে যায়, ফলে আলোকসংশ্লেষণ হ্রাস পায়। খরা বা মাটির আর্দ্রতা কমে গেলে শিকড়ের কার্যক্ষমতা কমে এবং পুষ্টি গ্রহণ ব্যাহত হয়; মাটি শুকিয়ে গেলে সালোকসংশ্লেষণ বাধা পায় এবং ফসল শুকিয়ে যায়। অন্যদিকে অতিবৃষ্টি বা জলাবদ্ধতা শিকড়ে অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করে, ফলে শিকড় পচা ও ফলন কমার ঝুঁকি বাড়ে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ধানের কথা বলেন: অতিবৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে থাকলে ধানের শিকড়ে অক্সিজেন প্রবাহ কমে যায় এবং ফলন কমে। উচ্চ আর্দ্রতা ছত্রাকজনিত রোগবালাই দ্রুত ছড়াতে সহায়তা করে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এসব পরিবর্তন মাঠপর্যায়ে উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি ডেকে আনে।
পরাগায়নের সময়ের তাপের কথা তিনি আলাদা করে বলেন। উচ্চ তাপমাত্রায় পরাগায়ন ব্যাহত হলে ধানের শিষে ও গমের শীষে দানা পূর্ণতা পায় না, যাকে বিজ্ঞানীরা হিট স্ট্রেস বা তাপজনিত চাপ বলেন। ধান গবেষণায় বহু আগে থেকেই ফুল ফোটার সময়কে সবচেয়ে সংবেদনশীল পর্যায় হিসেবে দেখা হয়। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) ফাইটোট্রন, অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার গবেষণাগারে করা একটি পরীক্ষার ফল ১৯৭৭ সালে জাপানের গবেষণা সাময়িকী জার্কে (JARQ) প্রকাশিত হয়। সেখানে ফুল ফোটা অবস্থায় ধানগাছকে ৩৫, ৩৮ ও ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়। দেখা যায়, যে দিন ধানের ফুল (স্পাইকলেট) ফোটে, সেদিনের উচ্চ তাপমাত্রাই চিটা বা বন্ধ্যত্ব তৈরি করে; ফুল ফোটার আগের বা পরের দিনের উচ্চ তাপমাত্রা নিষেকের ওপর সামান্যই প্রভাব ফেলে। উচ্চ তাপের সময় যেসব ফুল ফুটেছিল, সেগুলোর উর্বরতা ছিল খুবই কম।

ফসলের ক্ষতি যখন আর্থিক ক্ষতি
সমীরণ বিশ্বাসের মতে, বাংলাদেশের কৃষকের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এই বৈজ্ঞানিক ক্ষতিগুলো আর্থিক ধাক্কায় রূপ নেয়। জাতীয় পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে তিনি লেখেন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, শিলাবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির কারণে অনেক কৃষকের মৌসুমি বিনিয়োগের ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও জলবায়ু-সহনশীল জাত কিছুটা সুরক্ষা দিলেও কৃষকের আর্থিকভাবে টিকে থাকার জন্য তা যথেষ্ট নয় বলে তিনি যুক্তি দেন। এ কারণেই তাঁর মতে বৈজ্ঞানিকভাবে নকশা করা শস্য বিমা আজ কৃষির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচিত, যাতে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকি নির্ধারণ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব হয়।
লেখাটি প্রকাশের আগের বছরের হিসাব দেখায়, এমন ধাক্কা কত বড় হতে পারে। বার্তা সংস্থা ইউএনবি ২০২৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি সভার খবর দেয়। সেখানে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া আকস্মিক বন্যায় ২৩ জেলায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এসব জেলায় মোট ৩ লাখ ৭২ হাজার ৭৩৩ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমির পরিমাণ ২ লাখ ৮ হাজার ৫৭৩ হেক্টর। আনুমানিক ৭ লাখ ১৪ হাজার ৫১৪ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন কম হয়, যার মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা; ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৮৯। বন্যাকবলিত ২৩ জেলায় মোট আবাদ করা ফসলের ১৪.৫৮ শতাংশ নষ্ট হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ফেনীতে ৩৫ হাজার ৬৭৩ হেক্টর, অর্থাৎ জেলার ফসলি জমির ৮০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্য সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো হলো নোয়াখালী (৩৮ হাজার ৪৫৬ হেক্টর, ৩৭ শতাংশ), কুমিল্লা (৪৯ হাজার ৬০৮ হেক্টর, ৩৬ শতাংশ), লক্ষ্মীপুর (১৫ হাজার ৬২৬ হেক্টর, ৩৩ শতাংশ), চট্টগ্রাম (২৩ হাজার ৯৯২ হেক্টর, ১৬ শতাংশ), মৌলভীবাজার (১৫ হাজার ২২২ হেক্টর, ১২ শতাংশ) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া (৮ হাজার ৩২৬ হেক্টর, ৩৫ শতাংশ)।
