বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা ২০২১ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো নদীর সরু, লম্বাটে দেশি মাছ কাকিলার কৃত্রিম প্রজনন ঘটাতে সক্ষম হন। ইনস্টিটিউটের যশোর স্বাদু পানি উপকেন্দ্রে প্রায় তিন বছরের নিবিড় গবেষণার পর এই সাফল্য আসে, আর ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট রাত চারটায় ডিম থেকে প্রথম পোনা বের হয়। ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট এই খবর প্রকাশ করে বিবিসি বাংলা জানায়, দেশি প্রজাতিকে বিলুপ্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টায় ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উন্মুক্ত জলাশয়ের যে মাছগুলো রক্ষা করছেন, কাকিলা তার ৩১তম। এর ফলে পুষ্টিসমৃদ্ধ এসব মাছ এখন সহজে পুকুরেও চাষ করা সম্ভব হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
প্রতিবেদনটি কাকিলাকে একটি বড় প্রেক্ষাপটে তুলে ধরে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে বেশ কিছু ছোট মাছের প্রজাতি বিপন্ন হয়ে পড়লেও এসব মাছের মোট উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে, আর বিবিসি বাংলার ভাষায় এটা সম্ভব হয়েছে মৎস্য বিজ্ঞানীদের গবেষণায় ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে। কাকিলাকে কীভাবে ধরা হলো, পরিবহন করা হলো, পুকুরে অভ্যস্ত করা হলো এবং শেষে প্রজনন ঘটানো হলো, তা সম্প্রচারমাধ্যমটিকে বর্ণনা করেন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. রবিউল আউয়াল হোসেন ও বিজ্ঞানী মো. শরীফুল ইসলাম।
ছোট মাছ: প্রজাতি বিপন্ন, উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী
বিবিসি বাংলার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্বাদু পানিতে ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়, তার মধ্যে ১৪৩টিই ছোট মাছ। প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব মাছ আকারে নয় সেন্টিমিটারের ছোট সেগুলোকে ছোট মাছ বা স্মল ইন্ডিজেনাস স্পেসিস (এসআইএস) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মৎস্য গবেষণায় এর চেয়ে বড় আকারসীমাও ব্যবহৃত হয়: ২০১৫ সালের বাংলাদেশের মিঠা পানির মাছের লাল তালিকায় ২৫ সেন্টিমিটারের নিচের মাছকে মাঝারি ও ছোট মাছ বলা হয়েছে। ফিশবেসের হিসাবে কাকিলার সাধারণ দৈর্ঘ্য ৩০ সেন্টিমিটার, অর্থাৎ দুই মাপকাঠিতেই এটি বড়, তবে এর বাসস্থান ও বিপদ একই উন্মুক্ত জলাশয়ের।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার) বাংলাদেশের ৬৪টি প্রজাতির মাছকে বিপন্ন বলে উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মহাশোল, খরকি, পিপলা শোল, কালা পাবদা ও বাঘ মাছ। বিবিসি বাংলা জানায়, এ কারণে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে অস্তিত্বের হুমকিতে পড়া এসব মাছের বেশ কয়েকটিকে রক্ষার পরিকল্পনা নিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মৎস্য বিজ্ঞানীরা আগের কয়েক বছরে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ৩০টি মাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শিং, মাগুর, পুঁটি, বাইম, টেংরা, ফলি, বাতাসি, ঢেলা, বৈরালি, গুতুম ও খলিসা। কাকিলা যোগ হওয়ায় সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৩১-এ।
