মাগুরা জেলার শতখালী ইউনিয়নের বয়রা গ্রামের মাছ চাষি ইন্দ্রজিৎ কুমার বিশ্বাস ২০২৬ সালের এপ্রিলে জানান, সাত একর পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে তিনি প্রায় ৮০ লাখ টাকার মাছ বিক্রির আশা করছেন। জাগো নিউজ ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল এ খবর প্রকাশ করে। প্রতি একর ১ লাখ টাকা হিসাবে মোট ৭ লাখ টাকায় তিনি পুকুরগুলো লিজ নেন এবং সেই মৌসুমেই প্রথম বড় পরিসরে চাষ শুরু করেন। এর আগে তিনি শুধু ছোট ছোট পুকুরে মাছ চাষ করতেন। নতুন উদ্যোগে তিনি ট্যাংরা, পাবদা, দেশি জাতের রুই, কাতল ও সিলভার কার্প চাষ করেন।
ইন্দ্রজিতের নিজের হিসাবে মোট বিনিয়োগ হয়েছিল প্রায় ৫২ লাখ টাকা। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, এরই মধ্যে প্রায় ১৪০ মণ মাছ বিক্রি করে ১৪ লাখ টাকা আয় করেছেন; এর মধ্যে ১০ এপ্রিল বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩০ মণ সাদা মাছ, অর্থাৎ কার্পজাতীয় মাছ। তখনকার বাজারদর হিসেবে তিনি জানান, রুই প্রতি কেজি ৩০০ টাকা, সিলভার কার্প ২২০ টাকা এবং পাবদা ৩৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। সব মিলিয়ে তার মোট বিক্রি প্রায় ৮০ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে তিনি আশা করছিলেন। এই অঙ্কটি প্রতিবেদনের সময়ে তার প্রত্যাশা, সম্পন্ন হওয়া বিক্রি নয়।
মাছের আকার ও প্রথম পাবদার ফলন
মাছ কত বড় হয়েছে, তার বর্ণনা দেন ইন্দ্রজিৎ নিজেই। তিনি বলেন, 'সিলভার কার্প মাছ ৫-৬ কেজি, কাতল ৪ কেজি, রুই ২ কেজি পর্যন্ত হয়েছে। পাবদা কেজিতে ৮-১০টি উঠছে। ট্যাংরা এখনো পুরোপুরি ধরা না পড়লেও আনুমানিক ৫০ কেজির মতো হয়েছে। ট্যাংরা এক মাস পর বিক্রির কথা ছিল কিন্তু মাছ দ্রুত বড় হয়ে গেছে। নতুন পাবদা চাষে ভালো সাড়া পেয়ে এবার বাজারজাত করছি।'
মাছের হিসাব হয়েছে মণে। মণ উপমহাদেশের প্রচলিত ওজনের একক, যা বাংলাদেশের মাছ ও শস্যের কেনাবেচায় এখনো চলে। এক মণে ৪০ সের; স্বাধীনতার পর উপমহাদেশে এর মেট্রিক সংজ্ঞা দাঁড়ায় ৩৭.৩২৪২ কিলোগ্রাম, আর বাংলাদেশজুড়ে এক মণ ধরা হয় ৪০ কেজি। প্রতিবেদন লেখার সময় ট্যাংরা তখনো পুরোপুরি ধরা হয়নি, আর পাবদা সবে বাজারে উঠতে শুরু করেছিল।
এই খামারকে খবরে এনেছে পাবদা। ইন্দ্রজিতের পুকুরে পাবদা উঠছিল কেজিতে ৮ থেকে ১০টি, যে আকারের কথা সহায়তাকারী সংস্থা ও স্থানীয় জেলে দুজনেই আলাদা করে বলেছেন। তুলনার জন্য, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) তাদের চাষ নির্দেশিকায় বলেছে, পাবদা ৪০ থেকে ৫০ গ্রাম ওজনের হলেই বিক্রির জন্য ধরা যায়।
এডিআই ও পিকেএসএফের সহায়তায় পাবদায় সাফল্য
জেলা মৎস্য অফিসের পাশাপাশি ইন্দ্রজিৎকে সহায়তা দিচ্ছিল বেসরকারি সংস্থা অল্টারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এডিআই)। এডিআইয়ের কৃষি ইউনিটের ফোকাল পারসন ও মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর আমিন মুকুল জাগো নিউজকে বলেন, 'পিকেএসএফ ও এডিআইয়ের সহযোগিতায় ২০১৪ সাল থেকে মাগুরা ও যশোরে বিভিন্ন প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করলেও পাবদা চাষে তেমন সফলতা আসছিল না। অবশেষে ইন্দ্রজিৎ দাদার পুকুরে আমরা পাবদা চাষে সফল হয়েছি। এখন কেজিতে ৮-১০টি সাইজের পাবদা উঠছে, যা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাফল্য।'
তার মতে, 'এ অঞ্চলের মানুষের ধারণা ছিল পাবদা চাষ সম্ভব নয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় সেই ধারণা বদলে গেছে।'
