সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

মিরসরাইয়ে কৃষি অফিসের প্রদর্শনী প্লটে ব্রোকলি চাষে সফল তরুণ উদ্যোক্তা মামুন

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে উপজেলা কৃষি অফিসের প্রদর্শনী প্লটে ৫০ শতক জমিতে ব্রোকলির ভালো ফলন পান তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মোহাম্মদ মামুন। এসএসিপি প্রকল্পের আওতায় সে মৌসুমে উপজেলায় ১৫ জন কৃষক ৫ একরে ব্রোকলি চাষ করেন।

মিরসরাইয়ে কৃষি অফিসের প্রদর্শনী প্লটে ব্রোকলি চাষে সফল তরুণ উদ্যোক্তা মামুন
শাকসবজি

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মোহাম্মদ মামুন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া প্রদর্শনী প্লট থেকে ব্রোকলির ভালো ফলন পাচ্ছিলেন। জাগো নিউজের মিরসরাই উপজেলা প্রতিনিধি ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এ খবর জানান। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে মৌসুমে এসএসিপি প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় তিনটি প্রদর্শনীর মাধ্যমে ৫ একর জমিতে গ্রিন ক্রাউন জাতের ব্রোকলি চাষ হচ্ছিল, আর চাষিরা জানান, অন্য সবজির চেয়ে ব্রোকলি ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে মামুন বলেন, অনেক ক্রেতা এখনো সবজিটি চেনেন না; উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, ব্রোকলিকে মানুষের কাছে পরিচিত করতে তাঁর দপ্তর মাঠ দিবস করছে।

পাঁচ একর প্রদর্শনী প্লটে ১৫ জন কৃষক


উপজেলা কৃষি অফিসের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন চলমান শীত মৌসুমে প্রদর্শনী হিসেবে ৫ একর জমিতে ১৫ জন কৃষক ব্রোকলি চাষ করেছেন। প্রতিবেদনে ব্রোকলিকে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ও কম খরচে চাষযোগ্য সবজি হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং বলা হয়, মামুনের মতো আরও অনেকে এ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। চাষিরা প্রতিবেদককে জানান, অন্যান্য সবজির তুলনায় ব্রোকলি ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে।

মামুন উপজেলার পূর্ব মলিয়াইশ এলাকার বাসিন্দা। কৃষি অফিসের দেওয়া প্রদর্শনীর আওতায় তিনি নিজের ৫০ শতক জমিতে ব্রোকলি চাষ করেন; দেশের প্রচলিত জমির মাপে ১০০ শতকে এক একর, অর্থাৎ জমিটি প্রায় আধা একর। সরেজমিনে প্রতিবেদক জানতে পারেন, ওই জমিতে তিনি ১ হাজার ৫০০ ব্রোকলির চারা লাগিয়েছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছিল; কোনো কোনো ব্রোকলির ওজন হয়েছিল ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম। বাজারে এসব ব্রোকলি বিক্রি হচ্ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকায়, আকার অনুযায়ী দামের হেরফের হচ্ছিল।

মামুনের বাবা প্রতিবেদককে বলেন, ব্রোকলি চাষে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা তাঁদের নানা পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, 'বিক্রির দামটা যদি আরও বেশি পেতাম, তবে আরও লাভবান হতে পারতাম।'

পরিবারের জন্য এক টুকরো জমি থেকে বাণিজ্যিক চাষ


মামুন জানান, ভাবনাটা এসেছিল বাড়ির সবজি খেত থেকে। তিনি বলেন, 'গত বছর নিজেদের খাওয়ার জন্য কিছু জায়গায় ব্রোকলি চাষ করেছিলাম। খুব ভালো ফলন হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে চাষের পরিকল্পনা করি। উপজেলা কৃষি অফিসের প্রদর্শনী পেয়ে ৫০ শতক জমিতে চাষ করি। ফলন ভালো হয়েছে।'

তাঁর হিসাবে খরচ হয়েছিল ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা, আর ওই জমির ব্রোকলি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশা করছিলেন। এ অঙ্কগুলো প্রতিবেদনের সময়ে তাঁর নিজের দেওয়া হিসাব ও প্রত্যাশা; চূড়ান্ত বিক্রির কোনো তথ্য প্রতিবেদনে ছিল না।

