খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূলীয় ঘেরে বাগদা চিংড়িকে বহুদিন ধরে বলা হয় "সাদা সোনা"। দেশ থেকে বিদেশে যে বড় আকারের চিংড়ি রপ্তানি হয়, এটি সেই বাগদা; দেশের মানুষের খাবারের তালিকাতেও এটি প্রিয়। আমাদের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যাঁদের পুকুর নেই তাঁরাও বাড়িতে মাঝারি আকারের একটি গভীর চৌবাচ্চায় বছরের যেকোনো সময় বাগদা চিংড়ি চাষ করতে পারেন, তবে পোনা ছাড়তে হবে সকালে বা সন্ধ্যায়, যখন তাপমাত্রা সহনীয় থাকে।
এই প্রতিবেদন সেই ধারণাটি রেখেই তা কর্তৃপক্ষের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছে। এখানে জানা যাবে বাগদা চিংড়ি আসলে কী, বাংলাদেশে এর চাষ কীভাবে হয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং তাদের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা পানি, পোনা, খাবার ও রোগ নিয়ে কী বলে, আর মজুদ ঘনত্ব, ফলন ও খরচ নিয়ে প্রকাশিত হিসাব কী দেখায়। সাধারণত যে মাটির পুকুরে এই চিংড়ি চাষ হয়, তার সঙ্গে বাড়ির চৌবাচ্চার পার্থক্য কোথায়, সেটিও এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে।
বাগদা চিংড়ি কী
বাগদা হলো Penaeus monodon প্রজাতির বাংলা নাম; ইংরেজিতে একে জায়ান্ট টাইগার প্রন বা ব্ল্যাক টাইগার শ্রিম্প বলা হয়। ১৭৯৮ সালে ইয়োহান ক্রিস্টিয়ান ফ্যাব্রিসিয়াস প্রথম এই প্রজাতির বর্ণনা দেন। অনেকে একে মাছ বললেও এটি মাছ নয়। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া চিংড়িকে কাঁকড়া ও লবস্টারের আত্মীয় ক্রাস্টেশিয়ান প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করেছে, যারা দশপদী বা ডেকাপোডা বর্গের সদস্য।
আমাদের মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পৃথিবীতে ৭টি পরিবারের ৫৪০ প্রজাতির বাগদা চিংড়ি আছে। এই সংখ্যাটি আসলে অনেক বড় একটি দলের। ৭টি পরিবারের ৫৪০টি জীবিত প্রজাতি মিলে গঠিত ডেনড্রোব্রাঙ্কিয়াটা উপবর্গ, অর্থাৎ যেসব চিংড়ি ডিম শরীরে বহন না করে সরাসরি পানিতে ছেড়ে দেয়। বাগদা সেই দলের একটি প্রজাতি মাত্র, পিনেইডি পরিবারের সদস্য, এবং এই দলের সবচেয়ে বড় প্রজাতিও এটিই: দৈর্ঘ্যে ৩৩৬ মিলিমিটার এবং ওজনে ৪৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।
এফএওর প্রজাতি পরিচিতি অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক বাগদা ৩৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং স্ত্রী চিংড়ি সাধারণত পুরুষের চেয়ে বড় হয়। তলদেশ, খাবার ও পানির ঘোলাটে ভাব অনুযায়ী এর শরীরের রং সবুজ, বাদামি, লাল, ধূসর বা নীল হয়, খোলসের ওপর আড়াআড়ি কালো ও হলুদ ডোরা থাকে। প্রকৃতিতে এটি পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে থাকে। এটি কেবল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সাগরে প্রজনন করে, আর জীবনের প্রথম পর্যায়গুলো কাটায় মোহনা, লেগুন ও ম্যানগ্রোভ বনে। দিনের বেলা এটি তলার মাটিতে গর্ত করে লুকিয়ে থাকে, রাতে খাবারের খোঁজে বের হয়।
বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বাংলাদেশে ৫৬ প্রজাতির চিংড়ি পাওয়া যায়: ৩৭টি লোনা পানির, ১২টি আধা-লোনা পানির এবং ৭টি মিঠা পানির। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চিংড়ির তালিকায় বাগদার গড় আকার পুরুষের ক্ষেত্রে ২৯.৮ সেন্টিমিটার এবং স্ত্রীর ক্ষেত্রে ৩০ সেন্টিমিটার; এর আবাস বঙ্গোপসাগর ও মোহনা, আর প্রজননকাল নভেম্বর থেকে মার্চ।

বাংলাদেশে বাগদা চাষের প্রেক্ষাপট
বাংলাপিডিয়া জানায়, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও কক্সবাজারে প্রায় ১,৪৫,০০০ হেক্টর উপকূলীয় ও জোয়ারভাটার জমিতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার খামারে বাগদা চাষ হচ্ছিল। কোথাও এটি এককভাবে, কোথাও অন্য মাছের সঙ্গে, খুলনা অঞ্চলে ধানের সঙ্গে এবং চকরিয়া অঞ্চলে লবণের সঙ্গে চাষ হতো। ১৯৮০ সালে লোনা পানির চিংড়ি পুকুর ছিল ২০,০০০ হেক্টরেরও কম। জ্ঞানকোষটি আরও লিখেছে, চিংড়ি পুকুর তৈরির জন্য চকরিয়া সুন্দরবনের বেশির ভাগ ম্যানগ্রোভ কেটে ফেলা হয়েছিল।
মৎস্য অধিদপ্তরের যে তথ্য ঢাকা পোস্ট ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশ করে, তাতে খাতটির চাপের চিত্র স্পষ্ট। ২০১১-১২ অর্থবছরে চিংড়ি উৎপাদন সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫২ হাজার ৫২৩ মেট্রিক টনে পৌঁছায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৯ হাজার ২১৩ মেট্রিক টনে। রপ্তানি সবচেয়ে বেশি হয় ২০০৬-০৭ অর্থবছরে, ৫৩ হাজার ৩৬১ মেট্রিক টন, যার মূল্য ছিল ২ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা; ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ৩৩ হাজার ৩৬২.৫২ মেট্রিক টন, মূল্য ৩ হাজার ৮৮.৮৫ কোটি টাকা। তখন উপকূলের প্রায় ১.৭০ লাখ হেক্টর ঘের ও খামারে, প্রায়ই ধান, মাছ বা লবণের সঙ্গে, বাগদা চাষ হতো।
বাংলাপিডিয়ায় বাংলাদেশের সনাতন ও উন্নত সনাতন চাষের প্রচলিত সময়সূচিও দেওয়া আছে: ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ঘের বা পুকুর প্রস্তুত করা হয়, ফেব্রুয়ারি-মার্চে পোনা মজুদ করা হয়, আর জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলে চিংড়ি আহরণ ও নতুন করে পোনা ছাড়া।
ঢাকা পোস্টের ওই প্রতিবেদনে চিংড়ি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের বাগদার রপ্তানি মূল্য যেখানে প্রতি পাউন্ড প্রায় ৭ ডলার, সেখানে ভেনামি চিংড়ি বিক্রি হয় প্রায় ৫ ডলারে। ভেনামি হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় সাদা চিংড়ি, যা ভারত ও ভিয়েতনাম বিপুল পরিমাণে চাষ করে। ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রথম আলো জানায়, খুলনার পাইকগাছায় দেশে ভেনামির প্রথম পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়েছে; বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) দেওয়া পুকুরে থাইল্যান্ড থেকে আনা ৮ লাখ পোনা ছাড়া হয়।