পিকেএসএফ বা পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠিত একটি শীর্ষ উন্নয়ন সংস্থা। ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানোর বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি ১৯৮৯ সালের ১৩ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। সংস্থাটি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে কাজ করে, অর্থাৎ বেসরকারি সংস্থাগুলো তার অর্থায়ন ও সেবা গ্রামের পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দেয়; এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার আগারগাঁওয়ে। পিকেএসএফ জানায়, ২০১৩ সালের জুনে তারা কৃষি উন্নয়নকে মূলধারার কর্মসূচি হিসেবে চালু করে, যার মাধ্যমে ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিকেএসএফের সঙ্গে এডিআইয়ের মৎস্য কাজ মাগুরা ও পাশের যশোরে চলছে ২০১৪ সাল থেকে।
খামার দেখতে মানুষ আসছিলেন। জাল টানা দেখতে আসা সুজন কুমার বিশ্বাস বলেন, 'শুনেছিলাম এখানে উন্নতমানের মাছ চাষ হচ্ছে। জাল টানতে এসে দেখলাম সত্যিই বড় বড় রুই, কাতল, সিলভার কার্প হয়েছে। পাবদাও ৮-১০টি কেজি সাইজের। আমিও সামনে এমন চাষ করার চেষ্টা করবো। সেজন্যই মূলত দেখতে আসা।' স্থানীয় জেলে সুনীল কুমার বিশ্বাস বলেন, 'এ বছর এমন বড় পাবদা আর কোথাও পাইনি। কাতল, সিলভার, রুই, সব মাছই খুব ভালো সাইজের হয়েছে। এই পুকুরের মাছের মান ভালো।'
শালিখা ও মাগুরা: পুকুরগুলো যেখানে
শতখালী মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের একটি; বাকিগুলো আড়পাড়া, গঙ্গারামপুর, তালখড়ি, ধনেশ্বরগাতী, বুনাগাতী ও শালিখা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, শালিখার আয়তন ২২৮.৬৫ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে ঝিনাইদহ সদর ও মাগুরা সদর উপজেলা, দক্ষিণে বাঘারপাড়া ও নড়াইল সদর, পূর্বে নড়াইল সদর, মাগুরা সদর, লোহাগড়া ও মহম্মদপুর এবং পশ্চিমে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ও বাঘারপাড়া উপজেলা। উপজেলার নদী চিত্রা, নবগঙ্গা ও ফাটকি; বিলের মধ্যে আছে জামলা, নেউরা ও বুড়ুলির বিল। প্রধান ফসল ধান, পাট, ডাল, তেলবীজ, আখ, গম ও শাকসবজি। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ১,৬৩,৬৫৮ জন, আর ২০২২ সালের জনশুমারিতে ১,৭৯,৬৬৬ জন।
মাগুরা জেলা খুলনা বিভাগে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, জেলার আয়তন ১,০৩৯.১০ বর্গকিলোমিটার; উত্তরে রাজবাড়ী, দক্ষিণে যশোর ও নড়াইল, পূর্বে ফরিদপুর এবং পশ্চিমে ঝিনাইদহ জেলা। প্রধান নদী গড়াই-মধুমতি, নবগঙ্গা ও কুমার। জেলায় চারটি উপজেলা (মাগুরা সদর, মহম্মদপুর, শালিখা ও শ্রীপুর), ৩৬টি ইউনিয়ন ও ৭১১টি গ্রাম। মাগুরা মহকুমা হয় ১৯৪৫ সালে এবং জেলা হয় ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৯,১৮,৪১৯ জন। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, ৬৬.৩ শতাংশ, এর পরে ব্যবসা ১২.৩৪ শতাংশ।

ইন্দ্রজিতের পুকুরের পাঁচ মাছ