তাঁর বর্ণনায় মূল সমস্যা খেতে নয়, বাজারে। তিনি বলেন, 'ব্রোকলির সঙ্গে এখনকার মানুষ তেমন পরিচিত নন। অনেক সময় ক্রেতারা কিনতে আগ্রহী হন না। তবে ভিন্ন হচ্ছে যারা ব্রোকলি সম্পর্কে জানেন; তারা বিক্রির নির্ধারিত দাম থেকে বেশি দিয়ে কিনে নেন। সাধারণ মানুষ পরিচিত হলে ভালো দামে বিক্রি করে দ্বিগুণ লাভ করা সম্ভব।'

বাংলাদেশের একটি সবজির দোকানে শালগম, আলু ও মুলার সঙ্গে ব্রোকলি, জানুয়ারি ২০২৪। ছবি: Sm faysal / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের একটি সবজির দোকানে শালগম, আলু ও মুলার সঙ্গে ব্রোকলি, জানুয়ারি ২০২৪। ছবি: Sm faysal / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কৃষি অফিস ও মাঠ দিবস


মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় জাগো নিউজকে বলেন, ব্রোকলি একটি পুষ্টিকর সবজি। তাঁর ভাষায়, 'এতে অ্যান্টি ক্যানসার উপাদানসহ বিভিন্ন ভিটামিন আছে, যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। যেহেতু ব্রোকলি অনেকেই চেনেন না, তারপরও মোটামুটি চাহিদা আছে। আমরা এটি চাষাবাদের পাশাপাশি বাজারজাত এবং মানুষের কাছে পৌঁছাতে মাঠ দিবস করছি। এর উপকারিতাসহ নানা বিষয়ে জনসম্মুখে আলোচনা করছি। আশা করি চাষাবাদের পরিমাণ আরও বাড়বে।'

উপজেলা কৃষি অফিস কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি সম্প্রসারণ সংস্থা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মাঠপর্যায়ের দপ্তর। ঢাকা ট্রিবিউনে ২০২৩ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এ সেবার ইতিহাসবিষয়ক এক লেখা অনুযায়ী, কয়েকটি সংস্থা একীভূত করে ১৯৮২ সালে বর্তমান অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে ১৯৭৫ সালে কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা) এবং পাট পরিদপ্তর গঠিত হয়েছিল, পরে আসে তুলা উন্নয়ন বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড ও উদ্যান উন্নয়ন বোর্ডের মতো নির্দিষ্ট ফসলভিত্তিক সংস্থা।

মামুন যে ধরনের প্রদর্শনী প্লট পেয়েছেন, ব্রোকলি পরিচিত করাতে অধিদপ্তর এমন প্রদর্শনী আগেও করেছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের বরাতে রাজশাহীর ডিএইর এক উপপরিচালককে উদ্ধৃত করে জানায়, একসময় গ্রামের কৃষক ও ভোক্তাদের কাছে ফসলটি অপরিচিত ছিল; সম্প্রসারণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এটিকে জনপ্রিয় করতে কাজ করেছে এবং অধিদপ্তর প্রদর্শনী প্লটে এর চাষ করেছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ফুলকপি ও বাঁধাকপির চেয়ে ব্রোকলি বেশি তাপমাত্রা সইতে পারে।

এসএসিপি প্রকল্প কী


এসএসিপি হলো স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট (ক্ষুদ্র কৃষকের কৃষি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রকল্প), কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প, যাতে অর্থায়ন করেছে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ)। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে মিরসরাইয়ের ব্রোকলি প্রদর্শনীগুলোকে এ প্রকল্পের আওতাভুক্ত বলা হয়। ইফাদের নির্বাহী বোর্ডে উপস্থাপিত ২০১৮ সালের ২১ মার্চ তারিখের প্রেসিডেন্টস রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রকল্পটি সাজানো হয়েছিল বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে উচ্চমূল্যের ফসলের উন্নয়নকে ঘিরে। এর পেছনে ধারণা ছিল, পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণের কৃষকেরা সহজে ঢাকার বাজারে সবজি, ডাল, ফল ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্য পাঠাতে পারবেন।

দক্ষিণাঞ্চল কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল, নথিতে তার ব্যাখ্যাও আছে। সেখানে বলা হয়, দেশে দরিদ্র মানুষের হার সবচেয়ে বেশি বরিশাল বিভাগে, ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ; আর ২০০৮ সালের কৃষিশুমারি অনুযায়ী দক্ষিণাঞ্চলে কৃষক খানা ছিল প্রায় ৩১ লাখ, যার ২৭ লাখই ক্ষুদ্র কৃষক। অঞ্চলটি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, ভূমিক্ষয়, লবণাক্ততা, বন্যা ও জলাবদ্ধ মাটির ঝুঁকিতে থাকে। প্রকল্পটি সরকারের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার (২০১৩) সঙ্গে সংগতি রেখে সাজানো হয়, আর ইফাদের ঋণটি ছিল অত্যন্ত সহজ শর্তে: ১০ বছরের রেয়াতকালসহ ৪০ বছরে পরিশোধযোগ্য।

