কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ১২টি পয়েন্ট থেকে ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল শনিবার পর্যন্ত মোট পাঁচ হাজার ৯৮টি সামুদ্রিক কাছিমের বাচ্চা বঙ্গোপসাগরে অবমুক্ত করা হয়। ওই দিন বিকেলে মৌসুমের সর্বশেষ দফায় ৫৫০টি কাছিমের বাচ্চা সাগরে ছাড়া হয়। সেদিন সন্ধ্যায় জাগো নিউজের টেকনাফ প্রতিনিধি এ খবর দেন। তথ্যগুলো দেয় পরিবেশবাদী সংস্থা নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (নেকম), যারা সৈকত থেকে কাছিমের ডিম সংগ্রহ করে সুরক্ষিত হ্যাচারিতে ফোটায় এবং বাচ্চাগুলো সাগরে ছেড়ে দেয়।
নেকমের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন ম্যানেজার আব্দুল কাইয়ুম জানান, ২০২৪-২৫ মৌসুমে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকার ১২টি পয়েন্ট থেকে ২৬ হাজার ৯০০টি ডিম সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্য থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৯৮টি বাচ্চা অবমুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, নেকম আগের চার বছরে ৪১ হাজার ৪৮০টি ডিম সংগ্রহ করেছিল, যার ৮৫ শতাংশ থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে সাগরে অবমুক্ত করা হয়। সেদিন মৌসুমের কতগুলো ডিম হ্যাচারিতে ফোটার অপেক্ষায় ছিল, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি।
২০২৪-২৫ মৌসুম যেভাবে এগিয়েছে
৫ এপ্রিলের অবমুক্তি ছিল কক্সবাজারের দক্ষিণ উপকূলে পুরো মৌসুম জুড়ে চলা কাজের শেষ ধাপ। এর এক সপ্তাহ আগে, ২০২৫ সালের ২৯ মার্চ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) জানায়, সেদিন দুপুর দেড়টার দিকে টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের মাঝেরপাড়া সৈকতে প্রায় ৩০০টি কাছিমের বাচ্চা ছাড়া হয়। বাচ্চাগুলো ফুটেছিল শাহপরীর দ্বীপের মাঝেরপাড়া সৈকতের কাছের একটি হ্যাচারিতে। নেকমের একই কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, শুধু মাঝেরপাড়া এলাকা থেকেই আট হাজার ৫০০টি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং সেদিনের আগেই কয়েক দফায় সেখান থেকে দুই হাজার বাচ্চা সাগরে ছাড়া হয়।
টিবিএসকে তিনি তখন জানান, টেকনাফসহ জেলার ১২টি স্থান থেকে সে বছর ২৫ হাজার ৭০০টি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সংগৃহীত ডিমের প্রায় ৮৫ শতাংশ থেকে সফলভাবে বাচ্চা ফুটেছে। ৫ এপ্রিল জাগো নিউজকে দেওয়া হিসাবে মৌসুমের ডিমের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ হাজার ৯০০টিতে। টিবিএস আরও জানায়, নেকম বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে ২০ বছর ধরে কাছিম সংরক্ষণের কাজ করছে। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, সামুদ্রিক কাছিম এখন মাত্র ৩৪টি স্থানে ডিম পাড়তে আসে, যেখানে এক দশক আগে এমন স্থান ছিল ৫২টি।
একই সময়ে অন্য সংগঠনগুলোও কাছিমের বাচ্চা অবমুক্ত করছিল। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম টেকনাফ উপজেলারই সেন্ট মার্টিন দ্বীপ থেকে জানায়, দ্বীপের একটি হ্যাচারিতে জন্ম নেওয়া অলিভ রিডলি প্রজাতির ৫৪৪টি কাছিমের বাচ্চা দ্বীপের উত্তর সৈকত থেকে বঙ্গোপসাগরে ছাড়া হয়েছে। এতে কয়েক দফায় সেখানে অবমুক্ত বাচ্চার সংখ্যা দাঁড়ায় এক হাজার ২৪৬টিতে। ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩ মার্চ পর্যন্ত দুজন ডিম সংগ্রহকারী দ্বীপে ২৬টি মা কাছিমের পাড়া তিন হাজার ১৮৪টি ডিম সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন। এই কাজ পরিচালনা করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আমার সেন্ট মার্টিন’, সহায়তা দেয় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ইউএনডিপির এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তারা দুই বছর ধরে এ কার্যক্রম চালাচ্ছিল।