পাবদা (Ompok pabda) সিলুরিডি গোত্রের একটি দেশি ক্যাটফিশ বা গোঁফওয়ালা মাছ। ফিশবেসের তথ্যমতে, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের স্বচ্ছ ও ঘোলা পানির নদী, খাল, পুকুর ও হ্রদে এর বাস, আর এটি সর্বোচ্চ ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ সালে যে লাল তালিকা প্রকাশ করে (মূল্যায়ন ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর), তাতে পাবদা 'বিপন্ন'। মূল্যায়নকারীরা লিখেছেন, একসময় সারা দেশে পাবদা মোটামুটি প্রচুর পাওয়া যেত; কিন্তু ব্যাপক পলি জমা ও জলাভূমির রূপান্তরে আবাস সংকুচিত হওয়া, তার সঙ্গে অতিরিক্ত আহরণ ও দূষণে আশির দশকে এর সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যায়, এবং আগের দশ বছরে এর সংখ্যা সম্ভবত ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে। এর বাংলা নামের মধ্যে আছে মধু পাবদা, পাবদা ও পাইব্বা।
ট্যাংরা নামটি কয়েকটি ছোট বাগরিড ক্যাটফিশের জন্য ব্যবহৃত হয়। এদের একটি Mystus tengara, যা বাজারি বা গুইত্তা ট্যাংরা নামে পরিচিত; ফিশবেস অনুযায়ী এটি ১৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হয়, বাতাস থেকে শ্বাস নিতে পারে এবং নদী ও পুকুরের স্রোতের ও বদ্ধ দুই রকম পানিতেই থাকে। আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ সালে একে 'ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত' হিসেবে মূল্যায়ন করে এবং লেখে, দেশের সব ধরনের মিঠাপানির আবাসে এটি মোটামুটি সাধারণ ও বিস্তৃত।
রুই (Labeo rohita) ও কাতল (Catla catla) ভারতীয় প্রধান কার্প, যাদের আদি নিবাস বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তান। ফিশবেস জানায়, রুই উদ্ভিদভোজী এবং এর প্রজনন সাধারণত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সময়ে, প্লাবিত নদীতে; কাতল খাবার খায় পানির ওপরের ও মাঝের স্তরে। ২০১৫ সালের লাল তালিকায় বাংলাদেশে দুটিই 'ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত': রুই এখনো ভালো সংখ্যায় পাওয়া যায় এবং ব্যাপকভাবে চাষ হয়, আর কাতলের প্রাকৃতিক প্রাচুর্য কম হলেও এর কৃত্রিম প্রজনন ব্যাপকভাবে প্রচলিত এবং দেশের প্রায় সব অঞ্চলে এর চাষ হয়।

সিলভার কার্প (Hypophthalmichthys molitrix) বাংলাদেশের দেশি মাছ নয়। ফিশবেস অনুযায়ী এর আদি নিবাস পূর্ব এশিয়ার বড় নদী অববাহিকা, চীনের আমুর থেকে সি জিয়াং পর্যন্ত, আর প্রাপ্তবয়স্ক মাছ প্ল্যাঙ্কটন খায়; মাছ চাষ ও শৈবালের আধিক্য নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি সারা বিশ্বে ছড়ানো হয়েছে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, ষাটের দশকের শেষ দিকে হংকং থেকে সিলভার কার্প বাংলাদেশে আনা হয় এবং এটি দেশের পুকুরে মিশ্রচাষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাছ হয়ে উঠেছে।

বিএফআরআইয়ের নির্দেশিকায় পাবদা চাষ
পাবদা ও গুলশা নিয়ে বিএফআরআইয়ের নির্দেশিকা ব্যাখ্যা করেছে, কেন মাছ দুটি দুর্লভ হয়ে পড়ে। নদীর উজানে চর জেগে নাব্যতা কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, ধানখেতে কীটনাশকের ব্যবহার এবং বিল-ঝিল শুকিয়ে মাছ ধরার কারণে এদের প্রজনন ও চারণক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, আইইউসিএনের ২০০৩ সালের সমীক্ষায় পাবদা ও গুলশাকে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় রাখা হয়, আর বাজারে সরবরাহ কম ও চাহিদা বেশি বলে এদের দাম রুইজাতীয় মাছের চেয়ে অনেক বেশি। পরে বিএফআরআইয়ের গবেষকেরা কৃত্রিম প্রজনন, পোনা লালন-পালন ও চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সফল হন। পাবদা মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত প্রজনন করে।
চাষিদের জন্য বিএফআরআই কার্পজাতীয় মাছের সঙ্গে পাবদা ও গুলশার মিশ্রচাষের পরামর্শ দেয়। নির্দেশিকায় পদ্ধতিটি এভাবে দেওয়া আছে:
- ৪০ থেকে ৬০ শতাংশের এমন পুকুর বাছাই করতে হবে, যেখানে বছরে অন্তত আট-নয় মাস ৪ থেকে ৬ ফুট পানি থাকে; মিহি ফাঁসের জাল বারবার টেনে রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত মাছ সরাতে হবে।
- শতাংশে ১ কেজি চুন দিয়ে পুকুর প্রস্তুত করতে হবে; তিন-চার দিন পর শতাংশে ৬ থেকে ৮ কেজি পচা গোবর, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম টিএসপি পানিতে গুলে ছিটাতে হবে; সার দেওয়ার তিন থেকে পাঁচ দিন পর পানি সবুজাভ হলে পোনা ছাড়তে হবে।
- প্রতি শতাংশে ৫ থেকে ৭ সেন্টিমিটারের ৫০টি পাবদা ও ৮০টি গুলশা এবং ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটারের ৮টি কাতলা, ১২টি রুই, ১০টি মৃগেল ও ২টি গ্রাস কার্পের পোনা ছাড়তে হবে।
- পরদিন থেকে চালের কুঁড়া (৪০ শতাংশ), গমের ভুসি (২৫ শতাংশ), সরিষার খৈল (২০ শতাংশ) ও ফিশমিল (১৫ শতাংশ) মিশিয়ে মাছের দেহের ওজনের ৩ থেকে ৮ শতাংশ হারে খাবার দেওয়া যায়; সপ্তাহে একবার হররা টানতে হবে, পানি কমলে বাইরে থেকে পানি দিতে হবে এবং পানির স্বচ্ছতা ২০ সেন্টিমিটারের মধ্যে থাকলে সার দেওয়া বন্ধ রাখতে হবে।
- পাবদা ৪০ থেকে ৫০ গ্রাম ও গুলশা ৬০ থেকে ৮০ গ্রাম হলে বিক্রির জন্য ধরা যায়, আর পোনা ছাড়ার আট-নয় মাস পর পুকুরের সব মাছ ধরে ফেলতে হবে।
বিএফআরআই বলছে, এই পদ্ধতিতে হেক্টরে পাবদা ২৫০ থেকে ৩২৫ কেজি, গুলশা ৮০০ থেকে ৯০০ কেজি এবং রুইজাতীয় মাছ ৪,৫০০ থেকে ৫,০০০ কেজি উৎপাদন হয়, আর রুইজাতীয় মাছের সঙ্গে পাবদা ও গুলশার মিশ্রচাষে হেক্টরে প্রায় ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রায় ২.৫০ লাখ টাকা মুনাফা করা যায়। নির্দেশিকা সতর্ক করেছে, পানির গুণাগুণ চাষের উপযোগী না থাকলে মাছের বৃদ্ধি আশানুরূপ হয় না এবং হ্যাচারির রেণু বা পুকুরের মাছ রোগাক্রান্ত হতে পারে; পুকুরভেদে অবস্থা আলাদা, তাই কোনো মাত্রা মেনে চলার আগে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এর পেছনের প্রজনন-গবেষণারও ইতিহাস আছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জানায়, বিএফআরআই প্রায় বিলুপ্ত ২৩টি দেশি মাছের পোনা উৎপাদন করেছে, যার মধ্যে পাবদাও আছে, এবং দেশে প্রথমবারের মতো দেশি মাছের জীবন্ত জিন ব্যাংক গড়েছে; তখনকার মৎস্যমন্ত্রী বলেন, পুকুরে ছোট দেশি মাছের উৎপাদন ২০০৯ সালের ৬৭,৩৪০ টন থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২.৪১ লাখ টনে উঠেছে। ২০২১ সালের মে মাসে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ময়মনসিংহ থেকে জানায়, বিএফআরআইয়ের স্বাদুপানি কেন্দ্রের গবেষকেরা ট্যাংরা, গুলশা ও পাবদাসহ ২৪টি বিপন্ন প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজননে সফল হয়েছেন।
মাগুরার আগে দক্ষিণ-পশ্চিমে পাবদা চাষ
এ অঞ্চলে পাবদা চাষের চেষ্টা ইন্দ্রজিতের খামারেই প্রথম নয়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে জাগো নিউজ পাশের ঝিনাইদহ জেলা থেকে জানায়, খরচের তুলনায় লাভ ভালো হওয়ায় মহেশপুর উপজেলায় পাবদা চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে: ২০১৬ সালে দুজন চাষি দিয়ে শুরু হয়ে তখন চাষির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০ জনে, আর আগের মৌসুমে ১৫০ মেট্রিক টনের বেশি পাবদা উৎপাদিত হয়। সেখানকার চাষিরা ময়মনসিংহের বেসরকারি হ্যাচারি থেকে পোনা এনে মিশ্র ও দানাদার খাবার খাইয়ে বড় করতেন এবং পানির পরিবেশ ঠিক রাখতে একই পুকুরে অন্য জাতের মাছ রাখতেন। এক বিঘার একটি পুকুরে দেড় লাখ টাকা খরচ করে প্রায় ৩ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করা যেত, আর পুকুরপাড় থেকেই গড়ে ৩৩০ টাকা কেজি দরে পাবদা বিক্রি হতো।