বিমা না থাকলে এই ক্ষতির পুরো ভার পড়ে কৃষক পরিবারের ওপর। ২০২২ সালের অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের পর ২৮ অক্টোবর দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার এক পেঁপে ও সবজিচাষি প্রায় ৫ লাখ টাকা এবং রূপসা উপজেলার এক মাছ ও চিংড়িচাষি প্রায় ৬ লাখ টাকা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন, আর কৃষিবিমা না থাকায় তাঁদের মতো হাজারো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক অসহায় হয়ে পড়েছেন। পত্রিকাটি ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ইনস্যুরেন্স সিচুয়েশন অ্যানালাইসিস'-এর উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বছরে গড়ে প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়।
শস্য বিমা কী এবং সূচকভিত্তিক বিমা কীভাবে টাকা দেয়
দ্য ডেইলি স্টার ২০১৮ সালের মে মাসে শস্য বিমাকে বর্ণনা করেছিল এমন একটি বিমা প্যাকেজ হিসেবে, যা শিলাবৃষ্টি, খরা ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি থেকে কৃষককে রক্ষার জন্য তৈরি। প্রচলিত বিমায় দুর্যোগের পর বিমাকারী প্রতিষ্ঠান প্রত্যেক কৃষকের ক্ষতি আলাদাভাবে যাচাই করে। সমীরণ বিশ্বাস বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে শস্য বিমাকে কৃষিঝুঁকির পরিমাপ ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নভিত্তিক একটি পরিসংখ্যানসমৃদ্ধ মডেল হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, আবহাওয়া-সূচকভিত্তিক শস্য বিমায় আবহাওয়াজনিত ঝুঁকিকে পরিমাপযোগ্য সূচকে রূপান্তর করা হয়, যেমন বৃষ্টিপাত সূচক, তাপমাত্রা সূচক বা বন্যা সূচক, এবং সেই সূচকের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হয়। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিমার অর্থ দেওয়া হয়: বৃষ্টিপাত নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে নামলে বা তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার ওপরে উঠলে, কিংবা অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, লবণাক্ততার বিস্তার ও অতিরিক্ত কুয়াশার ক্ষেত্রে। মাঠে গিয়ে প্রত্যেক কৃষকের ক্ষতি যাচাই করতে হয় না বলে এই পদ্ধতি ক্ষতি যাচাইয়ের জটিলতা কমায় এবং কৃষকের হাতে দ্রুত আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেয়। তিনি লেখেন, বিশ্বজুড়ে সূচকভিত্তিক শস্য বিমা দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে এবং বাংলাদেশেও পরীক্ষামূলকভাবে এই মডেল ব্যবহৃত হচ্ছে; তাঁর আশা, ভবিষ্যতে এটি বড় পরিসরে কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
দ্য ডেইলি স্টারের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পাইলট প্রকল্পে একই পদ্ধতির বর্ণনা ছিল: নির্দিষ্ট এলাকায় ঘূর্ণিঝড় বা ক্রান্তীয় ঝড় নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছালে, কিংবা বৃষ্টিপাত নির্দিষ্ট মাত্রার ওপরে উঠলে বা নিচে নামলে, অর্থাৎ নির্ধারিত জলবায়ু-সীমা ছুঁলে কৃষক ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন। এডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের সুরক্ষা থাকলে খারাপ আবহাওয়ায় হঠাৎ ফসল নষ্ট হলেও কৃষক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সঞ্চয় চালিয়ে যেতে পারেন।
