জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০২৬ সালের ৬ জুলাই রাতে সাপে কাটা এক নারীকে নেওয়া হয় এবং পরে তাঁর মৃত্যু হয়। স্বজনদের অভিযোগ, সময়মতো সাপের বিষের প্রতিষেধক (অ্যান্টিভেনম) দেওয়া হয়নি। পরদিন মঙ্গলবার (৭ জুলাই) হাসপাতালে কর্তব্যরত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার আসাদুজ্জামানের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। জাগো নিউজ ২৪ জানায়, অভিযোগ উঠেছে বালিজুড়ি ইউনিয়ন শ্রমিকদলের আহ্বায়ক ও নিহত নারীর ছোট ভাই শরীফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। ঘটনা তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে।
রাতে হাসপাতালে, পরে মৃত্যু
নিহত রমিছা বেগমের (৫৫) বাড়ি উপজেলার বালিজুড়ি ইউনিয়নের তারতাপাড়া গ্রামে; দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি মাছ ব্যবসায়ী চান মিয়ার স্ত্রী। স্বজনদের ভাষ্যে, সোমবার রাত প্রায় ১০টার দিকে তাঁকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা করিয়ে জানান, কামড়টি সম্ভবত বিষধর সাপের নয়। স্বজনদের অভিযোগ, এরপর রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হলেও সময়মতো অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়নি এবং শেষে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হয়।
মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে দুই রকম বিবরণ পাওয়া যায়। জাগো নিউজ ২৪ লিখেছে, তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অন্যদিকে নয়া দিগন্তকে স্বামী চান মিয়া বলেন, হাসপাতাল থেকে তাঁরা স্ত্রীকে ওঝার কাছে নিয়ে যান এবং কবিরাজকে না পেয়ে বাড়ি নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ভাষ্য
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন নয়া দিগন্তকে বলেন, বিষধর সাপের কামড় কি না নিশ্চিত হতে নিয়ম অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং ফল নেগেটিভ এলেও অ্যান্টিভেনম দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। তাঁর দাবি, এ সময় রোগীর ছেলে হাসপাতালে চিকিৎসা করাবেন না বলে জানান এবং কবিরাজের কাছে নেওয়ার কথা বলে রোগীকে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে রোগীকে আবার আনা হয় এবং জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা হয়; হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত থাকলেও স্বজনরা রোগীকে অটোরিকশায় নিয়ে যান বলে তিনি জানান।
জাগো নিউজ ২৪-কে তিনি বলেন, ‘রোগীর মৃত্যুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ আমার কাছে লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্তব্যরত চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চিকিৎসকের ওপর হামলার অভিযোগ
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার নিহতের স্বজনরা হাসপাতালে এসে আসাদুজ্জামানের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান এবং একপর্যায়ে শরীফ উদ্দিন তাঁর ওপর শারীরিক হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে। চিকিৎসককে রক্ষা করতে এগিয়ে আসা হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীও হামলার শিকার হন। ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন নয়া দিগন্তকে অভিযোগ করেন, রোগীর স্বজন পরিচয়ে এক ব্যক্তি জরুরি বিভাগে ঢুকে কর্তব্যরত চিকিৎসককে মারধর করেন এবং তাঁর পরনের পোশাক ছিঁড়ে ফেলেন।
মাদারগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্নেহাশিস রায় জাগো নিউজ ২৪-কে বলেন, ‘কর্তব্যরত চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মাদারগঞ্জ জামালপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পশ্চিমে যমুনা নদীর পূর্ব তীরের একটি উপজেলা। ২০২২ সালের জনশুমারিতে এর জনসংখ্যা ছিল ২,৮৫,৯৯৯ জন; বালিজুড়ি এর সাতটি ইউনিয়নের একটি।
গ্রামে সাপে কাটা ও অ্যান্টিভেনমের সংকট
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের জুলাইয়ের ‘ন্যাশনাল সার্ভে অন অ্যানুয়াল ইনসিডেন্স অ্যান্ড এপিডেমিওলজি অব স্নেকবাইট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক জরিপের বরাতে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, দেশে বছরে চার লাখের বেশি মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং অন্তত ৭,৫১১ জন মারা যান; আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশ গ্রামের মানুষ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, উপজেলা পর্যায়ের সব সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম না থাকায় অনেক রোগীকে শহরের হাসপাতালে যেতে হয়, আর কাছে প্রতিষেধক না পেয়ে গ্রামের রোগীরা প্রায়ই কবিরাজের কাছে যান। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম তখন বলেছিলেন, অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পর কিছু রোগীর তীব্র শ্বাসকষ্ট হয় এবং নিবিড় পরিচর্যা লাগে, যা উপজেলা পর্যায়ে নেই; তাই রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০১৭ সালের জুনে সাপের দংশনজনিত বিষক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের তালিকায় তোলে। সংস্থাটির হিসাবে বিশ্বে বছরে আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং ৮১,৪১০ থেকে ১,৩৭,৮৮০ জন মারা যান; কৃষিশ্রমিক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। WHO বলছে, অ্যান্টিভেনমই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা এবং নিরাপদ ও কার্যকর অ্যান্টিভেনম সহজলভ্য হলে বেশির ভাগ মৃত্যু ও গুরুতর পরিণতি পুরোপুরি এড়ানো যায়। ২০৩০ সালের মধ্যে সাপে কাটায় মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব অর্ধেকে নামানো সংস্থাটির লক্ষ্য।

ছবি: T.Tuhin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ঢাকা ট্রিবিউন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)