মহেশপুরের উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন তখন পত্রিকাটিকে বলেন, কৃষির যেকোনো খাতের তুলনায় পাবদা চাষ লাভজনক, মহেশপুরের পাবদা এলসির মাধ্যমে ভারতে পাঠানো হয়, এবং সাধারণত মার্চের শুরুতে পুকুরে পোনা ছাড়া হয় ও ছয় মাস পর থেকে মাছ ধরার উপযোগী হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ইন্দ্রজিৎ পাবদার যে বাজারদর জানান, কেজি ৩৩০ টাকা, তা ২০২০ সালে মহেশপুর থেকে জানানো পুকুরপাড়ের গড় দামের সমান।
মাগুরার মাছ উৎপাদন ও ঘাটতি
মাগুরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাধন চন্দ্র সরকার জাগো নিউজকে বলেন, 'জেলায় বছরে মোট ১৯,৬৯২ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। যেখানে চাহিদা ২৩,০০২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ ঘাটতি রয়েছে ৩,৩১০ মেট্রিক টন। এই ঘাটতি পূরণে আমরা সচেতনতা বৃদ্ধি, দেশীয় প্রজাতি সংরক্ষণে অভয়াশ্রম স্থাপন এবং মৎস্য আইন বাস্তবায়নে জোর দিয়েছি।'
মৎস্য অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত 'ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ ২০২৩-২৪' জেলার ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বছরের হিসাব ভেঙে দেখিয়েছে। এতে মাগুরার অভ্যন্তরীণ মাছ উৎপাদন ধরা হয়েছে ১৭,৯০৬ টন। সবচেয়ে বড় উৎস পুকুর: ২,৫০০ হেক্টর পুকুরে ১২,৮৫১ টন, হেক্টরে গড়ে ৫.১৪ টন। প্লাবনভূমি থেকে এসেছে ৩,১২৮ টন, নদী থেকে ১,২৪১ টন, বাঁওড় থেকে ২৬৮ টন, বিল থেকে ২৩১ টন, মৌসুমি চাষের জলাশয় থেকে ১২৯ টন এবং চিংড়ি খামার থেকে ৫৮ টন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার ১৯,৬৯২ টনের হিসাবটি ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেওয়া তার নিজের তথ্য, যা ভিন্ন কোনো বছরের হতে পারে।
ইয়ারবুক দেখায়, মাগুরার পুকুরে কোন মাছ কতটা হয়। ২০২৩-২৪ সালের ১২,৮৫১ টনের মধ্যে রুই ২,৬০২ টন, মৃগেল ২,২০৩ টন, কাতল ২,১৭৮ টন এবং সিলভার কার্প ২,০৪৫ টন। পাঙাশ ৮৭৫ টন, মিরর ও কমন কার্প ৬৮২ টন, বাটা ৬৩৪ টন এবং তেলাপিয়া ৪৫২ টন। ট্যাংরা ও পাবদার মতো ছোট দেশি মাছ ইয়ারবুকে 'অন্যান্য অভ্যন্তরীণ মাছ' হিসেবে গোনা হয়, মাগুরার পুকুরে যার পরিমাণ ছিল ২৭১ টন। একই বছরে পাশের যশোর জেলায় শুধু পুকুর থেকেই উৎপাদন হয় ১,৪৩,৯৫২ টন।
অভয়াশ্রম, ক্ষতিকর জাল ও মৎস্য আইন
দেশি মাছ ফিরিয়ে আনতে জেলায় কী করা হচ্ছে, তা জানান সাধন চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, 'প্রতি উপজেলায় বছরে অন্তত একটি করে অভয়াশ্রম স্থাপন করা হচ্ছে। ক্ষতিকর জাল ব্যবহার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা সিএনআরএস ও এডিআইয়ের সহায়তায় জেলায় এ বছর ২০টি অভয়াশ্রম নির্মাণ হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছের প্রজাতি আবারও ফিরে আসছে।'