উৎপাদন বৃদ্ধির হারও ছিল বড়। বিবিসি বাংলার উদ্ধৃত মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে এক দশকে ছোট মাছের উৎপাদন চারগুণেরও বেশি বেড়েছে: ২০০৯ সালে উৎপাদন ছিল ৬৭,০০০ মেট্রিক টন, আর ২০১৮ সালে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন। এক বছর আগে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে প্রায় একই হিসাব দেয়: পুকুরে দেশি ছোট মাছের উৎপাদন ২০০৯ সালের ৬৭,৩৪০ টন থেকে বেড়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২.৪১ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। মন্ত্রণালয় তখন জানায়, দেশের ২৬০ প্রজাতির মধ্যে ১৪৩টি ছোট দেশি মাছ।

আইইউসিএনের লাল তালিকায় বাংলাদেশের মিঠা পানির মাছ
৬৪টি বিপন্ন প্রজাতির হিসাবটি এসেছে আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত 'রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, ভলিউম ৫: ফ্রেশওয়াটার ফিশেস' থেকে। ওই মূল্যায়নে ২৫৩টি প্রজাতি যাচাই করা হয়, যার মধ্যে ৬৪টি, অর্থাৎ ২৫.৩ শতাংশ, হুমকির মুখে বলে চিহ্নিত হয়: ৯টি মহাবিপন্ন, ৩০টি বিপন্ন এবং ২৫টি সংকটাপন্ন। আরও ২৭টি প্রজাতি প্রায়-সংকটাপন্ন, ১২২টি ন্যূনতম উদ্বেগের এবং বাকি ৪০টির বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। কোনো মাছকে বিলুপ্ত বা আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত পাওয়া যায়নি। এর আগে ২০০০ সালের মূল্যায়নে ২৬৬টি প্রজাতি যাচাই করে ৫৪টিকে হুমকির মুখে পাওয়া গিয়েছিল: ১২টি মহাবিপন্ন, ২৮টি বিপন্ন ও ১৪টি সংকটাপন্ন।
বিবিসি বাংলা যে পাঁচটি মাছের নাম উদাহরণ হিসেবে দিয়েছে, ২০১৫ সালের তালিকায় সবকটিই সবচেয়ে গুরুতর শ্রেণিতে। মহাশোল (Tor tor, টর মহাশির), খরকি বা খোরকা (Schistura corica, ছোট এক প্রজাতির গুতুম জাতীয় মাছ), পিপলা শোল (Channa barca, বারকা স্নেকহেড), কালা পাবদা (Ompok pabo, এক প্রজাতির ক্যাটফিশ) এবং বাঘাইড় বা বাঘ মাছ (Bagarius bagarius, নদীর বড় ক্যাটফিশ), সবগুলোই বাংলাদেশে মহাবিপন্ন হিসেবে মূল্যায়িত।
লাল তালিকায় দেখা যায়, হুমকির মুখে থাকা প্রজাতিগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশই ২৫ সেন্টিমিটারের নিচের মাঝারি ও ছোট মাছের দলের। এতে ব্যাখ্যা করা হয়, ছোট মাছ মূলত ছোট উপনদী, প্লাবনভূমি ও অন্যান্য ছোট জলাশয়ে থাকে, যার অনেকগুলো শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায়; কীটনাশক এবং সেচে জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরা ও ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহারের মতো অতিরিক্ত আহরণে এরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হুমকির মুখে থাকা মাছের বেশিরভাগ পাওয়া যায় দেশের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, যেখানে আবাসস্থল হারানোর মাত্রা সবচেয়ে ব্যাপক।
মূল্যায়নে প্রধান হুমকিগুলোও তালিকাভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের নদীগুলো বছরে প্রায় ২৪০ কোটি টন পলি বহন করে, যা নদীর তলদেশ, প্লাবনভূমি ও বিলের তলায় জমে অনেক জলাশয়কে শুষ্ক মৌসুমে অগভীর বা শুকনো করে ফেলে। জলাভূমি কৃষিজমি ও বসতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে; বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচের জন্য তৈরি বাঁধ নদী ও প্লাবনভূমির মধ্যে মাছের পাশাপাশি চলাচল আটকে দেয়; আর মাছ চলাচলের পথ ছাড়া প্লাবনভূমির ওপর দিয়ে তৈরি সড়ক জলাভূমিকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। ফসলের মাঠের কীটনাশক ও সার পানিতে মেশে, দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ১৩,০০০ টন বলে উল্লেখ করা হয়; আর অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ও পৌর বর্জ্য বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু, মেঘনা, কর্ণফুলী, সুরমা ও ধলেশ্বরীর মতো নদী দূষিত করছে।