বাংলাদেশে এ ধরনের প্রকল্পে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা এর সীমাবদ্ধতার কথাও বলেছেন। রাজশাহীতে মাঠ পরিদর্শনের পর ২০১৯ সালের ৩০ আগস্ট দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে লেখা এক নিবন্ধে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) একজন প্রধান আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ লেখেন, বৃষ্টিপাতের মতো যেসব সাধারণ ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই ও পরিমাপ করা যায়, সেগুলোর ক্ষেত্রে সূচকভিত্তিক বিমা ভালো কাজ করে; কিন্তু শিলাবৃষ্টির মতো স্থানীয় ঘটনায় এটি সামান্যই সুরক্ষা দেয়, আর রোগের প্রাদুর্ভাবের মতো পুরো এলাকাজুড়ে ঘটা কিছু ঘটনাও এতে ধরা না-ও পড়তে পারে। তিনি ক্ষতিপূরণভিত্তিক ও সূচকভিত্তিক বিমার মিশ্রণ চালুর সুপারিশ করেন এবং বলেন, প্যাকেজ নকশায় কৃষকদের যুক্ত করলে তা তাঁদের নিজেদের অনুভূত ঝুঁকির সঙ্গে মিলবে।
বিমার পেছনে স্যাটেলাইট, সেন্সর ও তথ্য
সমীরণ বিশ্বাসের বর্ণনায়, ফসলের ক্ষতি নির্ণয়ে এখন ব্যবহৃত হয় স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ভিত্তিক মাটির আর্দ্রতা সেন্সর, এনডিভিআই নামের উদ্ভিদ সূচক, ফলন পূর্বাভাস মডেল এবং মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম। এসব প্রযুক্তি ফসলের বৃদ্ধি, চাপের মাত্রা, আর্দ্রতা ও উৎপাদন সম্ভাবনা উচ্চ নির্ভুলতায় নির্ণয় করে, ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্বচ্ছ, দ্রুত ও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা যায় বলে তিনি লেখেন। তাঁর মতে, সেন্সরনির্ভর আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, স্যাটেলাইট ডেটা, রিমোট সেন্সিং ও আইওটি প্রযুক্তি এই বিমা ব্যবস্থাকে আরও নির্ভুল করে তুলছে।
এনডিভিআইয়ের পূর্ণরূপ নরমালাইজড ডিফারেন্স ভেজিটেশন ইনডেক্স। মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার আর্থ অবজারভেটরি ব্যাখ্যা করে, পাতার ক্লোরোফিল দৃশ্যমান আলো জোরালোভাবে শোষণ করে, যা উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণে কাজে লাগায়; আর পাতার কোষের গঠন নিকট-অবলোহিত (নিয়ার-ইনফ্রারেড) আলো জোরালোভাবে প্রতিফলিত করে। ভূমি থেকে প্রতিফলিত দৃশ্যমান ও নিকট-অবলোহিত আলোর তুলনা করে বিজ্ঞানীরা সবুজ উদ্ভিদের ঘনত্ব মাপেন এবং কোথায় গাছপালা ভালো আছে আর কোথায় পানির অভাবের মতো কারণে চাপে আছে, তার মানচিত্র তৈরি করতে পারেন। এনডিভিআইয়ের খুব কম মান, ০.১ বা তার নিচে, নির্দেশ করে পাথর, বালু বা বরফে ঢাকা অনুর্বর এলাকা; ০.২ থেকে ০.৩ মাঝারি মান নির্দেশ করে ঝোপঝাড় ও তৃণভূমি; আর ০.৬ থেকে ০.৮ উচ্চ মান নির্দেশ করে নাতিশীতোষ্ণ ও ক্রান্তীয় বৃষ্টিবন।

সূচকভিত্তিক বিমার ভিত্তি হলো আবহাওয়ার তথ্য। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৮ সালের মে মাসে জানায়, বাংলাদেশে এডিবির সহায়তায় চলা পাইলট প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে মিলে গত ২৫ থেকে ৩০ বছরের আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহার করে একটি নতুন আবহাওয়া সূচক তৈরি করা হয় এবং বিভিন্ন উপজেলা পরিষদ ভবনের ছাদে প্রায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ যন্ত্র বসানো হয়। এডিবির ওই বিশেষজ্ঞ ২০১৯ সালে লেখেন, পাইলটের প্যারামেট্রিক আবহাওয়া সূচকে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জলবায়ু তথ্য ব্যবহার করে ক্ষতিপূরণের সীমা ঠিক করা হয়, দুর্যোগের পর সময়মতো দাবি নিষ্পত্তিতে স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র সহায়তা করে এবং মোবাইল আর্থিক সেবা বিকাশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় প্রিমিয়াম সংগ্রহ ও দাবির অর্থ পরিশোধ দক্ষ ও স্বচ্ছ হয়।

২০২৫ সালের আগে বাংলাদেশে শস্য বিমা