কাছিমের হ্যাচারি যেভাবে কাজ করে
সামুদ্রিক কাছিম সাধারণত রাতে জোয়ারের সর্বোচ্চ সীমার ওপরে বালুতে গর্ত খুঁড়ে ডিম পাড়ে, তারপর ডিম পাহারা না দিয়েই সাগরে ফিরে যায়। কক্সবাজার উপকূলে ডিম পাড়ার মৌসুমে সংরক্ষণকর্মীরা সৈকত পাহারা দেন, ডিম পাড়ার পরপরই প্রতিটি বাসার ডিম তুলে বেড়া দেওয়া হ্যাচারির বালুতে আবার পুঁতে রাখেন, যেখানে কুকুর, শিয়াল, মানুষ বা জোয়ারের পানি পৌঁছাতে পারে না। বাচ্চা বের হলে সেগুলোকে পানির কিনারায় নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, আর তারা হেঁটে সাগরে নেমে যায়।
২০২৩ সালের ৫ জানুয়ারি ডেইলি স্টার বাংলা এই কাজের বিবরণ দেয়। সে মৌসুমে কক্সবাজার সৈকতের পেঁচার দ্বীপ এলাকায় একটি কাছিম ১২৫টি ডিম পাড়ে, যা ছিল সেখানে ওই মৌসুমের প্রথম ডিম পাড়া। কাছিমটি সাগরে ফিরে যাওয়ার পর নেকমের কর্মীরা ডিমগুলো সংগ্রহ করেন। নেকমের মো. আব্দুল কাইয়ুম জানান, ডিমগুলো হ্যাচারিতে প্রায় আড়াই মাস নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হবে, তারপর বাচ্চা ফুটবে। সংস্থাটির ড. শফিকুর রহমান বলেন, প্রজনন মৌসুম শুরু হলে প্রতি বছর অক্টোবর থেকে সামুদ্রিক কাছিম উপকূলে আসতে শুরু করে এবং এপ্রিল পর্যন্ত ডিম পাড়ে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে টিবিএস নেকমের ইকোলাইফ প্রকল্পের আব্দুল লতিফকে উদ্ধৃত করে জানায়, বালু থেকে বাচ্চা বের হতে প্রায় ৬৫ দিন লাগে।
এই কাজের সবচেয়ে বিস্তারিত প্রকাশ্য চিত্র পাওয়া যায় ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর জার্নাল অব থ্রেটেনড ট্যাক্সায় প্রকাশিত একটি পিয়ার-রিভিউড গবেষণায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞানী এম. ফরিদ আহসান এবং কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের (কোডেক) দুই সহকর্মী ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সোনাদিয়া দ্বীপ থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পর্যন্ত সৈকতে জরিপ চালান। তাঁরা উপকূলের এই অংশে ২২টি সক্রিয় হ্যাচারি পান: মেরিন লাইফ অ্যালায়েন্সের ১১টি, নেকমের আটটি, কোডেকের দুটি এবং নাম না জানা একটি পরিচালনাকারীর একটি। ২০২১-২২ মৌসুমে শুধু অলিভ রিডলি কাছিমই ডিম পেড়েছিল।
কোডেকের হ্যাচারিগুলোতে গবেষকেরা ২৬টি বাসা নথিভুক্ত করেন, দুই হাজার ৯৪৩টি ডিম সংগ্রহ করেন এবং এক হাজার ৬১২টি সুস্থ বাচ্চা বঙ্গোপসাগরে ছাড়েন। প্রতিটি বাসায় ২১ থেকে ১৬৫টি ডিম ছিল, গড়ে ১০৩টি। ডিম ফুটতে সময় লেগেছে ৪৫ থেকে ৭৫ দিন, গড়ে ৫৩ দিন। মার্চ থেকে মে মাসে বাতাসের তাপমাত্রা বেশি থাকায় ডিম দ্রুত ফুটেছে। লেখকেরা লিখেছেন, সংগঠনগুলো মূলত ডিম সংগ্রহ ও বাচ্চা অবমুক্ত করে, পাশাপাশি পুস্তিকা ও পোস্টার প্রকাশ করে এবং স্থানীয় মানুষের জন্য সেমিনার, র্যালি ও কর্মশালার আয়োজন করে। তাঁদের মতে, এসব প্রচেষ্টা আরও সমন্বিত হলে বেশি কার্যকর হতো।
অলিভ রিডলি ও বাংলাদেশের অন্যান্য সামুদ্রিক কাছিম
