সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

ডাব খেয়ে নারিকেলগাছের চূড়ায় ঘুমিয়ে পড়া যুবককে নামাল ফায়ার সার্ভিস

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ডাব পাড়তে নারিকেলগাছে উঠে এক যুবক চূড়ায় বসে ডাবের পানি পান করে ঘুমিয়ে পড়েন; প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর ফায়ার সার্ভিস মইয়ের সাহায্যে তাঁকে নিচে নামায়।

ডাব খেয়ে নারিকেলগাছের চূড়ায় ঘুমিয়ে পড়া যুবককে নামাল ফায়ার সার্ভিস
দৈনন্দিন

ডাব পাড়তে উঁচু একটি নারিকেলগাছে উঠেছিলেন শাহেন শাহ আলী (৩৫) নামের এক যুবক। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর, রোববার, গাছের চূড়ায় বসে একটি ডাবের পানি পান করে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। নিচ থেকে স্থানীয়রা বারবার ডাকলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে তাঁকে নিচে নামিয়ে আনে। ঘটনাটি ঘটে সেদিন দুপুরে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম কাশিমনগর ঈদগাহ মাঠের পাশে। খবরটি সেদিনই প্রকাশ করে জাগো নিউজ২৪।

এ ঘটনায় কেউ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। রামগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের দলনেতার ভাষ্য অনুযায়ী, মইয়ের সাহায্যে তাঁকে নিচে নামানো হয় এবং পরে রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে নামিয়ে দেওয়া হয়।

গাছের চূড়ায় দুই ঘণ্টা


প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাহেন শাহ আলী ডাব পাড়ার জন্য নারিকেলগাছে ওঠেন। গাছের মাথায় পৌঁছে একটি ডাবের পানি পান করেন এবং পাতার ফাঁকে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন। নিচে দাঁড়িয়ে লোকজন বারবার তাঁকে ডাকতে থাকেন, কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি।

খবর ছড়িয়ে পড়লে ঈদগাহ মাঠের আশপাশে হইচই পড়ে যায় এবং লোকজন জড়ো হতে থাকেন। স্থানীয়রা নানাভাবে চেষ্টা করেও তাঁকে নামাতে পারেননি। একপর্যায়ে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। রামগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের একটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর তাঁকে গাছের চূড়া থেকে নিচে নামিয়ে আনে।

দলনেতার বর্ণনায় উদ্ধারকাজ ধাপে ধাপে এগিয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা প্রথমে তাঁকে নিজে থেকে নেমে আসতে বলেন, কিন্তু তিনি অনড় থাকেন। অনেক পরে মইয়ের সাহায্যে তাঁকে নিচে নামানো হয়। নামার আগে তিনি রশিতে বেঁধে সাতটি ডাব নিচে নামান। উদ্ধারের পর দলটি তাঁকে উপজেলার সরকারি হাসপাতাল রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে নামিয়ে দেয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিস যা বলেছেন


স্থানীয় বাসিন্দা পারভেজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, গাছে উঠে ডাব খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া ওই যুবক তাঁর ভাষায় কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধী। তিনি জানান, যুবক নিজের বাড়ি উত্তরবঙ্গে বলে দাবি করেছেন, তবে তাঁর বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি। পারভেজ হোসেন বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে নামাতে পারিনি।’

রামগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের লিডার রেজাউল করিম বলেন, শাহেন শাহ আলী নামের এক ব্যক্তি নারিকেলগাছের চূড়ায় উঠে পড়েন এবং উঁচুতে বসেই ডাব খান। তাঁর ভাষায়, ‘খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথমে তাকে গাছ থেকে নামার জন্য বলি। তিনি অনঢ় থাকেন। অনেক পরে মইয়ের সাহায্যে তাকে নিচে নামিয়ে আনা হয়।’ তিনি আরও জানান, এ সময় যুবক রশিতে বেঁধে সাতটি ডাব নামান এবং পরে তাঁকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে নামিয়ে দেওয়া হয়।

