টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ২০২৬ সালের ১১ জুলাই, শনিবার, দেশের চারটি নদীর ছয়টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছিল। নদী চারটি হলো সাঙ্গু, কুশিয়ারা, মনু ও খোয়াই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সেদিন সকাল ৯টার তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি সতর্কসীমায় থাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
কোন নদী কোথায় বিপৎসীমার ওপরে
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজ্ঞপ্তিতে পয়েন্টভিত্তিক যে হিসাব দেওয়া হয়, তা এমন:
- সাঙ্গু: বান্দরবান পয়েন্টে বিপৎসীমার ১০৭ সেন্টিমিটার এবং দোহাজারী (চট্টগ্রাম) পয়েন্টে ১৯ সেন্টিমিটার ওপরে
- কুশিয়ারা: সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে ১৭ সেন্টিমিটার এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ২১ সেন্টিমিটার ওপরে
- মনু: মৌলভীবাজার পয়েন্টে ৩৮ সেন্টিমিটার ওপরে
- খোয়াই: হবিগঞ্জের বল্লা পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার ওপরে
কেন্দ্রের হিসাবে দেশের ১২৭টি পানি পরিমাপ স্টেশনের মধ্যে ৫৭টিতে পানি বাড়ছিল, ৬৪টিতে কমছিল এবং ছয়টিতে অপরিবর্তিত ছিল। তিস্তা, কুশিয়ারা, সুরমা, সোমেশ্বরী, মুহুরী ও মাতামুহুরী নদীর কয়েকটি স্টেশনে পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছিল।
আগের দিন, ১০ জুলাই শুক্রবার সকাল ৯টার হিসাবে পাঁচটি নদীর নয়টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপরে ছিল বলে জানিয়েছিল বাসস ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর। সেদিন সাঙ্গু বান্দরবান পয়েন্টে ছিল বিপৎসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ওপরে, খোয়াই বল্লায় ৬০ সেন্টিমিটার ওপরে, আর মাতামুহুরী বান্দরবানের লামায় ৪৭ ও কক্সবাজারের চিরিঙ্গায় ৩২ সেন্টিমিটার ওপরে। ১১ জুলাইয়ের তালিকায় মাতামুহুরী আর বিপৎসীমার ওপরে ছিল না, যদিও এর কয়েকটি স্টেশন তখনও সতর্কসীমায় ছিল।

সাত জেলায় বন্যা, পূর্বাভাসে নতুন এলাকা
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান সেদিন জানান, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান, এই সাত জেলায় বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। তাঁর ভাষ্যে, আগের দুই দিনের তুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও সিলেটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টি তুলনামূলক কম হয়েছিল, যা ইতিবাচক লক্ষণ। তবে পরের ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা থাকায় সেখানে বড় উন্নতির সম্ভাবনা কম বলে তিনি জানান। ভারী বৃষ্টি কমলে ১৩ জুলাই সোমবার থেকে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। দেশের দুই প্রধান নদী গঙ্গা ও যমুনার পানি তখনও বিপৎসীমার নিচে ছিল।
ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রের পূর্বাভাস ছিল পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের পানি বেড়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা ছাড়াতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীর কিছু স্থানেও একই আশঙ্কার কথা বলা হয়; লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে বলে জানানো হয়। তবে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার শঙ্কা নেই বলে জানায় কেন্দ্রটি।

চার নদীর পরিচয়
সাঙ্গুর উৎস মিয়ানমারের আরাকান পাহাড়ে। নদীটি বান্দরবানের থানচি উপজেলার রেমাক্রির কাছে বাংলাদেশে ঢুকে থানচি, রোয়াংছড়ি ও বান্দরবান সদর হয়ে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এর মোট দৈর্ঘ্য ২৭০ কিলোমিটার, যার ১৭৩ কিলোমিটার বাংলাদেশে।
কুশিয়ারা আন্তঃসীমান্ত নদী। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ভারতের বরাক নদী সিলেটের জকিগঞ্জের অমলশীদে দুই ভাগ হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে বয়ে যায়; কুশিয়ারা ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, নবীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা পেরিয়ে মারকুলিতে আবার সুরমার সঙ্গে মেলে। মনু নদী ভারতের ত্রিপুরা থেকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে মনুমুখে কুশিয়ারায় মিশেছে। খোয়াইয়ের উৎস ত্রিপুরার আঠারমুড়া পাহাড়; নদীটি হবিগঞ্জের বল্লা দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে এবং হবিগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে গিয়ে লাখাইয়ে কুশিয়ারায় মেলে। এর দৈর্ঘ্য ১৬৬ কিলোমিটার।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়; এটি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এবং এর প্রধান কার্যালয় ঢাকায়।


ছবি: Aditya Kabir / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১১ জুলাই ২০২৬), ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন (১১ জুলাই ২০২৬), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা (১১ জুলাই ২০২৬), বাসস (১০ জুলাই ২০২৬), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর (১০ জুলাই ২০২৬), দৈনিক ইনকিলাব (১০ জুলাই ২০২৬), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)