একই নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটি ১১টি জেলার ৩০টি উপজেলায় বাস্তবায়নের কথা ছিল, লক্ষ্য নির্ধারণের মানদণ্ড অনুযায়ী বাছাই করা হবে ২৫০টি ইউনিয়ন। লক্ষ্যভুক্ত ৩০টি উপজেলার মোট জনসংখ্যা ছিল ৭০ লাখ ১৮ হাজার ২১৮, খানা ১২ লাখ ৪৬ হাজার ২১। প্রকল্প থেকে সরাসরি উপকৃত হওয়ার কথা অন্তত আড়াই লাখ গ্রামীণ খানার। উপকারভোগীর প্রায় ৮০ শতাংশ হবেন ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক; তরুণ প্রায় ২০ শতাংশ আর নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ৩০ শতাংশ। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ছয় বছর।

নকশায় তিনটি কারিগরি অংশ ও একটি ব্যবস্থাপনা অংশ রয়েছে:

  • উচ্চমূল্যের ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি গ্রহণ: ক্ষুদ্র কৃষকদের দিয়ে নতুন প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও গ্রহণ, আর স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গবেষণা।
  • উচ্চমূল্যের ফসলের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন: বহু অংশীজনের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাজার-সংযোগ, ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, এবং সরবরাহ শৃঙ্খলজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি।
  • জলবায়ু-সহনশীল ভূপৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবস্থাপনা: সেচ ও নিষ্কাশন অবকাঠামো, সঙ্গে পানি ব্যবহারকারী দলের প্রশিক্ষণ।
  • প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সমন্বয়, যার নেতৃত্বে ডিএইর প্রকল্প দপ্তর।

ইফাদের নথিতে চারটি বাস্তবায়নকারী সংস্থার নাম আছে: ডিএই, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর (ডিএএম), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি); প্রকল্প সমন্বয়ক আসবেন বারি থেকে প্রেষণে। মাঠপর্যায়ে মূল দায়িত্বে থাকবেন ডিএইর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও ডিএএম নিযুক্ত বিপণন সহায়কেরা। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০১৮ সালের আগস্টে জানায়, প্রকল্পের ব্যয় ৯২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বা ১০ কোটি ৯৮ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার: ইফাদের ঋণ ৬ কোটি ৪৫ লাখ ডলার ও অনুদান ২০ লাখ ডলার, সরকারের ২ কোটি ৮৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার, বেসরকারি খাতের ৮১ লাখ ডলার এবং উপকারভোগীদের ৬৬ লাখ ডলার। ২০২১ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘ বাংলাদেশের এক লেখায় বলা হয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণসহ কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে; সেখানে পটুয়াখালীর এক অগ্রণী কৃষকের কথা ছিল, যিনি প্রকল্পের প্রদর্শনী প্লটের ফুলকপি বিক্রি করেছিলেন।

মিরসরাই: পাহাড় আর সাগরের মাঝের উপজেলা


মিরসরাই চট্টগ্রাম জেলার সবচেয়ে উত্তরের উপজেলা। দেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এর আয়তন ৪৮২ দশমিক ৮৮ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলা, দক্ষিণে সীতাকুণ্ড উপজেলা ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ফটিকছড়ি উপজেলা আর পশ্চিমে সোনাগাজী ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা। প্রধান নদী ফেনী; জ্ঞানকোষে সন্দ্বীপ চ্যানেল এবং ইছাখালী, মহামায়া, ডোমখালী, হিঙ্গুলী ও মায়ানী খালের কথাও আছে।

বাংলাপিডিয়ায় উপজেলার জনসংখ্যা ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৭১৬, ইউনিয়ন ১৬টি; এর মধ্যে আছে মিঠানালা, মায়ানী, দুর্গাপুর, করেরহাট ও জোরারগঞ্জ। খানার ৫১ দশমিক ৩০ শতাংশ কৃষিজমির মালিক, ভূমিহীন ৪৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। প্রধান ফসল ধান, ডাল, আলু, বেগুন, শাকসবজি ও বাঁশ; প্রধান রপ্তানিপণ্য বাঁশ, মাছ, ধান, আলু, কলা ও শাকসবজি। জ্ঞানকোষ অনুযায়ী আখ, পাট, অড়হর, সরিষা, তিল, তিসি ও চিনাবাদাম এখানে বিলুপ্ত বা প্রায় বিলুপ্ত ফসল, আর প্রধান ফল আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, লিচু, আনারস ও তরমুজ।