তাঁর কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল কি না, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি; তাঁর বাড়ি বা পরিবার সম্পর্কেও আর কোনো তথ্য ছিল না। এখানে সেদিন প্রতিবেদক, স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের দলনেতা যা বলেছেন, কেবল সেটুকুই রাখা হয়েছে।

রামগঞ্জ উপজেলা ও লক্ষ্মীপুর জেলা


রামগঞ্জ লক্ষ্মীপুর জেলার উত্তর-পূর্বের উপজেলা। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ১৬৯.৩১ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে ফরিদগঞ্জ, হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তি উপজেলা, দক্ষিণে লক্ষ্মীপুর সদর ও রায়পুর উপজেলা এবং পূর্বে নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা। রামগঞ্জ থানা গঠিত হয় ১৮৯১ সালে, আর উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালের ২৪ মার্চ। এখানে একটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়ন রয়েছে; ২০০১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬৮৬ জন।

বাংলাপিডিয়ার একই ভুক্তিতে আম, কাঁঠাল, কমলা, নারিকেল, সুপারি ও কলাকে উপজেলার প্রধান ফল বলা হয়েছে। প্রধান রপ্তানিপণ্যের তালিকার শুরুতেই নারিকেল ও সুপারি, এরপর কমলা, শীতলপাটি ও লোহার তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী। বাংলাপিডিয়ার উদ্ধৃত শুমারির তথ্যে উপজেলার ৩১.৬২ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, ১৯.১৪ শতাংশের ব্যবসা এবং ১৩.২৫ শতাংশের ভাড়া ও প্রবাসী আয়। উপজেলার প্রধান ফসল ধান, গম, পাট, আলু ও ডাল; কুটির শিল্পের মধ্যে আছে শীতলপাটি ও নকশিকাঁথা। এখানে হাট-বাজার প্রায় ৫০টি, যার মধ্যে সোনাপুর হাট, পানিয়ালা হাট ও ভাটরা হাট উল্লেখযোগ্য।

চট্টগ্রাম বিভাগের জেলা লক্ষ্মীপুরের আয়তন ১,৪৪০.৩৯ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে চাঁদপুর, পূর্বে নোয়াখালী, দক্ষিণে ভোলা ও নোয়াখালী এবং পশ্চিমে বরিশাল, ভোলা ও মেঘনা নদী। প্রধান নদী মেঘনা, ডাকাতিয়া ও কাটাখালী। লক্ষ্মীপুর মহকুমা হয় ১৯৭৯ সালে, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে। জেলায় পাঁচটি উপজেলা: লক্ষ্মীপুর সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর। ২০১১ সালের আদমশুমারির বরাতে বাংলাপিডিয়া জেলার জনসংখ্যা দিয়েছে ১৭ লাখ ২৯ হাজার ১৮৮ জন, আর ৪৭.৫১ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।

নারিকেলের জেলা লক্ষ্মীপুর


লক্ষ্মীপুর দেশের সুপরিচিত নারিকেল-অঞ্চলগুলোর একটি; রামগঞ্জের ওই গাছের মতো নারিকেলগাছ এখানকার প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় চোখে পড়ে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) লক্ষ্মীপুরের উপপরিচালক দৈনিক ইত্তেফাককে জানান, জেলায় ২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে নারিকেলের বাগান রয়েছে; এর বাইরে প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় আছে নারিকেলগাছ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লক্ষ্মীপুরে ২৬ হাজার মেট্রিক টন নারিকেল উৎপাদিত হয়।