বাংলাদেশে শস্য বিমার ইতিহাস দীর্ঘ হলেও পরিসর সামান্য। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৯৭৩ সালের ১৪ মে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি) শস্য বিমা ও গবাদিপশু বিমার মতো কিছু অপ্রচলিত বিমা প্রকল্পও পরিচালনা করে, আর শস্য বিমা কেবল এসবিসির কাছেই পাওয়া যেত। বিশ্বব্যাংকের ডিজাস্টার রিস্ক ফাইন্যান্সিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স প্রোগ্রামের এক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বলা হয়, কয়েক দশক আগে এসবিসি ছোট পরিসরে শস্য, গবাদিপশু ও জলজ চাষের বিমা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছিল, কিন্তু বিমা ব্যবসার খারাপ ফলের (পুওর আন্ডাররাইটিং রেজাল্ট) কারণে সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। একই বিশ্লেষণে সিরাজগঞ্জ জেলার নির্বাচিত কয়েকটি গ্রামে অক্সফামের পুরোপুরি ভর্তুকিনির্ভর বন্যা-সূচক বিমার পাইলটের কথাও আছে, যা ২০১৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বড় বন্যার পর সাত শতাধিক পরিবারকে দাবির অর্থ দিয়েছিল।
সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত এডিবির সহায়তায় এসবিসির আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্য বিমা (ডব্লিউআইবিসিআই) প্রকল্প। এসবিসির ওয়েবসাইটে প্রকল্পের পাতায় (সর্বশেষ হালনাগাদ ২০১৭ সালের ৩ মে) এর লক্ষ্য বলা হয়েছে, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের মতো জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা ও চরম আবহাওয়ার মুখে কৃষিখাত, বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের ঝুঁকি কমাতে অভিযোজনের হাতিয়ার হিসেবে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্য বিমা তৈরি ও বাস্তবায়ন। পরিকল্পিত কাজের মধ্যে ছিল অন্তত তিন জেলায় কৃষকবান্ধব বিমাচুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ, সূচকভিত্তিক বিমার নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা, অন্তত ২০টি আবহাওয়া কেন্দ্রের উন্নয়ন, অন্তত ৬ হাজার কৃষকের মধ্যে বিমা ও জলবায়ু ঝুঁকি বিষয়ে সচেতনতা এবং বিমা কোম্পানি ও বিতরণ সহযোগীদের অন্তত ৩০০ কর্মীর প্রশিক্ষণ।
দ্য ডেইলি স্টার ২০১৮ সালের ১৩ মে জানায়, এডিবির ২০ লাখ মার্কিন ডলার অনুদানে ২০১৪ সালের মার্চে তিন জেলায় পাইলটটি শুরু হয়: খরাপ্রবণ রাজশাহী, বন্যাপ্রবণ সিরাজগঞ্জ ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ নোয়াখালী। এসবিসি আয়োজিত এক সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ৬ হাজার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১২ হাজার ক্ষুদ্র কৃষক বিমার আওতায় আসেন; এসবিসি প্রিমিয়াম হিসেবে ৫১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা সংগ্রহ করে, যার ২১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ছিল এডিবি ও সরকারের ভর্তুকি, আর ততদিনে ৫৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকার দাবি নিষ্পত্তি হয়। সেই সেমিনারে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেন, কৃষি বিমার বাজার অনুন্নত এবং একে পরিপক্ব করতে সরকারের একটি নীতি প্রণয়ন করা উচিত; তিনি কৃষিঋণের সঙ্গে বিমা যুক্ত করার সুপারিশ করেন। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিবেশী ভারতে শস্য বিমা জনপ্রিয়, কিন্তু বাংলাদেশে তা এখনো চালু হয়নি। ২০১৯ সালের নিবন্ধে এডিবির বিশেষজ্ঞ লেখেন, এসবিসির মাধ্যমে সাড়ে ৯ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র কৃষক বিমার আওতায় আসেন এবং প্রিমিয়াম কৃষক, সরকার ও প্রকল্প অর্থায়নকারীর মধ্যে ৫০:২৫:২৫ অনুপাতে ভাগ হয়; কৃষকেরা তাঁকে জানান, এই ভর্তুকি ছাড়া প্রিমিয়াম দেওয়া তাঁদের সাধ্যের বাইরে।