মৎস্য অভয়াশ্রম হলো নদী, খাল বা বিলের এমন অংশ, যেখানে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়, যাতে মা মাছ টিকে থেকে ডিম ছাড়তে পারে এবং পোনা বড় হতে পারে। ২০২৩-২৪ সালের ইয়ারবুকে উন্মুক্ত অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের বিশেষ কর্মসূচির মধ্যে অভয়াশ্রম স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা আছে; সঙ্গে আছে সমাজভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা, বিল নার্সারি, বিপন্ন প্রজাতিসহ পোনা অবমুক্তি, প্রজনন ও চলাচলের জন্য আবাস পুনরুদ্ধার, জেলেদের পরিচয়পত্র এবং মৎস্য সংরক্ষণ আইনের প্রয়োগ। ইয়ারবুক জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচিত নদী ব্যবস্থায় প্রায় ৫০৮টি মৎস্য অভয়াশ্রম এবং ছয়টি ইলিশ অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে।
জাতীয় হিসাবেই এর প্রয়োজন স্পষ্ট। ইয়ারবুক অনুযায়ী, দেশের মোট মাছ উৎপাদনে উন্মুক্ত জলাশয়ের আহরিত মাছের অংশ ১৯৮৩-৮৪ সালের ৬২.৫৯ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩-২৪ সালে ২৮.১৩ শতাংশে নেমেছে; এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে অতিরিক্ত আহরণ, মাছের আবাসের অবনতি ও বিলুপ্তি, জলাশয়ে পলি জমা এবং শিল্প ও কৃষি রাসায়নিকের দূষণ। নদীতে ইলিশ কমে যাওয়ার কারণের মধ্যে ইয়ারবুক মনোফিলামেন্টের ছোট ফাঁসের জাল, অর্থাৎ কারেন্ট জালের ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছে।
মাছ ধরার নিয়মকানুন প্রয়োগ হয় মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন এবং ১৯৮৫ সালের বিধিমালার অধীনে। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর জাটকা (ছোট ইলিশ) ধরায় আট মাসের নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, সংশোধিত মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৮৫ অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা ভাঙলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
এক নজরে বাংলাদেশের মাছ উৎপাদন
মাগুরার ঘাটতির বিপরীতে জাতীয় চিত্রটি প্রবৃদ্ধির। ২০২৩-২৪ সালের ইয়ারবুকে দেশের মোট মাছ উৎপাদন ধরা হয়েছে ৫০.১৮ লাখ টন, যা লক্ষ্যমাত্রা ৪৮.৯৩ লাখ টনের চেয়ে বেশি। বদ্ধ জলাশয়ের চাষ থেকে এসেছে ২৯.৭৮ লাখ টন বা ৫৯.৩৪ শতাংশ, উন্মুক্ত অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে ১৪.১২ লাখ টন বা ২৮.১৩ শতাংশ এবং সামুদ্রিক উৎস থেকে ৬.২৯ লাখ টন বা ১২.৫৩ শতাংশ। শুধু পুকুরের আয়তন ছিল ৪,২৪,১৬৮ হেক্টর, উৎপাদন ২৩,৬৮,৭৪১ টন, হেক্টরে গড়ে ৫,৫৮৪ কেজি, যা দেশের মোট মাছ উৎপাদনের ৪৭.২০ শতাংশ।
খাদ্য ও কর্মসংস্থানে মাছের গুরুত্ব বড়। ইয়ারবুক বলছে, বাংলাদেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে; মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণ ৬৭.৮০ গ্রাম, যেখানে লক্ষ্য ছিল ৬০ গ্রাম; আর দেশের জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ পূর্ণকালীন বা খণ্ডকালীনভাবে এ খাতে যুক্ত।
ছবি: JIBON / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ (১০ এপ্রিল ২০২৬), মৎস্য অধিদপ্তর (ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ ২০২৩-২৪), বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (পাবদা ও গুলশা চাষ নির্দেশিকা), আইইউসিএন বাংলাদেশ (রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, খণ্ড ৫: মিঠাপানির মাছ, ২০১৫), ফিশবেস, বাংলাপিডিয়া, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), জাগো নিউজ (২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (৭ মে ২০২১ ও ১ নভেম্বর ২০২৫), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)