চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার পাহাড়ে গ্রীষ্মকালীন রূপবান শিম চাষ করে বাড়তি আয় করছিলেন কৃষকেরা। ২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, কুমিরা ইউনিয়নের বড় কুমিরা পাহাড়ে তখন যতদূর চোখ যায় শিমের ফুল ফুটে ছিল, লতায় থোকা থোকা ঝুলছিল বেগুনি রঙের শিম। কৃষকদের কেউ বাজারে বিক্রির জন্য শিম তুলছিলেন, কেউ লতার পরিচর্যায় ব্যস্ত ছিলেন। রূপবান জাতের এই শিম গ্রীষ্মকালে লাগানো হয় বলে একে গ্রীষ্মকালীন শিম বলা হয়।
পাহাড়জুড়ে চার শতাধিক স্থানে চাষ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপজেলার ছোটদারোগার হাট থেকে ছলিমপুর পর্যন্ত পাহাড়ের চার শতাধিক স্থানে এই শিম চাষ হয়েছিল। উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে সীতাকুণ্ডে গ্রীষ্মকালীন শিমের চাষ হয়েছিল ২৮ হেক্টর জমিতে, ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ৩০ হেক্টর। প্রায় ৩০০ কৃষক রূপবান শিম চাষ করেন। কুমিরা ও বাঁশবাড়িয়ার পাহাড়ের বেশির ভাগ এলাকায় এর আবাদ হয়; এ ছাড়া সৈয়দপুর, বারৈয়ারঢালা ও সীতাকুণ্ড পৌর সদরেও রূপবান শিম চাষ হয়েছিল। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চাষিরা এই শিম বিদেশেও পাঠাচ্ছিলেন।
ধর্মপুর এলাকার কৃষক জাহাঙ্গীর আলম জাগো নিউজকে বলেন, 'আমরা পাহাড়ে নানা রকম কৃষি উৎপাদন শুরু করি। কাউকে খাজনা বা টাকা দেওয়া লাগে না। নেই কোনো সেচ দেওয়ার চিন্তা।'

শিমের জন্য পরিচিত সীতাকুণ্ড
সীতাকুণ্ড উপজেলা শিম উৎপাদনের জন্য পরিচিত। উপজেলাটির মাঝ বরাবর সীতাকুণ্ড পাহাড়শ্রেণি চলে গেছে, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেল। এই শ্রেণির চন্দ্রনাথ পাহাড় ৩৫২ মিটার উঁচু, চট্টগ্রাম জেলার সবচেয়ে উঁচু স্থান। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম জেলার মোট শিম চাষের অর্ধেক হয় সীতাকুণ্ডে, আর সেখানে ছুরি, বাটা, পুট্টি, রূপবান ও কার্তিকোডা এই পাঁচ জাতের শিম চাষ হয়।
শীতকালে সীতাকুণ্ডের ছুরি, লইট্টা ও বাটা শিমের চাহিদা বেশি। তবে গ্রীষ্মকালীন শিমও সুস্বাদু ও লাভজনক হওয়ায় এর চাষ বাড়ছিল। ২০২১ সালের অক্টোবরে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, রূপবান শিমের রং বেগুনি; বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে লাগানো হয় এবং শ্রাবণ মাস থেকে শিম তোলা শুরু হয়। সে বছর উপজেলায় ২৫ হেক্টর জমিতে এর চাষ হয়েছিল। শিম (Lablab purpureus) শিমজাতীয় (ফ্যাবেসি) পরিবারের লতানো গাছ; এর কচি শুঁটি ও বীজ সবজি হিসেবে খাওয়া হয়, আর গাছ একবার বেড়ে উঠলে খরা সইতে পারে।

দাম, বিক্রি ও পাহাড়ে চাষের সুবিধা
কৃষক জাহাঙ্গীর আলম ও দেলোয়ার হোসেন বলেন, 'আমরা বিগত প্রায় ১০ বছর ধরে পাহাড়ে গ্রীষ্মকালীন শিম চাষ করে আসছি। এ শিম ওঠার শুরুতে প্রতি কেজি বিক্রি করেছি ১৬০-১৭০ টাকা। এখনো ১৪০ টাকা দরে শিম বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা এসে এ শিম নিয়ে যাচ্ছেন।'
স্থানীয়রা জানান, পাহাড় দুর্গম হওয়ায় উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি। তবে বর্ষায় সমতলে অতিবৃষ্টিতে পানি জমে শিমের লতা নষ্ট হতে পারে, পাহাড়ে পানি জমে না বলে সে ঝুঁকি থাকে না। পাহাড়ে শিম চাষ বাড়ায় অনাবাদি জমিও কমছিল। রূপবান শিম শীতকালীন শিমের চেয়ে বেশি সময় ধরে ফলন দেয় বলে লাভও বেশি হয় বলে জানান তাঁরা।
কুমিরা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুজন ঘোষ বলেন, 'প্রতি হাটে (সপ্তাহে দুদিন) ইউনিয়ন থেকে অন্তত ১৫ টন শিম বিক্রি করেন কৃষকেরা। এখন ১৫ টন শিমের মূল্য ১৫-১৮ লাখ টাকা।' তিনি জানান, ফুল আসার পর তা ধরে রাখতে কী প্রয়োগ করতে হয়, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ কৃষকদের পরামর্শ দেয় এবং মাঝে মাঝে পাহাড়ে গিয়ে তদারক করে। কোনো ওষুধ বা মাত্রা ব্যবহারের আগে কৃষকদের উপজেলা কৃষি অফিস বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, 'এই শিমে দীর্ঘসময় ফলন হয়। শীতকালীন শিমের চেয়েও দাম বেশি। ফলে কৃষকেরা গ্রীষ্মকালীন শিম চাষের দিকে ঝুঁকছেন। প্রতি বছর বাড়ছে শিম চাষ। শীতকালীন শিমের মতো রূপবান শিমও খুব সুস্বাদু। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে এর সুনাম আছে।'

ছবি: Eng.Md.Aminul Islam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উইকিপিডিয়া (সীতাকুণ্ড উপজেলা; লাবলাব)





মন্তব্য
(০)