২০২৬ সালের ১২ জুন, শুক্রবার সন্ধ্যায় শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় বিষধর সাপের কামড়ে ১৩ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের নামা হাতিপাগাড় এলাকায় বাড়ির সামনের পুকুরপাড়ে তাকে সাপে কামড়ায়। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। জাগো নিউজ ২৪ সেদিনই খবরটি প্রকাশ করে।
পুকুরপাড়ে সাপের কামড়
পরিবার ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জাগো নিউজ ২৪ জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ছেলেটি বাড়ির সামনের পুকুরপাড়ে গিয়েছিল। সেখানে হঠাৎ একটি বিষধর সাপ তাকে কামড় দেয়। পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
প্রতিবেদনে সাপটি কোন প্রজাতির, তা শনাক্ত করার কোনো তথ্য ছিল না। তাই কোন সাপ কামড়েছিল, সে বিষয়ে এখানে কিছু বলা হচ্ছে না। নিচে দেশের যে বিষধর সাপগুলোর কথা এসেছে, সেগুলো সাধারণ তথ্য হিসেবে দেওয়া হলো; এ ঘটনার সাপের পরিচয় হিসেবে নয়।
গারো পাহাড়ের পাদদেশে নালিতাবাড়ী
নালিতাবাড়ী ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর জেলার একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ৩২৭.৬০ বর্গকিলোমিটার। উপজেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে শেরপুর সদর ও নকলা উপজেলা, পূর্বে ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট এবং পশ্চিমে ঝিনাইগাতী উপজেলা। ১৯৮৩ সালে নালিতাবাড়ী থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে উপজেলাটি গঠিত, নয়াবিল তার একটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী উপজেলার জনসংখ্যা ২ লাখ ৭১ হাজার ৯৩৩।
ভোগাই, কংশ, মালিঝি ও থলং উপজেলার প্রধান নদী; খুসকি, পাইকাল, কাস্তি, বড়, কুলা ও দুবলাকুড়ি উল্লেখযোগ্য বিল। গারো, হাজং, হদি, মান্দাই ও কোচ জনগোষ্ঠীর মানুষও এ উপজেলায় বাস করেন। ২০১১ সালের জনশুমারির তথ্য ধরে বাংলাপিডিয়া জানায়, উপজেলার ৭০.০৬ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। ধান, পাট, গম, আলু, সরিষা ও শাকসবজি এখানকার প্রধান ফসল; আম, কাঁঠাল, লিচু ও কলা প্রধান ফল, আর চাল, কলা ও শাকসবজি উপজেলার প্রধান রপ্তানিপণ্য।
ভোগাই নদীর ওপর রাবার ড্যাম এবং পোড়াগাঁও ইউনিয়নের মধুটিলা ইকোপার্ক উপজেলার পরিচিত স্থাপনা ও দর্শনীয় স্থান। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ৩৮০ একরের মধুটিলা ইকোপার্ক বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছে, মধুটিলা বন রেঞ্জের মধ্যে অবস্থিত।

শেরপুর ১৯৮৪ সালের আগে জামালপুর জেলার একটি মহকুমা ছিল; সে বছর এটিকে জেলায় উন্নীত করা হয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়তন ১,৩৬৪.৬৭ বর্গকিলোমিটার, আর উপজেলা পাঁচটি: শেরপুর সদর, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী, নকলা ও শ্রীবরদী। জেলার উত্তরেও মেঘালয়। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, সোমেশ্বরী, চেল্লাখালী, ভোগাই, কংশ ও দিগনা জেলার প্রধান নদী। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ১ হাজার ৮৫৩, আর জেলার ৬৫.৭১ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
দেশে সাপের কামড়: সংখ্যার চিত্র
সাপের কামড় বাংলাদেশে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি) ২০২১-২২ সালে "ন্যাশনাল সার্ভে অন অ্যানুয়াল ইনসিডেন্স অ্যান্ড এপিডেমিওলজি অব স্নেকবাইট ইন বাংলাদেশ" নামে একটি জাতীয় জরিপ চালায়। ২০২৩ সালের ১৮ জুন প্রকাশিত এর ফলাফল অনুযায়ী দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং তাঁদের মধ্যে ৭ হাজার ৫১১ জন মারা যান।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা ট্রিবিউন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওই বছরের জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানায়, দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২৪৪ জন প্রতিবছর বিষধর সাপের কামড়ের শিকার হন এবং প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচজন মারা যান। জরিপ অনুযায়ী সাপে কাটা মানুষের ৯৫ শতাংশই গ্রামের বাসিন্দা।
