২০২৬ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে বর্ষার বৃষ্টি প্রায় থেমে যায়। বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা চন্দন কুমার জাজওয়াড়ে ১৪ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানান, আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে 'মনসুন ব্রেক' বা মৌসুমি বায়ুর সাময়িক বিরতির কারণে পশ্চিম-উত্তর ও মধ্য ভারতে বেশ কয়েক দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল না এবং খরা পরিস্থিতি প্রকট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন খরিফ মৌসুমের বপন চলছিল, অথচ একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে টানা বৃষ্টি হচ্ছিল।
ভারতের আবহাওয়া দফতর (আইএমডি) সে সপ্তাহের শনিবার জানায়, পরের ছয় থেকে সাত দিন উত্তর-পশ্চিম ভারত, পশ্চিম-মধ্য ভারত এবং দক্ষিণ উপদ্বীপ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিরতি এসেছিল এমন সময়ে, যখন সে বছর ভারতে মৌসুমি বৃষ্টি এমনিতেই গড়ের চেয়ে কম ছিল।
বিশেষজ্ঞরা যা বলেছিলেন
'লাইভ ওয়েদার অফ ইন্ডিয়া' নামের একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা নবদীপ দাহিয়া সামাজিক মাধ্যম 'এক্স'-এ জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহের স্যাটেলাইট ছবি পোস্ট করে লেখেন, "পশ্চিমঘাট পর্বতমালা থেকে শুরু করে দেশের ভিতরের দিকে অবস্থিত 'কোর মনসুন জোন', কোথাও কোনো বৃষ্টিপাত নেই। আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর, উভয় জায়গাতেই মেঘের উপস্থিতি নগণ্য।" তার মতে দৃশ্যটি দেখে মনে হচ্ছিল ১২ জুলাই নয়, যেন ১২ এপ্রিলের সকাল, এবং ১৮ জুলাইয়ের আগে পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা ছিল না।
আবহাওয়াবিদ ও স্কাইমেট ওয়েদারের প্রধান মহেশ পাহলাওয়াত বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেন, ১৯-২০ জুলাই পর্যন্ত পশ্চিম-উত্তর ও মধ্য ভারতে বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই এবং দিল্লি ও জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে (এনসিআর) তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকতে পারে। তিনি বলেন, "মনসুন ব্রেক নিয়মিত হলেও, এবার এর উপর 'এল নিনোর' প্রভাব কাজ করছে। মৌসুমি বায়ু এমনিতেই দুর্বল এবং এবারের ব্রেকটি দীর্ঘস্থায়ী।" তার ব্যাখ্যায়, সাধারণত বৃষ্টি চার-পাঁচ দিনের জন্য উত্তরের এলাকায় সরে গিয়ে আবার নেমে আসে, কিন্তু এবারের বিরতি দশ দিন ধরে চলার কথা ছিল, যাতে মৌসুমি বৃষ্টির পরিমাণ আরও কমবে।
পাহলাওয়াত জানান, ওই সময় উত্তর প্রদেশের পূর্বাংশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে, তবে অনেক এলাকা শুষ্ক থাকবে। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভা সদস্য সাগরিকা ঘোষ সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, জুলাইয়ে মৌসুমি বায়ুর এই দুর্বলতা কৃষি, জল নিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবিকার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে এবং তিনি বিষয়টি সংসদে তুলবেন।

মনসুন ব্রেক কী এবং কেন হয়
ভারতের আবহাওয়া দফতরের মৌসুমি বায়ু বিষয়ক প্রশ্নোত্তর অনুযায়ী, মনসুন ট্রাফ বা মৌসুমি অক্ষরেখা একটি লম্বা নিম্নচাপ বলয়। এটি স্বাভাবিক অবস্থানের দক্ষিণে থাকলে দেশের বড় অংশে বর্ষা সক্রিয় থাকে। অক্ষরেখা উত্তরে সরে হিমালয়ের পাদদেশে চলে গেলে বা একেবারে না দেখা গেলে দেশের বেশির ভাগ জায়গায় 'ব্রেক' দেখা দেয়; তখন হিমালয়ের পাদদেশে ভারী বৃষ্টি হয় এবং কখনো ব্রহ্মপুত্রে বন্যা হয়।
পাহলাওয়াতের ভাষায়, পশ্চিমা বায়ু প্রবল হলে তা অক্ষরেখাকে উত্তরে ঠেলে দেয়। বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়জনিত নিম্নচাপ তৈরি হয়ে স্থলভাগের দিকে এগোলে তা মৌসুমি বায়ুকে আবার দক্ষিণে টেনে আনে, তখন বৃষ্টি ফেরে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠ স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ হয়ে ওঠার ঘটনা, যা প্রায়ই ভারতে মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের (এনওএএ) ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার ২০২৬ সালের ৯ জুলাই পূর্বাভাস দেয়, এল নিনো বছরের শেষ পর্যন্ত আরও শক্তিশালী হবে, ২০২৭ সালের বসন্তের শুরু পর্যন্ত তা টিকে থাকার সম্ভাবনা ৯৭ শতাংশ এবং অক্টোবর-ডিসেম্বরে 'খুব শক্তিশালী' এল নিনোর সম্ভাবনা ৮১ শতাংশ।

খরিফ বপনে ঝুঁকি
খরিফ ফসল হলো ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমের ফসল, যা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রথম বৃষ্টিতে বোনা হয় এবং অক্টোবর-নভেম্বরে কাটা হয়; ধান, ভুট্টা ও তুলা এর প্রধান ফসল। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে ভারতে গড়ের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছিল; এরপর ৯ জুলাই পর্যন্ত ভালো বৃষ্টিতে ঘাটতি নেমে আসে ১২ শতাংশে। ডাউন টু আর্থের খবরে জানা যায়, আইএমডি ১ জুলাই পূর্বাভাস দিয়েছিল যে জুলাইয়ের বৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ৯৪ শতাংশের নিচে থাকতে পারে।

ছবি: Cpangarkar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, ভারতের আবহাওয়া দফতর (আইএমডি), এনওএএ ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার, ডাউন টু আর্থ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)