প্রতি বর্ষায় গোপালগঞ্জের বিলাঞ্চলের কৃষকেরা দেখেন, তাঁদের জমি একটু একটু করে পানির নিচে হারিয়ে যাচ্ছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস টুঙ্গিপাড়া উপজেলার মিত্রডাঙ্গা গ্রাম থেকে খবর দেয়, সেখানকার কৃষকেরা কচুরিপানা স্তূপ করে লম্বা ভেলা বানান এবং পানির ওপর সবজি ও মসলা চাষ করেন। বাসস জানায়, গোপালগঞ্জে ২২৯টি বিল ও জলাভূমি আছে, যা বছরে প্রায় আট মাস জলাবদ্ধ থাকে।
২০২৫ সালের বর্ষার শুরুতে লেখা এই প্রতিবেদনে জানা যাবে, বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছর কেন বন্যা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টের বন্যায় কৃষকের কতটা ক্ষতি হয়েছিল, আর বন্যার পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) কী পরামর্শ দেয়। এরপর আছে স্থানীয়ভাবে বয়রা বা ধাপ নামে পরিচিত প্রচলিত ভাসমান বেডের কথা: এটি কীভাবে তৈরি হয়, এতে কী জন্মে, কারা এটি ছড়িয়ে দিয়েছে এবং এর সীমাবদ্ধতা কোথায়।
প্রায় প্রতি বছর কেন বন্যা ফিরে আসে
প্রায় প্রতি বছরই আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের নানা এলাকায় বন্যা হয়। এর কারণ স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, মৌসুমি বন্যা, আকস্মিক বন্যা, উপকূলীয় বন্যা এবং উজানের দেশ ভারত, ভুটান ও চীন থেকে ঢল হিসেবে নেমে আসা পানি।
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া দেশের বন্যাকে তিন ভাগে ভাগ করেছে। মৌসুমি বন্যা ঋতুভিত্তিক: এর পানি ধীরে বাড়ে, ধীরে কমে, বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবিয়ে দেয় এবং জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করে। আকস্মিক বন্যায় পানি হঠাৎ বাড়ে ও হঠাৎ কমে; সাধারণত পাহাড়ি এলাকার উপত্যকায় এমন বন্যা হয়। জোয়ারজনিত বন্যা স্বল্পস্থায়ী, এর উচ্চতা সাধারণত ৩ থেকে ৬ মিটার, এবং এটি দেশের ভেতরের বন্যার পানি নিষ্কাশনে বাধা দেয়।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক বছরে দেশের প্রায় ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ ১৮ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। ভয়াবহ বন্যার বছরে প্লাবিত এলাকা দেশের মোট আয়তনের ৫৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এর কারণ হিসেবে বাংলাপিডিয়া দেশের সাধারণ নিচু ভূপ্রকৃতি, ঘিঞ্জি নদী-নেটওয়ার্ক দিয়ে বয়ে যাওয়া বড় বড় নদী এবং প্রধান নদীগুলোর পানির চূড়া একই সময়ে আসার কথা বলেছে। মে থেকে অক্টোবরের আর্দ্র মৌসুমে প্রধান নদীগুলো দিয়ে দেশে ৮,৪৪,০০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি ঢোকে। উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নেমে আসা পাহাড়ি অববাহিকার পানি আকস্মিক বন্যা ঘটায়, যা সাধারণত স্বল্পস্থায়ী হলেও কখন কতটা তীব্র হবে তা আগে থেকে বলা কঠিন।
বাংলাদেশ নিচু, তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে নয়। বাংলাপিডিয়া বলছে, দেশের প্রায় অর্ধেক ভূমি ১০ মিটার সমোন্নতি রেখার নিচে, আর গঙ্গার জোয়ার-প্লাবনভূমির দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের একটি চওড়া অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ০.৯১ মিটার উঁচু। দেশের ভেতরে বাঘিয়া বিল ও চান্দা বিলসহ গোপালগঞ্জ-খুলনা পিট অববাহিকা এবং উত্তর-পূর্বের হাওর অববাহিকা বড় আকারের নিচু এলাকা।
সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, বরগুনা, পিরোজপুর, মাদারীপুরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে জলাবদ্ধতা চোখে পড়ার মতো। বন্যা বা দীর্ঘ জলাবদ্ধতা কৃষির কতটা ক্ষতি করবে, তা নির্ভর করে এর বিস্তার আর পানি কত দিন থাকে তার ওপর। যেসব জমিতে প্রতি বছর নির্দিষ্ট একটি সময় পানি জমে থাকে, সেই সময়টা ফেলে না রেখে ভাসমান বেডে ফসল চাষের আওতায় আনা যায়।

২০২৪ সালের আগস্টের বন্যায় কৃষকের ক্ষতি
২০২৪ সালের আগস্টে ভারী মৌসুমি বৃষ্টির পর দেশের পূর্বাঞ্চলে বড় বন্যা হয়। ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, পূর্বাঞ্চলের ২৩টি জেলায় এই বন্যায় কৃষিতে ৩৩.৪৬ বিলিয়ন টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং প্রায় ১৪ লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ওই প্রতিবেদনের ফসলভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, বছরের ওই সময়ের বন্যা কোন ফসলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। রোপা আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১,৪১,৬০৯ হেক্টরে, আউশ ধান ৩৮,৬৮৯ হেক্টরে। রোপা আমনের বীজতলা নষ্ট হয় ১৪,৯০৮ হেক্টরে, আর সবজি ১১,২৯০ হেক্টরে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার ৯টি জেলার ৮০ হাজার ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য ১৩৬.৬ মিলিয়ন টাকার নগদ সহায়তা এবং বিনা মূল্যে বীজ ও সার বরাদ্দ করেছে। এত বীজতলা নষ্ট হওয়ায় বোঝা যায়, কেন বন্যার পর সরকারি পরামর্শের বড় অংশ জুড়ে থাকে চারা জোগাড় আর দেরিতেও লাগানো যায় এমন জাত বাছাইয়ের কথা।
বন্যার পর ফসল, মাছ ও গবাদিপশু রক্ষায় ডিএই ও ব্রির পরামর্শ
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র যখন জানাচ্ছিল যে উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি কমছে, তখন ডিএইর কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প বন্যা-পরবর্তী সময়ের জন্য একটি বিশেষ পরামর্শ প্রকাশ করে। ধানের জন্য এর মূল কথাগুলো ছিল:
- বন্যাকবলিত সব এলাকায় ব্রি উদ্ভাবিত আলোক-সংবেদনশীল জাত যেমন বিআর৫, বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৪৬ ও ব্রি ধান৫৪ এবং আলোক-সংবেদনশীল স্থানীয় জাত যেমন নাইজারশাইল, রাজাশাইল ও কাজলশাইল ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরাসরি বপন করা যাবে, আর রোপণ শেষ করতে হবে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে।
- যেখানে বীজতলা করার মতো উঁচু জমি নেই, সেখানে ভাসমান বীজতলা, ঢাকা বীজতলা বা ট্রেতে চারা তৈরি করতে হবে।
- বন্যার পানিতে ডুবে থেকেও বেঁচে যাওয়া ধানগাছের পাতায় কাদা বা পলি লেগে থাকলে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর পরিষ্কার পানি ছিটিয়ে পাতা ধুয়ে দিতে হবে।