এর আগের হিসাবগুলো ছিল ভিন্ন। ২০০৯ সালে দেশের ৬৪ জেলার ২৪টিতে ১৮ হাজার ৮৫৭ জনের ওপর চালানো একটি জরিপের ভিত্তিতে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক সাময়িকী পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেসে প্রকাশিত গবেষণায় (রহমান ও সহকর্মীরা) অনুমান করা হয়, গ্রামীণ বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৯ জন সাপের কামড়ের শিকার হন এবং ৬ হাজার ৪১ জন মারা যান। গবেষণাটিতে সাপের কামড়ের বার্ষিক হার পাওয়া যায় প্রতি এক লাখ মানুষে ৬২৩.৪। ২০১৯ সালের অক্টোবরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির এক সেমিনারে বছরে প্রায় ৭ লাখ মানুষের সাপের কামড়ের শিকার হওয়া এবং ৬ হাজারের বেশি মৃত্যুর কথা বলা হয়। সেখানে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, দেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৬ জন সাপের কামড়ে মারা যান।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের আগস্টের এক বিশ্লেষণে লেখে, নতুন জরিপে সাপের কামড়ের সংখ্যা আগের অনুমানের চেয়ে কম এলেও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. রোবেদ আমিন পত্রিকাটিকে বলেন, আগের তথ্য শুধু গ্রামভিত্তিক ছিল, আর নতুন জরিপটি ক্লাস্টারভিত্তিক হওয়ায় বেশি নির্ভরযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জানায়, বাংলাদেশে বন্যার সময় মৃত্যুর দ্বিতীয় সাধারণ কারণ সাপের কামড়।
শিশু ও গ্রামের মানুষ কেন বেশি ঝুঁকিতে
ডব্লিউএইচওর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের তথ্যপত্র অনুযায়ী সাপের কামড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষিশ্রমিক ও শিশুরা। শরীরের ওজন কম বলে শিশুদের ওপর বিষের প্রভাব প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশি তীব্র হতে পারে এবং দ্রুত দেখা দিতে পারে। সংস্থাটির ২০১৯ সালের প্রশ্নোত্তর পাতায় বলা হয়, কৃষিকাজে যুক্ত মানুষ, যার মধ্যে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী কর্মজীবী শিশুরাও আছে, এবং দুর্বলভাবে নির্মিত ঘরে বসবাসকারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
রহমান ও সহকর্মীদের গবেষণায় সাপে কাটা মানুষের ১১ শতাংশ ছিল ১০ বছর বা তার কম বয়সী শিশু, আর ১১ থেকে ২০ বছর বয়সীরা ছিল ২২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি কামড়ের ঘটনা ঘটেছে পানিতে (২৭ শতাংশ), এরপর মাঠে (২৪ শতাংশ); বাড়ির আঙিনায় ও ঘরের ভেতরে প্রায় সমান অনুপাতে (১১ ও ১২ শতাংশ)। ৭১ শতাংশ কামড় লেগেছে পায়ে। ৩৬ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে রাতে, সকাল ও বিকেলে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ করে।
গবেষকেরা দেখেছেন, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে সাপের কামড় সবচেয়ে বেশি হয়; অক্টোবরে ২২ শতাংশ ও জুলাইয়ে ১৫ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের ব্যাখ্যায়, এ সময় কৃষিকাজ বেশি হয়, গরম ও বৃষ্টিতে সাপের চলাফেরাও বাড়ে। রাতে বাড়িতে বা রাস্তার পাশে কামড়ের ঘটনাকে তাঁরা ক্রেইট বা কালাচ সাপের সঙ্গে যুক্ত করেছেন: এ সাপ সাধারণত নিশাচর, মানুষের বসতির কাছে গর্ত, কাঠের স্তূপ বা বাড়ির বাগানে লুকিয়ে থাকে এবং বর্ষার রাতে ঘরেও ঢুকে পড়ে। ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনেও বলা হয়, বর্ষায় রাস্তা ও বসতির পাশে পানি জমে সাপ আবাস হারায়, ফলে গ্রামে সাপে কাটা রোগী বাড়ে।
বাংলাদেশের বিষধর সাপ
