বরগুনা সদর উপজেলার বাসিন্দা আরিফুর রহমান একসময় ক্যামেরা হাতে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরতেন ফটো-সাংবাদিক হিসেবে। চল্লিশ পেরোনো এই মানুষটি পরে পেশা ছেড়ে বেছে নেন প্রকৃতির কাছে থাকার জীবন: সমুদ্রসৈকতে প্লাস্টিক ও আবর্জনা কুড়ানো আর মানুষকে পরিবেশ নিয়ে সচেতন করা। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ১৮ মার্চ তার এই পথচলার গল্প প্রকাশ করে।
কর্মজীবনের শুরুতে আরিফুর রহমান দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফটো-সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। পেশার কাজে ঘুরতে ঘুরতে তিনি উপলব্ধি করেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য যেমন অপার, মানুষের অবহেলায় তা তেমনি দ্রুত নষ্টও হচ্ছে।
সাংবাদিকতা ছেড়ে প্রকৃতির কাছে
দীর্ঘদিনের পেশা ছাড়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাংবাদিকতা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, দেশের নানা প্রান্ত দেখার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু একটা সময় মনে হলো, আমি শুধু দেখছি আর ছবি তুলছি, অথচ প্রকৃতির জন্য কিছুই করছি না। তখন মনে হলো, প্রকৃতির কাছেই থাকা দরকার।’
এরপর থেকে তিনি নিজেকে পরিচয় দেন একজন ‘পর্যটক’ হিসেবে। তার ভ্রমণপথ নির্দিষ্ট নয়: কখনো প্রত্যন্ত গ্রামে, কখনো সৈকতের নির্জন অংশে যান। পথে তিনি খেয়াল রাখেন প্রকৃতি কোথায় কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, স্থানীয় মানুষ ও শিশু-কিশোরদের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা নিয়ে কথা বলেন। তার ভাষায়, ‘প্রকৃতি আমাকে তৃপ্তি দেয়। সেই তৃপ্তির বদলে আমি যদি সামান্য কিছু করতে পারি, এটাই আমার আনন্দ।’
আরিফুর রহমানের জেলা বরগুনা বরিশাল বিভাগের একটি উপকূলীয় জেলা; এর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। জেলার আয়তন ১,৯৩৯.৩৯ বর্গকিলোমিটার, আর ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখ ১০ হাজার ৫৩১।

কুয়াকাটা সৈকতে ব্যাগ হাতে
সমুদ্রসৈকত আরিফুর রহমানের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা, কিন্তু সেখানে প্লাস্টিক ও নানা আবর্জনার স্তূপ দেখে তিনি কষ্ট পান। তাই সৈকতে হাঁটার সময় একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে বালুতে পড়ে থাকা প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য আবর্জনা কুড়িয়ে নেন। বিশেষ করে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে তাকে প্রায়ই এ কাজে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে দোষ দিতে চাই না। কিন্তু আমরা যদি নিজেরাই যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলি, তাহলে প্রকৃতি কীভাবে সুন্দর থাকবে?’
কুয়াকাটা পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার একটি পর্যটন শহর। এখানকার সৈকত প্রায় ১৮ কিলোমিটার লম্বা, আর এখান থেকে বঙ্গোপসাগরে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়।
সৈকতটির প্লাস্টিক সমস্যা নতুন নয়। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৩ সালের ৫ জুন জানায়, স্বেচ্ছাসেবী তরুণ সংগঠন ব্লু-গার্ডের ২০২২ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, কুয়াকাটা সৈকতে প্রতিদিন প্রায় ২৩ কেজি (২২.৭৭ কেজি) অপচনশীল বর্জ্য জমে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ কয়েকটি সংগঠনের আবেদনের পর হাইকোর্ট দেশজুড়ে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও উপকূলীয় এলাকায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য নিষিদ্ধ করেন, তবে সেই নিষেধাজ্ঞার কার্যকর প্রয়োগ তখনো চ্যালেঞ্জ ছিল।

ছোট কাজে বড় বার্তা
আবর্জনা কুড়ানোর পাশাপাশি আরিফুর রহমান পর্যটক, স্থানীয় দোকানদার ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলেন এবং অনেককে সৈকতের পাশে ময়লার জন্য নির্দিষ্ট ডাস্টবিন রাখতে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতিকে বাঁচাতে বড় কোনো আন্দোলনই সবসময় দরকার হয় না। ছোট ছোট কাজও অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যদি প্রত্যেকে নিজের ময়লাটা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে, তাহলেই অনেক সমস্যা কমে যাবে।’ জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, তার দেখাদেখি কোনো কোনো পর্যটক নিজেরাও ময়লা তুলে ফেলেন।
দেশজুড়ে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে চলায় এমন উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক ২০২১ সালের ডিসেম্বরে জানায়, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে মাথাপিছু বার্ষিক প্লাস্টিক ব্যবহার ২০০৫ সালের ৩ কেজি থেকে তিন গুণ বেড়ে ২০২০ সালে ৯ কেজিতে দাঁড়িয়েছে এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের বড় অংশ জলাশয় ও নদীতে ফেলা হয়।

ফটো-সাংবাদিকতার ব্যস্ততার তুলনায় তার জীবন এখন সাদামাটা, তবে আক্ষেপ নেই। তিনি বলেন, ‘আগে হয়তো বড় বড় খবরের ছবি তুলতাম। এখন ছোট ছোট কাজ করি। কিন্তু এখন যে তৃপ্তি পাই, সেটা অন্যরকম।’ তার বিশ্বাস, প্রকৃতি রক্ষা কেবল সরকারের নয়, সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব। উপকূলীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কার ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সুমন শিকদারের মতে, আরিফুর রহমানের এই পথচলা ভিন্নধর্মী ও অনুপ্রেরণাদায়ক।
ছবি: Salahuddin66 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, বিশ্বব্যাংক, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)