- পানি নেমে যাওয়ার ৮ থেকে ১০ দিন পর গাছে নতুন পাতা গজালে বিঘাপ্রতি ৭ থেকে ৮ কেজি ইউরিয়া ও ৫ থেকে ৬ কেজি পটাশ সার দিতে হবে; পরে গাছের বয়স বুঝে প্রয়োজনমতো ইউরিয়া ও পটাশ উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
- বন্যায় ডোবেনি এমন আমন খেত (রোপণের ৩০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত) থেকে ২ থেকে ৩টি কুশি তুলে এনে ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে রোপণ করা যায়।
- যেখানে বেশি বয়সের (সর্বোচ্চ ৬০ দিন) আমনের চারা পাওয়া যায়, সেখানে পানি নেমে গেলে ২০ x ১৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে গোছাপ্রতি ৪ থেকে ৫টি চারা রোপণ করতে হবে; শেষ চাষের সময় বিঘাপ্রতি টিএসপি ১০ কেজি ও এমওপি ১৪ কেজি এবং রোপণের ৭ থেকে ১০ দিন পর বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ২৫ কেজি ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
পরামর্শে সতর্ক করা হয়, বন্যার পর ধানে খোলপোড়া ও পাতাপোড়া রোগ দেখা দিতে পারে। খোলপোড়া দমনে সুষম সারের পাশাপাশি অনুমোদিত মাত্রায় প্রোপিকোনাজোলের মতো ছত্রাকনাশক বিকেলে প্রয়োগ এবং পাতাপোড়া দমনে বিঘাপ্রতি বাড়তি ৫ কেজি এমওপি সার দেওয়ার কথা বলা হয়। পাতা মোড়ানো পোকা ও বাদামি গাছফড়িংয়ের জন্যও নিয়মিত খেত দেখতে হবে। যেকোনো বালাইনাশক কেনার আগে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পরামর্শ শুধু ধানে সীমিত ছিল না। ধান, সবজি ও অন্যান্য দাঁড়ানো ফসলের জমি থেকে বাড়তি পানি বের করে দিতে এবং জমি থেকে পানি সরে গেলে নতুন করে সবজি চাষ করতে বলা হয়। পুকুর বা জলাশয়ের পাড় ভেঙে গেলে দ্রুত মেরামত করতে বা ভাঙা অংশ জাল দিয়ে ঘিরে দিতে, বন্যার পানির সঙ্গে ঢুকে পড়া অনাকাঙ্ক্ষিত মাছ ধরে ফেলতে এবং স্থানীয় মৎস্য অফিসের পরামর্শমতো পুকুরে চুন ও লবণ দিতে বলা হয়। বন্যার পর গরুর ক্ষুরারোগ, তড়কা ও বাদলা, ছাগল-ভেড়ার পিপিআর এবং কৃমির আক্রমণ দেখা দিতে পারে বলে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের সহায়তায় টিকা ও কৃমিনাশকের ব্যবস্থা করতে বলা হয়।
বন্যাপ্রবণ এলাকার ধান নিয়ে ব্রির একটি ফ্যাক্ট শিটে আরও বলা হয়েছে, যেখানে রোপা আমন ১২ থেকে ১৬ দিন পানিতে ডুবে থাকার আশঙ্কা থাকে, সেখানে ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২ চাষ করে সন্তোষজনক ফলন পাওয়া যেতে পারে। বিআর২২, বিআর২৩ ও ব্রি ধান৪৬-এর ৩০ থেকে ৫০ দিন বয়সের চারা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি (ভাদ্রের শেষ) পর্যন্ত রোপণ করেও ভালো ফলন মেলে। বন্যার কারণে আমন রোপণ খুব দেরি হয়ে গেলে ব্রি বরং আগাম বোরো চাষের কথা ভাবতে বলে, নভেম্বরের মাঝামাঝি (কার্তিকের শেষ) চারা তৈরি করে।
ভাসমান বেড: জমে থাকা পানির পুরোনো সমাধান