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মহামায়া হ্রদ, অক্টোবর ২০১৪। ছবি: Hasib / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মহামায়া হ্রদ, অক্টোবর ২০১৪। ছবি: Hasib / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বাংলাদেশের খেতে যেভাবে এল ব্রোকলি


ব্রোকলি (Brassica oleracea var. italica) ক্রুসিফেরাস বা ব্রাসিকা পরিবারের সবজি; যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তালিকায় এ পরিবারে আছে বাঁধাকপি, ফুলকপি, কেল, মুলা ও শালগমও। বাংলাদেশে এটি শীতের ফসল, কিছুদিন আগেও শহরের বাজারের বাইরে তেমন পরিচিত ছিল না। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে একে রাজশাহীতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা অপ্রচলিত শীতকালীন সবজি বলা হয়, যার চাহিদা বাড়ছিল শহুরে ভোক্তা, চায়নিজ রেস্তোরাঁ ও হোটেলে; সেখানে বলা হয়, ব্রোকলির দাম ফুলকপির তিন থেকে চার গুণ। ওই প্রতিবেদনে বারির এক ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বাণিজ্যিক ব্রোকলি চাষের সম্ভাবনা উজ্জ্বল, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোর দীর্ঘ শীত ফসলটির জন্য উপযোগী; স্থানীয়ভাবে একে সবুজ ফুলকপি বলা হয়।

একই প্রতিবেদনে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক প্রকল্প পরিচালক বলেন, ব্রোকলির চাষপদ্ধতি বাঁধাকপি ও ফুলকপির মতোই, আর ৬৫ থেকে ৭০ দিনে হেক্টরপ্রতি অন্তত ৪০ থেকে ৫০ হাজার গাছ উৎপাদন করা যায়।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় তিন হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ব্রোকলি চাষ হচ্ছে; দুই বছর আগে ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম-২ (এনএটিপি-২) প্রকল্পের অংশ হিসেবে স্থানীয় কৃষি বিভাগ পাইলট আকারে এর চাষ শুরু করেছিল। শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, পোকামাকড়ে কম ক্ষতি হয় বলে ফসলটি দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। সেখানকার এক কৃষক বিঘাপ্রতি খরচ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আর বিক্রি ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা বলে জানান; পাইকারি দাম ছিল প্রতিটি ১৫ থেকে ২০ টাকা। একই চাষির ভাষ্য, চারা রোপণের ৯০ দিনের কম সময়ে ব্রোকলি তোলা যায়; আরেক চাষি জানান, এক বিঘায় তাঁর প্রথম আবাদে ৪ হাজার ব্রোকলি হয়েছিল। জেলা ডিএই দপ্তরের উপপরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, দেশের পুষ্টিঘাটতি পূরণে ব্রোকলি ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে বার্তা সংস্থা ইউএনবির এক প্রতিবেদন, যা বাণিজ্যবিষয়ক সাইট ফ্রেশপ্লাজা প্রকাশ করে, জানায় যে যশোরের মণিরামপুরে ২০১৬ সালে পলাশী গ্রামে প্রথম ব্রোকলি চাষ হয়, যা শুরু করেছিল সফল নামের একটি বেসরকারি সংস্থা। সেখানকার কৃষকেরা বলেন, প্রচলিত সবজির চেয়ে এটি লাভজনক, পোকার আক্রমণও কম, আর ফসল যায় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা প্রান্তে। এসব আগের প্রতিবেদনেও সেই একই চিত্র, যা মামুন মিরসরাইয়ে বলেছেন: যেখানে ক্রেতা সবজিটি চেনেন সেখানে ফলন ও দাম ভালো, আর সেই বাজার বড় করতে কাজ করছেন সম্প্রসারণকর্মীরা।

গাছে ব্রোকলির মাথা, স্পেনের কাতালোনিয়ায় তোলা ছবি। ছবি: Victor M. Vicente Selvas / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গাছে ব্রোকলির মাথা, স্পেনের কাতালোনিয়ায় তোলা ছবি। ছবি: Victor M. Vicente Selvas / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