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলাদেশের সাপের কামড় ব্যবস্থাপনার জাতীয় নির্দেশিকার বরাত দিয়ে জানায়, দেশে প্রায় ১০০ প্রজাতির সাপ আছে, যার ৩৭টি বিষধর। এর মধ্যে ১৬টি সামুদ্রিক সাপ, তিন ধরনের গোখরা বা কেউটে, পাঁচ ধরনের ক্রেইট (কালাচ ও শঙ্খিনী জাতীয়), দুই ধরনের প্রবাল সাপ, ছয় ধরনের সবুজ বোড়া এবং একটি প্রকৃত ভাইপার, রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাতে ঢাকা ট্রিবিউন অবশ্য ৯৮ প্রজাতির কথা বলেছে, যার ৩১টি বিষধর; উৎসভেদে সংখ্যায় এই ভিন্নতা আছে।
ডব্লিউএইচও জানায়, ক্রান্তীয় এশিয়ায় গুরুতর সাপের কামড়ের বেশির ভাগের জন্য দায়ী গোখরা জাতীয় সাপ (নাজা), ক্রেইট (বাঙ্গারাস) এবং যেখানে আছে সেখানে রাসেলস ভাইপার। বিষধর সাপের কামড়ে পক্ষাঘাত হয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে, রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা প্রাণঘাতী হতে পারে, কিডনি স্থায়ীভাবে বিকল হতে পারে এবং টিস্যুর ক্ষতি থেকে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা অঙ্গহানি ঘটতে পারে।

২০২৪ সালের জুনে দেশজুড়ে রাসেলস ভাইপার নিয়ে আতঙ্ক ছড়ালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সচেতনতা কার্যক্রম শুরু করে। আরব নিউজকে অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে, আর রাসেলস ভাইপার আক্রান্ত না হলে কামড়ায় না। একই মাসে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এক নির্দেশনায় সাপ দেখলে ধরা বা মারার চেষ্টা না করে জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩-এ বা বন বিভাগকে জানাতে বলে। নির্দেশনায় বলা হয়, বেজি, গুইসাপ, বাগডাশ, গন্ধগোকুল, বনবিড়াল, মেছো বিড়াল, কয়েক প্রজাতির পাখি এবং কিছু সাপ রাসেলস ভাইপার খেয়ে এর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে, আর এসব প্রাণী নির্বিচারে মারার কারণে প্রকৃতিতে এ সাপ বেড়ে যাচ্ছে।

অ্যান্টিভেনম ও জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা
ডব্লিউএইচও বলছে, সাপের বিষের বেশির ভাগ প্রভাব ঠেকাতে বা ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা মানসম্মত অ্যান্টিভেনম। এটি সংস্থাটির অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় আছে এবং যেখানে সাপের কামড় হয়, সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হওয়া উচিত। কামড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব অ্যান্টিভেনম দিলে সবচেয়ে ভালো ফল মেলে, কারণ বিষের অনেক প্রভাব পরে আর ফেরানো যায় না।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ডব্লিউএইচও জানায়, তাদের সহায়তায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সাপের কামড় ব্যবস্থাপনার নির্দেশিকা হালনাগাদ করেছে, সে বছর দেশজুড়ে ৫ হাজার ডোজ অ্যান্টিভেনম বিতরণ করা হয়েছে এবং অক্টোবর ও নভেম্বরে বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৫২ জন চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের অক্টোবরের সেমিনারে "সাপের কামড়ের চিকিৎসা নির্দেশিকা ২০১৯"-এর প্রচ্ছদ উন্মোচন করা হয়। সেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, প্রতিটি জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ উপজেলা হাসপাতালে তা নেই, এবং দ্রুত সব উপজেলা হাসপাতালে তা পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তৎকালীন স্বাস্থ্য মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন, ভারত থেকে অ্যান্টিভেনম আসে, কিন্তু বাংলাদেশের সাপের প্রজাতি কিছুটা ভিন্ন, তাই দেশেই অ্যান্টিভেনম তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।