বাড়ির চৌবাচ্চায় কি বাগদা চাষ সম্ভব
মূল প্রতিবেদনে তিনটি ব্যবহারিক পরামর্শ ছিল। মাঝারি আকারের চৌবাচ্চা ব্যবহার করুন। খেয়াল রাখুন চৌবাচ্চাটি যেন গভীর হয়। আর পোনা ছাড়ুন সকালে অথবা সন্ধ্যায়, কারণ তখন তাপমাত্রা সহনীয় থাকে, নইলে পোনা মারা যেতে পারে। শেষ পরামর্শটি কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকার সঙ্গে সরাসরি মেলে; আর প্রথম দুটি কাজে লাগাতে হলে চৌবাচ্চায় কী কী থাকতে হবে, তা-ও নির্দেশিকাগুলো ব্যাখ্যা করে।
সবচেয়ে জরুরি তথ্য হলো, বাগদা লোনা ও আধা-লোনা পানির প্রাণী, তাই শুধু কলের বা নলকূপের মিঠা পানিতে এটি টেকে না। এফএও জানায়, কিশোর বাগদা প্রতি হাজারে ১ থেকে ২ ভাগ (পিপিটি) পর্যন্ত কম লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। এফএও ও এশিয়ার জলজ চাষ কেন্দ্রগুলোর নেটওয়ার্ক নাকার (NACA) প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা বলছে, পুকুরে বাগদা ৫ থেকে ৪০ পিপিটি লবণাক্ততা সহ্য করে এবং সবচেয়ে দ্রুত বাড়ে ১৫ থেকে ৩০ পিপিটিতে। তাই বাড়ির চৌবাচ্চায় লোনা পানির জোগান লাগবে; এফএও থাইল্যান্ডের ভেতরের দিকের হ্যাচারির কথা বলেছে, যারা ট্রাকে করে আনা সাগরের পানি বা লবণ পানি কিনে কাজ চালায়।
দ্বিতীয় তথ্যটি প্রাণীটির স্বভাব নিয়ে। এফএওর পরিচিতি অনুযায়ী, বাগদা তলদেশ থেকে খাবার খায় বলে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ হয় কেবল মাটির পুকুরে। এফএও আরও সতর্ক করেছে, কংক্রিটের ট্যাংকে পোনা লালন করলে বেঁচে থাকার হার কম হয়, কারণ বেশি ঘনত্বে পোস্টলার্ভা একে অপরকে খেয়ে ফেলে। তাই বাড়ির ছোট চৌবাচ্চাকে লাভজনক খামার না ভেবে অল্প কয়েকটি চিংড়ি নিয়ে পরীক্ষামূলক চাষ হিসেবে দেখাই ভালো।
তবে চিংড়ি চাষে ট্যাংকের ব্যবহার একেবারে নেই, তা নয়। এফএও ও নাকার নির্দেশিকায় কংক্রিটের ট্যাংকে পোনা লালনের বর্ণনা আছে: ট্যাংক ছাঁকা সাগরের পানিতে ভরা হয়, বাতাস সঞ্চালন করা হয়, পানির মান ঠিক রাখতে ডায়াটম যোগ করা হয়, আর পোস্টলার্ভা দেয়াল ও তলায় আঁকড়ে থাকে বলে বাড়তি জায়গা হিসেবে পলিথিনের জাল দেওয়া হয়। প্রতিদিন অর্ধেক পানি বদলানো হয়। এমন নার্সারি ট্যাংকে বাগদার জন্য প্রস্তাবিত ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৫,০০০ পোনা, এবং পুকুরে সরানোর আগ পর্যন্তই পোনা সেখানে থাকে।
পানি: লবণাক্ততা, তাপমাত্রা, পিএইচ ও অক্সিজেন
চৌবাচ্চায় চাষ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করে পানির ওপর। এফএও ও নাকার নির্দেশিকা চিংড়িচাষিরা যে মাপগুলো পরীক্ষা করেন তা দিয়েছে, এবং এ জন্য মাঠে ব্যবহারের পানি পরীক্ষার কিট, যাকে নির্দেশিকা সস্তা ও সহজে ব্যবহারযোগ্য বলেছে, আর একটি সাধারণ থার্মোমিটার ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