ইত্তেফাকের একই প্রতিবেদনে উঠে আসে একসময়ের ফেলনা জিনিস ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসার কথা। নারিকেলের যে ছোবড়া আগে ফেলে দেওয়া হতো বা জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হতো, তা থেকে এখন আঁশ ও গুঁড়া তৈরি হচ্ছে; জেলায় এমন প্রায় ৩০টি কারখানা চালু রয়েছে। আঁশ দিয়ে তৈরি হয় জাজিম, গদি, দড়ি, স্লিপার, খেলনা ও শৌখিন সামগ্রী, আর গুঁড়া বা কোকোডাস্ট কৃষিকাজে, বিশেষ করে মাটির ঘাটতি আছে এমন বাগানে ব্যবহৃত হয়। শ্রমিকেরা আঁশ রোদে শুকিয়ে ২০ কেজির গাঁট বা ‘বেল’ বাঁধেন; এই আঁশ ও গুঁড়া পাঠানো হয় খুলনা, ঢাকা, কক্সবাজার, শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন স্থানে, যেখানে কারখানায় তোশক, জাজিম, পাপোশ, দড়ি এবং সোফা ও চেয়ারের গদি তৈরি হয়। দালাল বাজারের এক কারখানার মালিক জানান, একটি নারিকেলের ছোবড়া তিনি কেনেন দুই থেকে তিন টাকায়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) জেলা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ছোবড়া থেকে ঠিক কত আয় হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান কোনো সরকারি দপ্তরে নেই।

এই জেলার ডাবও যায় দূর-দূরান্তে। ২০২২ সালের এপ্রিলে প্রথম আলো ডাবের বাজার নিয়ে প্রতিবেদন করে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা তখন জানান, ঢাকার পাইকারি বাজারে ডাবের মূল জোগান আসে লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ভোলা, বরিশাল ও পিরোজপুর থেকে। এসব জেলার স্থানীয় আড়ত থেকে নিলামে ডাব কিনে দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়। সে সময় ঢাকার বাজারে আকারভেদে প্রতিটি ডাব বিক্রি হচ্ছিল ৬০ থেকে ১২০ টাকায়, আর লক্ষ্মীপুরের এক ব্যবসায়ী জানান, সবশেষ তিনি মাঝারি আকারের প্রতিটি ডাব ঢাকায় পাঠিয়েছেন ৪৮ টাকা দরে, অথচ দুই সপ্তাহ আগেও এমন ডাবের দাম ছিল ৪০ টাকার কম। একই প্রতিবেদনে বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, সেখানে গাছে থাকা প্রতিটি ডাব তখন আকারভেদে বিক্রি হচ্ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকায়, এক মাস আগেও যা ছিল ২০ থেকে ২৫ টাকা; গরম বাড়ায় চাহিদা বেড়েছিল।

ঢাকার সদরঘাটের রাস্তার বাজারে ভ্যানভর্তি ডাব। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঢাকার সদরঘাটের রাস্তার বাজারে ভ্যানভর্তি ডাব। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

নারিকেলগাছ ও ডাব


নারিকেলগাছের বৈজ্ঞানিক নাম Cocos nucifera; এটি পাম বা তালজাতীয় উদ্ভিদ পরিবারের সদস্য এবং গ্রীষ্মমণ্ডলের প্রায় সব অঞ্চলে জন্মে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় গাছটি ৮ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়; কাণ্ড মসৃণ ও নলাকার, তাতে ঝরে যাওয়া পাতার আংটির মতো দাগ থাকে। ভালো যত্ন পেলে একটি গাছে বছরে ২০০ বা তার বেশি ফল ধরতে পারে। ফল ধরে গাছের মাথায়, পাতার ঠিক নিচে কাঁদিতে; তাই ডাব বা নারিকেল পাড়তে হলে পাতাহীন পুরো কাণ্ড বেয়ে উঠতে হয়।

বাংলাদেশে নারিকেলগাছ মূলত বসতবাড়ির গাছ হিসেবে লাগানো হয়, ফল ও নানা ব্যবহারের জন্য; সড়কের পাশে সারি করেও লাগানো হয়। পরিপক্ব নারিকেলের শাঁস কাঁচা খাওয়া হয় এবং মিষ্টান্ন ও রান্নায় ব্যবহৃত হয়; শুকনো শাঁস বা কোপরা থেকে তেল হয়; ছোবড়া থেকে হয় মাদুর, দড়ি ও ব্রাশ; শক্ত খোল জ্বালানি ও কাঠকয়লা তৈরিতে লাগে; পাতা দিয়ে মাদুর, ঝুড়ি ও ঘরের ছাউনি হয়; আর কাণ্ড দিয়ে হয় ঘরের আড়া, খুঁটি ও ছোট সাঁকো। বাংলাপিডিয়া বলছে, কচি নারিকেল বা ডাব, যার পানি শাহেন শাহ আলী পান করেছিলেন, তৃষ্ণা মেটানো পানীয় হিসেবে খুবই জনপ্রিয়।

বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে প্রায় ৩১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে নারিকেলের আবাদ হয় এবং মোট উৎপাদন প্রায় ৯৬ হাজার মেট্রিক টন; তবে এই হিসাব কোন বছরের, ভুক্তিতে তা বলা নেই। আর ডিএইর হিসাবে লক্ষ্মীপুরের ২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর বাগানের মধ্যে বসতবাড়ির আঙিনার গাছগুলো ধরা হয়নি; ডিএইর ওই কর্মকর্তার ভাষায়, জেলার প্রতিটি বাড়ির আঙিনাতেই রয়েছে নারিকেলগাছ।

উঁচু থেকে পড়ে যাওয়া: পরিসংখ্যান যা বলে


রামগঞ্জের ঘটনাটি নিরাপদে শেষ হয়েছে, কারণ যুবককে অক্ষত অবস্থায় নামানো গেছে। কিন্তু উঁচু থেকে পড়ে যাওয়া দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে গুরুতর আঘাতের ঝুঁকিগুলোর একটি। ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ফ্যাক্টশিট অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনার পরেই পড়ে যাওয়া বিশ্বে অনিচ্ছাকৃত আঘাতজনিত মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। সংস্থাটির হিসাবে প্রতিবছর পড়ে গিয়ে প্রায় ৬ লাখ ৮৪ হাজার মানুষ মারা যান; এর ৮০ শতাংশের বেশি মৃত্যু ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে, আর পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলেই ঘটে এসব মৃত্যুর ৬০ শতাংশ। বছরে প্রায় ৩ কোটি ৭৩ লাখ পতন এতটাই গুরুতর হয় যে চিকিৎসা নিতে হয়। পড়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বে প্রতিবছর ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি প্রতিবন্ধিতা-সমন্বিত জীবনবর্ষ (ডালি) হারায়; সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডোবা, পুড়ে যাওয়া ও বিষক্রিয়া মিলিয়ে যত বছর মানুষ প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কাটান, পড়ে যাওয়ার কারণে কাটান তার চেয়েও বেশি।

ডব্লিউএইচও বলছে, পড়ে গিয়ে মৃত্যুর হার পুরুষদের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে বেশি; এর একটি ব্যাখ্যা ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা ও পেশাগত বিপদ। উঁচুতে কাজের পেশাকে সংস্থাটি ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রেখেছে। প্রতিরোধে তাদের সুপারিশের মধ্যে আছে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় কর্মস্থলের নিরাপত্তা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ ও বহুমুখী নিরাপত্তা কর্মসূচি; উঁচুতে কাজ করা মানুষের জন্য হারনেস, আটকে রাখার ব্যবস্থা, পতন ঠেকানোর ব্যবস্থা ও নিরাপদ মাচা; এবং বিপজ্জনক জায়গা ঘিরে রাখা বা সেখানে যাওয়া সীমিত করা।

বাংলাদেশে গাছ থেকে পড়ে যাওয়া এমন আঘাতের একটি সাধারণ উৎস। ২০২১ সালের অক্টোবরে মোমেনশাহী মেডিকেল জার্নালে (Mymensingh Medical Journal) প্রকাশিত এক গবেষণায় ২০১৭ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে আসা ৬৯ হাজার ৭৪০ জন রোগীর নথি বিশ্লেষণ করা হয়; দিনে গড়ে রোগী আসতেন ৯৬ জন। রোগীদের মধ্যে পুরুষ ও নারীর অনুপাত ছিল ৩:১, আর সবচেয়ে বেশি রোগী ছিলেন ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী। মোট রোগীর ৪৩ শতাংশ এসেছিলেন উঁচু থেকে পড়ে আঘাত নিয়ে, যা সড়ক দুর্ঘটনার ২৫ শতাংশ ও মারামারির ১৮ শতাংশের চেয়ে বেশি। গবেষকেরা লিখেছেন, গাছ থেকে পড়া রোগী প্রতিবছর এপ্রিল থেকে জুনে সবচেয়ে বেশি, ৩৫ শতাংশ।