যেখানে পানি নেমে যায়, সেখানে ধানের এসব পরামর্শ কাজে আসে। কিন্তু সবচেয়ে নিচু বিলে পানি মাসের পর মাস থেকে যায়, আর সেখানে কৃষকেরা নির্ভর করেন একটি পুরোনো কৌশলের ওপর: পানির ওপর জলজ উদ্ভিদের ভেলায় কম্পোস্ট ও পুষ্টি জমিয়ে তাতে ফসল ফলানো।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানায়, দক্ষিণ বাংলাদেশের জলাভূমিতে, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও বরিশাল জেলার কিছু অংশে, জুন থেকে অক্টোবরের বর্ষায় মানুষ চাষের জমি খুঁজে পেতে হিমশিম খায়। সেখানকার কৃষকেরা স্থানীয়ভাবে ধাপ নামে পরিচিত ভাসমান বাগান গড়ে তুলেছেন, যেখানে মাটি ছাড়াই পুষ্টিসমৃদ্ধ পানিতে গাছ ও ফসল জন্মে। এফএওর ভাষ্য, স্থানীয় কৃষকেরা প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। ২০১৫ সালে এফএও বাংলাদেশের ভাসমান বাগান কৃষিপদ্ধতিকে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ঐতিহ্য ব্যবস্থা (জিআইএএইচএস) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যার আওতায় রয়েছে ২,৫০০ হেক্টর এলাকা।
কচুরিপানা (Eichhornia crassipes) লাতিন আমেরিকার উদ্ভিদ। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, উনিশ শতকের শেষ ভাগে এটি ব্রাজিল থেকে বাংলায় আনা হয়। ১৯২০-এর দশকের মধ্যে এটি বাংলার জলাশয় ছেয়ে ফেলে, নদীপথে চলাচল বাধাগ্রস্ত করে এবং গভীর পানির আমন ও পাট চাষ কঠিন করে তোলে; ১৯৩৬ সালের কচুরিপানা আইনে গৃহস্থদের নিজেদের জমি থেকে এটি সরানো বাধ্যতামূলক করা হয়। বাংলাপিডিয়া আরও বলছে, পচা কচুরিপানার স্তূপ ফসলের জন্য চমৎকার সার, আর এমন স্তূপে ফসল ভালো জন্মাত বলে কৃষকেরা ভাসমান খেত তৈরিতে আগ্রহী হন।
২০২১ সালের জুলাইয়ে দ্য ডেইলি স্টারে হাসিব মো. ইরফানুল্লাহ এ পদ্ধতির ইতিহাস তুলে ধরেন: একসময় জমিতে স্তূপ করে রাখা ধানের নাড়া বন্যার পানিতে ভেসে উঠত, আর ১৯৬০-এর দশক থেকে উচ্চফলনশীল ধানের জাত পুরোনো খড়নির্ভর ব্যবস্থার জায়গা নিলে কচুরিপানাই হয়ে ওঠে প্রধান উপকরণ। বাংলাপিডিয়া বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে কচুরিপানার ভাসমান বেডে সবজি চাষের কথা উল্লেখ করেছে।

বয়রা যেভাবে তৈরি করবেন
উপকরণ সবই জলাভূমির গ্রামে সহজে মেলে। বয়রা তৈরি হয় এগুলো দিয়ে:
- কচুরিপানা, যা বেডের মূল কাঠামো;
- গভীর পানির ধানের খড়;
- অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ, যেমন ক্ষুদিপানা, কুটিপানা ও শেওলা;
- কিছু বাঁশের খণ্ড, কাঠামো তৈরি ও বেড আটকে রাখার খুঁটির জন্য।
এফএও এক বাক্যে পদ্ধতির মূল কথা বলেছে: কচুরিপানার ঘন স্তরের ওপর বাঁশ বিছানো হয়। কৃষকেরা যে ধাপগুলো মেনে চলেন:
- পানির ওপর ভাসমান কচুরিপানা স্তূপ করে তার ওপর বাঁশের কাঠামো বা ভেলা বসাতে হবে।
- এর ওপর আরও কচুরিপানা ঘন করে স্তূপ করতে হবে। জলাবদ্ধতা কত দিন থাকবে, সেই হিসাবে পুরুত্ব ঠিক করতে হবে, যাতে পুরো সময় বেডটি ভেসে থাকে।
- সবার ওপরে গোবর ও কম্পোস্টের একটি স্তর দিতে হবে।
- বেডটি কিছুদিন রেখে দিতে হবে। মূল প্রতিবেদনে ১০ থেকে ১৫ দিন পর বীজ বোনার কথা বলা হয়েছে; এফএও জানায়, শেষবার স্তূপ করার ৮ থেকে ১০ দিন পর কৃষকেরা বীজ বোনেন বা চারা লাগান।
- বয়রা পানিতে সরে যেতে পারে বলে এটিকে দেখাশোনার সুবিধাজনক জায়গায় নিয়ে বাঁশের খুঁটি দিয়ে আটকে দিতে হবে।