এ লক্ষ্যে সরকারি অর্থায়নে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভেনম রিসার্চ সেন্টার গড়ে তোলা হয়। মোঙ্গাবের ২০২৩ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী কেন্দ্রটি ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত, এর প্রধান গবেষক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অনিরুদ্ধ ঘোষ, এবং তখন পর্যন্ত দেশে নিজস্ব কোনো অ্যান্টিভেনম ছিল না, পুরোটাই আমদানিনির্ভর।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম "পলিভ্যালেন্ট", অর্থাৎ ক্রেইট, গোখরা ও রাসেলস ভাইপারসহ চার ধরনের বিষধর সাপের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য তৈরি, এবং ইনসেপ্টা একমাত্র ওষুধ কোম্পানি যারা তা ভারত থেকে আনে। ডা. রোবেদ আমিন বলেন, দেশের ক্রেইট সাপ ভারতের ক্রেইটের মতো নয়, তাই এ অ্যান্টিভেনম এখানকার ক্রেইটের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর, তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তিনি জানান, ২০২০-২১ সালে সরকারের মাধ্যমে হাসপাতালগুলোতে ৫০ হাজার ভায়াল অ্যান্টিভেনম বিতরণ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যান্টিভেনমের মেয়াদ পাঁচ বছর, আর বাইরে থেকে কিনতে হলে প্রতি ভায়ালের দাম আগের ৭০০-৮০০ টাকা থেকে বেড়ে ১,৬০০ টাকা হয়েছে।
ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৩ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, ২০২২ সালের শুরু পর্যন্ত দেশের ৮০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিভিল সার্জন কার্যালয়, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৪১ হাজার ৪৭০ ডোজ অ্যান্টিভেনম পাঠানো হয়, যার অনেকগুলোর মেয়াদ পেরিয়ে গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম পত্রিকাটিকে বলেন, কিছু রোগীর অ্যান্টিভেনম নেওয়ার পর তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং নিবিড় পরিচর্যা লাগে, যা উপজেলা পর্যায়ে নেই, তাই সেখানে অনেক সময় রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের জুনে তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, দেশে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম আছে এবং সব জায়গায় হাসপাতালগুলোতে তা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; একই মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরব নিউজকে জানায়, সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে অ্যান্টিভেনম বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।
ওঝার কাছে গিয়ে সময় নষ্ট
রহমান ও সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা যায়, সাপে কাটার পর ৮৬ শতাংশ মানুষ প্রথমে গেছেন ওঝা বা সাপুড়ের কাছে, ৬ শতাংশ গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে, আর মাত্র ৩ শতাংশ সরাসরি নিবন্ধিত চিকিৎসক বা হাসপাতালে। যে ব্যবস্থাগুলো নেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল মন্ত্র পড়া (৬০ শতাংশ), কামড়ের জায়গার চারপাশে একাধিক কাটা (৪৩ শতাংশ), এক বা একাধিক বাঁধন, মুখ দিয়ে রক্ত চুষে নেওয়া (১১ শতাংশ) এবং জোর করে বমি করানো (১৮ শতাংশ)। গবেষকেরা কাটা, ভুলভাবে বাঁধন দেওয়া ও মুখ দিয়ে চোষাকে সম্ভাব্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেছেন।
ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনেও বলা হয়, কাছে অ্যান্টিভেনম না পেয়ে গ্রামের রোগীরা প্রায়ই কবিরাজের কাছে যান। ২০২৪ সালের এপ্রিলে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা শরীয়তপুরের এমন একটি ঘটনার খবর দেয়: সাপে কাটা এক যুবককে পরিবার প্রথমে ওঝার কাছে নিয়ে যায়, রাত ১০টার দিকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসা চলার মধ্যেই তিনি মারা যান। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার তখন বলেছিলেন, বিষধর সাপ কামড়ালে দ্রুত হাসপাতালে এনে অ্যান্টিভেনম দিতে হয়।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের নির্দেশনাতেও ওঝার কাছে না গিয়ে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যেতে বলা হয় এবং জানানো হয়, সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। নালিতাবাড়ীর এ ঘটনায় অবশ্য জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী পরিবার ছেলেটিকে সরাসরি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়েছিল।