শ্রীলঙ্কার জাফনায় নারিকেলগাছের মাথায় একজন গাছি। ছবি: Indi Samarajiva / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
শ্রীলঙ্কার জাফনায় নারিকেলগাছের মাথায় একজন গাছি। ছবি: Indi Samarajiva / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

নারিকেলগাছ থেকে আগের উদ্ধারের ঘটনা


নারিকেলগাছ থেকে কাউকে নামাতে ফায়ার সার্ভিসের ডাক পড়া রামগঞ্জেই প্রথম নয়। ২০২১ সালের জুনে প্রথম আলো জানায়, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বেগমপুর গ্রামে ২২ বছর বয়সী এক নারী রাতে একা নারিকেলগাছে উঠে আর নামতে পারছিলেন না। মহেশপুর ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা জানান, প্রায় ৪০ মিনিটের চেষ্টায় ৬০ ফুট উঁচু গাছ থেকে রশির সাহায্যে তাঁকে নামানো হয়; এ সময় তিনি জ্ঞান হারান। পরে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং তিনি ভালো আছেন বলে জানানো হয়।

২০২৩ সালের মার্চে ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা ফরিদপুরের মধুখালীতে আরও দীর্ঘ এক উদ্ধার অভিযানের খবর দেয়। ১৫ বছরের এক কিশোর একটি বিদ্যালয়ের মাঠে প্রায় ৫০ ফুট উঁচু নারিকেলগাছে ডাব পাড়তে উঠে গাছের মাথায় আটকে পড়ে। নিচে থাকা ছোট ভাই অনেকক্ষণ তার সাড়া না পেয়ে স্থানীয়দের জানালে তাঁরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। মধুখালী ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জানান, গাছটি অনেক বড় হওয়ায় এবং উদ্ধারের সহায়ক যন্ত্রপাতি না থাকায় ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর রাত দেড়টার দিকে কিশোরকে নামিয়ে মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়; সুস্থ হয়ে পরদিন সকালে সে ছাড়া পায়।

উঁচু জায়গা থেকে উদ্ধার ফায়ার সার্ভিসের অন্য কাজেরও অংশ। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চে খুলনার রূপসা সেতুর কাছে একটি পার্কে নাগরদোলা বিকল হয়ে ৪০ থেকে ৫০ ফুট উঁচুতে ১৫ থেকে ২০ জন আটকে আছেন বলে ৯৯৯-এ ফোন আসে। খবরটি খুলনার টুটপাড়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে পাঠানো হলে তাদের দল ১০ শিশুসহ ১৫ জনকে অক্ষত অবস্থায় নিচে নামিয়ে আনে।

ফায়ার সার্ভিস ও ৯৯৯


রামগঞ্জে উদ্ধার অভিযান চালানো দলটি বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের (এফএসসিডি)। এটি অগ্নিনির্বাপণ, উদ্ধার অভিযান ও বেসামরিক প্রতিরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় জরুরি সেবা সংস্থা, কাজ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আগুন নেভানোর পাশাপাশি সংস্থাটি কারিগরি উদ্ধারকাজ করে, ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন করে এবং সাধারণ মানুষকে অগ্নিনির্বাপণ, প্রাথমিক চিকিৎসা ও দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেয়।

ফায়ার সার্ভিসের অনেক উদ্ধারের ডাক এখন আসে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ হয়ে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রথম আলোর প্রকাশিত পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৯৯৯ চালু হয় ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর। যেকোনো ফোন থেকে বিনা মূল্যে এ নম্বরে কল করা যায়; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন এই সেবার সঙ্গে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা যুক্ত। ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় সাত বছরে ৯৯৯-এ কল আসে ৫ কোটি ৮৪ লাখ ৮৮ হাজার ১০৭টি; এর মধ্যে জরুরি সেবা চেয়ে কল ছিল ১৯ লাখ ৩৩ হাজার ২৯৪টি, যার ১ লাখ ৫৬ হাজার ১২৯টিতে সেবা দেয় ফায়ার সার্ভিস। শুধু ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ৯৯৯-এর মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিস ২৩ হাজার ৯৫৭টি জরুরি সেবা দেয়।