- লবণাক্ততা: সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি ১৫ থেকে ৩০ পিপিটিতে; পুকুরে প্রায় ৫ থেকে ৪০ পিপিটি পর্যন্ত সহ্য করে। লবণাক্ততা স্থির রাখতে হবে, ভারী বৃষ্টির পর যেমন হঠাৎ কমে যায়, তেমনটি যেন না হয়।
- তাপমাত্রা: পিনেইড চিংড়ির জন্য আদর্শ তাপমাত্রা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। নির্দেশিকা বলছে, বাগদা সারা বছর চাষ করা যায়; এটি মূল প্রতিবেদনের সেই কথাকেই সমর্থন করে যে বছরের যেকোনো সময় বাগদা চাষ সম্ভব।
- পিএইচ: সাধারণত ৭.৫ থেকে ৯.০ পিএইচের পানি উপযোগী। পিএইচ ৫.০-এর নিচে নামলে বৃদ্ধি কমে যায়, আর ৯.৫-এর বেশি হলে পানি ক্ষতিকর হতে পারে।
- দ্রবীভূত অক্সিজেন: ৪ পিপিএমের নিচে না নামাই ভালো। ভোরবেলা অক্সিজেন সবচেয়ে কম থাকে, কারণ সারা রাত উদ্ভিদ ও প্রাণী তা ব্যবহার করে।
- অ্যামোনিয়া: প্রতি লিটারে ০.৪৫ মিলিগ্রাম অ-আয়নিত অ্যামোনিয়া নাইট্রোজেনে চিংড়ির বৃদ্ধি অর্ধেকে নেমে আসতে দেখা গেছে। এর উৎস বর্জ্য ও পচা খাবার।
- হাইড্রোজেন সালফাইড: পানিতে ০.১ থেকে ০.২ পিপিএম হলে চিংড়ি ভারসাম্য হারায়, আর ৪ পিপিএমে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। তলার কালো, পচা কাদায় এটি তৈরি হয়।
নির্দেশিকা আরও বলছে, গরম পানিতে অক্সিজেন কম থাকে অথচ প্রাণীর প্রয়োজন বাড়ে, কারণ তাপমাত্রা প্রতি ১০ ডিগ্রি বাড়লে জৈবিক বিক্রিয়ার গতি মোটামুটি দ্বিগুণ হয়। ঠান্ডা সময়ে পোনা ছাড়ার পরামর্শের পেছনে এটিই কারণ। এ থেকে বোঝা যায়, রোদেলা উঠানে স্থির পানির ছোট চৌবাচ্চা কেন ঝুঁকিপূর্ণ: বাতাস মেশার মতো পানির উপরিভাগ কম, আর বর্জ্য দ্রুত জমে যায়। নিবিড় চাষে নির্দেশিকা প্রতিদিন এক-তৃতীয়াংশ পানি বদলানোর কথা বলেছে।

পোনা সংগ্রহ ও ছাড়ার নিয়ম
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রথম কাজ পোনা সংগ্রহ করা; আর পোনা কোথা থেকে আসছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাপিডিয়া জানায়, আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে পোনার প্রধান উৎস ছিল উপকূলের পানি থেকে জাল দিয়ে ধরা প্রাকৃতিক পোনা, এবং কক্সবাজার ও টেকনাফ এলাকার প্রায় ৪৮টি বাগদা হ্যাচারি বছরে প্রায় ৪০০ কোটি পোনা উৎপাদন করছিল। এফএও বলছে, অতিরিক্ত আহরণ এবং নার্সারি এলাকায় হোয়াইট স্পট রোগের কারণে প্রাকৃতিক পোনার ব্যবহার কমেছে, তাই এখন বেশির ভাগ খামার হ্যাচারির পোনার ওপর নির্ভর করে।
এফএও মজুদের আগে পোস্টলার্ভা পরীক্ষার পরামর্শ দেয়: হোয়াইট স্পট ও অন্যান্য ভাইরাস শনাক্তে পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) পরীক্ষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ঢাকা পোস্টকে বলেন, দুটি হ্যাচারিতে ভাইরাসমুক্ত বাগদা চিংড়ির চাষ শুরু হয়েছে। এফএওর হিসাবে ডিম ফোটার পর পোস্টলার্ভা-১৫ (পিএল-১৫) পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় ২৬ দিন লাগে; সাধারণত এই পর্যায়ের পোনাই মজুদ করা হয়। পোনা কীভাবে পরিবহন করতে ও ছাড়তে হয়, এফএও ও নাকার নির্দেশিকা তা এভাবে ব্যাখ্যা করেছে:
- পরিবহন: সাধারণত অক্সিজেনভরা পলিথিন ব্যাগে পোনা আনা হয়। ৬০ বাই ৪০ সেন্টিমিটারের একটি ব্যাগে ৬ থেকে ৮ লিটার সাগরের পানি আর ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ পোনা রাখা হয়; ভাঙা বরফ ও কাঠের গুঁড়া দিয়ে পানির তাপমাত্রা প্রায় ২২ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে রাখলে পোনা ১২ ঘণ্টার বেশি বেঁচে থাকে।
- খাপ খাওয়ানো: তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার হঠাৎ পরিবর্তনে পোনা খুব সংবেদনশীল। ব্যাগের পানির সঙ্গে ধীরে ধীরে পুকুর বা চৌবাচ্চার পানি মেশান, অথবা বন্ধ ব্যাগগুলো পানিতে ভাসিয়ে রাখুন যতক্ষণ না দুই পানির তাপমাত্রা সমান হয়, তারপর আস্তে আস্তে পোনা ছাড়ুন।
- সময়: পানি যখন ঠান্ডা থাকে, তখন পোনা ছাড়াই ভালো, অর্থাৎ ভোরে সকাল ৭টা থেকে ১০টা অথবা রাতে ৯টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। মূল প্রতিবেদনের পরামর্শের সঙ্গে এটি মিলে যায়।
- লালন: মজুদের পর প্রথম কয়েক দিনে নাড়াচাড়া, পরিবহন ও খাপ খাওয়ানোর চাপে অনেক পোনা মারা যায়, তাই অনেক সময় পোনাকে প্রায় এক মাস থেকে ৪৫ দিন নার্সারি পুকুর, ট্যাংক বা জালের খাঁচায় লালন করে তারপর মূল পুকুরে ছাড়া হয়।
খাবার ও প্রতিদিনের যত্ন
প্রকৃতিতে বাগদা ছোট ক্রাস্টেশিয়ান, শামুক-ঝিনুক জাতীয় প্রাণী, কেঁচোজাতীয় পলিকিট ও তলার অন্যান্য ধীরগতির প্রাণী খায়; পা দিয়ে খাবার তুলে ধীরে ধীরে কুরে কুরে খায়। নির্দেশিকা একে সর্বভুক ও উচ্ছিষ্টভোজী বলেছে, তবে সতর্ক করেছে যে খাবার কম বা নিম্নমানের হলে চিংড়ি স্বজাতিকে খেতে শুরু করে।
প্রতিদিন চিংড়ির আনুমানিক মোট ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে খাবার দেওয়া হয়, আর চিংড়ি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হার কমে; নির্দেশিকায় ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে চতুর্থ মাসে ৪ শতাংশে নামানোর একটি ক্রমহ্রাসমান হারের উল্লেখ আছে। সাধারণত দিনে ২ থেকে ৫ বার খাবার দেওয়া হয়। দিনে পাঁচবার খাওয়ালে দুবার দিনের বেলায় আর তিনবার রাতে দিতে হবে, কারণ অন্ধকারে চিংড়ি বেশি সক্রিয় থাকে।
খাবারের পরিমাণ ঠিক আছে কি না, তা বোঝা যায় খাবারের ট্রে দিয়ে। খাবারের একটি অংশ পানিতে নামানো ট্রেতে রাখা হয়; পরের বার খাবার দেওয়ার সময় ট্রে খালি থাকলে একটু বাড়ানো হয়, আর খাবার রয়ে গেলে কমানো হয়। এফএও জানায়, দানাদার খাবার সাধারণত দুই ঘণ্টার বেশি অটুট থাকে না, তাই উচ্ছিষ্ট খাবার দ্রুত পানি নষ্ট করে। ছোট চৌবাচ্চায় না খাওয়া খাবার তুলে ফেলা উচিত। পানি ও চিংড়ির অবস্থা পরীক্ষার সবচেয়ে ভালো সময় প্রতিদিন সকাল, যখন অক্সিজেন সবচেয়ে কম থাকে। খোলস বদলের পর নতুন খোলস নরম থাকা অবস্থায় চিংড়িকে সঙ্গীরা খেয়ে ফেলতে পারে; ভিড়ের চৌবাচ্চায় চিংড়ি কমে যাওয়ার এটি একটি কারণ।