বিশ্বের সাগরে সাত প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিম আছে। মোঙ্গাবে ২০২৪ সালের এপ্রিলে জানায়, এর পাঁচটি বাংলাদেশের জলসীমায় পাওয়া যায়: অলিভ রিডলি, সবুজ কাছিম (গ্রিন টার্টল), হকসবিল, লগারহেড ও লেদারব্যাক। এর মধ্যে শুধু অলিভ রিডলি, সবুজ কাছিম ও হকসবিল দেশের উপকূলে ডিম পাড়ে, আর সবুজ কাছিম ও হকসবিল বিরল। জার্নাল অব থ্রেটেনড ট্যাক্সার গবেষণাতেও অলিভ রিডলিকে একমাত্র সাধারণ ডিম পাড়া প্রজাতি বলা হয়েছে। ২০২৫ সালের ৪ মার্চ প্রথম আলো জানায়, ১০-১২ বছর আগে কক্সবাজার উপকূলে দলবেঁধে হকসবিল ও সবুজ কাছিম ডিম পাড়তে আসত, কিন্তু কয়েক বছর ধরে তারা আর সেখানে ডিম পাড়েনি।
অলিভ রিডলির (Lepidochelys olivacea) নাম এসেছে এর হৃৎপিণ্ড আকৃতির খোলসের জলপাই-সবুজ রং থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নোয়া) তথ্যমতে, এটি সবচেয়ে ছোট সামুদ্রিক কাছিমগুলোর একটি: পূর্ণবয়স্ক কাছিম দুই থেকে আড়াই ফুট লম্বা এবং ওজনে ১০০ পাউন্ড পর্যন্ত হয়। এটি মূলত প্রশান্ত, ভারত ও আটলান্টিক মহাসাগরের উষ্ণমণ্ডলীয় পানিতে, বেশির ভাগ সময় খোলা সাগরে থাকে এবং শৈবাল, কাঁকড়া-চিংড়িজাতীয় প্রাণী, টিউনিকেট ও শামুক-ঝিনুকজাতীয় প্রাণী খায়। প্রায় ১৪ বছর বয়সে এটি প্রজননক্ষম হয়।
নোয়া জানায়, স্ত্রী অলিভ রিডলি প্রতি বছর ডিম পাড়ে, এক মৌসুমে এক থেকে তিনবার, প্রতিবার প্রায় ১০০টি ডিম। কেউ একা ডিম পাড়ে, কেউ ‘আরিবাদা’য় অংশ নেয়, যেখানে শত শত থেকে হাজার হাজার স্ত্রী কাছিম একসঙ্গে তীরে উঠে ডিম পাড়ে। বিশ্বের অন্যতম বড় আরিবাদা হয় একই বঙ্গোপসাগরের তীরে, পূর্ব ভারতের ওডিশার গহিরমাথা উপকূলে। অন্য সামুদ্রিক কাছিমের মতো এর বাচ্চা স্ত্রী না পুরুষ হবে, তা নির্ভর করে ডিম ফোটার সময় বালুর তাপমাত্রার ওপর: উষ্ণ বাসায় বেশির ভাগ স্ত্রী এবং তুলনামূলক ঠান্ডা বাসায় বেশির ভাগ পুরুষ বাচ্চা হয়। সদ্য ফোটা বাচ্চা পানির ওপরের উজ্জ্বল দিগন্তের দিকে এগিয়ে সাগর খুঁজে নেয়। এ কারণে সৈকতে কৃত্রিম আলো থাকলে তারা ডাঙার দিকে চলে যায়, যেখানে অনেকে পানিশূন্যতা বা ক্লান্তিতে মারা যায় কিংবা চাপা পড়ে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের লাল তালিকায় ২০০৮ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী অলিভ রিডলি ‘সংকটাপন্ন’ (Vulnerable) প্রজাতি। নোয়ার হিসাবে গত শতাব্দীতে এর বৈশ্বিক সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৬ শতাংশ কমেছে। বিপন্ন বন্যপ্রাণীর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কনভেনশন সাইটেসের পরিশিষ্ট ১-এ প্রজাতিটি তালিকাভুক্ত, ফলে এর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেনাবেচা নিষিদ্ধ। মোঙ্গাবের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে একে বিপন্ন বলা হয়েছে। সেন্ট মার্টিনের আশপাশে নথিভুক্ত আরেক প্রজাতি সবুজ কাছিম একমাত্র সামুদ্রিক কাছিম, যা মূলত সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালের মতো উদ্ভিদ খায়। নোয়া জানায়, এর স্ত্রী কাছিম প্রতি বাসায় প্রায় ১১০টি ডিম পাড়ে এবং ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সে প্রজননক্ষম হয়।

কক্সবাজারে আগের মৌসুমগুলো
২০২৫ সালের সংখ্যাগুলো এসেছে একই উপকূল থেকে কয়েক বছরের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পর। ২০২৪ সালের এপ্রিলে মোঙ্গাবে জানায়, সে মৌসুমে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত নেকম পাঁচটি হ্যাচারিতে অলিভ রিডলির ১২ হাজার ৪২৫টি ডিম পেয়েছে, যা আগের মৌসুমের আট হাজার ৯৬টির চেয়ে প্রায় ৫৩ শতাংশ বেশি এবং চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। হ্যাচারিগুলো ছিল কক্সবাজার জেলার পেঁচার দ্বীপ, শিলখালী, শাহপরীর দ্বীপ, মাদারবুনিয়া ও সোনাদিয়া দ্বীপে। নেকমের নির্বাহী পরিচালক মনজুরুল হান্নান খান মোঙ্গাবেকে বলেন, কয়েকটি সংগঠন স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে হ্যাচারিগুলোর দেখভাল করে, আর স্থানীয় মানুষ ও জেলেদের সচেতনতাই মূল বিষয়।