বেসরকারি বিমা কোম্পানি ও উন্নয়ন সহযোগীরাও আলাদা পাইলট চালিয়েছে। ঢাকা টাইমস ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর জানায়, সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ৬৭৫ জন কৃষককে আমন ধানের শস্য বিমাদাবি বাবদ ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা পরিশোধ করে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স; প্রকল্পটি ২০১৮ সাল থেকে সিনজেনটা ফাউন্ডেশন ফর সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার ও সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনের (এসডিসি) অর্থায়নে চলছিল। ২০২২ সালের অক্টোবরে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, ২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশ মাইক্রোইন্স্যুরেন্স মার্কেট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের অধীনে ব্র্যাক ও সিনজেনটা ফাউন্ডেশনের অংশীদারত্বে এবং এসডিসির সহযোগিতায় আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্য বিমার একটি পাইলট চলছে, যার আওতায় এসবিসি ও গ্রীন ডেল্টা কৃষকদের পলিসি দিচ্ছে। ২০২১ সালে স্কিম চালুর সময় ব্র্যাক ৯৬৬ জন কৃষককে পলিসি দিয়েছিল, ২০২২ সালে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৩ জনে, এবং বোরো ও আলুচাষিদের অনেক দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে। গ্রীন ডেল্টার এক কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে জানান, ২০১৫ সাল থেকে কোম্পানিটি ৬ লাখ কৃষককে সহায়তা করেছে এবং সে বছরই ১ লাখের বেশি কৃষকের প্রায় ৮ কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তি করেছে; তবে ক্ষয়ক্ষতির তথ্যের অভাবে ঘূর্ণিঝড়ে ফসলের ক্ষতির জন্য তাদের কোনো পলিসি নেই। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব পরীক্ষামূলক উদ্যোগের বাইরে কৃষকদের জন্য তখনো কোনো বিমা স্কিম চালু হয়নি।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরের জন্যও পরিকল্পনা ছিল। সমকাল ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল জানায়, সরকার হাওরবেষ্টিত সাত জেলা সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পরীক্ষামূলকভাবে শস্য বিমা চালু করতে যাচ্ছে। এসবিসির প্রকল্পের আওতায় কৃষকের কাছ থেকে নামমাত্র প্রিমিয়াম নেওয়া হবে, বাকি অর্থ দেবে সরকার, আর কৃষিঋণ দেওয়ার সময় ঋণের শর্ত হিসেবে বিমা করা হবে। এসবিসির প্রস্তাবে বলা হয়, এই সাত জেলায় মোট কৃষিজমি ১৯ লাখ ৩৭ হাজার হেক্টর, হাওরের সংখ্যা ৩৭৩ এবং মোট কৃষিজমির ৯০ ভাগে বোরো ধান চাষ হয়; ২০১৭ সালে অকাল বন্যায় হাওরে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়, যেমনটি হয়েছিল ২০০৪, ২০১০ ও ২০১৩ সালেও।
২০২৫ সালেও চলমান বিতর্ক
সমীরণ বিশ্বাস যখন লেখেন, তখনো বাংলাদেশে শস্য বিমা ব্যাপকভাবে চালু হওয়ার চেয়ে আলোচনার বিষয়ই বেশি ছিল। ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট নতুন কৃষি ও পল্লিঋণ নীতিমালা ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, কৃষি বিমা নিয়ে তিনি খুব একটা উৎসাহী নন, কারণ দেশের মূল বিমাই ঠিকমতো চলছে না। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি বলেন, কৃষি বিমা ঝুঁকিপূর্ণ, দেশের বিমা কোম্পানিগুলোর এটি পরিচালনার যোগ্যতা বা সক্ষমতা কখনো হবে বলে তাঁর মনে হয় না, এবং আগামী ১০ বছরের মধ্যে তিনি সে সম্ভাবনা দেখছেন না; তবে তারা পারলে তাকে স্বাগত জানানো হবে। তাঁর মতে, বিমা কোম্পানিগুলোর দক্ষতা, এ খাতের অনিশ্চয়তা এবং প্রিমিয়াম দেওয়ার সক্ষমতা বিবেচনায় এ পর্যায়ে কৃষি বিমা আর্থিকভাবে লাভজনক হবে না, তাই এটি নিয়ে ভাবা খুব একটা বাস্তবমুখী নয়, যদিও তিনি চান এটি হোক।