রোগবালাই ও প্রতিরোধ
বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশের চিংড়ি খামারে ব্যাপক মড়কের জন্য দায়ী রোগগুলোর তালিকা দিয়েছে: হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস, ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়াজনিত ভিব্রিওসিস, নরম খোলস, কালো ফুলকা, মাংসপেশির পচন, এবং ছত্রাক ও প্রোটোজোয়াজনিত সংক্রমণ। জ্ঞানকোষটি রোগের প্রাদুর্ভাবকে মূলত পুকুরের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, তলা ও পানির খারাপ মান এবং কারিগরি জ্ঞানের অভাবের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সবচেয়ে মারাত্মক হোয়াইট স্পট রোগ। এফএওর বর্ণনায়, আক্রান্ত চিংড়ি খাওয়া কমিয়ে দেয়, নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং দলে দলে মারা যায়; লক্ষণ দেখা দেওয়ার ৩ থেকে ১০ দিনের মধ্যে মোট মৃত্যু শতভাগে পৌঁছাতে পারে। অনেক চিংড়ির খোলস ঢিলে হয়ে যায় এবং তাতে ০.৫ থেকে ২.০ মিলিমিটারের সাদা দাগ দেখা দেয়, যা মাথার খোলসের ভেতরের দিকে সবচেয়ে স্পষ্ট; মরণাপন্ন চিংড়ি গোলাপি বা লালচে-বাদামি হয়ে যেতে পারে। ইয়েলোহেড রোগেও ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে শতভাগ চিংড়ি মারা যেতে পারে।
এফএও স্পষ্ট বলেছে, এসব ভাইরাস সংক্রমণ সারানোর কোনো রাসায়নিক বা ওষুধ নেই। তাপমাত্রা বা লবণাক্ততার হঠাৎ পরিবর্তনের পর, যেমন ভারী বৃষ্টির পর, এবং খারাপ পানির চাপে হোয়াইট স্পটের প্রাদুর্ভাব ঘটে। তাই প্রতিরোধই ভরসা, আর তা নির্ভর করে ব্যবস্থাপনার ওপর:
- শুধু ভাইরাস পরীক্ষিত, সম্ভব হলে পিসিআর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ পোস্টলার্ভা মজুদ করুন।
- পানির অবস্থার হঠাৎ পরিবর্তন এড়িয়ে চলুন এবং তলা বর্জ্যমুক্ত রাখুন।
- কাঁচা খাবার, বিশেষ করে ক্রাস্টেশিয়ান জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো ভাইরাস বহন করতে পারে।
- কাঁকড়া ও অন্যান্য ক্রাস্টেশিয়ান যেন ঢুকতে না পারে, আর জাল ও সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখুন।
- অস্বাভাবিক মড়ক দেখলে আন্দাজে ওষুধ না দিয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে জানান।
মজুদ ঘনত্ব, ফলন ও খরচ: সূত্র যা বলে
এফএওর পরিচিতিতে বাগদা চাষকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সনাতন বা এক্সটেনসিভ খামার, যা বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামে প্রচলিত, সাধারণত পাঁচ হেক্টরের চেয়ে বড় জোয়ারনির্ভর পুকুরে প্রতি বর্গমিটারে ২টির বেশি চিংড়ি ছাড়ে না, এবং ছয় মাস বা তার বেশি সময় পরে ৫০ গ্রামের বেশি ওজনের চিংড়ি তোলে; ফলন হেক্টরপ্রতি বছরে ৫০ থেকে ৫০০ কেজি। আধা-নিবিড় পুকুরে প্রতি বর্গমিটারে ৫ থেকে ২০টি পোস্টলার্ভা ছাড়া হয়, ফলন ৫০০ থেকে ৪,০০০ কেজি। নিবিড় পুকুরে ছাড়া হয় ২০ থেকে ৬০টি, ব্যাপক বায়ু সঞ্চালন লাগে, ফলন ৪,০০০ থেকে ১৫,০০০ কেজি।