সাপে কামড়ালে কী করবেন: ডব্লিউএইচওর পরামর্শ
ডব্লিউএইচও বলছে, সাপের কামড়ের প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে প্রচলিত বেশির ভাগ পদ্ধতিই হয় অকার্যকর, নয় বিপজ্জনক, অথবা আসল চিকিৎসায় দেরি করিয়ে দেয়। সংস্থাটির পরামর্শ:
- আক্রান্ত মানুষকে স্থির রাখুন, একেবারেই নড়াচড়া করতে দেবেন না।
- অস্থায়ী স্ট্রেচারে করে দেরি না করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান; সম্ভব হলে কাত করে শুইয়ে রাখুন, যাতে শ্বাসনালি সুরক্ষিত থাকে।
- সরু বাঁধন (টুর্নিকেট) দেওয়া, ক্ষত বা অঙ্গ কাটা, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের মতো রাসায়নিক লাগানো বা গরম কাচের পাত্র বসিয়ে বিষ টেনে বের করার চেষ্টা বিপজ্জনক ও অকার্যকর; এগুলো করবেন না।
- "কালো পাথর" জাতীয় প্রতিকার অকার্যকর এবং মূল্যবান সময় নষ্ট করে।
প্রতিরোধ নিয়ে ডব্লিউএইচও জানায়, যেসব এলাকায় সাপের কামড় বেশি, সেখানে খালি পায়ে হাঁটা কামড়ের বড় কারণ; ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কামড় লাগে হাঁটুর নিচে, যা জুতা পরলে অনেকটা ঠেকানো যায়। বাড়ির আশপাশ, চলার পথ ও শিশুদের খেলার জায়গায় ঘাস ছোট রাখা এবং আবর্জনা ও পুরোনো নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ সরিয়ে ফেলা, রাতে বাইরে বেরোলে আলো সঙ্গে রাখা, ঘরে সাপ ঢোকার পথ বন্ধ করা এবং উঁচু বিছানায় ভালোভাবে গুঁজে দেওয়া মশারির ভেতরে ঘুমানো কামড়ের ঝুঁকি কমায়। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গর্তে হাত-পা না ঢোকানো এবং সাপ আছে এমন এলাকায় কাজের সময় বুট ও লম্বা প্যান্ট পরার কথাও বলা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে সাপের কামড় ও ২০৩০ সালের লক্ষ্য
ডব্লিউএইচওর ২০২৩ সালের তথ্যপত্র অনুযায়ী বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন, যার মধ্যে ১৮ লাখ থেকে ২৭ লাখ মানুষের শরীরে বিষ ঢোকে। বছরে ৮১ হাজার ৪১০ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ জন মারা যান, আর এর প্রায় তিন গুণ মানুষ অঙ্গহানি বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হন। শুধু এশিয়াতেই প্রতিবছর ২০ লাখ পর্যন্ত মানুষ বিষাক্ত কামড়ের শিকার হন।
২০১৭ সালের জুনে ডব্লিউএইচও সাপের কামড়জনিত বিষক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অবহেলিত ক্রান্তীয় রোগের তালিকায় যুক্ত করে। এরপর তৈরি কৌশলপত্রের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব ৫০ শতাংশ কমানো। এ জন্য চারটি উদ্দেশ্য ঠিক করা হয়েছে: জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত ও সক্ষম করা, নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং অংশীদারত্ব, সমন্বয় ও সম্পদ বাড়ানো। সংস্থাটি বলছে, যেসব দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল এবং প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবায় পৌঁছানো কঠিন, সেখানে বোঝা সবচেয়ে বেশি; অনেক রোগী প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই পৌঁছান না, ফলে সরকারি হিসাবে ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রায়ই কম আসে।
ছবি: Anup Sadi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা ট্রিবিউন, পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস (রহমান ও সহকর্মী, ২০১০), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, মোঙ্গাবে, আরব নিউজ, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)