একই প্রতিবেদনে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সারওয়ার আলম জানান, কক্সবাজারে সরকারের পাঁচটি প্রজনন কেন্দ্র আছে, যেখানে সৈকতের বালুতে বাসার মতো জায়গা তৈরি করে কৃত্রিমভাবে ডিম ফোটানো হয়। তিনি বলেন, প্রজনন এলাকায় মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে এবং কুকুর ও শিয়ালের হাত থেকে ডিম রক্ষায় সবার সহযোগিতা দরকার। বাংলাদেশ মেরিন লাইফ অ্যালায়েন্সের সাবেক কর্মসূচি কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল মোঙ্গাবেকে বলেন, প্রজনন মৌসুমে সেন্ট মার্টিন সৈকতের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বড় জাল দিয়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ, কিন্তু জেলেরা প্রায়ই এ নিয়ম মানেন না।
২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল টিবিএস জানায়, সেদিন কক্সবাজারের তিন জায়গায় ৭৫০টি কাছিমের বাচ্চা ছাড়া হয়: রামুর পেঁচার দ্বীপে ৩৫০টি, মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপে ২৫০টি এবং টেকনাফের মাদারবুনিয়ায় ১৫০টি। কর্মকর্তারা তখন জানান, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত উপকূলে প্রায় ৩০ হাজার ডিম নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং এর আগেই পাঁচ হাজার বাচ্চা সাগরে ফিরে গেছে। নেকমের ইকোলাইফ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক ড. শফিকুর রহমান টিবিএসকে বলেন, আগের তিন বছরে ২৯ হাজার ৪৫০টি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এর ৮৫ শতাংশ থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে অবমুক্ত করা হয়েছে। টিবিএসের তথ্যমতে, ইকোলাইফ প্রকল্পের অর্থায়ন করে ইউএসএআইডি ও সামিট, আর এটি পরিচালিত হয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায়।
সৈকতে ভেসে আসা মৃত মা কাছিম
২০২৪-২৫ মৌসুমে অস্বাভাবিক সংখ্যায় মৃত কাছিম সৈকতে ভেসে আসে। ২০২৫ সালের ৪ মার্চ প্রথম আলো জানায়, কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মার হিসাবে প্রায় আড়াই মাসে উপকূলের ৫০টির বেশি স্থানে ২৪০টির বেশি মা কাছিম ভেসে এসেছে, এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৩৫টি ও ফেব্রুয়ারিতে ৮৭টি। সবগুলোই অলিভ রিডলি, আর প্রায় ৯০ শতাংশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং পেটে ডিম ছিল। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নেকমের নিজস্ব হিসাবে এ সংখ্যা ছিল ১৩০টির বেশি। বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানান, শুধু ২৪ ও ২৫ জানুয়ারিতেই ৬৮টি মৃত কাছিম তীরে এসেছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয় পত্রিকাটিকে জানায়, তাদের নিজস্ব কোনো হিসাব নেই।
প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিরা কয়েকটি কারণের কথা বলেন। নেকমের আব্দুল কাইয়ুম বলেন, সাগরজুড়ে নিষিদ্ধ জাল পাতা হচ্ছে এবং সেসব জালে আটকে অনেক মা কাছিম মারা যাচ্ছে; পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালকও বলেন, নিষিদ্ধ জালে অনেক কাছিম মারা যায়। পত্রিকাটি জানায়, উপকূলে ৬৫ হাজারের বেশি ট্রলার মাছ ধরে, যার বেশির ভাগই গিলনেট বা ফাঁসজাল ব্যবহার করে। ট্রলারের পাখার আঘাত, সৈকতের আলো, সাগরে ফেলে দেওয়া জাল, ডিম পাড়ার মৌসুমে সৈকতে মানুষের ভিড় এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে ডিম পাড়ার জায়গা কমে যাওয়াকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, জেলেদের আটকে পড়া কাছিম অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে এবং কারণগুলো তদন্ত হওয়া দরকার। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসব মৃত্যুর কারণ যথাযথভাবে গবেষণা করা হয়নি।
