নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নিঝুম দ্বীপ একসময় হাজারো চিত্রা হরিণের জন্য পরিচিত ছিল, কিন্তু সেখানে হরিণ দ্রুত কমে আসছিল। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই ক্ষয়ের কারণ হিসেবে বন উজাড়, বসতি বিস্তার, চোরাশিকার, শিয়াল-কুকুরের আক্রমণ, রোগ এবং মিঠাপানি ও খাদ্যের সংকটের কথা তুলে ধরা হয় এবং হরিণ রক্ষায় পরিকল্পিত উদ্যোগের আহ্বান জানানো হয়।
নিঝুম দ্বীপের বন ও হরিণের ইতিহাস
বাংলাপিডিয়া ও উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চাশের দশকের শুরুতে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পলি জমে বল্লারচর, কামলারচর, চর ওসমান ও চর মুরি নিয়ে দ্বীপগুচ্ছটি জেগে ওঠে। বন বিভাগ সেখানে কেওড়াপ্রধান ম্যানগ্রোভ বন গড়ে তোলে। প্রথম আলোর ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বন বিভাগের 'নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ২০১৫-২০২৫' উদ্ধৃত করে বলা হয়, ১৯৭২ সালে স্বল্প পরিসরে বনায়ন শুরু হয় এবং ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর থেকে পুরোদমে কাজ চলে। কেওড়া, গেওয়া, বাইন ও কাঁকড়া গাছ লাগানো হয়; কেওড়াপাতা ও দূর্বা ঘাস হরিণের প্রধান খাবার।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে বন বিভাগ দ্বীপে ১৪টি হরিণ অবমুক্ত করে। শিকারি প্রাণী না থাকায় হরিণ দ্রুত বাড়ে এবং ১৯৯৬ সালের শুমারিতে সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ হাজারে। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল সরকার নিঝুম দ্বীপের ৯ হাজার ৫৫০ একর বনভূমিসহ জাহাজমারা রেঞ্জের ৪০ হাজার ৩৯০ একর বনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে।

হরিণ কমে যাওয়ার কারণ
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০০ সালের পর থেকে হরিণ কমতে শুরু করে। ২০০৬ সালের এক গবেষণায় সংখ্যা পাওয়া যায় ১৪ হাজার ৪০০। আইইউসিএনের ২০১৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের রেড লিস্টের স্তন্যপায়ী খণ্ডে বলা হয়, আবাসস্থল হ্রাস, খাদ্যসংকট এবং শিয়াল ও বুনো কুকুরের হাতে নবজাতক হরিণ মারা পড়ায় ২০১৫ সালে সংখ্যা দুই হাজারের নিচে নেমে আসে। ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত এক মাসের টহলে মাত্র আটটি হরিণ দেখা গিয়েছিল বলে বনকর্মীরা প্রথম আলোকে জানান।
নোয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু ইউসুফ প্রথম আলোকে বলেন, 'নিঝুম দ্বীপের ৪০ হাজার ৩৯০ একর জমি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছিল। সেখানে এখন ইউনিয়ন পরিষদ হয়েছে।' বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন সংশোধিত হয়ে কার্যকর হওয়ার আগপর্যন্ত মানুষ প্রকাশ্যে ও গোপনে হরিণ শিকার করত; পরে হরিণ পাচার ও শিকারের মামলাও হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা ফিরোজের তত্ত্বাবধানে করা এক গবেষণার বরাতে প্রথম আলো জানায়, বর্ষায় কিছু হরিণের খুরারোগ হয়, তখন হাঁটতে কষ্ট হওয়া হরিণ কুকুরের কামড়ে মারা পড়ে। ২৬৮টি মরা হরিণের হাড় ও মাথা বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্ত্রী হরিণ বেশি মারা পড়ায় বংশবিস্তারও কমেছে। লবণাক্ততা বাড়ায় মিঠাপানির অভাব এবং আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে হাজারো হরিণ মারা পড়ার কথাও প্রতিবেদনে আছে। জাগো নিউজের নিবন্ধেও খাবার পানি ও খাদ্যের সংকটে হরিণের পাশের চরে চলে যাওয়া এবং লোকালয়ে এসে মানুষের হাতে ধরা পড়ার কথা বলা হয়।

চিত্রা হরিণ ও দেশের অন্য হরিণ
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ প্রজাতির হরিণ পাওয়া যায়। সুন্দরবনের চিত্রা হরিণ ছাড়া অন্য প্রজাতিগুলোর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে; বারশিঙা বা জলার হরিণ এ দেশে আর বুনো অবস্থায় নেই। সবচেয়ে বড় সাম্বার টিকে আছে সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে, আর সবচেয়ে ছোট মায়া হরিণ পাওয়া যায় সুন্দরবন, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামে। চিত্রা হরিণের লালচে বাদামি লোমে আজীবন সাদা ফোঁটা থাকে; পেট, গলা, পেছনের অংশ এবং পা, লেজ ও কানের ভেতরের দিক সাদা। প্রাপ্তবয়স্ক হরিণের ওজন প্রায় ৮৫ কেজি, পুরুষের শিং তিন শাখার। একসময় দেশের প্রায় সব বনে থাকলেও এখন এরা মূলত সুন্দরবনে সীমিত।
সুন্দরবনে অবশ্য চিত্রা হরিণ বেড়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইইউসিএনের ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের জরিপে সেখানে হরিণের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪, যা ২০০৪ সালে ছিল ৮৩ হাজার। তবে পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ চোরাশিকার সারা বছর চলে; খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, বনকর্মীরা অভিযান চালিয়ে শিকারি ধরছেন ও ফাঁদ জব্দ করছেন।

সংরক্ষণে যা প্রস্তাব করা হয়েছে
জাগো নিউজের নিবন্ধের যুক্তি ছিল, দেশে চিত্রা হরিণ নিয়ে গবেষণা খুব কম হয়েছে এবং আবাসস্থল রক্ষা না করলে এই প্রজাতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। নিবন্ধে নিঝুম দ্বীপে মিঠাপানির ব্যবস্থা, বন রক্ষা, চোরাশিকার বন্ধ এবং পরিকল্পিত ইকোট্যুরিজম গড়ে তোলার কথা বলা হয়; লেখকের মতে উন্নত দেশের মতো হরিণ খামার নিয়েও ভাবা যেতে পারে। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে আবার দেখানো হয়েছিল, বাঘ বা অন্য শিকারি প্রাণী ছাড়া, বাস্তুতন্ত্র বিবেচনা না করে হরিণ ছাড়ায় দ্বীপে প্রথমে অস্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি এবং পরে দ্রুত বংশনাশ ঘটে; ফলে যেকোনো উদ্যোগে পুরো বনের প্রতিবেশ বিবেচনায় রাখার প্রয়োজন সামনে আসে।

ছবি: Israt hakim / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো (১১ জানুয়ারি ২০২৫), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (৫ এপ্রিল ২০২৬), বাংলাপিডিয়া (হরিণ), উইকিপিডিয়া (নিঝুম দ্বীপ)




মন্তব্য
(০)