৯৯৯-এর কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে বলেন, দুর্ঘটনা, মানুষ ও প্রাণীর জীবন রক্ষা, বন্য প্রাণী উদ্ধার ও অগ্নিকাণ্ডে জরুরি সহায়তার জন্য সেবাটি সারা দেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে; তবে জরুরি নয় এমন অনেক বিষয়েও এখনো এ নম্বরে কল আসে।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি রেসকিউ টেন্ডার বা উদ্ধারকারী গাড়ি। ছবি: Shadman Samee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি রেসকিউ টেন্ডার বা উদ্ধারকারী গাড়ি। ছবি: Shadman Samee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)

মানসিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পাওয়া


যুবককে মানসিক প্রতিবন্ধী বলে যে বর্ণনা স্থানীয় বাসিন্দা দিয়েছেন, তা তাঁর নিজের ধারণা; প্রতিবেদনে যুবকের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো চিকিৎসা-তথ্য ছিল না। ২০২১ সালের ঝিনাইদহের ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, এ ধরনের ঘটনা মানসিক রোগ, আর এমন মানুষকে জিনে ধরেছে বলে গ্রামে যে বিশ্বাস প্রচলিত, তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যায় ভোগা অনেকেই চিকিৎসা পর্যন্ত পৌঁছান না। ২০২৫ সালের আগস্টে বিএমসি সাইকিয়াট্রি (BMC Psychiatry) সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯-এর ৭ হাজার ২৭০টি খানার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, মানসিক রোগে আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেন না। চিকিৎসা-ঘাটতি সবচেয়ে বেশি আসক্তিজনিত রোগে, ৯৫.২৪ শতাংশ; সবচেয়ে কম বাইপোলার ডিসঅর্ডারে, ৬৫.৬৩ শতাংশ। গবেষকেরা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতা জরুরি ভিত্তিতে বাড়ানোর প্রয়োজনের কথা বলেছেন। পরিবারের কারও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত; উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও সেই পরামর্শ পাওয়া যায়।

ছবি: Kamaltf / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ২৪, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, মোমেনশাহী মেডিকেল জার্নাল, বিএমসি সাইকিয়াট্রি, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

দৈনন্দিন

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

সাতক্ষীরার বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত পরিবারের ৭৪.৯ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীন

ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনে ঘর হারিয়ে সাতক্ষীরা শহরের বস্তিতে ওঠা ৩৫৮ পরিবারের ওপর খানি বাংলাদেশ ও প্রানের গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৪.৯ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীন, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় মাত্র ৭.৫ শতাংশ।

চ্যানেল আই অনলাইন১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
দৈনন্দিন

এলপিজি ব্যবসায়ীদের দুই দিনের ধর্মঘট প্রত্যাহার, ২৯ অক্টোবর গণশুনানি করবে বিইআরসি

সরকারের কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি আর বিইআরসির সঙ্গে আলোচনার পর ১৫ ও ১৬ অক্টোবর দোকান বন্ধ রাখার কর্মসূচি তুলে নিয়েছেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা; তাঁদের দাবি নিয়ে ২৯ অক্টোবর গণশুনানি।

নিউজবাংলা ২৪১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
দৈনন্দিন

ঘাটাইলের চান্দশীতে মাসের পর মাস জলাবদ্ধতা, পানির নিচে আবাদি জমি

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল পৌরসভার চান্দশী গ্রামে ড্রেনেজ না থাকায় শত শত পরিবার পানিবন্দি, আবাদি জমি তলিয়ে চাষ করতে পারছেন না কৃষকেরা; ইউএনও বলছেন, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হবে।

মানবজমিন১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)