বঙ্গোপসাগরে ধরা লাল চিংড়ি নৌকার খোপে বরফের নিচে শুয়ে থাকে বিদেশযাত্রার অপেক্ষায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জাগো নিউজের প্রতিবেদক খায়রুল বাশার আশিক ভোরের ঘাটে ভিড়ে থাকা মাছ ধরার ট্রলারে এই দৃশ্য দেখেন: ভেজা কাঠ, মোটা দড়ি আর ভেজা জালের মাঝে নৌকার কোমর-সমান গভীর খোপে বরফ দেওয়া চিংড়ি। দুই-এক দিন আগে সাগরে ধরা এই চিংড়ি কয়েক দিনের মধ্যে টোকিও বা আমস্টারডামের রেস্তোরাঁয় পৌঁছাতে পারে। মাঝখানে থাকে বরফে সংরক্ষণ, মাথা আলাদা করা, বাছাই, কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ আর হিমায়িত কনটেইনারে পাঠানোর দীর্ঘ কর্মযজ্ঞ।
সাগরে ধরা থেকে ঘাটে বাছাই
গভীর সাগরে ট্রলার ও নৌকায় হাজারো জেলে কাজ করেন। তাঁরা সাধারণত ট্রল জাল ফেলেন; কয়েক ঘণ্টা পর জাল তুললে রুপালি মাছের ভিড়ে উজ্জ্বল লাল চিংড়ি আলাদা করে চোখে পড়ে। ধরা পড়ার পরপরই চিংড়ি বড় প্লাস্টিকের ক্রেট ও বস্তায় বরফ দিয়ে রাখা হয়। নৌকার নিচের অন্ধকার খোপই তখন অস্থায়ী হিমঘর, শ্রমিকেরা সেখানে নেমে বরফ ঢালেন।
দ্রুত বরফ দেওয়া কেন জরুরি, তা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রকাশিত চিংড়ি ব্যবস্থাপনার নির্দেশিকায় বলা আছে: গরমের দিনে ঘণ্টাখানেকের দেরিতেও চিংড়ির মান উল্লেখযোগ্যভাবে নষ্ট হতে পারে। ঘাটে নামানোর পর খোলা জায়গায় ঢেলে আকার, রং ও সতেজতা দেখে চিংড়ি বাছাই হয়। শত শত শ্রমিক ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাথা ছাঁটা, খোসা ছাড়ানো ও ধোয়ার কাজ করেন; কখনো মাথা আলাদা করার কাজটি নৌকাতেই হয়ে যায়। এরপর চিংড়ি আবার বরফে ঢেকে দেওয়া হয়।

মাথা আলাদা করা হয় কেন
রপ্তানির জন্য সাধারণত চিংড়ির দেহাংশ রাখা হয়, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে মাথাহীন চিংড়ির চাহিদা বেশি এবং মাথা রেখে দিলে ওজন বাড়লেও মান ধরে রাখা কঠিন হয়। এফএওর নির্দেশিকা অনুযায়ী কাঁচা আস্ত চিংড়ির ওজনের প্রায় ৪০ শতাংশই মাথা, লেজের খোসা ও পা মিলিয়ে আরও প্রায় ১৫ শতাংশ; ফলে কাঁচা মাংস থাকে প্রায় ৪৫ শতাংশ। একই নির্দেশিকা বলছে, কারখানায় চিংড়ি প্রথমে আকার অনুযায়ী গ্রেডিং হয়, কারণ বড় চিংড়ির দাম সাধারণত বেশি।

আড়ত, কারখানা ও রপ্তানির পথ
মাথাহীন চিংড়ি বরফসহ ককশিটের বায়ুরোধী বাক্সে ভরে বড় আড়তদার বা পাইকারের কাছে পাঠানো হয়। পাইকারেরা হিমঘর বা হিমায়িত ট্রাকে সেগুলো খুলনা, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠান, যেখানে ধোয়া ও গ্রেডিং হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামের রপ্তানিকারকেরা এই চিংড়ি কিনে নেন। প্রক্রিয়াজাত চিংড়ি হিমায়িত কনটেইনারে ভরে সমুদ্র বা আকাশপথে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার সুপারমার্কেট ও রেস্তোরাঁয় পাঠানো হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের আগস্টে জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের চিংড়ি রপ্তানি আয় ছিল ২৯ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, আগের বছরের চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি; একসময় এই আয় ৫৫ কোটি ডলার ছাড়িয়েছিল। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী চিংড়ি খাতের ওপর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ নির্ভরশীল, যাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ সরাসরি হ্যাচারি, চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে যুক্ত।

জেলের হাতে দামের ছোট অংশ
এই সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রথম ও সবচেয়ে কঠিন ধাপটি জেলেদের। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী সাগরে জেলেরা কেজিপ্রতি গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পান; চিংড়ির দামের বড় অংশ তাঁদের হাতে যায় না। চট্টগ্রামের জেলে আবু সালেহ মিয়া প্রতিবেদককে বলেন, 'লাল চিংড়ি আমাদের কাছে সোনার মতো। একটা ভালো দিন মানে কয়েক হাজার টাকা আয়।' তিনি জানান, সাগরের উত্তাল ঢেউ, ঝড় আর অনিশ্চয়তা জেলেদের নিত্যসঙ্গী।
ঢাকার ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল চত্বরে অবস্থিত সার্ক কৃষি কেন্দ্র দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশে ফসল, মৎস্যসহ নানা খাত নিয়ে কাজ করে। কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ প্রোগ্রাম অফিসার মো. আবুল বাশার জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের লাল চিংড়ি আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাদ ও মানের পরিচয় ধরে রেখেছে; তবে পরিবহন সংকট, ব্যাংকিং ও মান নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ এর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে হুমকিতে ফেলেছে। তাঁর মতে, এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে উৎপাদন বৃদ্ধি, মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।
ছবি: Goutam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার (রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও, টরি অ্যাডভাইজরি নোট ৫৪), সার্ক কৃষি কেন্দ্র





মন্তব্য
(০)