বপন, দূরত্ব ও ফলন নিয়ে গবেষণা যা বলে


দেশের নানা অঞ্চলে ব্রোকলি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে বারির কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে ২০০৯-১০ রবি মৌসুমে করা এক মাঠ পরীক্ষা, যা ট্রপিক্যাল অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ অ্যান্ড এক্সটেনশন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়, তিনটি বপনের তারিখ (১ অক্টোবর, ১৫ অক্টোবর ও ৩০ অক্টোবর) ও তিনটি গাছের দূরত্ব তুলনা করে। ১ অক্টোবরের বপনে সর্বোচ্চ ফলন হয় হেক্টরপ্রতি ২১ দশমিক ৩৯ টন, আর ৩০ অক্টোবরের বপনে সর্বনিম্ন ১৩ দশমিক ৬ টন। সবচেয়ে কাছাকাছি দূরত্ব, ৬০ x ৪০ সেন্টিমিটারে ফলন হয় হেক্টরে ১৮ দশমিক ৮ টন, যা ৬০ x ৫০ সেন্টিমিটারের ১৭ দশমিক ৬ টনের সঙ্গে পরিসংখ্যানগতভাবে প্রায় সমান; ৬০ x ৬০ সেন্টিমিটারে ফলন ছিল ১৬ টন। ১ অক্টোবরে বপন ও ৬০ x ৪০ সেন্টিমিটার দূরত্বের সমন্বয়ে সর্বোচ্চ ফলন মেলে, ২২ দশমিক ৫ টন।

লবণাক্ত উপকূলীয় মাটিতে খুলনার দৌলতপুরে বারির অন-ফার্ম রিসার্চ ডিভিশন ২০১৯-২০ রবি মৌসুমে বারি ব্রোকলি-১ ও আরও তিনটি জিনোটাইপ তিনটি রোপণ তারিখে (২০১৯ সালের ২১ নভেম্বর, ১ ডিসেম্বর ও ১১ ডিসেম্বর) পরীক্ষা করে; মাটির লবণাক্ততা ছিল ২ দশমিক ৬ থেকে ৪ দশমিক ৮ ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, ২১ নভেম্বরে রোপণ করা ব্রোকলিতে সবার আগে মাথা আসে এবং তারিখগুলোর মধ্যে সেটিতেই ফলন সবচেয়ে বেশি, হেক্টরে ১২ দশমিক ৬৯ টন; আর চার জিনোটাইপের মধ্যে থাইল্যান্ড-২ মাথার ব্যাস, ওজন ও ফলন তিনটিতেই এগিয়ে ছিল, ফলন হেক্টরে ১৬ দশমিক ০১ টন। ২১ নভেম্বরে রোপণ করা থাইল্যান্ড-২ ছিল সেরা সমন্বয়: গাছপ্রতি মাথার ওজন ৪১৯ দশমিক ৭৪ গ্রাম, ফলন হেক্টরে ১৮ দশমিক ৬৬ টন। জাপান-১ জিনোটাইপে পাতা হয়েছিল সবচেয়ে বেশি, গাছপ্রতি গড়ে ২৫ দশমিক ৪৪টি, কিন্তু তার প্রভাব ফলনে দেখা যায়নি।

মিরসরাইয়ের কাছাকাছি নোয়াখালী সদরের একটি খামারে ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত জৈব সারের তুলনামূলক একটি পরীক্ষা হয়, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে রিসার্চ ইন অ্যাগ্রিকালচার, লাইভস্টক অ্যান্ড ফিশারিজ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। অর্ধেক গোবর ও অর্ধেক ভার্মিকম্পোস্ট দেওয়া প্লটে বিক্রয়যোগ্য ফলন হয় সর্বোচ্চ, হেক্টরে ১৯ দশমিক ২৪ টন; কোনো জৈব সার না দেওয়া প্লটে ফলন ছিল সবচেয়ে কম। ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োগে ৫৫ থেকে ৬১ দিনে মাথা আসে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি-আবহাওয়া তথ্য পোর্টাল (বামিস) বারি ব্রোকলি-১ জাতের নাম উল্লেখ করে বপনের সময় দিয়েছে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি, আর ৩০ থেকে ৩৫ দিন বয়সী চারা রোপণের উপযোগী বলে জানিয়েছে। পোর্টালটি জমিতে পানি জমতে না দেওয়া এবং ভারী বৃষ্টির পর পানি বের করে দেওয়ার পরামর্শও দেয়। সার ও বালাইনাশকের মাত্রা মাটি ও পোকার ধরন অনুযায়ী বদলায় বলে তা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

