মালাইকারি, ভুনা কিংবা অন্য যেকোনো পদ, চিংড়ি টাটকা না হলে রান্নার স্বাদ নষ্ট হয়, বাড়তে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। ২০২৬ সালের ৮ জুলাই প্রকাশিত জাগো নিউজের লাইফস্টাইল ডেস্কের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারে অনেক সময় টাটকা বলে দীর্ঘদিন হিমঘরে রাখা বা মানহীন চিংড়ি বিক্রি করা হয়। তাই বিক্রেতার কথার ওপর ভরসা না করে কয়েকটি সহজ লক্ষণ দেখে ক্রেতা নিজেই চিংড়ির মান যাচাই করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) এবং খাদ্যবিজ্ঞানের গবেষণাও একই ধরনের লক্ষণের কথা বলে।
দেশের দুই প্রধান চিংড়ি: গলদা ও বাগদা
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ৫৬ প্রজাতির চিংড়ির খবর পাওয়া যায়, যা লোনা, আধা লোনা ও মিঠা পানিতে ছড়িয়ে আছে। বাজারে সবচেয়ে পরিচিত দুটি হলো গলদা ও বাগদা। গলদা (Macrobrachium rosenbergii) মিঠা পানির চিংড়ি; নদী, শাখানদী, খাল ও নদীর মোহনায় এদের পাওয়া যায় এবং বাগেরহাট, খুলনা, যশোর, পটুয়াখালী, বরিশাল ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় এর চাষ হয়। বাগদা (Penaeus monodon) বা জায়ান্ট ব্ল্যাক টাইগার শ্রিম্প বঙ্গোপসাগর ও মোহনার চিংড়ি; সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় এর চাষ হয়। বাংলাপিডিয়া বলছে, দুটি প্রজাতিই রপ্তানির মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে বড় ভূমিকা রাখে।

গন্ধ, দৃঢ়তা ও রং দেখে যাচাই
গন্ধ সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা। এফডিএর পরামর্শ অনুযায়ী, মাছের গন্ধ হবে টাটকা ও মৃদু; আঁশটে, টক বা অ্যামোনিয়ার মতো ঝাঁঝালো গন্ধ থাকবে না। চিংড়ির ক্ষেত্রে সংস্থাটি বলছে, এর মাংস হবে স্বচ্ছ, মুক্তার মতো রঙের, এবং গন্ধ থাকবে খুব কম বা একেবারেই না। ঝাঁঝালো বা টক গন্ধ পেলে সেই চিংড়ি না কেনাই নিরাপদ।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভালো চিংড়ির খোসা শক্ত, টানটান ও স্বাভাবিকভাবে চকচকে থাকে; হাতে নিলে খোসা নরম লাগলে বা শরীর স্পঞ্জের মতো চেপে গেলে সেটি তাজা নয়। এফডিএও টাটকা মাছের মাংস দৃঢ় হওয়ার এবং চাপ দিলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসার কথা বলে।
রঙের ক্ষেত্রে মাথা, লেজ ও খোসার জোড়ায় কালচে বা বাদামি দাগ নজরে আসে। খাদ্যবিজ্ঞানে একে মেলানোসিস বা ব্ল্যাকস্পট বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এলএসইউ অ্যাগসেন্টার ও লুইজিয়ানা সি গ্র্যান্টের এক তথ্যপত্র অনুযায়ী, চিংড়ির শরীরে স্বাভাবিকভাবে থাকা এনজাইম বাতাসের সংস্পর্শে এই দাগ তৈরি করে; এটি ক্ষতিকর নয় এবং শুরুর দিকের এই রং বদল ব্যাকটেরিয়াজনিত পচনের লক্ষণ নয়, কারণ ব্যাকটেরিয়া বাড়ার আগেই কালচে ভাব দেখা দেয়। ২০১৫ সালে ক্রিটিক্যাল রিভিউজ ইন ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় বলা হয়, ধরার পর নাড়াচাড়া ও হিমায়িত সংরক্ষণের সময় এই দাগ তৈরি হয় এবং এতে চিংড়ির বাজারমূল্য কমে। অর্থাৎ বেশি কালো দাগ সাধারণত চিংড়িটি ধরার পর অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়; তবে পচন ধরেছে কি না, তা গন্ধ ও দৃঢ়তা মিলিয়ে বিচার করাই ভালো।

হিমায়িত চিংড়ি কেনার সময় সতর্কতা
এখন অনেকে প্যাকেটজাত হিমায়িত চিংড়ি কেনেন। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্যাকেটের ভেতরে অতিরিক্ত বরফ বা চিংড়ির গায়ে বরফের মোটা আস্তরণ থাকলে সতর্ক হওয়া দরকার। এফডিএ একই পরামর্শ দেয়: যে প্যাকেটে তুষারের মতো জমাট বা বরফের দানা দেখা যায়, তা এড়িয়ে চলুন, কারণ এটি দীর্ঘদিন সংরক্ষণ অথবা একবার গলিয়ে আবার জমানোর লক্ষণ হতে পারে। সংস্থাটি আরও বলে, ঠিকভাবে জমানো মাছ বাঁকানো যায় না।

কেনার পর সংরক্ষণ ও রান্না
চিংড়ি কেনার পর দীর্ঘ সময় বাইরে ফেলে না রেখে দ্রুত ঠান্ডায় রাখা জরুরি। এফডিএর পরামর্শ অনুযায়ী, দুই দিনের মধ্যে রান্না করলে সামুদ্রিক খাবার ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রার ফ্রিজে রাখতে হবে, নইলে সঙ্গে সঙ্গে ডিপ ফ্রিজে জমিয়ে ফেলতে হবে। হিমায়িত চিংড়ি আগের রাতে ফ্রিজের নিচের অংশে রেখে ধীরে গলানোর কথা বলে সংস্থাটি। বেশির ভাগ সামুদ্রিক খাবার ভেতরের তাপমাত্রা ১৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত রান্না করতে হয়; চিংড়ি ঠিকমতো রান্না হলে এর মাংস দৃঢ়, মুক্তার মতো ও অস্বচ্ছ হয়ে যায়।
ছবি: Ave Maria Mõistlik / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), এলএসইউ অ্যাগসেন্টার ও লুইজিয়ানা সি গ্র্যান্ট, ক্রিটিক্যাল রিভিউজ ইন ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন, বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)