চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও খামারিদের দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে বীজ, সার, গবাদিপশুর টিকাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। ২০২৬ সালের ১৮ জুলাই, শনিবার, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। জাগো নিউজের চট্টগ্রাম প্রতিবেদক সভার খবরটি প্রকাশ করেন।
বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতি
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ১৭ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে সরকারি প্রাথমিক হিসাব তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, টানা আট দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে মোট ২৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিভাগের ৪৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েন ২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৩৫ জন কৃষক।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যে, ৩১৮টি ইউনিয়নের ২৩ হাজার ৬১০টি পুকুর ও জলাশয় এবং ৭৮৯টি চিংড়ি ঘের তলিয়ে যায়; মৎস্য খাতে ক্ষতি ২১০ কোটি ১০ লাখ টাকা। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির ৪৫টি উপজেলায় প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতি ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। বন্যায় মারা যায় ৭১টি গরু, ১৬৫টি ছাগল, ৫০টি ভেড়া, ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০টি মুরগি ও ২ হাজার ৫০৮টি হাঁস। তলিয়ে যায় চারণভূমি, নষ্ট হয় খড়, ঘাস ও পশুখাদ্য।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১১ জুলাইয়ের টানা বর্ষণে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, ফলের বাগান, মরিচখেত ও পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বণিক বার্তার ১৭ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে ডিএই চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে কৃষিতে প্রায় ৩০৯ কোটি টাকার ক্ষতির কথা জানান।

বীজ, চারা ও গোখাদ্য সহায়তা
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস জানায়, সভার আগের দিন ১৭ জুলাই মন্ত্রী চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারীতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ধানবীজ, মৎস্যচাষিদের মধ্যে পুকুর পুনর্বাসনের উপকরণ ও খামারিদের মধ্যে গোখাদ্য বিতরণ করেন এবং গবাদিপশুর এফএমডি ও পিপিআর টিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। সেখানে তিনি বলেন, বন্যাকবলিত পাঁচ জেলার কৃষকদের বিনামূল্যে ধানবীজ ও চারা দেওয়া হবে। যাদের জমি তখনো পানির নিচে, তাদের জন্য কৃষকের জমি ভাড়া নিয়ে বিকল্প বীজতলা তৈরি করা হয়েছে, যার চারা ১৫ থেকে ২০ দিন পর বিতরণ করা হবে। গোখাদ্যের সংকট মোকাবিলায় প্রথম ধাপে ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দের কথাও তিনি জানান।

১৫ দিনে সব গবাদিপশুকে ক্ষুরা রোগের টিকা
সার্কিট হাউজের সভায় মন্ত্রী বলেন, বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারের পক্ষে একবারে সব ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত পুনর্বাসনে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকার শতভাগ গবাদিপশুকে ক্ষুরা রোগ (এফএমডি) প্রতিরোধী টিকার আওতায় আনা হবে। ছয় মাস আগে যেসব পশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সেগুলোকেও আবার টিকা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর ভাষায়, একটি গবাদিপশু মারা গেলে একজন খামারি আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, সে কথা মাথায় রেখেই টিকা কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউওএএইচ) তথ্যে, ক্ষুরা রোগ গরু, শূকর, ভেড়া, ছাগলসহ দুই খুরবিশিষ্ট প্রাণীর মারাত্মক ও অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত পশুর নিঃসরণ, নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া কণা এবং দূষিত খাদ্য, পানি, সরঞ্জাম ও যানবাহনের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায়। প্রাপ্তবয়স্ক পশুর মৃত্যুহার সাধারণত ১ থেকে ৫ শতাংশ হলেও বাছুরের মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি, আর আক্রান্ত পশুর উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। রোগটি সহজে মানুষে ছড়ায় না।

সহায়তা বিতরণে অনিয়মে কঠোর অবস্থানের কথা
মন্ত্রী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, সরকারি সহায়তা যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং কেউ বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, বীজ ও টিকা বিতরণে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি সহ্য করা হবে না, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান 'জিরো টলারেন্স'; অনিয়ম বা অবহেলার অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সহায়তা বিতরণে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ও বরদাশত করা হবে না বলে তিনি জানান।
সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. খোরশেদ আলম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন, বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আতিয়ার রহমান, ডিএই চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ বিভাগ ও জেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ছবি: Department of Foreign Affairs and Trade / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বণিক বার্তা, বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ)





মন্তব্য
(০)