নেত্রকোনার উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে প্রচুর বৃষ্টিপাতের পানি পাহাড়ি ঢল হয়ে জেলার নদ-নদীতে নামতে শুরু করায় ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল, বুধবার, হাওরের কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দেয় স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। অকাল বন্যায় উঠতি বোরো ফসলের ক্ষতির শঙ্কা থেকেই এই সতর্কতা।
সেদিন দুপুরে নেত্রকোনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাওরের জমিতে ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে তা জমিতে রেখে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি জানান, আগেও নেত্রকোনায় ভারী বৃষ্টি হয়েছে এবং হাওরের নিম্নাঞ্চলে তখনো বৃষ্টির পানি জমে ছিল; উজানের ঢল নামলে পানি আরও বাড়বে।
চৈত্র থেকে বৃষ্টি, বাড়ছিল নদীর পানি
পাউবো জানায়, সে বছর চৈত্র মাসের শুরু থেকেই নেত্রকোনায় বৃষ্টি হচ্ছিল এবং অতিবৃষ্টিতে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। উজানে বৃষ্টি হলে জেলায় পাহাড়ি ঢল নামে, তখন সোমেশ্বরী, কংস, ধনু, উব্দাখালীসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বাড়ে। এতে যেকোনো সময় হাওর এলাকায় অকাল বন্যা দেখা দিয়ে ফসলের ক্ষতি হতে পারে।
আগের দুই সপ্তাহের বৃষ্টিতে কংস, উব্দাখালী, ধনুসহ বেশ কয়েকটি নদ-নদীর পানি বাড়ছিল। মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার দুপুর একটা পর্যন্ত খালিয়াজুরির ধনু নদে পানি বাড়ে প্রায় ২ ফুট। খালিয়াজুরির ইউএনও নাদির হোসেন শামীম বলেন, ধনু নদে পানি কিছুটা বেড়েছে এবং নিচু জায়গার কিছু খেতে বৃষ্টির পানি জমেছে; তাই কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান কাটতে বলা হয়েছে।
চেরাপুঞ্জি, যার আরেক নাম সোহরা, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার একটি শহর। খাসি পাহাড়ের বাতাসমুখী ঢালে অবস্থিত এই এলাকায় বছরে গড়ে ১১ হাজার ৭৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়; এর চেয়ে বেশি গড় বৃষ্টি হয় কেবল কাছের মৌসিনরামে। হাওর অববাহিকার উত্তর সীমায় মেঘালয়ের এই পাহাড়শ্রেণি, তাই সেখানকার ভারী বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচের হাওরে নেমে আসে।


হাওরের একমাত্র ফসল বোরো
হাওর হলো দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাটি বা পিরিচের মতো নিচু জলাভূমি। বর্ষায় নদী ও খালের পানিতে এগুলো বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়, আর শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠা জমিতে বোরো ধান চাষ হয়। যুগান্তরের একই দিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেত্রকোনার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দার কিছু অংশ মূলত হাওরাঞ্চল। জেলার ছোট-বড় ১৩৪টি হাওরের ৮৯টিই খালিয়াজুরিতে, এবং এই একমাত্র ফসলের ওপরই কৃষকের সারা বছরের সংসার, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়ালেখার খরচ নির্ভর করে।
আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় সে বছর ১৩৮ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ দেওয়া হয়, পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে যার ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি টাকা। এসব বাঁধের ওপর প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নির্ভর করে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। পানি বাড়তে থাকায় কৃষকরা ২০১৭ সালের মতো অকাল বন্যায় ফসল হারানোর আশঙ্কা করছিলেন।

খালিয়াজুরিতে পুরোদমে ধান কাটা, শ্রমিক সংকট
খালিয়াজুরি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন। ওই সপ্তাহেই পুরোদমে ধান কাটা শুরু হয়। তিনি বলেন, চাষিদের আগাম জাতের ধান লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেকে বেশি ফলনের আশায় আগাম জাত কম লাগান। ২৯৭ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের খালিয়াজুরি উপজেলায় ২০২২ সালের জনশুমারিতে লোকসংখ্যা ছিল ৯৬ হাজার ৩৪৫।
যুগান্তর জানায়, অনেক হাওরে পানি থাকায় কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটতে সমস্যা হচ্ছিল, শ্রমিকেরও সংকট ছিল। কৃষকদের ভাষ্য, একসময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান কাটার শ্রমিক হাওরে আসতেন, কিন্তু বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে বাইরের শ্রমিক আসা কমে গেছে; আর যন্ত্র চালু হওয়ায় স্থানীয় শ্রমিকরাও আগের মতো ধান কাটেন না।

ছবি: Redmin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক যুগান্তর, উইকিপিডিয়া (চেরাপুঞ্জি, হাওর, খালিয়াজুরি উপজেলা)





মন্তব্য
(০)