দক্ষিণ কাজাখস্তানে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় চলা দ্বিতীয় সেচ ও নিষ্কাশন উন্নয়ন প্রকল্প (সেকেন্ড ইরিগেশন অ্যান্ড ড্রেনেজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট, আইডিআইপি-২) কিজিলোর্দা, ঝাম্বিল, তুর্কিস্তান ও আলমাতি অঞ্চলে ৮১২ দশমিক ৬ কিলোমিটার আস্তরণযুক্ত খাল সংস্কার করেছে। ২০২৬ সালের ১৬ জুন প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে ১ লাখ হেক্টরের বেশি কৃষিজমিতে সেচ ও নিষ্কাশন সেবা উন্নত হয়েছে এবং কৃষকের ফলন বেড়েছে।
শিমকেন্তে সদ্য সংস্কার করা একটি খালের পাশে দাঁড়িয়ে কৃষক আতাবেক কোজাবেকভ নিজের ফসলের কথা বলেন: “এ বছর আমরা তুলা লাগিয়েছি। চারার সংখ্যা বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় উৎপাদনশীলতা ৫০ শতাংশ বেশি।” বিশ্বব্যাংক জানায়, তিনি এখন প্রতি হেক্টরে ৬ হাজার ৫০০ কেজি তুলা তুলছেন, আর এর মূল কারণ উন্নত সেচ: ঠিক সময়ে, ঠিক পরিমাণে নির্ভরযোগ্যভাবে পানি পৌঁছানো। প্রতিবেদনের ভাষায়, দক্ষিণ কাজাখস্তানে এমন অভিজ্ঞতা লাখো কৃষকের।
প্রকল্পটি কী, কত বড়
বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প তথ্য অনুযায়ী, আইডিআইপি-২ অনুমোদন পায় ২০১৩ সালের ২৭ জুন। এতে বিশ্বব্যাংকের অঙ্গীকার ১০২ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার, আর প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ৩৪৩ দশমিক ০১ মিলিয়ন ডলার। বাস্তবায়ন করে কাজাখস্তানের পানিসম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয়ের পানিসম্পদ কমিটি। প্রকল্পের লক্ষ্য, প্রকল্প এলাকার কৃষকদের জন্য সেচ ও নিষ্কাশন সেবা উন্নত করা।
আস্তরণযুক্ত খালের পাশাপাশি প্রকল্পটি ২ হাজার ৩২৫ কিলোমিটার মাটির শাখা খাল এবং ২৮ হাজার ৮০০-র বেশি জলকাঠামো সংস্কার করেছে। এ অঞ্চলের পানির বড় উৎস সিরদরিয়া নদী। নদীটি তিয়েন শান পর্বত থেকে নেমে দক্ষিণ কাজাখস্তান হয়ে আরাল সাগরের উত্তরাংশে পড়েছে এবং কিজিলোর্দা অঞ্চলের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। সোভিয়েত আমলে এই নদীর পানি ব্যাপক সেচ প্রকল্পে সরিয়ে নেওয়ায় আরাল সাগর প্রায় হারিয়ে যায়; তাই এখানে খালের পানি অপচয় রোধ গুরুত্বপূর্ণ।

দূরনিয়ন্ত্রিত পাম্প আর সহজ আস্তরণ
কিজিলকুমের একটি সাইটে আকেলিক গ্রুপের প্রতিনিধি পাভেল গ্রাসমিক ট্যাবলেটে দেখান দূর থেকে পাম্প চালানোর ব্যবস্থা। পানির স্তর ও চাপের সেন্সর থেকে তথ্য অবিরাম যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সার্ভারে; বিদ্যুৎ গেলে ব্যাকআপ ব্যাটারি দুই দিন তথ্য পাঠানো চালু রাখে। শুধু ওই সাইটেই ১৪৭ কিলোমিটার খালে হাতে চালানো ব্যবস্থাপনার জায়গা নিয়েছে রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ, ফলে সমস্যা আগেভাগে ধরা যায় এবং যে পানি আগে অলক্ষ্যে নষ্ট হতো তা সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে।
সব সমাধান উচ্চপ্রযুক্তির নয়। যেখানে খাল বসতির গা ঘেঁষে গেছে এবং ভারী যন্ত্র ঢুকতে পারে না, সেখানে প্রকৌশলীরা বিটুমিন জিওমেমব্রেন আস্তরণ বসিয়েছেন। এটি কয়েক ঘণ্টায় বসানো যায় এবং টেকে ৪০ থেকে ৫০ বছর। পাভেলের কথায়, এর আয়ু কংক্রিটের খালের মতোই, আর খাল এখনো বেলচা দিয়ে হাতে পরিষ্কার করা যায়।

কৃষকের হাতে ব্যবস্থাপনা, নতুন কাজ
প্রকল্পটি অবকাঠামো টিকিয়ে রাখাতেও জোর দিয়েছে: পরিচালনা নির্দেশিকা তৈরি, পানি ব্যবস্থাপনায় কৃষকের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং অর্থায়নের ব্যবস্থা। প্রকল্প শেষে ১১টি সেচ স্কিমের সবগুলো, মোট ১ লাখ হেক্টর, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনায় চলছিল। দুটি পরীক্ষামূলক কৃষি সমবায়, যাদের আওতায় ৪ হাজার ২৭৪ হেক্টর জমি ও ৪৩০টি খামার, নিজেরাই অবকাঠামো চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে শুরু করেছে; সরকার এই মডেল দেশজুড়ে ছড়াতে চায়।
পানি ব্যবস্থাপনা, শস্য পর্যায়ক্রমের মতো কৃষিচর্চা ও পানিসাশ্রয়ী সেচ নিয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন ১০ হাজার ২০০-র বেশি মানুষ। কী চাষ হবে, সে সিদ্ধান্ত কৃষকেরই। প্রকল্পে সরাসরি উপকৃত হয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ২৩৪ জন পানি ব্যবহারকারী, যাঁদের ৪৮ শতাংশ নারী।
কাজও তৈরি হয়েছে খাল নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও আশপাশের কৃষি-ব্যবসায়। নিষ্কাশন অবকাঠামো ও পাম্প স্টেশন নির্মাণ ও তদারকিতে যুক্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘মেলিওরেটর’ এলএলপির প্রতিনিধি নুরকেনবায় ওনাল বলেন, “আমরা এই গ্রামের বিশেষজ্ঞ আর বাইরের তরুণ শ্রমিকদের নিয়োগ দিয়েছি। তাঁরা ভালো কাজ করেছেন, ফল দিয়েছেন এবং মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।” তাঁর মতে, এই পদ্ধতি দেশের অন্য অঞ্চলেও প্রয়োগ করা যায়।
বিশ্বব্যাংক জানায়, প্রকল্পের ফল কাজাখস্তানের নতুন পানি আইন, ‘পানিসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা ধারণা ২০২৪-২০৩০’ এবং সবুজ অর্থনীতিতে উত্তরণের পরিকল্পনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এ কারণে আইডিআইপি-২-কে দেখা হচ্ছে দেশজুড়ে পুনরাবৃত্তিযোগ্য একটি মডেল হিসেবে।

ছবি: Petar Milošević / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিশ্বব্যাংক (ফিচার, ১৬ জুন ২০২৬), বিশ্বব্যাংক প্রকল্প তথ্য (আইডিআইপি-২), উইকিপিডিয়া (সিরদরিয়া, কিজিলোর্দা অঞ্চল)





মন্তব্য
(০)