একই সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৩৯ হাজার কোটি টাকার কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে, যা আগের অর্থবছরের ৩৮ হাজার কোটি টাকার চেয়ে ২.৬৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও বিশেষায়িত ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের ২৫ হাজার ১২০ কোটি টাকা। এমন ঋণের সঙ্গে বিমা যুক্ত করার সুপারিশই এডিবি ২০১৮ ও ২০১৯ সালে করেছিল: সংস্থাটির বিশেষজ্ঞ লেখেন, কৃষিঋণ ও কৃষি উপকরণের সঙ্গে কৃষি বিমা যুক্ত করলে ফসলহানির সময় কৃষক সুরক্ষা পাবেন এবং পরের মৌসুমে ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা ফিরে পেতে সহায়তা হবে।
টেকসই কৃষির অংশ হিসেবে বিমা
সমীরণ বিশ্বাসের যুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শস্য বিমা কেবল ক্ষতিপূরণ নয়; এটি কৃষকের পুনর্বিনিয়োগের সক্ষমতা, ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একই সঙ্গে এটি কৃষকদের জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কৃষি উন্নয়নের পথ সুগম করে। তিনি লেখেন, এটি কৃষিকে শুধু নিরাপদই করে না, খাদ্য নিরাপত্তা, টেকসই উৎপাদন ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ধকল মোকাবিলায় কৃষকের জন্য নির্ভরযোগ্য আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে তুলতে শস্য বিমা ভবিষ্যৎ কৃষি ব্যবস্থার অন্যতম শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়ক, এবং এটি শুধু কৃষকের ফসল নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি অর্থনীতি ও সামগ্রিক উন্নয়ন সুরক্ষার একটি প্রমাণভিত্তিক সমাধান।
আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও বিমাকে একই হাতিয়ারের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। আইপিসিসির ২০২২ সালের সারসংক্ষেপে ঝুঁকি বণ্টন ও ভাগাভাগিকে এমন অভিযোজন উপায়ের তালিকায় রাখা হয়েছে, যা নানা খাতে প্রয়োগযোগ্য; সেখানে বলা হয়, দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা ও জলবায়ু সেবার মতো অন্য উপায়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে এগুলো বেশি সুফল দেয়। অভিযোজনের সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নের মাধ্যমের মধ্যে পারিবারিক সঞ্চয় ও বিমার নামও রয়েছে, এবং বলা হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মতো সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বেসরকারি অর্থায়ন টানা যায়।
এডিবির বিশেষজ্ঞের ২০১৯ সালের বিবরণে রাজশাহীর পাইলটে অংশ নেওয়া কৃষকদের নিজেদের মূল্যায়নও আছে: তাঁদের কাছে শস্য বিমা কোনো বোঝা নয়, অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে এটি সুফল দেয়; তবে বিমা কোম্পানিগুলোকে আরও দ্রুত দাবির টাকা দিতে হবে। তিনি লেখেন, ফসল ঋণ দেওয়া ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিমা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে ও কৃষকের দোরগোড়ায় তা পৌঁছে দিতে পারে, আর বীজ কোম্পানিসহ মূল্য শিকলের অন্যরাও অংশীদার হতে পারে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রিমিয়াম দেওয়া ও সঙ্গে সঙ্গে দাবির টাকা তোলার অভিজ্ঞতার পর কৃষকেরা আর্থিক প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী বলেও তিনি দেখতে পান।
ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, সাধারণ বীমা করপোরেশন, বাংলাপিডিয়া, বিশ্বব্যাংক, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি), ইউএনবি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, সমকাল, ঢাকা টাইমস, নাসা আর্থ অবজারভেটরি, জার্ক (জাপান ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ সেন্টার ফর এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস)




মন্তব্য
(০)