এফএও ও নাকার নির্দেশিকায় সনাতন চাষের একটি মাঠপর্যায়ের উদাহরণ আছে: প্রতি বর্গমিটারে ১টি চিংড়ি ছাড়লে আহরণের সময় একেকটির ওজন হয়েছে ৩৫ গ্রাম, ২টিতে ৩০ গ্রাম, আর ৪টিতে তা নেমে এসেছে ১৫ গ্রামে। নির্দেশিকার সিদ্ধান্ত, রপ্তানির জন্য পছন্দের ৩০ থেকে ৩৫ গ্রাম আকার ধরলে প্রতি বর্গমিটারে ২টিতেই সবচেয়ে ভালো ফলন ও আয় হয়েছে। অর্থাৎ একই পানিতে বেশি পোনা মানে ছোট চিংড়ি; ভিড়ের চৌবাচ্চায় তাই উৎপাদন সামান্য হয়।
আমরা যেসব কর্তৃপক্ষের তথ্য দেখেছি, তার কোনোটিতেই বাড়ির চৌবাচ্চায় বাগদা চাষের ফলন বা আয়ের হিসাব নেই, তাই এই প্রতিবেদনেও কোনো হিসাব দেওয়া হলো না। যেসব হিসাব আছে, সেগুলো পুকুরের। ২০২১ সালে পাইকগাছায় ভেনামির পরীক্ষামূলক চাষ শুরুর সময় মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে বলেন, ৮ লাখ পোনা থেকে ১৬ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদনের আশা করছেন তাঁরা, যা ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকায় বিক্রি হতে পারে, আর খরচ হবে ৪০ লাখ টাকার মতো। এটি ছিল একটি পুকুর প্রকল্প নিয়ে কর্মকর্তাদের অনুমান, চৌবাচ্চার জন্য কোনো প্রতিশ্রুতি নয়।

পরামর্শ ও সহায়তা কোথায় পাবেন
পুকুরে হোক বা চৌবাচ্চায়, বাগদা চাষ শুরু করতে চাইলে আগে মৎস্য অধিদপ্তরের উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলুন। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা পোস্টকে বলেন, আধুনিক চিংড়ি চাষের ওপর চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে; পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষের পরিকল্পনায় অধিদপ্তর সম্প্রসারণ সেবা, চাষি প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী খামার পরিচালনার কথাও উল্লেখ করেছে। স্থানীয় পানি, নির্ভরযোগ্য হ্যাচারি ও ভাইরাস পরীক্ষিত পোনা নিয়ে উপজেলা কর্মকর্তা পরামর্শ দিতে পারেন।
সরকারের মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএফআরআই ২০২১ সালের ভেনামি পরীক্ষার জন্য পাইকগাছায় ছয়টি পুকুর দিয়েছিল।
ছবি: CSIRO / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), এফএও কালচারড অ্যাকোয়াটিক স্পিসিজ ইনফরমেশন প্রোগ্রাম (Penaeus monodon), এফএও ও নাকার প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা "Shrimp Culture: Pond Design, Operation and Management" (১৯৮৬), বাংলাপিডিয়া (চিংড়ি), ঢাকা পোস্ট (৩০ ডিসেম্বর ২০২০, মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য), প্রথম আলো (২৮ এপ্রিল ২০২১), উইকিপিডিয়া (Dendrobranchiata, Penaeus monodon)





মন্তব্য
(০)