কাকিলা: কুমিরের মতো ঠোঁটের নদীর মাছ
বিবিসি বাংলার বর্ণনায় কাকিলা মাছের দেহ সরু ও লম্বাটে, অনেকটা সিলিন্ডারের মতো; মুখের সামনে ধারালো দাঁতযুক্ত লম্বা ঠোঁট, দেখতে অনেকটা কুমিরের মতো। কোথাও কোথাও এটি কাইক্কা ও কাখলে নামেও পরিচিত। ২০১৫ সালের লাল তালিকায় এর বাংলা নাম দেওয়া হয়েছে কানকিলা, কাইক্যা, কাকিলা, কাখলা ও কাইক্কা, আর ইংরেজি নাম ফ্রেশওয়াটার গারফিশ, নিডল ফিশ ও সিলভার নিডল ফিশ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Xenentodon cancila; ১৮২২ সালে হ্যামিলটন প্রথম এর বর্ণনা দেন, আর এটি নিডলফিশ পরিবার বেলোনিডির (Belonidae) সদস্য।
বিশ্বের মাছের তথ্যভান্ডার ফিশবেস অনুযায়ী, কাকিলা সর্বোচ্চ ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, সাধারণ দৈর্ঘ্য ৩০ সেন্টিমিটার। দেহ খুব লম্বাটে ও সামান্য চাপা; পিঠের দিক সবুজাভ রুপালি, নিচের দিকে ক্রমশ সাদাটে; পাশ বরাবর গাঢ় কিনারাযুক্ত একটি রুপালি ডোরা, আর পূর্ণবয়স্ক মাছের বক্ষপাখনা ও পায়ুপাখনার মাঝখানে চার-পাঁচটি দাগের সারি থাকে। মাছটি প্রধানত নদীতে থাকে, তবে পুকুর, খাল, বিল ও প্লাবিত মাঠেও পাওয়া যায়; একা একা মাঝপানিতে, সাধারণত স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটে এবং শিকার তাড়া করার সময় হঠাৎ দ্রুতগতিতে ছুটতে পারে। এটি ছোট মাছ, চিংড়ি জাতীয় প্রাণী ও পোকামাকড় খায়।
বিবিসি বাংলা জানায়, শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডেও এই মাছ পাওয়া যায়, তবে রঙ ও আকারে কিছু তারতম্য রয়েছে। ২০১৫ সালের লাল তালিকা এর বিস্তৃতিতে নেপাল ও মালয় উপদ্বীপও যোগ করে এবং জানায়, বাংলাদেশে মাছটি সারা দেশের নদী, হাওর, বাঁওড়, বিল, হ্রদ, পুকুর এবং জোয়ার-ভাটার লোনা পানির নদী ও তার শাখায় বাস করে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, খাল ও বিলের মতো অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে এক সময় কাকিলা প্রচুর পাওয়া যেত, বাজারেও উঠত, ফলে সাধারণ মানুষ তা খেতে পারত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনসহ মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে এর বসবাসের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ে। কীটনাশক ব্যবহারে এর প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জলাশয় ভরাটে বাধাগ্রস্ত হয় অবাধ চলাচল। মো. রবিউল আউয়াল হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আগে এই মাছটা প্রচুর পাওয়া যেত। কিন্তু এখন কিছু কিছু অঞ্চল ছাড়া আর কোথাও তেমন একটা পাওয়া যায় না। এরই প্রেক্ষিতে সরকার এই মাছটিকে রক্ষার উদ্যোগ নেয়।"
তবে আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নে মাছটির অবস্থা এতটা গুরুতর দেখানো হয়নি। ২০১৫ সালের জাতীয় লাল তালিকায় কাকিলাকে ন্যূনতম উদ্বেগের প্রজাতি বলা হয় এবং দেশের সবচেয়ে সাধারণ মিঠা পানির মাছগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, সাম্প্রতিক এক জরিপে এর সংখ্যা সামান্য কমার ইঙ্গিত মিললেও একে হুমকির কোনো শ্রেণিতে ফেলার মতো নিশ্চিত তথ্য নেই, আর এর বিস্তৃতির এলাকা প্রায় ২,১৭,৪৬৮ বর্গকিলোমিটার ও বসবাসের এলাকা প্রায় ১১,৮৫৭ বর্গকিলোমিটার, যা হুমকির যেকোনো শ্রেণির সীমার চেয়ে বেশি। ২০১৯ সালের ১২ আগস্ট করা আইইউসিএনের বৈশ্বিক মূল্যায়নেও প্রজাতিটি ন্যূনতম উদ্বেগের তালিকায়।

