বাংলাদেশে তীব্র গরমের সময় বলতে এপ্রিল ও মে মাস বোঝালেও এখন গরমকাল দীর্ঘ হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ২১শে এপ্রিল বিবিসি বাংলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের রেকর্ড ঘেঁটে দেখিয়েছিল, দেশে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা কবে, কোথায় উঠেছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বর্তমানে ৪৮টি আবহাওয়া স্টেশন আছে এবং ১৯৪৭ সাল থেকে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা হচ্ছে। সেই রেকর্ডে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৯৭২ সালের ১৮ই মে রাজশাহীতে, ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড কোথায় কত
আবহাওয়া অধিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী শীর্ষ তাপমাত্রাগুলো ঘুরেফিরে কয়েকটি জায়গাতেই উঠেছে:
- রাজশাহী, ১৮ই মে ১৯৭২: ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ
- রাজশাহী, এপ্রিল ১৯৮০: ৪৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি
- বগুড়া, এপ্রিল ১৯৮৯ এবং ঈশ্বরদী, মে ১৯৭০: ৪৪ ডিগ্রি
- বগুড়া, মে ১৯৫৮: ৪৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি
- যশোর (১৯৬৩), রাজশাহী (১৯৮৫) ও যশোর (২০২৪), সবই এপ্রিলে: ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি
২০২৪ সালের ৩০শে এপ্রিল যশোরে ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি ওঠে, আর একই দিনে চুয়াডাঙ্গায় ৪৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি, যা ১৯৮৮ সালের ১২ই ডিসেম্বর জেলার আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার চালুর পর সেখানে সর্বোচ্চ। চুয়াডাঙ্গায় এর আগে ১৯৯৫ সালের পহেলা মে ৪৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি, সে বছরের ২৫শে এপ্রিল ৪৩ ডিগ্রি এবং ১৯৮৯ সালের চৌঠা মে ৪৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি রেকর্ড হয়েছিল।

কালবৈশাখী কম হলে রেকর্ড ভাঙে
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, তীব্র গরম থেকে বাঁচার উপায় দমকা ও ঝড়ো হাওয়া। তাঁর ভাষায়, "যে যে বছরগুলোতে তাপমাত্রা বেশি রেকর্ড হয়েছে, ওই বছর কালবৈশাখী ঝড় কম হয়েছিল। অথবা, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গে হয়তো বেশি তাপমাত্রা ছিল এবং সেখান থেকে হয়তো বাংলাদেশে লু হাওয়ার অনুপ্রবেশ ছিল।" তিনি মনে করিয়ে দেন, সমতলের একটি স্টেশন সাধারণত ১৮ থেকে ২০ কিলোমিটার এবং পাহাড়ি স্টেশন ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকা কাভার করে; ফলে গাছপালা কম, কারখানা ও ইটভাটা বেশি এমন এলাকায় স্টেশন না থাকায় সেখানকার আরও বেশি তাপমাত্রা হয়তো মাপাই হয়নি।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গরম বেশি কেন
আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক বিবিসি বাংলাকে তিনটি কারণ বলেছিলেন। প্রথমত, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, মেহেরপুর ও খুলনা অঞ্চলে এবং এর পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গে বিস্তীর্ণ সমভূমি থাকায় পরিবহন পদ্ধতিতে তাপ সরাসরি প্রবাহিত হয়। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দিয়ে বঙ্গোপসাগরের জলীয় বাষ্প এই অঞ্চলে ঢোকে। তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় কারণ সূর্যের অবস্থান: উত্তরায়নের সময় ২১শে মার্চ থেকে ২১শে জুন পর্যন্ত সূর্যের সর্বোচ্চ কিরণ পড়ে ২৩ ডিগ্রি অক্ষরেখার আশপাশে, আর বাংলাদেশের অবস্থান ২২ থেকে ২৬ ডিগ্রির মধ্যে। প্রথম আলোর ২০২৪ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদনে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছিলেন, আগের ৪৩ বছরে সবচেয়ে বেশি দিন তাপপ্রবাহ বয়েছে যশোরে, এরপর চুয়াডাঙ্গা ও ঢাকায়।
বেশি তাপমাত্রা মানেই বেশি গরম লাগা নয়
মল্লিকের মতে গরমের অনুভূতিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা বাতাসের বেগ ও জলীয় বাষ্পের। ২০২৪ সালে ৭৬ বছরের রেকর্ড ভেঙে পহেলা এপ্রিল থেকে পাঁচই মে পর্যন্ত টানা ৩৫ দিন তাপপ্রবাহ ছিল; তখনও চুয়াডাঙ্গা বা রাজশাহীতে জলীয় বাষ্প কম ও বাতাস থাকায় অস্বস্তি তুলনামূলক কম ছিল, অথচ পটুয়াখালী, বরিশাল, বরগুনা ও কক্সবাজারে তাপমাত্রা কম হলেও সাগরের জলীয় বাষ্পে গরম অসহ্য লেগেছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ১০ ডিগ্রির নিচে নামলে গরম বেশি, পাঁচ ডিগ্রি হলে নাভিশ্বাস, আর পাঁচের নিচে লু হাওয়া ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি।
অন্যদিকে ময়মনসিংহ ও সিলেটে গরম তুলনামূলক সহনীয় থাকে হাওর ও পাহাড়ের কারণে। বঙ্গোপসাগরের জলীয় বাষ্প পাহাড়ে বাধা পেয়ে ওপরে ওঠে, মেঘ হয়ে বৃষ্টি নামায়; পাহাড়ের বাঁকে গরম ও ঠান্ডা বাতাস মিশে তাপমাত্রা কমায়।

তাপপ্রবাহের মাপকাঠি, মাঠের ঝুঁকি ও এ বছরের পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি মৃদু, ৩৮ থেকে ৪০ মাঝারি, ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি তীব্র এবং ৪২ ডিগ্রির বেশি হলে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ। বিবিসি বাংলা লিখেছিল, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির ওপরে উঠলে শরীরের নিজেকে ঠান্ডা করার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, যা মাঠে কাজ করা কৃষিশ্রমিকের জন্য সরাসরি ঝুঁকি। ২০২৪ সালের মে মাসে ব্র্যাকের এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, সে বছরের এপ্রিলের টানা গরমে বোরো ধান ঝুঁকিতে পড়ে, আমের মুকুল ঝরে যায় এবং দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনে ২৫ শতাংশ ক্ষতি হয়।
২০২৬ সালের জন্য আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস ছিল, বছরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে, তবে এপ্রিল মাস স্বাভাবিক থাকবে। মল্লিক বলেছিলেন, "২০২২ থেকে ২০২৭ সাল বিশ্বব্যাপীই উষ্ণ থাকবে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।" তবে তাঁর মতে কালবৈশাখী বেশি হওয়ায় গরমের তীব্রতা ২০২৪ সালকে ছাড়াবে না। আবহাওয়াবিদদের ইঙ্গিত ছিল, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ছয় থেকে আটটি তাপপ্রবাহ হতে পারে, যার তিন থেকে চারটি তীব্র।
ছবি: Nahid Sultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, প্রথম আলো (৩০ এপ্রিল ২০২৪, ২৭ এপ্রিল ২০২৪, ২৫ মে ২০২৪ ও ৭ মে ২০২৫), উইকিপিডিয়া (রাজশাহী)





মন্তব্য
(০)