যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার অববাহিকার জেলা গাইবান্ধা উর্বর পলিমাটি ও বিস্তীর্ণ চরের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ফসল, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু ও মাছ উৎপাদনে পরিচিত। জেলার অসংখ্য পরিবারের জীবিকা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ অনিশ্চিত আয়, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের কারণে এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম, আর অনেক কৃষকও চান না তাঁদের সন্তান একই অনিশ্চয়তায় পড়ুক।
সারাবাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমাজের একটি অংশ এখনো কৃষিকে কম মর্যাদার পেশা ভাবে; চাষাভুষা শব্দের ব্যবহারেও সেই অবজ্ঞা ফুটে ওঠে। শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, বন্যা, নদীভাঙন, খরা বা অতিবৃষ্টিতে ফসলহানির ঝুঁকি আর বাজারে দাম না পাওয়া তরুণদের চাকরি, ব্যবসা বা শহরের কাজের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গাইবান্ধা সদরের রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ হলেও বিক্রির সময় অনেক ক্ষেত্রে দাম খরচের সঙ্গে মেলে না, আর লোকসান পুষিয়ে দেওয়ার কেউ থাকে না। তাঁর কথায়, 'তাই এখন ছেলেমেয়েরা কৃষিকাজ করতে চায় না, আমরাও চাই না তারা এই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ুক।' একই গ্রামের কৃষক সিজু মিয়া জানান, কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের পড়াচ্ছেন যাতে তারা চাকরি করে, তাঁর মতো রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অনিশ্চয়তায় জীবন কাটাতে না হয়।
পলাশবাড়ী উপজেলার মনোহরপুরের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রিফাত হাসান বলেন, কৃষিকাজে কত আয় হবে তার নিশ্চয়তা নেই, অথচ চাকরিতে মাস শেষে নির্দিষ্ট আয় থাকে; তাই তিনি চাকরির প্রস্তুতিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কৃষিবিদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, তরুণদের কৃষি থেকে সরে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা ও উৎপাদনের জন্য উদ্বেগের; নতুন প্রজন্ম যুক্ত না হলে ভবিষ্যতে দক্ষ কৃষিশ্রমিক ও উদ্যোক্তার সংকট হতে পারে। তাঁর মতে, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, আধুনিক যন্ত্র, মানসম্মত বীজ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ালে কৃষি লাভজনক পেশা হতে পারে। এ জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা দরকার বলে জানান তিনি।
গাইবান্ধা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মুখ্য প্রশিক্ষক ড. মো. আবু সায়েম জানান, ইনস্টিটিউটে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে সরকারি চাকরি না পেলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী কৃষিতে যুক্ত না হয়ে অন্য পেশা বেছে নেন। তাঁর ভাষায়, পারিবারিক প্রত্যাশা ও আর্থসামাজিক চাপে অনেকেই কৃষি খাত থেকে সরে যাচ্ছেন, ফলে বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করা বিপুলসংখ্যক তরুণের সক্ষমতা এ খাতে কাজে লাগছে না।
প্রতিবেদনটি গাইবান্ধা থেকে সারাবাংলার।
ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0); গাইবান্ধার একটি ধানখেত।
সূত্র: সারাবাংলা





মন্তব্য
(০)