যশোরে তিন বছর: নদীর মাছকে পুকুরে অভ্যস্ত করা
বিবিসি বাংলা জানায়, গবেষণা হয় যশোরের স্বাদু পানি উপকেন্দ্রে, যেখানে প্রায় তিন বছর নিবিড় গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা ২০২১ সালের আগস্টে কৃত্রিম প্রজনন ঘটাতে সক্ষম হন। খুলনা বিভাগের যশোর জেলার আয়তন ২,৬০৬.৯৪ বর্গকিলোমিটার; জেলাটি পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা, আর এর প্রধান নদী ভৈরব, চিত্রা, বেতনা, কপোতাক্ষ ও মুক্তেশ্বরী। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বাঁওড়েরও এলাকা: নদী গতিপথ বদলালে পেছনে পড়ে থাকা অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদকে বাঁওড় বলে, আর বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় এগুলো সারা বছর পানি ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি, যেখানে নানা ধরনের জলজ প্রাণের বাস।
কাকিলা এক বছর আগেই ইনস্টিটিউটের গবেষণা তালিকায় ছিল। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, বিএফআরআই প্রায় বিলুপ্ত ২৩টি দেশি প্রজাতির পোনা উৎপাদন করেছে ও সেগুলোর চাষপদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে, আর তখন ঢেলা, শালবাইন, কাকিলা ও আঙুস ভোলের ওপর গবেষণা চলছিল।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ধাপে কাকিলাকে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে ধরে পুকুরের মতো বদ্ধ জলাশয়ে আনা হয়। ধরা ও পরিবহনের সময় খুব সতর্ক থাকতে হয়, যাতে মাছের কোনো ক্ষতি না হয়। মো. রবিউল আউয়াল হোসেন বলেন, "কাকিলা মাছ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এটিকে পানিতে রেখে, পানির ট্যাঙ্কে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেনের প্রবাহ দিয়ে, গাড়িতে করে খুব সাবধানে নিয়ে আসা হয়েছে। পরে এটি পুকুরের পানিতে ছেড়ে দিয়ে কন্ডিশনিং করা হয়েছে।"
তিনি জানান, প্রথমে পুকুরে মাছটির উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হয়: মাছটি স্রোত পছন্দ করে কি না, জলজ উদ্ভিদের মধ্যে থাকতে ভালোবাসে কি না, এসব মাথায় রেখে মোটামুটি একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এভাবে এক থেকে দুই বছর ধরে মাছটিকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো হয়। এ সময় এর আচার-আচরণ ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর নজর রাখা হয়, আর হ্যাচারিতে উৎপাদিত কার্প জাতীয় মাছের জীবিত পোনা এবং জলাশয় থেকে সংগৃহীত জীবিত ছোট মাছ খাইয়ে একে পুকুরের বদ্ধ পরিবেশে অভ্যস্ত করা হয়।
"পুকুরে জাল টেনে ধরার পর মাছটিকে আবার পানিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। একসময় জালের উপরে এসব মাছ মরে যেত। কিন্তু একটা সময় দেখা গেল এটি মাছের গা-সওয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ নতুন পরিবেশে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে," বলেন জনাব হোসেন। এরপরই মাছটির প্রজননের ব্যবস্থা করা হয়।
হরমোন প্রয়োগ থেকে পোনা: প্রজনন যেভাবে হলো