এমন মৃত্যু নতুন নয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে টিবিএস জানায়, আগের তিন মাসে কক্সবাজার সৈকতে ১০৩টি মা কাছিমের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। প্রধান হুমকি হিসেবে পত্রিকাটি ট্রলার ও মাছ ধরার জালের কথা বলে, যেখানে ডিম পাড়তে আসার পথে মা কাছিম আটকা পড়ে, সঙ্গে কুকুর, আবাসস্থল হারানো এবং পর্যটন উন্নয়নের কারণে বাড়তে থাকা আলোর কথাও উল্লেখ করে।
টেকনাফ, উখিয়া ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ
২০২৫ সালের অবমুক্তির সৈকতগুলো বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফ উপজেলার আয়তন ৩৮৮.৬৬ বর্গকিলোমিটার, এটি দেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, কক্সবাজার শহর থেকে ৮৬ কিলোমিটার দক্ষিণে। এর উত্তরে উখিয়া, দক্ষিণ ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর এবং পূর্বে নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্য। এর ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে আছে সাবরাং, বাহারছড়া ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। উত্তরের উখিয়া উপজেলার আয়তন ২৬১.৮০ বর্গকিলোমিটার, এর পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর; উখিয়ার ইনানী সৈকত প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ।
কক্সবাজার-টেকনাফ উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরের সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে বাংলাপিডিয়া দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ বলে উল্লেখ করেছে। এই উপকূলে কাছিমের ডিম পাড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি এই দ্বীপ। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সরকার দ্বীপের চারপাশের এক হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকাকে, যা বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় দেড় শতাংশ, ‘সেন্ট মার্টিন মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া’ বা সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে। এ কাজে সহায়তাকারী ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি (ডব্লিউসিএস) ২০২২ সালের ১১ জানুয়ারির ঘোষণায় জানায়, এলাকাটি অলিভ রিডলি, সবুজ কাছিম ও লগারহেডসহ হুমকির মুখে থাকা প্রজাতিগুলোকে সুরক্ষা দেয়। দ্বীপের হুমকিগুলোর মধ্যে আলোক দূষণের কথাও সংস্থাটি উল্লেখ করে।
প্রথম আলো জানায়, ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দ্বীপে পর্যটন সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়: নভেম্বরে পর্যটকেরা দিনে গিয়ে ফিরে আসবেন, রাতে থাকতে পারবেন না; ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে দিনে সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক যেতে ও রাতে থাকতে পারবেন; আর ফেব্রুয়ারিতে পর্যটন বন্ধ থাকবে। দ্বীপে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকও নিষিদ্ধ করা হয়। সরকার দ্বীপের পরিবেশ ও প্রবাল রক্ষার কথা উল্লেখ করে।

২০২৫ সালে আইন যা বলত
