ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলায় ২০২৬ সালের ৯ জুন মঙ্গলবার গোখরা সাপের কামড়ে শিফা আক্তার (১৬) নামের এক মাদরাসাছাত্রীর মৃত্যু হয়। জাগো নিউজ ২৪ সেদিন জানায়, উপজেলার পলাশতলী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। শিফা দড়িপাড়া এলাকার রিয়াজ উদ্দিনের মেয়ে।
সকালে কামড়, বিকেলে অবস্থার অবনতি
পারিবারিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেদিন সকালে ঘরের ভেতরে ফ্রিজের ওপর থেকে কিছু একটা নামানোর সময় একটি বিষধর গোখরা সাপ শিফার পায়ে কামড় দেয়। শুরুতে সে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি এবং স্বাভাবিকভাবে মাদরাসায় চলে যায়। বিকেল থেকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করলে তাকে দ্রুত ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ হাসানুল বলেন, 'শিফা আক্তার নামের সাপে কাটা এক রোগী হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।'

ফুলবাড়িয়া উপজেলা ও গোখরা সাপ
ফুলবাড়িয়া ময়মনসিংহ জেলার একটি উপজেলা। এর আয়তন ৩৯৮.৭০ বর্গকিলোমিটার, ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৪,৯৫,৯১৭। একটি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি; খিরু, নাগেশ্বরী, বানার ও বাজুয়া এখানকার প্রধান নদী।
গোখরা ফণাধারী বিষধর সাপ। দক্ষিণ এশিয়ার ভারতীয় গোখরা (Naja naja) বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ নেপালে পাওয়া যায়। বন, ধানখেত ও জলাভূমির পাশাপাশি গ্রাম ও শহরতলিতে মানুষের বসতির কাছেও এটি দেখা যায়। এর বিষে শক্তিশালী নিউরোটক্সিন থাকে, যা স্নায়ুর ওপর কাজ করে পেশি অবশ করে দেয়। গুরুতর ক্ষেত্রে কামড়ের তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশিও অবশ হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ও বিশ্বে সাপের কামড়ের চিত্র
পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস সাময়িকীতে ২০১০ সালে প্রকাশিত গ্রামীণ বাংলাদেশের এক গবেষণার হিসাবে, দেশের গ্রামাঞ্চলে বছরে আনুমানিক ৫,৮৯,৯১৯ জন সাপের কামড়ের শিকার হন এবং আনুমানিক ৬,০৪১ জন মারা যান। ওই গবেষণায় ৭১ শতাংশ কামড় লেগেছিল পায়ে। কামড়ের পর ৮৬ শতাংশ মানুষ প্রথমে গিয়েছিলেন ওঝা বা সাপুড়ের কাছে; সরাসরি চিকিৎসক বা হাসপাতালে গিয়েছিলেন মাত্র ৩ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০১৯ সালের কৌশলপত্রে জানায়, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২৭ লাখ মানুষ বিষধর সাপের কামড়ে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন এবং ৮১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা যান। সংস্থাটি সাপের কামড়কে অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এতে মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছে।

সাপে কাটলে করণীয়: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ
ডব্লিউএইচওর ২০১৯ সালের প্রশ্নোত্তর নির্দেশনা অনুযায়ী, সাপে কাটার প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে প্রচলিত বেশির ভাগ পদ্ধতি হয় অকার্যকর, নয়তো বিপজ্জনক, অথবা সঠিক চিকিৎসা দেরি করিয়ে দেয়। সংস্থাটির পরামর্শ:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্থির রাখুন, একেবারেই নড়াচড়া করতে দেবেন না।
- অস্থায়ী স্ট্রেচারে করে দেরি না করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিন; সম্ভব হলে কাত করে শোয়ান, যাতে শ্বাসনালি ও শ্বাসপ্রশ্বাস সুরক্ষিত থাকে।
- সরু শক্ত বাঁধন (টুর্নিকেট) দেবেন না, ক্ষতস্থান বা আক্রান্ত অঙ্গ কাটবেন না, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের মতো রাসায়নিক লাগাবেন না, গরম কাচের পাত্র দিয়ে বিষ টেনে বের করার চেষ্টা করবেন না।
- কালো পাথরের মতো পদ্ধতি অকার্যকর; এতে শুধু মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।
ডব্লিউএইচও বলেছে, প্রাণঘাতী সাপের কামড়ের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা সঠিক অ্যান্টিভেনম। কামড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব এটি দিলে ফল সবচেয়ে ভালো হয়, কারণ বিষের অনেক প্রভাব, যেমন কিছু স্নায়বিক ক্ষতি, পরে আর ফেরানো যায় না।
ঘরে সাপ ঠেকাতে সংস্থাটি বাড়ি এমনভাবে বন্ধ রাখার কথা বলেছে, যাতে সাপ ঢুকতে না পারে; তা সম্ভব না হলে উঁচু মাচা বা খাটে ভালোভাবে গুঁজে দেওয়া মশারির ভেতরে ঘুমানোর পরামর্শ দিয়েছে। বাড়ির আশপাশ, চলাচলের পথ ও শিশুদের খেলার জায়গায় ঘাস ছোট রাখা ও আবর্জনা সরিয়ে ফেলা, রাতে বাইরে আলো নিয়ে চলা এবং জুতা পরাও কামড়ের ঝুঁকি কমায়।
ছবি: Holger Krisp / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)