বিবিসি বাংলা জানায়, প্রকৃতিতে কাকিলা সাধারণত প্রবহমান জলাশয়ে, বিশেষ করে নদীতে এবং বর্ষায় প্লাবিত এলাকায় প্রজনন করে। পরিণত মাছ ভাসমান জলজ উদ্ভিদ নেই এমন জায়গায় থাকলেও স্ত্রী মাছ ডিম পাড়ে জলজ উদ্ভিদের পাতার নিচে ও ভাসমান শিকড়ে। বিজ্ঞানীরা দেখেন, জুলাই ও আগস্টে কাকিলার ডিমের পরিপক্বতা সবচেয়ে ভালো থাকে, তাই প্রজননের জন্য তাঁরা এই সময়টিই বেছে নেন। ফিশবেসেও লেখা আছে, এই প্রজাতির ডিমের গায়ের সুতার মতো অংশ দিয়ে ডিম পানির মধ্যে কোনো বস্তুর গায়ে আটকে থাকে।
মো. শরীফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এপ্রিল মাস থেকেই আমরা প্রজননের বিষয়ে পরীক্ষা চালাতে শুরু করি। প্রথমে এর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের ওপর গবেষণা চালানো হয়। যখন দেখা যায় যে মাছটি প্রজননের জন্য তৈরি তখন বিভিন্ন ডোজে বিভিন্ন ধরনের হরমোন প্রয়োগ করা হয়।" বেশ কিছু পরীক্ষার পর দেখা যায়, নির্দিষ্ট একটি ডোজে মাছটি উত্তেজিত হয়ে পড়ছে; তখন মা মাছ ডিম পাড়ে, পুরুষ মাছ সেখানে শুক্রাণু ছাড়ে এবং ডিম নিষিক্ত হয়। এতে বিজ্ঞানীরা ধরে নেন, ওই ডোজ প্রজননের উপযোগী। প্রতিবেদনে হরমোনের নাম বা মাত্রা জানানো হয়নি।
এরপর চৌবাচ্চার ভেতরে ঝরনার মতো পানির ধারা তৈরি করে সেখানে চার জোড়া মাছ ছাড়া হয়। কাকিলা সাধারণত কচুরিপানার মতো জলজ উদ্ভিদের গায়ে ডিম পাড়ে বলে চৌবাচ্চার ভেতরে সে রকম পরিবেশ তৈরি করা হয়। হরমোন ইনজেকশন দেওয়ার প্রায় ৪০ ঘণ্টা পরে মা কাকিলা ডিম ছাড়ে, এরপর বাবা মাছ শুক্রাণু ছাড়ে। কোনো দূষণে ডিম নষ্ট না হয় বা বড় মাছ খেয়ে না ফেলে, সে জন্য ডিমগুলো রাখা হয় নিবিড় পরিচর্যায়।
"কাকিলা মাছের ডিম আঠালো হয়। সেগুলো কচুরিপানার গায়ে শক্ত হয়ে লেগে থাকে। দেখা যায় যে বাবা কিম্বা মা মাছ এসব ডিম খাচ্ছে না। বরং যেখানে বেশি ডিম সেখানে তারা পাহারা দিচ্ছে। বোঝা গেল যে তাদের প্যারেন্টাল কেয়ার অত্যন্ত শক্তিশালী," বলেন জনাব ইসলাম। এই পর্যবেক্ষণ ফিশবেসে সংকলিত অ্যাকুরিয়ামের বিবরণ থেকে আলাদা, সেখানে এই প্রজাতিতে বাচ্চার যত্ন না নেওয়ার কথা লেখা আছে; প্রকৃতিতে মাছটি নিয়ে কত কম গবেষণা হয়েছে, এটি তারই ইঙ্গিত। অবশেষে ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট রাত চারটায় ডিম থেকে পোনা বের হয়।
বিবিসি বাংলা জানায়, এই মাছ নিয়ে বিজ্ঞানীদের তখনও পূর্ণাঙ্গ ধারণা ছিল না, কারণ এর আগে কখনো কাকিলা নিয়ে গবেষণা হয়নি; ফলে ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদেরই প্রথমবারের মতো কাজটি করতে হচ্ছিল। মো. রবিউল আউয়াল হোসেন জানান, এই গবেষণা থেকে পাওয়া ধারণা নিয়েই তাঁরা ধাপে ধাপে আরও সামনে এগোচ্ছেন।
গবেষণার পেছনের প্রতিষ্ঠান
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যা দেশের মৎস্য গবেষণার পরিকল্পনা, সমন্বয় ও পরিচালনার জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়; তবে এর কাজ প্রকৃতপক্ষে শুরু হয় ১৯৮৬ সালে। এর লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে সব জীবিত জলজ সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য মৌলিক ও অভিযোজনমূলক গবেষণা, কম খরচের ও পরিবেশবান্ধব মাছ চাষ ও ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং দক্ষ কারিগরি জনবল তৈরি। ইনস্টিটিউটের প্রধান মহাপরিচালক, আর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি পরিচালনা বোর্ড এটি তত্ত্বাবধান করে।
