খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও দাকোপ উপজেলায় একই পানিতে একাধিক প্রজাতির মাছ ও চিংড়ি চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠনের (সিবিও) সদস্যরা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য অধিদপ্তরের যৌথ প্রকল্প ‘কমিউনিটি বেইজড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকোয়াকালচার ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’-এর জলবায়ু সহনশীল মৎস্য চাষের পাইলট কার্যক্রম এর পেছনে কাজ করছে। ২০২৫ সালের ২৩ আগস্ট জাগো নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চাষিরা জানান, লোকসানের কারণে মাছ চাষ ছেড়ে দেওয়া অনেকে এই পদ্ধতিতে আবার ঘেরে ফিরেছেন।
প্রকল্পটি কী এবং কোথায় চলছে
প্রকল্প ও খুলনা জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় চলছিল; খুলনায় এর কাজ ডুমুরিয়া ও দাকোপ উপজেলায়। কার্যক্রম শুরু হয় ২০২০ সালের অক্টোবরে, আর প্রতিবেদনের সময় এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। প্রকল্প পরিচালক মো. সামছু উদ্দিন জানান, উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং হাওর অধ্যুষিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মোট ৯টি উপজেলায় প্রকল্পটি চলছে।
প্রথম আলোর ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিউনিটিভিত্তিক জলবায়ু সহনশীল ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ডেভেলপমেন্ট উদ্যোগটির অর্থায়ন করেছে গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ)। ওই সময় প্রকল্পটির তৈরি ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ রিস্ক অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের মৎস্য ও জলজ সম্পদ খাত দেশের ১২ শতাংশ মানুষের জীবিকায় সহায়তা করে, আর জলবায়ু পরিবর্তন এ খাতকে, বিশেষ করে নারীদের, ক্রমে ঝুঁকিতে ফেলছে।
দাকোপ খুলনা জেলার একটি উপকূলীয় উপজেলা, যার আয়তন ৯৯১.৫৮ বর্গকিলোমিটার। এর দক্ষিণে পশুর ও শিবসা নদীর মিলনস্থল; উপজেলার অন্য প্রধান নদী মানকি ও ভদ্রা। পাশের ডুমুরিয়া উপজেলার আয়তন ৪৫৪.২৩ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারিতে দাকোপের জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৬৯ এবং ডুমুরিয়ার ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮৯৯।

সিবিও কীভাবে কাজ করে
প্রকল্পের কাজ চলে সিবিওর মাধ্যমে। সম্প্রদায়ভিত্তিক মৎস্যচাষি, স্থানীয় চাষি, জেলে ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একেকটি সিবিও গঠিত হয়। পাইলট কার্যক্রমের জন্য প্রতিটি সিবিওকে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের উপকরণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল:
- মাছের পোনা, খাদ্য ও সার
- ওষুধ, প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক
- মাছ ধরার জাল
- পুকুর বা ঘেরের ইজারার টাকা
ডুমুরিয়া ও দাকোপের সিবিওগুলোর সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজ জানায়, একটি সিবিওতে ১২ জন নারী ও ১৩ জন পুরুষ সদস্য থাকেন। সদস্যরা ব্যাংকে হিসাব খুলে মাসিক সঞ্চয় ও ঘের থেকে আয়ের টাকা জমা রাখেন, প্রয়োজনে সভার সিদ্ধান্ত (রেজুলেশন) নিয়ে টাকা তোলেন এবং প্রতি মাসে নিজেদের মধ্যে সভা করেন। এফএও বাংলাদেশের এক সাফল্যগাথায়ও দাকোপের লক্ষ্মীখোলার সোনিয়া খাতুনের কথা বলা হয়েছে, যিনি নিজ এলাকার আরও ২৪ জনকে নিয়ে মাছ চাষের জন্য একটি সিবিও গড়ে তোলেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন, নেতৃত্ব ও জেন্ডার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন।
এফএওর ন্যাশনাল কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট (ফিশারি অ্যান্ড লাইভলিহুড) বিশেষজ্ঞ মাছুদুর রহমান জানান, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি উপকূলীয় উপজেলায় প্রকল্পটি ৫০টি সিবিও গঠন করেছে। এদের কাজের মধ্যে আছে জলবায়ু সহনশীল মাছ চাষ, মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ, কমিউনিটি পর্যায়ে মাছের খাদ্য উৎপাদন এবং আহরণোত্তর সেবা। প্রকল্প পরিচালক জানান, চাষিদের কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ, গলদা ও বাগদার মিশ্র চাষ, নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদন, পেনে মাছ চাষ, উন্নত ব্রুড মাছ উৎপাদন এবং পুকুরে জলবায়ু সহনশীল মাছ চাষে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

এক ঘেরে বাগদা, কার্প ও লোনা পানির মাছ
বাগদা চিংড়ি (Penaeus monodon) সামুদ্রিক কবচী প্রাণী, যা খাদ্য হিসেবে ব্যাপকভাবে চাষ হয়। গলদা (Macrobrachium rosenbergii) মিঠা পানির চিংড়ি, তবে এর লার্ভা দশা লোনা পানির ওপর নির্ভরশীল। ডুমুরিয়ার রুদাঘরা বাগদা চাষি সিবিওর সভাপতি মুক্তা বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, তাঁরা জলবায়ু সহনশীল বাগদার সঙ্গে কার্পজাতীয় মাছ ও লোনা পানির অন্যান্য মাছ একসঙ্গে চাষ করে লাভবান হয়েছেন এবং নারী সদস্যদের মধ্যে মাছ চাষে লোকসান হয় এমন ভুল ধারণা দূর হয়েছে।
ভান্ডারপাড়া ইউনিয়ন সিবিওর সম্পাদক বিভাশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ডুমুরিয়ায় লোকসানের কারণে অনেক চাষি মাছ চাষ ছেড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু একই পানিতে একাধিক মাছ চাষের পদ্ধতিতে অনেকে ফিরেছেন। জটিল বিষয়গুলো তাঁরা মাসিক সভায় আলোচনা করেন, প্রয়োজনে প্রশিক্ষক এসে প্রশিক্ষণ দেন। দাকোপের পানখালী ইউনিয়নের বারইখালী-বসুন্দিয়া সিবিওর সম্পাদক সোমা মণ্ডল জানান, তাঁদের ঘেরে বাগদা, কার্পজাতীয় মাছ, নোনা ট্যাংরা ও পারশে চাষ হচ্ছে এবং দাকোপের পানি মাছ চাষের জন্য খুব উপযোগী।
লক্ষ্মীখোলা সিবিওর জলবায়ু ও দুর্যোগ প্রশমনবিষয়ক সম্পাদক সোনিয়া খাতুন বলেন, করোনা মহামারির সময় চাষিদের অনেক ক্ষতি হয়; অনেকে শহরে কাজ খুঁজতে গিয়ে আর ফেরেননি। তবে অনেক নারী আবার মাছ চাষের হাল ধরেছেন, আর প্রশিক্ষণ ও হাতে-কলমে শেখার মাধ্যমে চাষিরা চাষের জটিলতা কাটাতে শিখেছেন। খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান জানান, প্রতিটি সিবিওকে প্রগতিশীল সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

ছবি: Kazi Asadullah Al Emran / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, এফএও বাংলাদেশ, উইকিপিডিয়া (দাকোপ ও ডুমুরিয়া উপজেলা, বাগদা ও গলদা চিংড়ি)





মন্তব্য
(০)