রোপণের উপযোগী ব্রোকলির চারা, মাটির ব্লকে তৈরি। ছবি: Schlaghecken Josef / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
রোপণের উপযোগী ব্রোকলির চারা, মাটির ব্লকে তৈরি। ছবি: Schlaghecken Josef / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ব্রোকলির পুষ্টি ও বিজ্ঞান যা বলে


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ব্রোকলির ভিটামিন ও ক্যানসার প্রতিরোধী উপাদানের কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচা ব্রোকলিতে থাকে ৮৯ দশমিক ৩ গ্রাম পানি, ৩৪ কিলোক্যালরি শক্তি, ২ দশমিক ৮২ গ্রাম আমিষ, ৬ দশমিক ৬৪ গ্রাম শর্করা, ২ দশমিক ৬ গ্রাম খাদ্য আঁশ, ৮৯ দশমিক ২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ১০১ দশমিক ৬ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে, ৬৩ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট, ৩১৬ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ৪৭ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও শূন্য দশমিক ৭৩ মিলিগ্রাম আয়রন।

ক্যানসারের বিষয়ে প্রমাণ অবশ্য কর্মকর্তার কথার মতো নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের ২০১২ সালের জুনে পর্যালোচিত ক্রুসিফেরাস সবজিবিষয়ক তথ্যপত্র বলছে, এসব সবজিতে গ্লুকোসিনোলেট নামের সালফারযুক্ত রাসায়নিক থাকে, যা রান্না, চিবানো ও হজমের সময় ভেঙে ইনডোল-৩-কার্বিনল ও সালফোরাফেনের মতো যৌগে পরিণত হয়; গবেষণাগারে ক্যানসার প্রতিরোধী প্রভাব নিয়ে এ যৌগগুলোই সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত। তবে তথ্যপত্র অনুযায়ী, মানুষের ওপর করা গবেষণার ফল মিশ্র। বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকায় ব্রোকলি একটি পুষ্টিকর সবজি; তবে কারও কোনো রোগ থাকলে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ছবি: Scott Bauer, USDA ARS / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

সূত্র: জাগো নিউজ, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, জাতিসংঘ বাংলাদেশ, বাংলাপিডিয়া, ঢাকা ট্রিবিউন, ইউএনবি (ফ্রেশপ্লাজার মাধ্যমে), ট্রপিক্যাল অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ অ্যান্ড এক্সটেনশন, বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ, রিসার্চ ইন অ্যাগ্রিকালচার, লাইভস্টক অ্যান্ড ফিশারিজ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বামিস), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউট

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

শাকসবজি

সম্পর্কিত খবর

শাকসবজি

কুয়াশায় শিকড় খাওয়ানোর প্রযুক্তিতে রোগমুক্ত আলুবীজ উৎপাদনের পরীক্ষা ইংল্যান্ডে

স্টার্টআপ এয়ারপনিক্স ও ডাইসন ফার্মিং ডেফরার অর্থায়নে দুই বছরের এক পরীক্ষা শুরু করেছে: কুয়াশাভিত্তিক পদ্ধতিতে বর্তমান খরচের অর্ধেকেরও কমে ইংল্যান্ডে রোগমুক্ত প্রথম প্রজন্মের আলুবীজ উৎপাদন সম্ভব কি না।

AgNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

মাশরুমের গাঁজন প্রযুক্তিতে টফুর বর্জ্য হলো প্রোটিনসমৃদ্ধ সুস্বাদু উপাদান

সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা সয়া দুধ ও টফুর অবশিষ্ট ওকারা ঝিনুক মাশরুমের মাইসেলিয়াম দিয়ে গাঁজন করে এর প্রোটিন প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশে তুলেছেন, বাড়িয়েছেন উমামি স্বাদ।

Green Queen১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
শাকসবজি

মাদারগঞ্জে ৬০ হেক্টরে আগাম শসা, দুই হাজার টন উৎপাদনের আশা

জামালপুরের মাদারগঞ্জে এবার প্রায় ৬০ হেক্টরে আগাম শসার আবাদ হয়েছে, উৎপাদন হতে পারে প্রায় দুই হাজার টন; পাইকারি বাজারে কেজি ৩০-৪০ টাকা, বিঘায় খরচ ১৫-২০ হাজার আর বিক্রি ৩০-৪০ হাজার টাকা।

ডেইলি বাংলাদেশ১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)