সদর দপ্তর ময়মনসিংহে। বাংলাপিডিয়ায় চারটি গবেষণা কেন্দ্রের উল্লেখ আছে: স্বাদু পানির মাছ চাষ গবেষণার জন্য ময়মনসিংহের স্বাদু পানি কেন্দ্র, নদীর মৎস্যসম্পদ গবেষণার জন্য চাঁদপুরের নদী কেন্দ্র, খুলনার পাইকগাছার লোনা পানি কেন্দ্র এবং কক্সবাজারের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র; সঙ্গে জলাধারের মৎস্য ব্যবস্থাপনার জন্য রাঙামাটিতে এবং প্লাবনভূমি নিয়ে গবেষণার জন্য সান্তাহারে দুটি উপকেন্দ্র। স্বাদু পানি কেন্দ্রটি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছে প্রায় ৪০ হেক্টর জায়গাজুড়ে; সেখানে পানি নিষ্কাশনযোগ্য ১১৮টি পরীক্ষামূলক পুকুর এবং বছরে ৩০ কোটির বেশি পোনা উৎপাদনক্ষম একটি কার্প হ্যাচারি রয়েছে। ২০২০ সালে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ইনস্টিটিউটের শাখা হিসেবে বগুড়া, সান্তাহার, নীলফামারীর সৈয়দপুর ও যশোরের নাম উল্লেখ করে।
কাকিলার প্রজননের আগের বছরে ইনস্টিটিউট দেশি মাছ নিয়ে কাজের পরিসর বাড়ায়। ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহে বিএফআরআইয়ের সদর দপ্তরে বিপন্ন দেশি মাছের একটি জিন ব্যাংক চালু হয়, যাকে দেশে এ ধরনের প্রথম বলে বর্ণনা করা হয়; উদ্বোধনে ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বলেন, দেশে মোট ২৬০ প্রজাতির মাছ আছে এবং তার ১৪৩টি তখন জিন ব্যাংকে রয়েছে। একই মাসে মহাপরিচালক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, এই কাজের ফলে জিন সংরক্ষণ, প্রজনন কৌশল ও বাণিজ্যিক চাষ সম্ভব হয়েছে এবং প্রতি বছর দেশি প্রজাতির প্রায় ৩০০ কোটি পোনা সরবরাহ করা হচ্ছে।
ছোট মাছের পুষ্টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিবিসি বাংলা জানায়, কাকিলা খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি অনুপুষ্টিসমৃদ্ধ: এতে আছে নানা ধরনের ভিটামিন, প্রোটিন, লিপিড এবং ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও আয়োডিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, আর বিজ্ঞানীদের মতে অন্যান্য ছোট মাছের তুলনায় কাকিলায় এসব উপাদান বেশি। ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, "সাধারণ মানুষের বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য এসব খনিজ পদার্থ খুবই উপকারী। যারা অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতায় ভুগছে তাদের জন্য এবং দেহের রক্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এসব খনিজ পদার্থ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।"
২০২১ সালের আগে প্রকাশিত গবেষণা দেখায়, এমন মাছ হারিয়ে গেলে খাদ্যতালিকায় কী ক্ষতি হয়। ২০১৭ সালের এপ্রিলে পিএলওএস ওয়ান সাময়িকীতে ওয়ার্ল্ডফিশের সঙ্গে কাজ করা গবেষকদের একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়, যাতে ১৯৯১, ২০০০ ও ২০১০ সালের জাতীয় খানা জরিপের ২৫,৪২৫টি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাছ খাওয়া ৩০ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু চাষ না করা প্রজাতির মাছ খাওয়া কমেছে ৩৩ শতাংশ, আর সেই জায়গা নিয়েছে চাষের মাছ। বেশি মাছ খাওয়া সত্ত্বেও মাছ থেকে পাওয়া আয়রন ও ক্যালসিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, কারণ সাধারণ চাষের প্রজাতিগুলোর পুষ্টিমান প্রাকৃতিক জলাশয়ের বৈচিত্র্যময় প্রজাতির তুলনায় সাধারণত কম।