২০২৫ সালের এপ্রিলে যখন বাচ্চাগুলো অবমুক্ত করা হয়, তখন বাংলাদেশে সামুদ্রিক কাছিম রক্ষার আইন ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ (২০১২ সনের ৩০ নং আইন)। এই আইনে ‘শিকার’-এর সংজ্ঞা ব্যাপক: কোনো বন্যপ্রাণীকে হত্যা করা, ধরা, বিষ প্রয়োগ করা, আহত বা ক্ষতি করা, কোনো বন্যপ্রাণীর কোনো অংশ নেওয়া এবং বন্য পাখি বা সরীসৃপের বাসা বা ডিম সংগ্রহ বা ধ্বংস করা, সবই শিকারের মধ্যে পড়ে। আইনের ৬(১) ধারা অনুযায়ী, এই আইনের অধীন লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারবেন না।
২০১২ সালের আইনের ৩৯ ধারা অনুযায়ী, ৬ ধারা লঙ্ঘনের শাস্তি ছিল সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড, আর একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। আইনটি কর্তৃপক্ষকে সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করে অভয়ারণ্যে মাছ ধরা বা জলযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে কাছিম, কুমির, ডলফিন, তিমি ও শুশুকের মতো মিঠা ও নোনা পানির জলজ প্রাণী রক্ষার ক্ষমতাও দিয়েছিল।
- ২০১২ সালের আইনে সরীসৃপের বাসা বা ডিম সংগ্রহ বা ধ্বংস করাও শিকার, যার মধ্যে সৈকতে কাছিমের বাসাও পড়ে।
- ৬(১) ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া কোনো বন্যপ্রাণী শিকার নিষিদ্ধ ছিল।
- ৩৯ ধারায় শাস্তি ছিল সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড; পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ দুই বছর বা এক লাখ টাকা বা উভয় দণ্ড।
মোঙ্গাবে ২০২৪ সালে জানায়, কক্সবাজার উপকূলের স্থানীয় মানুষকে জানানো হচ্ছিল যে বন্যপ্রাণী আইনে কাছিম হত্যা অবৈধ, আর জালে আটকে পড়া কাছিম ছেড়ে না দিলে জেলেদের জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়তে হতে পারে। একই প্রতিবেদনে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০১৬ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের কথাও বলা হয়, যার লক্ষ্যের মধ্যে ছিল দ্বীপের সামুদ্রিক কাছিম রক্ষা।
কাছিমের বাচ্চাগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ
সাগরে কাছিমের ভূমিকা নিয়ে উপকূলের সংরক্ষণকর্মীরা একই ধরনের কথা বলেছেন। ২০২৫ সালের মার্চে টিবিএস জানায়, কাছিম জেলিফিশ খায়, যা মাছের পোনা খেয়ে ফেলে, আর সাগর থেকে আবর্জনা ও আগাছা পরিষ্কারে সাহায্য করে; এভাবে সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নেকমের মনজুরুল হান্নান খানও ২০২৪ সালে মোঙ্গাবেকে একই কথা বলেন: পানির নিচের আবর্জনা খেয়ে কাছিম মাছের প্রজননে সাহায্য করে।
অলিভ রিডলির ক্ষেত্রে প্রতিটি বেঁচে থাকা বাচ্চাই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্ত্রী কাছিম প্রজননক্ষম হতে প্রায় ১৪ বছর লাগে এবং তারপর তারা যে সৈকতে জন্মেছিল, সেখানেই ডিম পাড়তে ফিরে আসে। টিবিএসে উদ্ধৃত নেকমের জরিপ, যেখানে এক দশক আগের ৫২টির জায়গায় ডিম পাড়ার স্থান নেমে এসেছে ৩৪টিতে, এবং ২০২৫ সালের শুরুতে তীরে গোনা শত শত মৃত মা কাছিম হ্যাচারির সংখ্যাগুলোর প্রেক্ষাপট তৈরি করে। ৫ এপ্রিলের মধ্যে অবমুক্ত পাঁচ হাজার ৯৮টি বাচ্চা এসেছে এমন ডিম থেকে, যেগুলো দিন দিন ব্যস্ত ও আলোকিত হয়ে ওঠা উপকূলে যেখানে পাড়া হয়েছিল সেখানেই থাকলে কুকুর, শিয়াল, মানুষ আর জোয়ারের মুখে পড়ত।

ছবি: Sundar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার বাংলা, মোঙ্গাবে, জার্নাল অব থ্রেটেনড ট্যাক্সা, নোয়া ফিশারিজ, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি, প্রথম আলো ইংরেজি, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ (বাংলাদেশের আইন)





মন্তব্য
(০)