প্রান্তিক কৃষকদের আয় বাড়ানো ও আর্থিক স্বচ্ছলতা আনার লক্ষ্যে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) বহিরাঙ্গন কার্যক্রম বিভাগ ২০২৬ সালের ২১ জুন, রোববার, ঢাকার কেরানীগঞ্জ কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করে। প্রশিক্ষণের শিরোনাম ছিল ‘বস্তায় আদা চাষ প্রযুক্তি এবং পেঁয়াজ উৎপাদনের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক স্বচ্ছলতা আনয়ন’।
শেকৃবি দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট নামে এর যাত্রা শুরু হয়; ২০০১ সালে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়ে বর্তমান নাম পায়। ক্যাম্পাস ঢাকার শেরেবাংলা নগরে। প্রশিক্ষণের স্থান কেরানীগঞ্জ ঢাকা জেলারই একটি উপজেলা।
প্রশিক্ষণে কারা ছিলেন, কী শেখানো হলো
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শেকৃবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. বেলাল হোসেন এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহুয়া শারমিন মুনমুন। সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিরাঙ্গন কার্যক্রম বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জামশেদ আলম। প্রশিক্ষক ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. শরীফুল ইসলাম এবং বি-স্ট্রং প্রকল্পের মনিটরিং অফিসার ও অতিরিক্ত পরিচালক (প্রেষণে) মো. নাসির উদ্দিন।
অংশ নেওয়া কৃষকদের যেসব বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়:
- বস্তায় আদা চাষের ব্যবহারিক কৌশল
- পেঁয়াজ উৎপাদনের উন্নত ব্যবস্থাপনা
- আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগ
- উৎপাদিত ফসলের বাজারজাতকরণ
প্রধান অতিথি বেলাল হোসেন বলেন, সীমিত জমিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বস্তায় আদা চাষ এবং উন্নত পদ্ধতিতে পেঁয়াজ উৎপাদন প্রান্তিক কৃষকদের জন্য লাভজনক ও টেকসই উদ্যোগ হতে পারে; এ ধরনের প্রযুক্তি উৎপাদন ব্যয় কমায়, আয় বাড়ায় এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে। সভাপতি জামশেদ আলম জানান, কৃষকের দক্ষতা বাড়ানো ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতেও চলবে।
বস্তায় আদা চাষ কেন গুরুত্ব পাচ্ছিল
প্রশিক্ষণের চার দিন আগে, ২০২৬ সালের ১৭ জুন সমকালে প্রকাশিত কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা যায়, দেশে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন আদার চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছিল প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার টন; ঘাটতি প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ১ লাখ ৩৫ হাজার টন আদা আমদানি হয়, যাতে ব্যয় হয় প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।
এই ঘাটতি কমাতে মন্ত্রণালয় তিন বছরে আদায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার কর্মপরিকল্পনা নেয়। এতে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে নতুন করে মোট ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আদা চাষ এবং আম বাগান, লিচু বাগান, বসতবাড়ি ও পতিত জমিতে বস্তাভিত্তিক চাষ বাড়িয়ে অতিরিক্ত ১ লাখ ৪৮ হাজার টন আদা উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের অধীনে ৪০ জেলায় ২৮ লাখ বস্তায় আদা উৎপাদন হয়েছিল।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বগুড়ার শিবগঞ্জের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশিকুল ইসলাম নিরু ২০২৪ সালের নভেম্বরে আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছিলেন, এক বস্তায় ৫০ থেকে ৬০ গ্রাম বীজ আদা লাগে এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বস্তাপ্রতি খরচ ৫০ থেকে ৬০ টাকা। তাঁর হিসাবে বস্তাপ্রতি এক কেজি ফলন হলেও কৃষক লাভবান হন। বাড়ির আনাচে-কানাচে, রাস্তার পাশে, নতুন বাগানে বা যেখানে ছায়া কম, সেখানেও বস্তায় আদা চাষ করা যায়; তাই অল্প জমির কৃষকের কাছে পদ্ধতিটি উপযোগী।

পেঁয়াজ উৎপাদনের চিত্র
পেঁয়াজও দেশের প্রধান মসলা ফসলগুলোর একটি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার ২০২৬ সালের ২৫ মে জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ৩১ লাখ ৪১ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়, আগের বছর যা ছিল ২৯ লাখ ৯০ হাজার টন। একই প্রতিবেদনে সংরক্ষণের অভাবে পেঁয়াজ পচে যাওয়া এবং কম দামে কৃষকের ক্ষতির কথাও উঠে আসে। উৎপাদনের সঙ্গে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের জ্ঞান তাই কৃষকের আয়ের জন্য জরুরি, আর কেরানীগঞ্জের প্রশিক্ষণে বাজারজাতকরণও ছিল আলোচ্য বিষয়।


ছবি: Jubair1985 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, সমকাল, আজকের পত্রিকা, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)