একই গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের ছোট দেশি মাছে মোট আয়রনের ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত হিম আয়রন পাওয়া গেছে, যেখানে লাল মাংসে তা প্রায় ৪০ শতাংশ। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে মাথাপিছু মাছের সরবরাহ ১৯৯০ সালের বছরে ৭.৬ কেজি থেকে বেড়ে ২০১৩ সালে ১৯.২ কেজি হয়েছে, আর সেই সরবরাহে চাষের মাছের অংশ ২৩ থেকে বেড়ে ৫৫ শতাংশ হয়েছে। গবেষকেরা বড় মাছের সঙ্গে ছোট দেশি মাছের মিশ্রচাষ, সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনার জলাভূমিতে পুষ্টিসমৃদ্ধ ছোট মাছ ছাড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিসমৃদ্ধ ছোট প্রজাতির কৃত্রিম প্রজনন গবেষণায় সরকারি বিনিয়োগ ও সেই প্রযুক্তি বেসরকারি হ্যাচারিতে পৌঁছে দেওয়ার সুপারিশ করেন।
বাংলাদেশের খাদ্যতালিকায় মাছের জায়গা কেন্দ্রীয়। মৎস্য অধিদপ্তরের ২০১৪ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০১৫ সালের লাল তালিকায় বলা হয়, খাদ্যের প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে, আর মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণ ৫২ গ্রাম, যেখানে সুপারিশকৃত মাত্রা ৬৮ গ্রাম। সেখানে আরও বলা হয়, ১২ লাখ পেশাদার জেলে পূর্ণকালীন মাছ ধরে জীবিকা চালান, আর আরও এক কোটি মানুষ নিজেদের খাবার বা বাড়তি আয়ের জন্য মাছ ধরেন।

দেশি মাছ রক্ষার আইন ও পরিকল্পনা
২০১৫ সালের লাল তালিকায় উল্লেখ আছে, বাংলাদেশে মাছ সংরক্ষণের উদ্বেগের শুরু ১৯৫০ সালে মৎস্য সংরক্ষণ আইন জারির মধ্য দিয়ে; আইনটি ২০১২ সালে সংশোধিত হয়। এই আইন জালের ফাঁসের আকারে বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং ক্ষতিকর জাল ও মাছ ধরার পদ্ধতি নিষিদ্ধ করে, লঙ্ঘনে শাস্তি ও জরিমানার বিধান রয়েছে। ২০০০ সালের মৎস্য নীতির মূল মনোযোগ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মৎস্যসম্পদে, আর বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর তফসিল ২-এ কয়েকটি মাছ অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো ধরায় বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ আছে।
লাল তালিকার প্রণেতারা আরও কী প্রয়োজন, তাও তুলে ধরেন। তাঁদের সুপারিশের মধ্যে ছিল:
- বাংলাদেশের সব মিঠা পানির মাছের জন্য প্রজাতিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা;
- মৎস্য সংরক্ষণ আইন ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইন সংশোধন করে হুমকির মুখে থাকা মাছের প্রজাতিকে গুরুত্ব দেওয়া;
- জলাভূমির রূপান্তর বন্ধ করা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প, সড়ক ও মহাসড়কে মাছ চলাচলের পথ রাখা;
- ক্ষয়ে যাওয়া জলাশয় পুনঃখনন ও সংযোগ খাল খুলে দেওয়া;
- দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশক নিষিদ্ধ করা এবং অপরিশোধিত শিল্প ও পৌর বর্জ্য পানিতে ফেলা বন্ধ করা;
- বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলে আরও মৎস্য অভয়াশ্রম গড়া এবং জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরা ও ক্ষতিকর জালের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো।
ছবি: Guérin Nicolas / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, আইইউসিএন বাংলাদেশ (রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, ভলিউম ৫: ফ্রেশওয়াটার ফিশেস, ২০১৫), ফিশবেস, বাংলাপিডিয়া, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা ট্রিবিউন, পিএলওএস ওয়ান (বোগার্ড ও অন্যান্য, ২০১৭)





মন্তব্য
(০)