বেডের পুরুত্ব গুরুত্বপূর্ণ। গবেষক অসিত বরণ মণ্ডল, মোহাম্মদ বশির আহমেদ ও মো. আব্দুল মান্নান ২০১৩ ও ২০১৪ সালে গোপালগঞ্জ জেলায় ১.৫, ২.০ ও ২.৫ মিটার পুরু কচুরিপানার বেডে ঢ্যাঁড়স, পুঁইশাক, শসা ও লালশাক চাষ করে পরীক্ষা করেন। ২০২৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব হর্টিকালচারাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে প্রকাশিত তাঁদের গবেষণাপত্রে দেখা যায়, সবচেয়ে পুরু বেডে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন সবচেয়ে ভালো হয়েছে, ঢ্যাঁড়সের ফলন হয়েছে হেক্টরপ্রতি ৭.৯৯ ও ৮.০৯ টন, আর সবচেয়ে পাতলা বেডে ফলন হয়েছে সবচেয়ে কম। ফলন ও খরচ মিলিয়ে ওই ফসলগুলোর জন্য ২.০ মিটার পুরু বেডকে উপযোগী পাওয়া গেছে। কচুরিপানা পচে পানিতে ঝরে পড়ায় বেড প্রতি মাসে পাতলা হয়েছে, আর সময়ের সঙ্গে পাতলা হওয়ার হার বেড়েছে।
স্বাভাবিক বীজতলা পানির নিচে থাকলে ভাসমান বেডে ধানের চারাও তৈরি করা যায়। ২০১৯ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, গাইবান্ধা জেলায় বন্যায় ২,৮৮১ হেক্টর আমন বীজতলা নষ্ট হওয়ার পর সুন্দরগঞ্জের কৃষকেরা কাদা মেশানো কচুরিপানার স্তূপে আমনের বীজ বুনেছিলেন।

ভাসমান বেডে কী কী চাষ হয়
এফএওর তালিকায় ভাসমান বেডের প্রধান ফসল ঢ্যাঁড়স, ঝিঙা, পুঁইশাক, বেগুন, শসা, লালশাক, ডাঁটা, চালকুমড়া, করলা, কলমিশাক ও বাঙ্গি। এক বর্ষা মৌসুমে একটি ভাসমান বাগানে দুই থেকে তিনবার ফসল তোলা যায়। শীতে পানি নেমে গেলে বেডগুলো ভেঙে অবশিষ্টাংশ মাটির উর্বরতা বাড়াতে ব্যবহার করা হয়, আর সেই জমিতে ধান ও অন্যান্য সবজি চাষ হয়।
মূল প্রতিবেদনে বেডের জন্য কয়েকটি মসলার নামও আছে: মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও সরিষা। ২০২২ সালের অক্টোবরে বাসস জানায়, গোপালগঞ্জের কৃষকেরা ভাসমান বেডে তরমুজ, বাঙ্গি, পেঁয়াজ, মরিচ, আদা, হলুদ, শসা, লাউ, কুমড়া, টমেটো, ডাঁটা, ফুলকপি, ঝিঙা, বাঁধাকপি, ব্রকলি, লালশাকসহ নানা শাক চাষ করছেন।
এফএওর হিসাবে, একই আকারের জমিতে চাষের তুলনায় ভাসমান সবজি চাষের উৎপাদনশীলতা প্রায় দশ গুণ। পচতে থাকা বেডে নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম ও ফসফরাস প্রচুর থাকে বলে সার প্রায় লাগেই না, আর চারপাশের পানি অনেক পোকামাকড় দূরে রাখে বলে বালাইনাশকও প্রায় ব্যবহার হয় না।
জলাবদ্ধ গ্রামের একটি পরিবারের জন্য এর মানে, মাঠ যখন কিছুই দেয় না তখনো সবজি ও আয়, বন্যার মৌসুমে কাজ, আর পানি নেমে গেলে জমির জন্য পচা কচুরিপানা ও কম্পোস্টের জৈব সার।
এনজিও প্রকল্প থেকে জাতীয় কর্মসূচি
শতাব্দীর শুরুর দিকে বেসরকারি সংস্থাগুলো পদ্ধতিটি হাতে নেয়। সরকার ও ইউএনডিপির টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (এসইএমপি, ১৯৯৮ থেকে ২০০৫) আওতায় আইইউসিএন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ (বিসিএএস) গোপালগঞ্জের মধুমতী প্লাবনভূমিতে বয়রা চাষ সম্প্রসারণ করে; ওই কাজের ভিত্তিতে ২০০৫ সালে আইইউসিএন "Baira: the floating gardens for sustainable livelihood" নামে একটি বই প্রকাশ করে।
এরপর আসে সরকারি কর্মসূচি। সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ে (সিডিএমপি-২, ২০১০ থেকে ২০১৫) ডিএই ৫৬৫ জন কৃষককে এ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুক্ত করে। ২০১২ সালে ডিএই বন্যাপ্রবণ ও জলাবদ্ধ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজন প্রযুক্তি হিসেবে ভাসমান সবজি ও মসলা চাষ সম্প্রসারণের একটি প্রকল্প শুরু করে, যা ৮টি জেলার ৪০টি উপজেলায় ১২ হাজার কৃষকের সঙ্গে কাজ করে। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ডিএইর আরও বড় পরবর্তী প্রকল্প ২৪টি জেলার ৪৬টি উপজেলায় বিস্তৃত ছিল।
২০২২ সালের অক্টোবরে বাসস জানায়, শুধু গোপালগঞ্জেই পাঁচ উপজেলার ১,৮০০ কৃষক ভাসমান বেডে সবজি ও মসলা চাষের পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) পদ্ধতিটি আরও দক্ষ করার উপায় নিয়ে গবেষণা করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ২০১৪ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কাঠামো সনদের (ইউএনএফসিসিসি) টেকনোলজি এক্সিকিউটিভ কমিটি এটিকে কার্যকর অভিযোজন প্রযুক্তি হিসেবে তুলে ধরে, আর জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) পঞ্চম মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এর সম্ভাব্য দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা হয়।
পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা ও কোথায় সহায়তা পাবেন
একটি ভাসমান বেড ততদিনই টেকে, যতদিন এর কচুরিপানা জোড়া লেগে থাকে। গোপালগঞ্জের গবেষণায় দেখা গেছে, বেড প্রতি মাসে পাতলা হয়, তাই পুরো জলাবদ্ধ মৌসুম টেকার মতো পুরু করে বেড বানাতে হয়।
প্রচলিত বেড সব জলাশয়ের জন্যও উপযোগী নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের হর্টিকালচার ইনোভেশন ল্যাবের গবেষকেরা ২০১৬ সালে লিখেছেন, কচুরিপানার গভীর স্তূপ ছোট মাছের পুকুরের জন্য উপযুক্ত নয়, কারণ পচনশীল কচুরিপানা পানি থেকে অক্সিজেন কমিয়ে দেয়। পুকুরমালিকদের জন্য তাঁরা নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া ও ভার্মিকম্পোস্ট ভরা বাঁশের একটি ভেলা নকশা করেন, যা খালি প্লাস্টিকের পাত্রের ওপর ভাসে; এতে পুকুরের পানির মানের কোনো ক্ষতি তাঁরা পাননি।
ভাসমান বেড তৈরি করতে চাইলে, কিংবা বন্যার পর বীজ, চারা বা পরামর্শের দরকার হলে কৃষক নিজের ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা ডিএইর উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। ডিএইর পরামর্শ অনুযায়ী মাছচাষিরা উপজেলা মৎস্য অফিসে এবং পশুপালকেরা টিকা ও চিকিৎসার জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে যেতে পারেন।
ছবি: Nazmulhuqrussell / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও, জিআইএএইচএস), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বামিস বিশেষ কৃষি আবহাওয়া পরামর্শ, ২৫ আগস্ট ২০২৪), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ফ্যাক্ট শিট, বাংলাপিডিয়া, বাসস, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য ডেইলি স্টার, আইইউসিএন, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব হর্টিকালচারাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, হর্টিকালচার ইনোভেশন ল্যাব (ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস)




মন্তব্য
(০)